পপরাজা মাইকেল জ্যাকসনের জীবন লৈখিক সাহিত্যে বলুন বা প্রাযুক্তিক সিনেমায় যথাযথভাবে তুলে ধরা ব্যাপক কঠিন হবার কথা। জ্যাকসনকে নিয়ে অসংখ্য বায়োপিক, ডকুমেন্টারি ইত্যাদি নির্মিত হয়েছে এইটা আমরা নিশ্চয় জানি। কিছু কিছু তো দেখেছি। বিস্তর টিভিসিনারি। কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্য ম্যুভি নির্মাণ? পরিচালক আঁতোয়াঁ ফুকা প্রথম ব্যক্তি যিনি এই কাজটি নিষ্পন্ন করেছেন। দুইহাজারনয় জুনে এমজে এন্তেকালের পরে এত বছর ধরে কেউ ফ্যুল লেন্থে এমজের উপর ফিচার ফিল্ম করার সাহস করেন নাই। কিন্তু হলো শেষ পর্যন্ত। দুইহাজারছাব্বিশের এপ্রিল মাসের শেষ হপ্তায় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মাইকেল’ চলচ্চিত্রটি জ্যাকসনের জীবনের এক বিদ্যুৎস্পর্শী চিত্রায়ন, কথাটা ‘মাইকেল’ দেখে যে-কেউ স্বীকার করব।
চলচ্চিত্রটি জ্যাকসনের জীবনের প্রতিটি দিক তুলে ধরেছে এমন নয় নিশ্চয়। নাইন্টিনএইটিফোরে পেপসির সেই ভয়াবহ বিজ্ঞাপনের ঘটনার ঠিক পরেই চলচ্চিত্রটি শেষ করা ফুকার একটি ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে বলা যেতে পারে, যেখানে জ্যাকসন আঘাত পেয়েছিলেন প্রচণ্ড এবং যা তার পরবর্তী জীবনে ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল। চলচ্চিত্রটিতে জ্যাকসনের জীবনের শুরুর দিনগুলোর উপর আলোকপাত করতে দেখা যায়, বিশেষ উল্লেখ্য তার পরিবারের সদস্যদের সমবায়ে ব্যান্ড ‘দ্য জ্যাকসন ফাইভ’-এ কাটানো সময় এবং তার একক ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোর উপর।
মূলত চলচ্চিত্রটি জ্যাকসনের বেড়ে ওঠা এবং একজন তারকা হয়ে ওঠার গল্প। দর্শকরা সরাসরি দেখতে পান সেই শিল্পক্ষুধা, শৃঙ্খলা, চাপ ও অসাধারণ প্রতিভা, যা জ্যাকসনকে এমনই শীর্ষছোঁয়া তারকা হতে সহায়তা করেছে। এই সিনেমাটি পপসম্রাটের প্রকৃত ভক্তদের জন্য, মনে রাখলে ভালো, জ্যাকসনের উপর একটি সত্যিকারের বায়োপিক দেখতে চাওয়া দর্শকদের জন্য নয়।
সিনেমাটির সেরা অংশ, যাকে শ্রেষ্ঠাংশ বলি বাংলায়, পপরাজার চরিত্র রূপদান করা তারকা জাফর জ্যাকসন। মাইকেল জ্যাকসনের ভাগ্নে সিনেমাটিতে তাঁর চরিত্রে অভিনয় করবেন শুনে এটি রিলিজের আগে থেকেই বিশ্বজুড়ে দর্শকদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী হয়ে যায়। মাইকেলের চরিত্র ফোটাবার ক্ষেত্রে তাঁর নিজের রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ভালো আর কে হতে পারে? জাফর দুনিয়াজোড়া ছায়াছবিদর্শকদের সেই প্রত্যাশার কথা জানতেন নিশ্চয়। সিনেমা দেখে মনে হয়েছে জেজে, মানে জাফর জ্যাকসন, এমজের ভাগ্নে জনপ্রত্যাশার দাগ ছুঁয়ে বেরিয়ে যেতে পেরেছেন অনেক দূরে।
সত্যিই, জাফর জ্যাকসনের অভিনয় এখানে অসাধারণ হয়েছে। মনে হচ্ছিল যেন দর্শকরা কোনো সিনেমা দেখছেন না, বরং স্বয়ং মাইকেলকেই দেখছেন। রক্তসম্পর্কীয় আঙ্কেলের চরিত্রে অভিনেতার সাবলীল ও সুগভীর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় সিনেমাটিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে পেরেছে এবং নিঃসন্দেহে এইটা অ্যাক্লেইম পাবে বড় বড় চলচ্চিত্রোৎসবে, দেখতে দেখতে এমনটা আন্দাজ হয়।

সিনেমাটির আরেকটি প্রশংসনীয় দিক হচ্ছে এর সাউন্ডস্কোর। প্রশংসনীয় সংগীতদৃশ্যগুলো। দর্শক হবার আগে জ্যাকসনের ভক্ত হবার কারণে এই সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যই আমার কাছে মনে হচ্ছিল অবিশ্বাস্যভাবে স্মৃতিজীবন্ত। মনে হচ্ছিল যেন সরাসরি দর্শকাসনে বসে জ্যাকসনকে মঞ্চ মাতাতে দেখছি! সাউন্ডট্র্যাকটি ছিল অসাধারণ–প্রতিটি গান নিখুঁতভাবে বাছাই করা, আর সেগুলি ছিল জ্যাকসনের ক্যারিয়ারের সেরা কিছু গান।
দর্শকরা জ্যাকসনের পুরো জীবন না দেখানোর জন্য চলচ্চিত্রটির সমালোচনা করতে পারেন; তবে, চলচ্চিত্রটির উদ্দেশ্যই ছিল না জ্যাকসনের জীবন আদ্যোপান্ত দেখানো। বরং এর উদ্দেশ্য ছিল জ্যাকসনের শিল্পকলার সৌন্দর্য দেখানো এবং তিনি যা-কিছুর প্রতিনিধিত্ব করতেন সেসবের ওপর আলোকপাত করা। আবার, এ-ও শুনলাম যে ফুকা ‘মাইকেল’-এর একটি সিক্যুয়েল নিয়া কাজ করছেন, যেখানে এমজের ‘ব্যাড’ (অ্যালবামনাম ও মাইকেলের একটি বিশেষ পর্যায়সূচক) যুগ থেকে শুরু করে ২০০৯ সালে মাত্র পঞ্চাশে পৌঁছে আকস্মিক অকালমৃত্যু পর্যন্ত জীবন দেখানো হবে।
সামগ্রিকভাবে চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত আবেগঘন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে দর্শকদেরে। এটি দেখায় যে সত্যিকারের মহান হয়ে উঠতে কী ধরনের মেহনত ও লড়াই প্রয়োজন হয়। জ্যাকসনের বাবা জো থেকে শুরু করে তাঁর জীবন বদলে দেওয়া পেপসি বিজ্ঞাপন শ্যুটকালীন ঘটনা পর্যন্ত বিভিন্ন মানসিক আঘাতের কথা তুলে ধরে চলচ্চিত্রটি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। জ্যাকসনের জীবন সম্পর্কে পড়া বা শোনা এক জিনিস, কিন্তু সেটিকে এমন রক্তমাংশহৃদয়ময় বাস্তবরূপে অভিনয় করতে দেখাটা আসলেই ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
যা হোক, সমালোচকরা যা-ই বলুক, ছবিটি অবশ্যই দেখার মতো। তবে এমজে নিয়া নানাবিধ সত্যিমিথ্যা জানাজানির পরে একজন দর্শক যখন সিনেমাটি দেখতে স্ক্রিনে চোখ রাখবেন তখন যেন বহুমাধ্যমবাহিত পূর্বজ্ঞানটাকে একটু সরিয়ে রেখে ডিরেক্টরের কাজটাকে দেখেন। মন্দভালো নিয়া আলাপ তো পরের ব্যাপার, আগে চাই নির্মোহভাবে দেখা।
ফাইরুজ রাইহান
গানপারে মাইকেল
গানপার ম্যুভিরিভিয়্যু
- আধখানা মাইকেল - June 4, 2026
- মানুষ ও যন্ত্রের ভবিষ্যৎ || আহমদ সায়েম - May 29, 2026
- আবের পাঙ্খা লৈয়া যাপিত সময়গুলি || রতন দেব - May 23, 2026

COMMENTS