সাহিত্যিকের পথরেখা : আয়ুর অরণ্যে এই স্মৃতির জোনাকি || জিহাদ মুনতাছির সাইম

সাহিত্যিকের পথরেখা : আয়ুর অরণ্যে এই স্মৃতির জোনাকি || জিহাদ মুনতাছির সাইম

শেয়ার করুন:

“এ আয়ুর অরণ্য ঘিরে রয়েছে কতশত স্মৃতির জোনাকি—তারা জ্বলছে আর নিভছে। নিভছে আর জ্বলছে। জ্বলছে ফের নিভছে। জ্বলছে…।”

সত্যিই তো, একজন মানুষের সমস্ত জীবন জুড়ে কতশত স্মৃতি! সেইসব স্মৃতির ভাণ্ড আগলেই তো একজন মানুষ একজীবন পার করে দেয়। সমস্ত জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আশা-হতাশার স্মৃতিতেই মানুষ বাঁচে।

‘আমার একলা পথের সাথি’-তে পাপড়ি রহমান সেই স্মৃতিভাণ্ডই আলগা করে দিয়েছেন। তার জীবনের স্মৃতির পালকের হাওয়ায় পাঠককে মোহিত করবার চেষ্টা করেছেন। সেইসব স্মৃতি সব-যে স্নিগ্ধ ঝর্ণার ঝিরিপথের রঙিন নুড়িপাথর, তা কিন্তু নয়! সেখানে বেদনাধারার মলিন নুড়িপাথরের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়। স্বাভাবিকভাবেই একজন মানুষের সমস্ত জীবন জুড়ে আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখের মিশেল থাকবেই। তা মেনে নিয়েই জীবনের স্নিগ্ধ ঝিরিপথ যেমন পার হয়ে যায়, তেমনি খরাগ্রস্ত জলহীন রুক্ষ উত্তপ্ত খটখটে খানাখন্দে ভরা পথও পার হতে হয়। সেই পথে বারবার পুড়ে অঙ্গার হতে হতেই মানুষ একজীবনে সমুদ্র মন্থনের জীবন্মৃতের সন্ধান করে। কেউ পায়, হয়তোবা কেউ পায় না। পাপড়ি রহমানও সন্ধান করছেন। হয়তো পেয়েছেন, হয়তো পাননি। কিন্তু পথহারা তিনি হননি। সাহিত্যের রঙিন আলপনার পথে পা রেখে তিনি সংগ্রাম করে গেছেন। অপমানিত হয়েছেন, দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবুও তিনি দমে যাননি। জীবনের অমৃতবাণী তার ঘাই-কলমের পেট থেকে ঝর্ণাজলের মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন। মানুষকে ভালোবেসেছেন, মানুষের কাছে যেতে চেয়েছেন। প্রকৃতিকে আঁকড়ে ধরেছেন।

আমি ‘আমার একলা পথের সাথি’ পড়তে গিয়ে প্রথম থেকেই একজন নারীর জীবন ও তার সাহিত্যিক হয়ে ওঠার সংগ্রামকে আলাদা করতে চেয়েছি। কিন্তু পারিনি। একজন নারীর জীবনসংগ্রামের চেয়েও একজন নারীর সাহিত্যিক হয়ে ওঠার সংগ্রামের ভূগোল আসলে ভীষণই কঠিন। সেই সংগ্রামের চালচিত্তির পাপড়ি রহমান তার জীবনস্মৃতি ‘আমার একলা পথের সাথি’-তে দেখিয়েছেন। ‘আমার একলা পথের সাথি’-র এক জায়গায় তিনি বলেছেন এইভাবে—

“জীবনের এই বিশাল জলনিধির জোয়ার-ভাটার স্রোতে নিরন্তর ভেসে যাওয়া। কখনো গুপ্তঘাতকের ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছি, কখনো-বা প্রকাশ্যেই কেউ ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি আঘাতে আঘাতে আমায় ক্ষতবিক্ষত করেছে। সেসব ক্ষত সারতে না সারতেই হয়তো অযাচিত সাফল্য এসে অঞ্জলি পূর্ণ করে দিয়েছে। জীবন আদতে কী? জীবন আদতে ব্যালেন্স-বিমের মতো কোনো এক ভারসাম্যের খেলা। সামান্য অনবধান হলেই ভারসাম্যে ভজঘট ঘটে যেতে পারে টালমাটাল হয়ে যেতে পারে চলার সারণি।”

অন্দরমহলের সংগ্রাম আর বহির্জীবনের সংগ্রহকে পাপড়ি রহমান নিজ অঞ্জলি পূর্ণ করে পথ হেঁটেছেন। দেখেছেন মানুষের জীবনের চালচিত্র। লিখেছেন অসামান্য সব ছোটগল্প। লিখেছেন ‘বয়ন’, ‘পালাটিয়া’, ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ কিংবা নারীর সংগ্রাম ঘেঁষা উপন্যাস ‘উষর দিন ধূসর রাত’-এর মতো উপন্যাস। সম্পাদনা করেছে ‘ধূলিচিত্র’-র মতো অসাধারণ লিটলম্যাগ। অনুবাদ করেছেন, সংগঠন গড়েছেন। আবার দাম্পত্য কলহ সামলে সংসারও করেছেন। অপমানের অগ্নিজ্বালাকে ফুল হিসেবে ফুটিয়েছেন সাহিত্যের পাতায় পাতায়। দুঃখকে তিনি শিল্পরূপেই জীবনে স্থান দিয়েছেন।

২.
এবার পাপড়ি রহমানের ভাষা নিয়ে কথা বলা যাক। গত কিছুদিন আগে আমি তার একটি ছোটগল্প পড়ছিলাম। গল্পটার নাম হলো ‘দয়ালহরির আত্মরক্ষা’। যদিও তার আগে আমি ওনার অনেকগুলি ছোটগল্প আর দুটো উপন্যাস পড়েছি, তথাপিও এই গল্পটা পড়ার পর আমি যারপরনাই বিস্মিত হলাম। গল্পের টেক্সট, ভাষা এবং এত কঠিন একটা সাবজেক্টকে তিনি যে সারল্যে উপস্থাপন করেছেন, তাতে একটু বিস্মিত হওয়াই স্বাভাবিক। সেই বিস্ময় এবং মুগ্ধতা নিয়েই ‘আমার একলা পথের সাথি’ পড়তে বসা। ‘আমার একলা পথের সাথি’ পড়তে বসার প্রথমেই ভীষণ জোরে একটা ধাক্কা দিলেন পাপড়ি রহমান। প্রথম প্যারায় তিনি লিখছেন এমন—

“সাহিত্য করতে আসা মানে অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া। এমন-তেমন অন্ধকার নয়, ঘোরঘুট্টি-নিকষকালো অন্ধকার। একেবারে নিঃসাড় তমিস্রা! যে-অন্ধকারে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। পথ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কম। তবুও অনেকেই এই অন্ধকারেই ঝাঁপ দেয়। না-জেনেবুঝেই দেয়! কিংবা জেনে-বুঝে! হয়তো সমুদ্রতটের বালিকণার ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যাওয়ার শব্দ শোনার ইচ্ছায় তারা ঝাঁপ দেয়। অথবা মেঘেদের উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনার আকাঙ্ক্ষায়। সপ্তস্তর গাঢ় অন্ধকারের মাঝে একেবারে ধূসর মেঘের মতন ঢুকে পড়বার আশায় ঝাঁপ দেয়। এমনও হতে পারে তারা হয়তোবা যা কিছু চির-অধরা, সেসবই করায়ত্ত করার আশায় অন্ধকারের চোরাবালিতে পা রাখে।”

পাপড়ি রহমানের ভাষায় এক অলীক সারল্য আছে, যা পাঠকের পাঠকে সহজ করে তোলে। ওনার লেখায় খটোমটো শব্দের ব্যবহার কম বটে, কিন্তু ভাষার সারল্য এবং ভাষার কারুকার্যশোভিত মনোমুগ্ধকর শোভা পাঠককে মোহিত করে (এই উপমা পাপড়ি রহমানের ছোটগল্প এবং উপন্যাসের জন্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা যায়)। পাপড়ি রহমানের গদ্যভাষা পাহাড়ের গা থেকে গড়িয়ে পড়া স্নিগ্ধ ঝর্ণাধারার মতো শীতল। আর পটে আঁকা মহালক্ষ্মীর মায়াময় আঁখিযুগলের মতো তার শোভা।

‘আমার একলা পথের সাথি’-র এক জায়গায় তৎকালীন সময়ের পত্রপত্রিকার বর্ণনা করেছেন এইভাবে—

“শহর জু্ড়ে তখন দৈনিক পত্রিকার ভীষণরকম ডামাডোল চলছে। দুই-চারটা নতুন পত্রিকা তাদের নব-নব পাতা মেলে রোদ্দুরের আলোর দিকে হাত-পা বাড়াতে শুরু করেছে। তাদের বাড়ানো হাতের আঙুলগুলো আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সেই আঙুলগুলোতে ঝাঁপ দেওয়ার আহ্বানও রয়েছে। তারা যেন ডানা মেলে অভয় দিয়ে বলছে—কোথায় আছ সব তরুণ-তুর্কির দল? চলে এসো হে আমাদের কর্মের দুনিয়ায়।”

৩.
‘আমার একলা পথের সাথি’ নিরেট পাপড়ি রহমানেরই জীবনস্মৃতি। এখান থেকে পাঠক একজন নারীর সাহিত্যিক হয়ে ওঠার সংগ্রামকেই অনুভব করতে পারবেন। আর নব্বই দশকের সাহিত্যপাড়ার আলো-হাওয়া-দুর্গন্ধের স্বাদও কিছু কিছু মিলবে ‘আমার একলা পথের সাথি’-তে। নব্বই দশকের নওজোয়ান সাহিত্যিকদের আলাপও কিছু কিছু এসেছে। সব মিলিয়ে বলতে গেলে ‘আমার একলা পথের সাথি’-তে সাহিত্যিক পাপড়ি রহমানকে অনেকখানিই পাওয়া যায়। অনুধাবন করা যায়। তার লেখালেখির আদ্যোপান্ত জানা যায়। এই স্মৃতিকথা পড়ার পর থেকে কবি আবুল হাসানের ‘আবহমান’ কবিতার কয়টি লাইন বারবার মাথায় ঘুরছে। সেইটে দিয়েই এই আলোচনার ইতি টানলাম—

“আমি যেন আবহমান থাকবো বসে
ঠুক ঠুক করে খাবো সূর্যলতা গাছের শিকড়
অন্ধকারের জল!
আমি যেন অনাদিকাল থাকবো বসে
বিশ্রুতিময় জীবনের কল্লোল
আমি যেন আবহমান থাকবো বসে
আবহমান আমিই কল্লোল
সময় থেকে সভ্যতাকে রাখবো ঢেকে
যুদ্ধ মড়ক নগ্ন ফলাফল।”

২৯ জৈষ্ঠ্য ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


গানপারে পাপড়ি রহমান
গানপার বইরিভিয়্যু

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you