ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৩ || পাপড়ি রহমান

ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৩ || পাপড়ি রহমান

শেয়ার করুন:

০৩.
ওয়েদারের ভুলভুলাইয়া দেখে কাটিয়ে দেয়া যায় দিবসরজনি। সারাদিন উজ্জ্বল রোদ্দুরে ছেয়ে থাকে চারপাশ। বিকালের ছায়া নামতে না নামতেই হিম হাওয়া এসে শীতল করে দিয়ে যায় তনুমন। ওই হিমহাওয়া এসে জুত করে বসে ঘরের ভিতর। আর খানিক বাদেবাদেই লেজ নাড়িয়ে জানান দিয়ে যায়—বরফজাদির শকট কিন্তু দোরগোড়ায়। ওভারকোট, বুট আর কয়েক প্রস্ত জামাকাপড় পরার জন্য প্রস্তুত হও হে নওজোয়ান। যদি তুমি নওজোয়ান না হয়ে হও বৃদ্ধ বা বয়স্ক তাহলে আরও কিছুটা কুঁকড়ে যাওয়ার জন্য আপাতত পিঠটাকে শিথিল করে দাও।

হিম হাওয়াকে ফালাফালা করে দিয়ে এ শহর ছুটে চলে অশ্ববেগে। কার সাধ্যি আছে একে থামানোর বা রাশ টেনে ধরার? যেখানে কর্মই জীবন, গতিই জীবনের মূলমন্ত্র। এইখানে আসুক তুষারঝড়। নামুক বরফবৃষ্টি। কিংবা আসমান থেকে ঝরে পড়ুক বড় বড় মেঘের চাঙারি—এ শহর চলমান থাকবে তার আপন গতিতে।

হিমধরা এক বিকেলে ভেসে আসে সুর। সম্মিলিত বাজনার আওয়াজ।
ধিম তানানা ধিম তা, মনটা কেন ভিজতে চায়?

আমরা উৎকর্ণ হই। এই চলমান শহরে এত আনন্দ উপচে পড়ছে কোত্থেকে? ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শব্দউৎস সন্ধান করি। অমল বালকদের উৎসুক মুখচ্ছবি ভাসতে থাকে ইতিউতি। নরম আলোয় ঘেরা নিবিড়-সবুজ ভেদ করে অদূরে জটলা পাকানো লোকজন। কান পাতলে শুনি বেজে চলেছে দারবুকা, আউদ আর রবাব। কখনোসখনো বাজছে বেহালার সুর। মিহি করুণ অথচ স্পষ্ট। আরব দেশের বাদ্যযন্ত্রের ঘোরলাগা সুরে মোহাচ্ছন্ন হয়ে উঠছে মেইপল গাছের শাখাপ্রশাখা। কালো গাড়িতে শাদাফুল আর নেটের সম্মিলনে থমকে দাঁড়ায় পথচারী। কালো স্যুট পরে গ্রুম নামে গাড়ির দরোজা খোলে। আর তখুনি বেজে ওঠে দারবুকা আর আউদ। দ্রিমি-দ্রিমি-ঢিমতা, দ্রিমি-দ্রিমি-ঢিমতা…

গোল বৃত্তের মতো দেখায় গ্রুমের সাথের লোকজনদের। স্কার্ট, শার্ট, গেঞ্জি, প্যান্টের সাথে হিজাবে মাথা ঢাকা। কুচ পরোয়া নাহি!

অগণন গাড়িচলাচলের শব্দকে ভ্যানিশ করে দিয়েছে অ্যারাব-বিবাহবার্তা। অতপর নীরবতা। বুক শূন্য করে দেবার মতো নীরবতা।

বয়স হলেই বরং জমে আড্ডা এবং নীরবতা! / নীরবতার অপর পারে সন্ধ্যে নামার একটু আগে / বয়স হচ্ছে বলেই বোধহয় হাঁটতে হাঁটতে একলা লাগে; / সন্ধ্যে নামার সময় হলে পশ্চিমে নয়, পুবের দিকে, / মুখ ফিরিয়ে ভাববো আমি কোন দেশে রাত হচ্ছে ফিকে…

ফের জোরে বাজতে থাকে দারবুকা। স্বর্গসড়কের ওপাশ থেকে এবার বেজে উঠছে রবাব।
শাদা কারনেশন হাতে ব্রাইড ঘুরে ঘুরে নাচে। ব্রাইডের পাশাপাশি নাচে তার সখিরা।

আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি / নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান। / আন্‌ তবে বীণা আন্ / সপ্তম সুরে বাঁধ্‌ তবে তান॥

দ্রিম দ্রিম নাচে গ্রুম এবং তার বন্ধুরা। জোরেসোরে বাজে আউদ। একটানা বাজিয়েরা বাজিয়ে যায়। একলহমা থামে। ফের শুরু হয় বাজনার ঘূর্ণন। দূর থেকে ব্রাইডের নৃত্যরত ভঙ্গিমা দেখে আমার মনে পড়ে বাউকুড়ানির কথা। ধুলাপরিপূর্ণ বাতাস পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরে। আর বাতাসের ভিতর যেন গোত্তা খাচ্ছে একটা ঝরাপাতা।

পাতার রঙ শাদা। ব্রাইড আদতে গোত্তাই খাচ্ছে। এই হাওয়ার ঘূর্ণি ওকে কোথায় নিয়ে ফেলবে ও তো জানে না। এই গ্রুম কি পড়তে যাচ্ছে ঝড়ের কবলে? তীব্র তুফানের বৃত্তে?

কিন্তু আপাতত সে ভেসে যাচ্ছে হাওয়ার ঘূর্ণির টানে। বলা যায় না। ফের গোত্তা খেয়ে নেমে আসতে পারে মাটিতে। আর পড়তে পারে মুখ থুবড়ে।

বিবাহ তো তাহাই। অন্ধের মতো পাশা খেলে যাওয়া। জুয়ার দান ফেলা। অন্ধকারেই বাজি ধরা। হেরে গেলে দেউলিয়া। জিতলে কোটিপতি। পলকে রাজাধিরাজ।

অন্য দেশ থেকে আলাদা করে রাখার ইচ্ছার কাঁটাতার কি আটকে দিতে পারে নিজের জন্মভূমির ঐতিহ্য, ইতিহাস? মুছে দিতে পারে যা-কিছু মানুষের চিরকালের?

নিয়ম আর কানুন দিয়ে মানুষের দেহ হয়তো আটকে রাখা যায়। কিন্তু মন?

যতক্ষণ কেউ নিজ থেকে সারেন্ডার না করে ততক্ষণ পর্যন্ত তার যা-কিছু আছে সবই স্বাধীন। সবই বল্গাহীন। কেন কেউ যায় আটকাতে?

—‘সে যদি তোমাকে অগ্নিতে ফেলে মারে?’ / বিনা চেষ্টায় মরে যাব একেবারে / — ‘সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান?’ / বৃষ্টিতে, আমি বৃষ্টিতে খানখান / — ‘সে যদি তোমাকে পিষে করে ধুলোবালি?’ / পথ থেকে পথে উড়ে উড়ে যাব খালি...

বিষয় আদতে এইগুলাই। এইগুলা। কিন্তু বোঝে তা কয়জনা?


ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you