
০৭.
মনের ভিতর বেদনার কালশিটে ঘুচাতে কতই না কসরত করি। সংগীতই সংগতি এ-রকম ভাবনা নিয়ে দিবারাত্রি সুরের মায়াজালে বন্দী করতে চাই নিজেকে। পারভেজ খান নামক একজন মিউজিশিয়ানের গান শুনছি। এই লোক দেখতে বেজায় খুবসুরৎ। গান গায় আরও খুবসুরৎ।
আজ অঞ্চিতর ইশকুলে ছিল প্যারেন্টস মিটিং। দেখতে গেলাম ক্যানাডিয়ান ইশকুলের হালচাল। পড়ানোর কায়দাকানুন। এদের হাতে বেত নয় আছে আনন্দের আকর। বাচ্চাদের কীভাবে খেলাচ্ছলে পড়াটা করানো যায় তারই নির্দেশিকা।
কয়েকটা নুড়িপাথরের ওপর বাচ্চাদের নাম লেখা। মানে একেকটা পাথর একেকটা বাচ্চা। আছে থিয়েটার শেখানো। ছবি আঁকা এবং খেলার সরঞ্জামাদি। বই ও রঙিন পেন্সিল। ক্লাসরুম নয় যেন কোনো প্লেগ্রাউণ্ড। সে-রকম করেই সাজিয়ে রাখা।
ক্লাসের এক মেয়েকে অঞ্চিতর ব্যাপক পছন্দ। সে ব্রিটিশ এক্সেন্টে বলে—স্যারাহ।
আমি বলি—সারাহ।
অঞ্চিত বলে—ওহ নো, স্যারাহ।
হাসিতে আমার দম আটকে আসে।
ইশকুলটা যে এত বড়, বাইরে থেকে বোঝা যায় না। অনেক অনেক ক্লাসরুম। আছে জিম ও অডিটোরিয়াম। আমাদের ঢুকবার মুখেই স্যারাহর সাথে দেখা হয়। অঞ্চিত কইমাছের মতো তড়পায় আর বলে—ওহ স্যারাহ, ইউ আর ডান?
আমি সারাহকে দেখি, ওর বাবামাকে দেখি। মা বোরকাওয়ালি। আমাকে সালাম দেয়। সারাহ হলো পঞ্চমবর্ষীয়া বালিকা।
বালিকার চুল কোমর ছাপিয়ে নেমেছে। কালো আঁখিতারা।
আমি মনে মনে বলি—এই বালিকা, তুমি যখন সুর হবে আমি তখন মিলিয়ে যাব। তুমি যখন গান হবে আমি তখন পাখি হয়ে উড়ে যাব। আর তুমি যখন যুবতী হয়ে উঠবে, আমি তখন নদী হয়ে ভেসে যাব বহুদূর।
আমিও নদীর মতো হারিয়ে যাব। আসব না ফিরে আর আসব না ফিরে কোনোদিন…
আহ! জীবন!
জীবন এত ছোট কেনে এ ভুবনে?
Springbank park-এর ছায়ার ভিতর দিয়ে হেঁটে যাই। বড় বড় উঁচা উঁচা বৃক্ষের সারি। Fall-এর রঙ লাগেনি এখনো তেমন করে। দুই/একটা গাছে পাতা ঝরার পূর্বাভাস। যেন জলপাইয়ের পাতার কমলাভা এসে ছোপ ফেলে গ্যাছে।
রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে— / তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে, / তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে / অশ্রুজলের করুণ রাগে॥ / রঙ যেন মোর মর্মে লাগে, আমার সকল কর্মে লাগে, / সন্ধ্যাদীপের আগায় লাগে, গভীর রাতের জাগায় লাগে॥ / যাবার আগে যাও গো আমায় জাগিয়ে দিয়ে, / রক্তে তোমার চরণ-দোলা লাগিয়ে দিয়ে।
অশ্রুজলের করুণ রাগ এসে জড়িয়ে ধরছে এই অনন্তবীথির মালঞ্চ।
আর মাঝখানে নদী ওই বয়ে চলে যায়…
Springbank park-এর মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে যে টেমস নদী—সে-নদী কেমন যেন জবুথুবু। যেন এই নদীর বুক পাথরে বোঝাই। তাই জল নড়ে কী নড়ে না। তাই এ-নদী সরু হয়ে খালের মতো বয়ে চলে যায়।
তবে Springbank park-এ বনস্পতিদের বিস্তার ভালোই বলা চলে। একেকটা বনস্পতি ১০০/১৫০ফুট দৈর্ঘ্য নিয়ে দিব্যি মাথা উঁচা করে দাঁড়িয়ে আছে।
বৃক্ষের বুক ফেটে তৈরি হয়েছে খোঁড়ল। বয়সের ছাপ লেগে আছে গাছেদের গুঁড়িতে। এসব বনস্পতিদের চূড়া দেখতে হলে কাঁধের ওপর মাথা ফেলে রাখতে হয় দীর্ঘক্ষণ। সরাসরি তাকালে ছোঁয়া যাবে না এদের উন্নত শির!
হাওয়ার চলাচল বোধগম্য হয় না বলে টেমস নদীটিকে মৃতবৎ দেখায়। নদীর তীর ঘেঁষে চলে গ্যাছে গাছেদের ঘন হয়ে থাকা। যেন সবুজ কোনো বনানী আগলে রেখেছে জলের ওই আধারটুকু!
টেমসের কলধ্বনি কানে এসে পৌঁছায় না। কিন্তু ছায়ার বিস্তার মনকে প্রফুল্ল করে তোলে।
ফুলফলের গাছ চোখেই পড়ল না। নাকে এসে লাগল না কোনো সুগন্ধি ফুলের বাস্না। অথচ বনভূমি নিবিড়। সবুজ ও সন্নিবেশিত।
ঢাল বেয়ে উঠে গেলে টেমসের ওপরের ব্রিজে চড়া যায়। ব্রিজের উপরে দাঁড়ালে আরও একাত্ম হয়ে ওঠে সবুজ অরণ্য।
কালোকোলো কাঠবিড়ালিরা চঞ্চলতা দেখিয়ে কোন গাছে যে উঠে যায়! বুঝতে চাইলেও বোঝার উপায় নাই। এই অরণ্যে সন্ধ্যা নামে অন্তত সূর্য ডুবে যাবার ঘন্টাখানেক আগে।
সূর্য সোনালি রঙ ছড়িয়ে ক্যানভাসে এঁকে চলেছে মনোরম ছবি। যেন কোনো ভিউকার্ড। আহ! শৈশবে এই ভিউকার্ডের কত কদরই-না করতাম! কেউ একটা ভিউকার্ড গিফট করলে আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠতাম। আমিও নিজের স্বার্থ দিয়া বলি কত কিশোর-যুবককেই না ওই মহামূল্যবান ভিউকার্ড উপহার দিয়েছি। আজ তাদের মাঝ থেকে কতক মানুষ নাই হয়ে গ্যাছে, ভিউকার্ডের সেই অপরূপ ছবিগুলাও আর নাই।
আহ! জীবন হলো অবিরাম স্মৃতির জাবর কেটে চলা! সেই ঝুমঝুম করে বেজে ওঠা তারুণ্য থেকেই আমি কেন জানি—জীবনটা কিছু নয় শুধু একমুঠো ধুলো…?
০৬ অক্টোবর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৭ || পাপড়ি রহমান - June 7, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৬ || পাপড়ি রহমান - May 29, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৫ || পাপড়ি রহমান - May 22, 2026

COMMENTS