মনফকিরা প্রকাশনীর প্রিয় সন্দীপন ভট্টাচার্য চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। খবরটা নীরবে পাঠ করলাম। তারপর গোটা একটা দিন চলে গেল। কি লিখব ভেবে পাইনি। সন্দীপন ভট্টাচার্যকে কেবল প্রকাশক বলব তা কি করে হয়। তিনি একাধারে লেখক, অনুবাদক এবং শিল্পীও। একটা মাল্টিডিসিপ্লিনারি মানুষ। গত বছরগুলোতে কতবার কলকাতা গেলাম একবারও সময় করে সন্দীপনদার কাছে যাওয়া হলো না এটা নিয়ে একটা অপরাধবোধ রয়ে গেল মনে। কত প্রিয় মুখ চলে যাচ্ছেন। যার গান শুনে গান গাইবার প্রেরণা পেয়েছিলাম সেই প্রতুল মুখোপাধ্যায় চলে গেলেন অথচ আমাদের কথা হয়েছিল ম্যাসেঞ্জারে যে আমি তাঁর ইন্টারভিউ করব। তা আর হলো না। সন্দীপন ভট্টাচার্যর চলে যাওয়াটাও তেমনই স্তম্ভিত করল আমায়।
আমাদের শেষ কথা হয়েছিল ম্যাসেঞ্জারেই। আমি তাকে ব্রেটল্ট বেখটের নির্বাসনে লেখা রোজনামচার কয়েক ছত্র পাঠ করে সেটির ভিডিও পাঠিয়েছিলাম। আর আমি লেখাগুলো পাঠ করেছিলাম শব্দায়ন-এর আবৃত্তি অনুষ্ঠানে গত বছর আগস্টে। কি করে যেন সেই পাঠের অংশ মনে করে পাঠিয়েছিলাম তাঁকে। তিনি দেখেছেন আর একটা শব্দে উত্তর লিখেছিলেন, ‘অভিভূত’! তারপর আগের মতোই নীরবতায় ডুব দিলেন। আর গতকাল জানতে পারলাম তিনি নেই।

আমি যখন আর্ট কলেজে পড়ি, ২০০০ সালের কথাই বলছি, সে-সময় বাংলাবাজারে আমার আনাগোনা শুরু হলো। সেখানে নবযুগ প্রকাশনীর বইয়ের দোকানে কলকাতার বইয়ের সম্ভার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। ঘন্টার পর ঘন্টা ধুলোজমা বই থেকে শুরু করে নতুন বইয়ের চাঁই। সেসব থেকে বেছে বেছে দুই একটা বই তাও খুব অল্প দামের হলে সেসব নিয়ে বাড়ি ফেরা। ক্লাস না থাকলে এ ছিল সে-সময়ের নিত্য কাজ আমার। হাত খরচ বাঁচিয়ে বই কিনে বাড়ি ফেরা। তো সেই সময় মনচাষা, মনফকিরা এদের বই নজরে এল। আলাদা করে নজরে পড়ার বহু কারণ আছে। প্রথম কারণ বইগুলো ভীষণ আলাদা ছিল আকারে প্রকারে, নকশায়। ‘পর্নটোপিয়া’, ‘গ্রাফিতি এক অবৈধ শিল্প’, ‘ডিলান ডিলান ফিফটি ফিফটি’, ‘কহেন কবি কোহেন’, ‘চা চরিত’, ‘ব্রেখট এর নির্বাসনে লেখা কবিতা’ এ-রকম আরও কত কত চটি বই। এসব বই হাতে নিলে আর রেখে আসতে পারতাম না। দরকার হলে বাকির খাতা খুলতে হতো।
এবং সেসময় একটু একটু বাংলাদেশের প্রকাশনা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। মহিউদ্দিন আহমেদের প্রকাশনা বিষয়ক বইটি হাতে এসেছে, চকবাজারের কেতাব পট্টির ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হচ্ছি। এবং প্রচ্ছদ আঁকার কাজ মাত্র শুরু করেছি। এ-রকম অবস্থায় প্রকাশনা বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত কিছুতে বুঁদ হয়ে থাকি তখন। আগামী প্রকাশনীর কামরুল হাসান মেনন ভাই, বাংলায়ন-এর অস্ট্রিক আর্যু ভাই, ঐতিহ্য প্রকাশনীর নাঈম ভাই এদের কাছ থেকে বাংলা প্রকাশনার পাঠ নিচ্ছি সে-সময়। ঠিক সে-সময়েই সন্দীপনদার মনফকিরা আমাদের নজরে এল। এবং কি কারণে যেন বইগুলো দেখলে মনে হতো এগুলো কেবল ছাপার জন্য তিনি প্রকাশ করেননি, এর পেছনে যেন অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। একটা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বোধ না থাকলে বক্তব্য না থাকলে এসব প্রকাশ করার কথা না। এই বার্তাটুকু পাঠক হিসেবে আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছিল। আমাদের অনেক মেধাবী বন্ধু সেসব বই দেখে মনে মনে প্রকাশক হয়ে ওঠার বাসনাও ব্যক্ত করল কেউ কেউ। ফলে বোঝাই যাচ্ছে কলকাতার দে’জ, আনন্দ বা প্রতিভাস-এর মতো ডাকসাইটে প্রকাশকের গ্ল্যামারকে ছাপিয়ে সে-সময় মনফকিরা হয়ে উঠেছিল আমাদের মনের খোরাক।

মনফকিরার অনূদিত বইগুলোর ভাষাও ছিল ভিন্ন। যতটা পারা যায় কন্টেক্সটকে সাথে নিয়ে বাংলা ভাষার পাঠকের অনুকূলে রেখে তবেই তিনি সেসব ভাষান্তর করতেন। ফলে তা ছিল প্রাঞ্জল আর ঝরঝরে। সন্দীপনদা বইপ্রকাশকে আন্দোলন মনে করতেন। তার একটা সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল লাল জীপের ডায়েরীতে, যেখানে আমিও যুক্ত ছিলাম প্রশ্নপর্বে। সেখানে সন্দীপনদা সবিস্তার বলেছেন তার বই-প্রকাশনা ভাবনার আদি অন্ত। একটা বদলের ভাবনা তার ছিলই। এবং একই সাথে ছিল একটা কোথাও পৌঁছুতে না পারার বেদনা।
জীবনানন্দ ছিল তার প্রিয় কবি। সন্দীপনদার সাথে নোকতা প্রকাশনীর মুনীরভাইয়ের বেশ ভালো যোগাযোগ ছিল। আমি মুনীরভাইয়ের কাছেও শুনেছি তিনি বইকে কীভাবে একটা আদর্শের ইশতেহারের মতো পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চান সে-কথা। তিনি বুকফ্যাশন পছন্দ করলেও তার নিজের বেলায় চাইতেন কম দামে দরকারি টেক্সটটা মানুষের হাতে পৌঁছে যাক। কোনো প্রতিবন্ধকতায় যেন পাঠককে পড়তে না হয়। আজ আমরা জানি বইয়ের মূল্য কেমন আকাশচুম্বী। তার যথেষ্ট কারণও আছে। কিন্তু সন্দীপনদা সেই জটিল অঙ্কটি মিলিয়ে ফেলেছিলেন। এপার বাংলার এক কৌতূহলী পাঠকের কাছে সুলভ মূল্যে বই পৌঁছে দেবার কঠিন কাজটি তিনি সমাধা করেছিলেন। আমরা হাতে পেয়েছিলাম পড়বার উপকরণ।

মনফকিরার ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গে নিশ্চয়ই আরও অনেক অফট্র্যাকের প্রকাশনার চল শুরু হয়েছিল। কেবল মনফকিরাই নয় সেসব প্রকাশনাগুলোও তখন প্রচলিত বিষয়বস্তুর বাইরে বহু বিষয় নিয়ে বই করতে শুরু করলেন। এখানেই সন্দীপনদার সাফল্য। তিনি যে-বইনির্মাণের ভাবনা বয়ে বেড়াচ্ছিলেন বা যা তিনি একা একাই করে যাচ্ছিলেন তা যেন আরও অনেককে উদবুদ্ধ করল।
মনফকিরা সারা কলকাতার প্রকাশনায় এক নতুন মাত্রা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল ২০০৫ সালে। সেই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। সন্দীপন ভট্টাচার্য চলে গেলেন তার কীর্তি রেখে, আমরা সাহিত্যের পাঠকেরা তার প্রকাশনার এই ইশতেহার আরও কিছুকাল মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে দিতে চাই।
তাঁর আত্মার নির্বাণ কামনা করি।
৩১ মে ২০২৬
গানপারে মনফকিরা
গানপারে সন্দীপন ভট্টাচার্য
শিবু কুমার শীল রচনারাশি
- সন্দীপন দ্য মনফকিরা || শিবু কুমার শীল - June 2, 2026
- শিশু সুরক্ষায় শীতলা দেবী || শিবু কুমার শীল - May 8, 2026
- এষকুশলাদি || শিবু কুমার শীল - May 1, 2026

COMMENTS