লেখাটা কোনো বিশেষ ঘটনার ভিতর দিয়া শুরু হয়নি। বলা যায়, এক ঠাণ্ডা বিকেলের নীরবতা থেকে তার জন্ম। দিনটাতে রোদ নেই, আবার মেঘও নেই। আকাশ এমনভাবে ঝুলে আছে যেন সে নিজেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতেছে। মিনিট দুয়েক আগে দুইটা পাখি উড়ে গেল মাথার উপর দিয়া। আশেপাশে গাছগাছালি কম না, বসার জায়গারও অভাব ছিল না; তবু তারা কোথাও থামল না। কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি ছাড়া, কোনো ঘোষণা ছাড়াই, দুইজন মানুষ যেমন সম্পর্ক শেষ করে চলে যায়—ঠিক সেইরকম নীরবতা মেনেই উড়ে গেল।
মাস দেড়েক আগেও এই এলাকার গাছগুলোর অবস্থা ছিল অন্যরকম। কোনো পাতাপল্লব ছিল না। রাস্তার ধারের গাছগুলারে দেখলে মনে হইত, কেউ যেন সজারুর কাঁটা একসাথে বেঁধে ঝাড়ু বানায়ে দাঁড় করায়ে রাখছে। ছোটবেলায় মা-চাচিরা ঘরের কোনায় যেভাবে ঝাড়ু রাখতেন, ঠিক সেইরকম। পার্থক্য শুধু এই—সেই ঝাড়ুতে কোনোদিন পাখি বসতে দেখি নাই; অথচ এই অরগানিক ঝাড়ুগুলোর ডালে প্রায়ই পাখিদের সাংস্কৃতিক উৎসব বসত। শব্দ, ডানা, উড়াউড়ি আর একধরনের স্বাধীন কোলাহলে ভরে থাকত চারপাশ। এখন সেই উৎসব গত হয়েছে।
এখন গাছে গাছে পাতা। তারও আগে এসেছিল ফুল। আমাদের দেশের অভিজ্ঞতায় গাছ মানেই আগে পাতা, তারপর ফুল, তারপর ফল। অথচ এই দেশের কিছু গাছ সেই নিয়ম মানে না। ঠিক উলটাও না অবশ্য, তবে ফুল আসে এমনভাবে—মনে হয় গাছটা বুঝি ফুলেরই তৈরি। এত বড় বড় ফুলে ভর্তি গাছ দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের প্রায় শূন্যের কোটায়। বইয়ে পড়েছি, মানুষের লেখায় জেনেছি, ছবিতে দেখেছি—কিন্তু তাতে গায়ে লাগে নাই। অন্যের গোসল দেখে যেমন নিজের শরীর ভেজে না, তৃপ্তিও আসে না; তেমনি অন্যের বর্ণনায় প্রকৃতির সৌন্দর্য কেবল তথ্য হয়ে থাকে, অনুভূতি হয় না। তাই পড়ে জানা আর চোখে দেখা—এই দুইটার মাঝখানে বিস্তর দূরত্ব। সেই অচল জায়গাটাই আজ সচল হইছে।
এই ফুলগুলোর আয়ু বড়জোর মাসখানেক। তারপর ধীরে ধীরে পাপড়ি ঝরে যায়, পাতা আসে, আবার ঋতু বদলায়। কিন্তু এই অল্প সময়ের সৌন্দর্যেই মানুষ মুগ্ধ হয়ে যায়। অনেকে ঘরের সামনে এনে লাগায় এই গাছ। এমনই একজন বলছিলেন—“ভাই, ফুল দেখে তো গাছ লাগাইছি। পরে দেখি গাছটা একেবারে বেখামা! কোনো ফলটল দেয় না। আবার ঠাণ্ডা পড়লে পাতাও মইরা যায়। তবে সেই সময়ও দেখতে সুন্দর লাগে—পাতাগুলা দুই-তিন রঙে বদলাইয়া যায়। এই দুইটা ভালোলাগারে পুঁজি কইরাই গাছটারে যত্ন নেওয়া। তিনি আর কোনো কাজের না।”
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আর কী আশা করেছিলেন?”
লোকটা হেসে বলল, “লাগানোর সময় এতকিছু মাথায় আসে নাই। শুধু ফুল দেখেই পাগলের মতো কিনে আনছিলাম। পরে ভাবলাম, হয়তো ফলও দিবে! কিন্তু না—সে শুধু ফুল দেখাইয়া শেষ। সবুজ পাতাগুলা কিছুদিন থাকে, তারপর ঝরে পড়ে। এইটুকুই তার জীবন, এইটুকুই তার সৌন্দর্য।”
কথাগুলা শুনে মনে হলো, প্রকৃতি আসলে মানুষকেই বারবার বোঝায়—সব গাছের কাজ এক না। ফলের গাছে ফুল আসে ঠিকই, কিন্তু সেই ফুলের বাহার এতটা চোখে লাগে না। আবার যে-গাছ ফুলে ভরে থাকে, তারে ফলের ভার বইতে হয় না। দুইটা সৌন্দর্য দুই রকম। যার যা প্রয়োজন, সে তা-ই নিবে।
মানুষও বোধহয় এই নিয়মের বাইরের কিছু না।
একজন মানুষের ভেতরে সব গুণ একসাথে থাকে না। যে খুব সমাজ বোঝে, সে হয়তো লিখতে পারে না। যে গভীর অনুভব নিয়ে শব্দ সাজায়, সে হয়তো দশজনের সঙ্গে মিশে উঠতে পারে না। কেউ ফুলের মতো—তার কাজ চারপাশে গন্ধ ছড়ানো; কেউ ফলের মতো—নিঃশব্দে প্রয়োজন মেটানো।
সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা সবাইরে একই মাপে বিচার করতে চাই। যে লেখে, তারে বলা হয় অসামাজিক। যে চুপচাপ থাকে, তারে বলা হয় অহঙ্কারী। অথচ তার প্রকাশের ধরনটাই শুধু আলাদা। ফলের গাছের ভেতরও ফুল থাকে; না-থাকলে ফল আসবে কেমনে? কিন্তু সে তার সমস্ত শক্তি ফলের দিকে দেয়, ফুলের প্রদর্শনীতে না। আবার যে ফুল হয়ে ফোটে, সে হয়তো ফল দিতে পারবে না—কিন্তু তার সৌন্দর্য মানুষকে থামায়ে রাখে, নিশ্বাস নিতে শেখায়।
প্রকৃতি এইভাবেই ভারসাম্য রাখে। একজনেরে সব দিলে অন্যজন অচল হয়ে যেত। তাই সে ভাগ করে দিয়েছে—কাউরে রঙ, কাউরে গন্ধ, কাউরে ফল, কাউরে শব্দ।
আর এইসব ভাবনার শুরু আসলে খুব ছোট্ট একটা জায়গা থেকে,—আমার গোলাপগাছে ফুল এসেছে।
ভাবছিলাম, এই নিয়ে দুইটা লাইন লিখব। কিন্তু শব্দের পর শব্দ আইসা জড়ো হইতে লাগল। একটা ফুলের সামনে দাঁড়ায়ে মানুষ কত কথা ভাবতে পারে—এইটা হয়তো সবার বেলায় ঘটে না। এইখানেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে লেখকের পার্থক্য।
একজন মানুষ ফুল দেখে ছবি তোলে, পানি দেয়, অতিথিদের দেখায়। আরেকজন মানুষ সেই ফুলের ভেতর নিজের জীবন, অপূর্ণতা, সমাজ, সম্পর্ক—সবকিছুর প্রতিচ্ছবি দেখতে শুরু করে। সে হয়তো ঘর গোছাতে পারে না, সামাজিকতায় খুব পটু না, নিজের জীবনটাকেও সুন্দর করে রাখতে পারে না; কিন্তু একটা ফুল তারে বসায়ে রাখে বহুক্ষণ। তারপর সেই মানুষ ফালতু ফালতু কিছু লেখা লেখে, যেগুলার ভেতর আবার নিজের মতো করে বেঁচে থাকে।
ফুল নিয়ে জীবনানন্দ দাশের একটি অসাধারণ কবিতা আছে। আমরা হয়তো বহুবার পড়েছি, তবু ফুলের কাছে দাঁড়ালে আবারও পড়তে ইচ্ছে করে। কবিতাটির নাম ‘এখানে আকাশ নীল’—
“এখানে আকাশ নীল—নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল ফুটে থাকে হিম শাদা—রং তার আশ্বিনের আলোর মতন…”
কবি যখন ফুলের কথা বলেন, তখন তিনি শুধু ফুল দেখেন না; তার ভেতর দিয়ে সময়, ইতিহাস, মানুষ আর হারায়ে-যাওয়া জীবনের শব্দও শুনতে পান। সজিনার ফুলের পাশে তিনি শুনতে পান কোকিলের ডাক, দেখতে পান মুকুন্দরামের থেমে-যাওয়া লেখা, কিংবা বেহুলার নিঃসঙ্গ যাত্রা। ফুল তখন আর নিছক ফুল থাকে না—সে হয়ে ওঠে স্মৃতির দরজা, মানুষের ভিতরের গোপন পথ।
আবার তাঁর আরেকটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—
“রাত যেন লেবুর ফুলের মত নক্ষত্রের গন্ধ দিয়ে ঘেরা শান্ত সব; শান্তি নেই : তবুও ব্যথার কথা যেন অবান্তর কবেকার জীবনের এইসব লুপ্ত প্রতিচ্ছবির ভেতর।”
এই জায়গাটাতেই বোধহয় কবিরা আলাদা। তারা একমাত্র মানুষ, যারা ফুলের মাঝে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পারে। সমাজের ভাঙাচোরা, মানুষের একাকিত্ব, হারায়ে-যাওয়া সময়—সবকিছুর ছায়া তারা একটা পাপড়ির ভেতরও খুঁজে পায়।
যারা সত্যিকার অর্থে দেখতে পারে, তারা সাধারণত বিচারে যায় না। কারণ তারা জানে, পৃথিবীর প্রতিটা জিনিসেরই আলাদা সৌন্দর্য আছে। ফুলকে ফল না-হওয়ার জন্য দোষ দেওয়া যায় না, আবার ফলের গাছকেও ফুলের বাহার না-থাকার জন্য ছোট করা যায় না। একজন কবি কিংবা লেখকের তাই কারো বিচার মানায় না। সে কাকে বিচার করবে? সবই তো নিজের মতো করে ঠিকঠাক আছে।
ফুলের মতোই সব ঠিকঠাক থাকুক—এই কামনা করেই আজ উবারে বের হই।
১১ মে ২০২৬
আহমদ সায়েম রচনারাশি
- bring me ease on anydays shaggy || Badruzzaman Alamgir - September 1, 2026
- অপূর্ণ জীবনের নান্দনিক সহমর্মিতা || আয়াজ আহমদ বাঙালি - August 30, 2026
- মন হইলো…মানুষ মূলত… || রোদ্দুর রিফাত - August 30, 2026

COMMENTS