“জীবন জীবিতের, জীবিতের ধর্ম বহতা অমোঘ দুর্নিবার। সব পুড়ছে ব্রহ্মান্ড পুড়ছে, আমিও পুড়ছি…”
—ঋত্বিক ঘটক
জীবন হলো শেখার ও নিজের মতো করে বাঁচার একটি সুন্দর যাত্রা। জীবন মোচড়ানো ব্যথায় হাত-পা ছেড়ে দেয়া বিড়াল-ঘুম।
আশ্চর্য কত কত মানুষের স্বপ্ন এঁকে এঁকে বিলীন করে দিয়েছি, তা জানা নাই৷ তেমনি এক আশ্চর্য মানুষ অমৃত। যাকে আমি কয়েকবার কাছ থেকে দেখেছি। পঁচিশমাইল আর বড়বাইদ জামিয়া ইসলামিয়া সৈয়দ আহমাদিয়া এতিমখানা ও মাদরাসার মাঝামাঝি কিংবা একটু আগে পরেও হতে পারে একটা বিশাল বড় বটগাছের নিচে অমৃতের অস্থায়ী চায়ের দোকান। একটা চায়ের দোকানে আমরা সাধারণত একটা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ খুঁজে পাই, যেখানে মানুষ চা খেতে খেতে নিজদের চিন্তাভাবনা ভাগ করে নেয়। এখানে এর তেমন কিছুই ঘটে না, কিংবা ঘটে।
একবার বনের ভেতর দিয়ে বাড়ির দিকে যাওয়ার সময় দেখলাম—অমৃত হাতের মুঠে করে দোকানের সামনে মুড়ি ছিটিয়ে দিচ্ছে। বানরগুলোও সাথে সাথে এসে গেল সেই মুড়ি খাওয়ার জন্যে। সম্ভবত তার কিছুক্ষণ আগে এখানে হালকা বৃষ্টি হয়ে গেছে। সেই ভেজা রাস্তায় দাঁড়িয়ে অমৃত একবার ভেবে দেখেছেন কি গাছেদের চারপাশে দাঁড়িয়ে—আমি যে তাদের থেকে ভিন্ন এক গাছ। কিন্তু কখনো হৃদয়ের কথা শুনেছেন কি অমৃত?
এই যে বানরদেরকে তার দোকানের সামনে বসিয়ে রাখা, এটা তার কৌশল ধরে নিতে পারেন। যখন শিশুবাচ্চারা বানার দেখার ছলে অটো-সিএনজি থামিয়ে সেখানে নামবে, তারপর তার বেচাকেনার ভেতর দিয়ে দৃশ্যের পর দৃশ্য দর্শিত হবে। অমৃতের মতো মানুষ যারা তারা ন্যূনতম বাঁচার স্বপ্ন দেখেন। এই বেঁচে থাকার সংগ্রামে প্রকৃতি, স্মৃতি ও মানবিকতার একটা কোমল জগৎ তৈরি করেন। হয়তো অমৃতের আরো কতকিছুর সাথে বয়ে বেড়ানো আছে। যা আমাদের দেখার বাইরে, যোগ হবে না কখনো!

এই তো কয়েকদিন আগে বাড়ি থেকে মধুপুরে আসার পথে ওর দোকানে গেলাম। সিএনজিতে আমি আর সিএনজিচালক এই দুজনেই ছিলাম। সিএনজিচালকের নাম আশরাফুল। চলতি পথে আশারাফুলের সাথে গল্প করতে করতে আসলাম। অমৃতের দোকানের কাছাকাছি আসতেই আশরাফুলকে বললাম আসো চা খাই। আশরাফুল রাজি হয়ে গেল। তারপর আমরা নামলাম। আমি গিয়ে বসলাম একটা ডালের উপর। বটগাছের শিকড় দুইপাশে গর্ত করে এই ডালটা বসানো। অদ্ভুত এক বসার আনন্দ যেন। আনন্দে আমার শরীর বিছিয়ে দিলাম। একটি পাখির পালক ঝরে পড়ল। তার সাথে বিনয় করে ঝরে পড়ল কিছু পাতা। যেখানে আমার উপস্থিতি ছিল। ছিল ভেতরে এক অজানা গানের প্রবাহে গতি ও বিরতির ক্রিয়া। চা খাওয়া শেষ হলে অমৃতকে জিজ্ঞাস করলাম—এই যে তোমার দোকান, নাম কী?
উত্তরে সে আমাকে বলেছিল—যেহেতু তুমিহীন তুমি আর আমিহীন আমি, তাই কখনো দোকানের নাম নিয়া ভাবি নাই। তবে তুমি চাইলে ভাবতে পারো—বটতলার দোকান।
গরম বাতাসের বেগ বাড়ে, সঙ্গে সঙ্গে বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির ফোঁটা ফাঁক ফাঁক দূরত্বে পড়তে থাকে। আর আমার পেছনে ফেলে আসার দূরত্বও বাড়তে থাকে।
*লেখায় ব্যবহৃত ছবি লেখকের সৌজন্যে পাওয়া।—গানপার
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- নিঃশব্দে পাহারা দেয় কেউ আশ্চর্য জীবন || শুভ্র সরকার - June 3, 2026
- বনটিয়ার গলাকাটা গান || শুভ্র সরকার - May 29, 2026
- যে গান ছোট হয়ে আসে || শুভ্র সরকার - May 24, 2026

COMMENTS