সিলেট শহরের জিন্দাবাজারে রাজা ম্যানশনের তিন তলায় দুই হাজার আট-নয় সালে চিত্রশিল্পী ইসমাইল গনি হিমনের বিমূর্ত নামে একটি ছোট আর্টস্পেস ছিল। হিমন বিমূর্ত নামে একটা প্রকাশনাও দাঁড় করানোর চেষ্টা চালায়। আমাদের অনেকেরই প্রথম কবিতাপুস্তক তার বিমূর্ত থেকে প্রকাশ পায়। সেই সময়টাতে বিমূর্ততে নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার। ওই সময়ে হিমনের আঁকা অসংখ্য রেখাচিত্র আমার কবিতার খাতায় রয়েছে। মূলত ওগুলো কবিতার ইলাস্ট্রেশন। আমাদের মধ্যে এসব ছাড়াও পাঠাভিজ্ঞতা শেয়ার করার একটা চর্চা ছিল। একদিন হিমন আমাকে কোনও ভূমিকা ছাড়াই একটা অনিয়মিত সাইজের পেপারব্যাক বই দেয় পড়ার জন্য। নাম ‘আমি চাক্ষিক, রূপকার মাত্র’। রামকিঙ্কর বেইজের ভাবনা, সাক্ষাৎকার ও ড্রয়িং দিয়ে সংকলন ও বিন্যাস করেছেন সন্দীপন ভট্টাচার্য। রামকিঙ্কর সেই যে মনে ঠাঁই নিয়েছেন, আজও সমান প্রীতিতে রয়ে গেছেন; বরং বলতে হয়, দিন দিন সেই প্রীতি আরও বাড়ছে। নানান উপায়ে তাঁকে জানার চেষ্টাতেও যে কী আনন্দ তা বলে শেষ হবে না।
তাঁকে খুঁজতে গিয়ে সমরেশ বসুর অসমাপ্ত উপন্যাস ‘দেখি নাই ফিরে’, ঋত্বিক ঘটকের অসমাপ্ত প্রামাণ্যচিত্র ‘রামকিঙ্কর বেইজ’, কিংবা মণীন্দ্র গুপ্তের ‘রঙ কাঁকর রামকিঙ্কর’—সবই আমাকে এক ধরনের উদাস বিষণ্নতায় ভরিয়ে তোলে। মনে হয়, তাঁকে ঘিরে যত শব্দ, বাক্য, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা কিংবা ভাস্কর্যের আয়োজন, সব মিলিয়েও যে একক মূর্তি দাঁড়ায়, তা অসমাপ্ত, অপূর্ণ, আংশিক মাত্র। তবু সেই আংশিকতাগুলোরও গভীর গুরুত্ব আছে।
প্রায়ই ভাবি, একদিন শান্তিনিকেতন যাব। দেখে আসব তাঁর কাজগুলো। সুজাতা ও বুদ্ধের ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে কল্পনা করতে চেষ্টা করব, কীভাবে মাস্টারমশাই কিঙ্করদাকে পায়েসের পাত্রটির কথা শুনিয়েছিলেন, অথবা কীভাবে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন খোলা আকাশের নিচে মূর্তিতে মূর্তিতে পরিপূর্ণ করে দিতে—যে কথাটির জন্য আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি, আর এই ফিরে না তাকানোকে উৎস করেই জন্ম নিয়েছিল সমরেশের ‘দেখি নাই ফিরে’। আড়ালে তখন হয়তো ভেসে উঠবে তাঁর ছাত্রী জয়া আপ্পাস্বামীর আবছা মুখ, কিংবা শরীর থেকে শরীরে রঙ ছড়িয়ে দেওয়া আসামের মেয়ে নীলিমা বড়ুয়ার হারিয়ে যাওয়া পোর্ট্রেট। ভুবনডাঙার খাদু, মণিপুরের বিনোদিনী, রাধারানী—প্রতিটি নাম যেন শিল্পী ও শিল্পের অভিপ্রায়ের ভেতর দ্বিমাত্রিক কিংবা ত্রিমাত্রিক হয়ে আমাকে টানে।

কোনও ছকবাঁধা নিয়মের দাস না হয়ে জীবনযাপনের শিল্প এবং শিল্পের রূপায়ন কিঙ্করকে তাঁর স্বমূর্তি সৃষ্টিতে শক্তি জুগিয়েছে। তিনি মডেল না নেওয়া এবং তেলরঙ ব্যবহার না করার মতো ভারতীয় শিল্পেমূল্যবোধ রক্ষার শান্তিনিকেতনী সংযম পালনের আদর্শে নিজেকে সমর্পণ করেননি। শিল্পের বিশ্বজনীন পথের দিকে ধাবিত কিঙ্করই সর্বপ্রথম শান্তিনিকেতনে মডেল নিয়েছেন, তেলরঙে ছবি এঁকেছেন। কলাভবনের ছাত্র থেকে পরে শিক্ষক হয়েছেন; ভাস্কর্য বিভাগের প্রধান হিসেবে সেখান থেকেই নিয়েছেন অবসর।
ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বাঁকুড়া যুগীপাড়ায় ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ শে মে, রামকিঙ্করের জন্ম। পিতা চণ্ডীচরণ, আর মাতা সম্পূর্ণা। পিতা পেশায় একজন নাপিত ছিলেন। ক্ষৌরকর্ম ছিল তাদের পারিবারিক বৃত্তি। পারিবারিক পদবী ছিল প্রামাণিক। বেইজ পদবী কিঙ্করের নিজের দেওয়া। সেই রামকিঙ্কর বেইজের জীবনাবসান হয় ভারতীয় আধুনিক ভাস্কর্যের পুরোধা হিসেবে। যদিও বর্ণবাদী সমাজের তুচ্ছতাচ্ছিল্য তাঁকে আমৃত্যু সহ্য করতে হয়েছে। নিজের এলাকায় অনেক উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কাছে তিনি ছিলেন স্রেফ চণ্ডি নাপিতের ছেলে। তাদের কাছে না তিনি শিল্পী, না একজন অধ্যাপক। রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর শান্তিনিকেতনেও বর্ণবাবাদীদের ঈর্ষার শিকার হন। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। লড়াই জারি রেখেছিলেন।

অদ্ভুত অপরূপ মানবিক প্রেমের প্রতিভূ হয়ে ভেঙে দিয়েছিলেন তথাকথিত সামাজিক মূল্যবোধ। তাঁর মডেল রাধারানী, যিনি একসময় রবীন্দ্রনাথের কন্যার গৃহপরিচারিকা ছিলেন, তাঁর সাথে বিয়েবহির্ভূত একত্রবাস সমাজের স্রোতের উজানে শিল্পীর এক তীব্র সাঁতার যেন মনে হয়। ডোমকন্যা রাধারানীকে আর তাঁকে জড়িয়ে কত কথা উড়েছে শান্তিনিকেতনে, হয়ত আজও সেই সব কথা ভেসে বেড়ায়। কিন্তু তিনি সে সময় ওসবে মোটেও কর্ণপাত করেননি। নিজের স্থায়ী বাসস্থান না থাকলেও ভুবনডাঙায় রাধারানীর জন্য একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন তিনি। মনে হয়, রামকিঙ্কর শুধু তাঁকে শিল্পের মডেল করেননি, তথাকথিত ভদ্রলোক সমাজের মুখেও যেন একপ্রকার ঝাঁটা মেরেছিলেন।
একবার দেশিকোত্তম উপাধিতে সম্মানিত হওয়ার পর কলাভবনের ছাত্ররা তাঁকে সংবর্ধনা জানানোর উদ্যোগ নেয়। অনুষ্ঠানে উপাচার্য নিজে সভাপতিত্ব করবেন। এই খবর জানিয়ে ছাত্ররা রামকিঙ্করের সম্মতি চাইতে গেলে তিনি একটি শর্ত রাখেন। তাঁর শর্ত ছিল, মঞ্চে উপাচার্যের পাশে সমান মর্যাদায় রাধারানীর আসন নিশ্চিত করা হলে, তবেই তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ছাত্ররা প্রথমে বিস্মিত হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়।


COMMENTS