তোফা হয় একবার একটা ঘুরান্টি দিয়া আসতে পারলে, স্টেইটসে তেমনটা যাইবার জন্য খোয়ায়েশ নাই মনে করেন, বা লান্ডানে যে একদম মুখায়া আছি যাইতে তেমনও না, ক্যানাডায় একবার গেলে মন্দ হয় না, আইস্-স্কেইটিং করা যাইত মনের হরষে, সবচেয়ে ভালো হয় একবার ভোদকাবান্ধব মস্কো ঘুরে এলে। ক্রেইমলিনের ঘণ্টাধ্বনিটাও তো কবে ম্যাকডোনাল্ডসের কাছে বেচে দেয় রুশিরা, তার আগে একবার রেকি করে আসা দরকার। আদ্দিসআবাবা নামে একটা জায়গা আছে, ছেলেবেলায় ইশকুলের বইতে পড়েছিলাম, সেইখানেও মনোরহস্যময় অজ্ঞাত কোনো কারণে ছেলেবেলা থেকেই যাব-যাব করছি। কিংবা শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের সাধনপীঠে একটাবার না-গেলে ব্যাপারটা বেন্যায় হয়া যায়। যেইসব জায়গায় যাইতে চেয়েছি জীবনে, সেইসব জায়গার সকাশে এইবার অনতিবিলম্বে বেরিয়ে পড়া দরকার। সফরে বেরোনোর বোঁচকাগাট্টি বাঁধাছাঁদা রাখতে হয়। পশ্চিমে দণ্ডেক বেলা নাই যে!
২
এইটা ঠিক যে, ফ্যাসিন্যাশন যতটা পাহাড়ের প্রতি, ম্যাড়ম্যাড়ে লাগে সেই-তুলনায় সমুদ্রসলিল, যত দুস্তরই হোক পারাবার, সমুদ্র কভু প্রণয়িনী ছিল না আমার, সমুদ্রবন্ডেজ ফিল করি নাই কখনো, নৈব চ, নেভার এভার। বরঞ্চ দুর্গম গিরি কান্তার মরু আমায় টেনেছে বারবার। তুলতুলে ল্যান্ডস্কেইপ, গোছানো ভূনৈসর্গিক নন্দনশোভিত জমিজিরেত, দরদালানের পারিপাট্য কখনো ভ্রমণ-পর্যটন প্রভৃতির জন্য ল্যুক্রেটিভ মনে হয় না আমার। পার্সওয়ালেট-আগলানো পুতুপুতু কর্পোরেট-এক্সিকিউটিভ ভীতুড্ডিমদের জন্য ওইসব সুবন্দোবস্ত। বঙ্গোপসমুদ্দুরে যেয়ে বেলাভূমবালুকায় সিক্তবসন পোজ, মুই না-পারিমু, মোরে ক্ষমিও প্রাণেশ্বরী প্রিয়তম! বরঞ্চ কলোর্যাডো রকি পর্বতাভিযানে বেরোই চলো, দুইজনে মাউন্টেইনিয়ারিং করি এসো, অথবা অ্যালাস্কায় যাই, সমুদ্রচন্দ্রিমার পরিবর্তে পর্বতচন্দ্রিমা আরও দুর্ধর্ষ অর্গ্যাজমিক না-হইবার কারণ তো দেখি না। অ্যাল্পাইন স্টাইলে মাউন্টেইনিয়ারিং আমাদিগেরে অফার করছে একইসঙ্গে স্নো-ক্লাইম্বিং, আইস্-ক্লাইম্বিং, রক-ক্লাইম্বিং এবং গ্ল্যাসিয়ার-ট্র্যাভেল মিলিয়ে একটি মিক্সচার প্যাকেজ; সো, মন্দ হয় না, ভেবে দ্যাখো। মোদ্দা কথা, পাহাড় লাগে ভালো, সমুদ্র ন পোষায়। আকাশে হেলান দিয়া ঘুমানো ওই সিনোরিতা পাহাড়।
৩
দার্জিলিং জায়গাটা ভারি মনোরম, বুঝলে? এই দ্যাখো, মনোরম শব্দোচ্চারমাত্রই ইলিয়াসের মুখ মনে পড়ে যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, দুর্দান্ত অক্সিমোরোন ‘মনোরম মনোটোনাস’ শব্দজোড়ের আবিষ্কর্তা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, গল্প-উপন্যাস লিখতেন, তুমি জানো। কখনো গিয়েছ দার্জিলিং? না-গেলে না-গিয়েছ, তবে যাওয়া যায়। রেলগাড়িতে, বাসগাড়িতে, কিংবা হাওয়াজাহাজেও। “কখনো-বা গাছ, কখনো-বা মেঘ, কখনো-বা একটা দুর্জয় খাদা-নাকওয়ালী পাহাড়ী মেয়ে, কখনো-বা এমন কত কী যা দেখতে-না-দেখতেই গাড়ি চলে যাচ্ছে” … এবং “ক্রমে ঠাণ্ডা, তারপরে মেঘ, তারপরে সর্দি, তারপরে হাঁচি, তারপরে শাল-কম্বল, বালাপোষ, মোটা মোজা, পা কনকন, হাত ঠাণ্ডা, মুখ নীল, গলা ভার-ভার, এবং ঠিক তার পরেই দার্জিলিং।” ট্যাগোর্স ট্র্যাভেল গাইড। দার্জিলিং থেকে, সেপ্টেম্বর ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে এই পথনির্দেশিকা বাৎলেছেন ভ্রমণদেব। তো, কথা আসলেই মিথ্যা না, দার্জিলিং মনোরমণীয় স্থলভূমি। বৃষ্টি হয়, তুষার ঝরে, মধুরোদ গড়ায়া নামে বেয়ে বেয়ে পাহাড়ের গা। আর অঞ্জনগান রহি রহি বেজে যায় হেথা-হোথা দার্জিলিঙনিসর্গের আনাচেকানাচে। সত্যিই কি অঞ্জনের গান ধ্বনিত হয় সেখানে? সত্যিই কি অঞ্জনসুর অনুরণিত হয় দার্জিলিঙের উচ্চাবচ বনভূমশোভা পার্বত্য অধিত্যকা-উপত্যকা ব্যেপে? যেয়ে দেখে এসো, স্বচক্ষে হেরিয়া আসো বর্ণাঢ্য ঘূর্ণিঋদ্ধ মস্ত বসুন্ধরা।
৪
ব্যাপারটা ঘটেছে, মে বি, প্রথমত সিনেমা ও দ্বিতীয়ত গানের জন্য। সমুদ্রে হেন অনীহা আর পাহাড়ে প্রেমের পেছনে এই দুই ‘দুষ্টু’ মাধ্যম—ম্যুভি আর গান—মুখ্যত দায়ী। সিনেমা বলতে বেইসিক্যালি স্প্যানিশ-মেক্সিক্যান সেটিঙস রয়েছে এমন-সমস্ত ম্যুভিগুলোতে যেমনটা পাহাড়াবহ ও যতটুকু মরুরুক্ষ দুর্গমতা বা গোধূলিনিরালা বালিবিস্তার, ততটুকুই কাফি, ততটুকুই অভিপ্রেত, বড়জোর কলোর্যাডো বা টেক্সাস সেটিঙস, এরচেয়ে বেশি ভিন্ন বর্দাস্ত হয় না। ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ধাঁচের ম্যুভিগুলো—সেবা প্রকাশনী ও কাজী আনোয়ার হোসেনের নাম এক্ষেত্রে ক্লিন্ট ইস্টউডের আগে উল্লেখ কর্তব্য—ছোটবেলা থেকে এই বুড়োবেলা অব্দি স্ক্রিনে সেঁটে রাখে আমারে, সরাতে দেয় না চোখ। জন ডেনভার আর অঞ্জন দত্ত দুতিয়ালি করেছেন গানে গানে পাহাড়ের। এই দুইজন বটে পাহাড়ের ব্র্যান্ড-অ্যাম্ব্যাস্যাডর, পাহাড়প্রোমোটর।
৫
বাংলা কবিতায় পাহাড় ততটা নাই, যতটা আছে সমুদ্র। ওইটাও, সমুদ্রের থাকাটাও, কবিতাভাবিত ও অনেক বেশি পরিমাণে ফ্যান্টাসাইজড। মনে হয় এমনটা। পাহাড় আছে, দুর্গম দুস্তর ও বন্ধুরতা সমেত, নজরুলের কবিতায় খানিকটা। তা-ও তো ইরান-তুরান, আরব্য-পারস্য পাহাড়, ঠিক আমাদের পাহাড় তো নয়। সেই-অর্থে অবশ্য সমুদ্র-পাহাড় নাইও আমাদের, যতটা আছে খাল-বিল-নদী-নালা-হাওর-জংলা-জলাশয়। কিন্তু সমুদ্র একটা আছে তো! কই? কোথায়? ওই-যে গো, দক্ষিণে! হ্যাঁ, তা আছে, কিন্তু ওইটাও তো হাফ-সমুদ্র, মানে উপসমুদ্র, বঙ্গোপসমুদ্র বলি আমরা। অ্যানিওয়ে। সাগর-দরিয়া-পাহাড়ের আবার আমার-তোমার ভেদ-বিভাজন কেন! সবকিছুতেই মালিকানা স্থাপন, অহং আরোপন, ঔনার্শিপ বিল্ডাপ, এন্টাইটলমেন্ট এস্ট্যাব্লিশ করা, মহা ব্যামো তো! ভ্রমণ করা না-করা নিয়া আলাপন, পর্বত প্রসব অথবা পার্বত্য চুক্তি মুসাবিদা বা ওয়াদাখেলাপ তো প্রসঙ্গ নয়। জ্বে, মূষিক না, বা মন্ত্রীও, প্রসূতি না কাজেই কোনোবিধ পর্বতেরও। আইজ্ঞা।
৬
আউট-ল্য, ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন, অ্যামেরিকান, রেড-ইন্ডিয়ান প্রভৃতি বিষয়ানুষঙ্গ লইয়া আমরা আকৈশোর উত্তেজিত। অসংখ্য ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ম্যুভি দেখা হয়েছে এ-জীবনে স্রেফ পাহাড়ের কাঠিন্য ও রুক্ষতা ভালোবেসে। কেমন করে খরখরে পাথুরে মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একেকটা মানুষের শাঁস, শুধু এইটুকু দেখতে আজও ওয়েস্টার্ন ম্যুভিস্ক্রিনে রাখি নিবদ্ধ চক্ষুজোড়া। হাজারেবিজারে হয়তো নয়, কিন্তু শ-খানেক ওয়েস্টার্ন ম্যুভির নাম তো এক-নিঃশ্বাসেই লিখে ফেলতে পারব। ‘ব্যুচ ক্যাসিডি’, ‘দি আনফর্গিভেন’, ‘দি গ্যুড, দি ব্যাড, দি আগ্লি’, ‘ওয়ান্স আপ্যন অ্যা টাইম ইন অ্যামেরিকা’, ‘থ্রি-টেন টু জ্যুমা’, ‘ফোর্ট অ্যাপাচি’, ‘প্যাট গ্যারেট অ্যান্ড বিলি দ্য কিড’, ‘দি ম্যাগ্নিফিসেন্ট সেভেন’, ‘দ্য আউট-ল্য হোস্যে ওয়েইল্স’, ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’, ‘ফর অ্যা ফিয়্যু ডলার ম্যোর’ কিংবা ‘হাই ন্যুন’ প্রভৃতি সিনেমাকীর্তি দেখেই জীবনে মানুষের মতো এহেন মানুষ হয়েছি যে দ্যাখো ভল্লুকেও মুখের কাছে এসে শুঁকে শেষে মরা লাশ ভেবে ফিরিয়া যায়, খায় না, গাছে-উঠে-বসা বন্ধুটি পয়গম্বরের মতো মগডালে বসে বসে দ্যাখে আর হাসে। অ্যানিওয়ে। এইসব মহান—অবশ্য মহাকালীন কি না বা কুলীন বংশজাত কি না তা জানি না, আমি কি আইএমডিবি না ওই তোমার রটেন টোম্যাটো নাকি যে হড়বড়াইব অ্যাওয়ার্ডগ্রাফ আর টপচার্টে রেকর্ড র্যাঙ্কিং দেখে?—এইসব রঙিন ও শাদাকালো ম্যুভির অনেক অংশ ঘুরিয়েফিরিয়ে বহুবার দেখেছি জীবনে। যেসব ছবি-বইপত্তর জিন্দিগির একটা-আধটা মুহূর্তও রৌশন করেছিল কোনোদিন, সেসবের পানে দুনিয়া যতই-না খাপ্পা থাকুক যায়-আসে না তাতে কিচ্ছুটি আমার। এর বাইরে ধুমধাড়াক্কা হার্ডকোর ওয়েস্টার্ন ঘরানার ম্যুভি দেখাদেখির তো সত্যিই ইয়ত্তা নাই। বীরত্ব ও লড়াইদৃশ্যের যেনতেন ম্যুভি দেখার বয়স তথা ম্যাজিক্যাল স্টেট অফ কনশাসনেস পেরিয়ে এক-সময় কিঞ্চিৎ ক্রিটিক্যাল কনশাসনেস গ্রো করে ভেতরে। টের পাই যে এ-ধারার ম্যুভিগুলোতেও বহুরঞ্জিত পোলিটিক্স রয়েছে। বেশিরভাগেরই ইন্টেনশন দখলদার শ্বেতকায়দের জয়গাথা গাওয়া। আজকের যে-অ্যামেরিকা, তামাম জাহানের সর্দারি ও খবরদারি করুয়া অ্যামেরিকা, যা-কিছু ভালো আর যা-কিছু মন্দ সমস্তকিছু মনোপোলি ডিসাইড করা অ্যামেরিকা, তা-সবের ছাঁচ ওই সিনেমাগুলোতে এবং বাংলায় সেবা/প্রজাপতি প্রকাশনের ছাপানো বইগুলোতে মেলে। এক-সময় এটুকু বোধবুদ্ধি হয় যে, সংরক্ষিত অঞ্চল তৈরির অজুহাতে জুলুম-জবরদস্তিমূলক উপায়ে ইন্ডিয়ানদের একঘরে করার পর শাদা আদমিদের তরফ থেকে ইন্ডিয়ানদের জন্যে অ্যাজেন্ট নিযুক্ত করত সরকার। এইসব অ্যাজেন্ট সরকারের আগ্রাসনস্বার্থ রক্ষা করত। ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রে বা কাহিনিব্যঞ্জক বইপত্রে এই অ্যাজেন্ট মহোদয়দিগেরে আমরা প্রায়শ শেরিফের ভূমিকায় দেখে থাকব। বংশপরম্পরাসূত্রে বসবাসরত ভূমিজ ইন্ডিয়ানদের ন্যায্য অধিকার থেকে একের-পর-এক কূটকৌশল ও ছুঁতোনাতায় ঠকায়া অ্যামেরিকানরা কালক্রমে পরাজিত ও পদানত করে সেই মানুষগুলোকে। এইসব জেনেছি ধীরে ধীরে, একগাদা ওয়েস্টার্ন বই-সিনেমা সাবড়ানো হয়ে গেছে তদ্দিনে, এবং প্রচুর অন্যায় স্তোকবাক্য সমর্থন করা হয়ে গেছে সেটলার অ্যামেরিকানকৃত। সহসা ‘বাস্তবে ওয়েস্টার্ন কাহিনির পশ্চিম’ শিরোনামে একটা বই পড়ে এই ক্রিটিক্যাল কনশাসনেসের পত্তনি। বইটা কাজী মাহবুব হোসেন প্রণীত, প্রজাপতি প্রকাশন থেকে বেরোনো। গত শতকের নব্বইয়ের দশক মধ্যভাগে একটা বইয়ের ধারাবাহিক অনুবাদ ছাপা হচ্ছিল ‘জনকণ্ঠ’ নামে বাংলাদেশি এক দৈনিকের পাতায়। সেই পাঠাভিজ্ঞতা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ব্যক্তিগত ওয়েস্টার্ন সিনেমা বাছবিচারের ক্ষেত্রে। সেইটি Bury My Heart at Wounded Knee শিরোনামে একটা আশ্চর্য বইয়ের বঙ্গানুবাদ, ‘আমারে কবর দিও হাঁটুভাঙ্গার বাঁকে’, অ্যামেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রেড-ইন্ডিয়ান ইতিহাস, ইংরেজি ভাষায় Dee Brown প্রণীত বইটি বাংলা করেছেন দাউদ হোসেন। মূলত উত্তর-অ্যামেরিকার পশ্চিম ভূখণ্ড দখলের ঘটনাবলিই বর্ণিত হয়েছে বইটিতে। এক মর্মস্পর্শী ও তথ্যপূর্ণ বই। মিসিসিপি-মিসৌরি পারায়া, দিগন্তবিস্তীর্ণ প্রেইরিহৃদয় চিরে, রকি-পর্বতমালা ডিঙায়া মহাসাগরের অন্যপার থেকে অনুপ্রবেশকারী ইউরোপীয় ধবলাঙ্গরা পঙ্গপালের মতো দখল করে নিচ্ছিল একে একে ব্ল্যাক হিল্স ও ক্যালিফোর্নিয়ার স্বর্ণখনি, বনাঞ্চল, গবাদি ও ঘোড়ার চারণক্ষেত্র, আবাদযোগ্য জমিজিরেত সহ সমগ্র ভূভাগ। ধ্বংসবিষাদময় সেই সময়টায় ব্যর্থ হতে থাকে রেড-ইন্ডিয়ানদের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের যাবতীয় প্রচেষ্টা, যার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে ‘উন্ডেড নি’ নামের এক পার্বত্য খাঁড়ির বাঁকে, সেটি ছিল ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষদিকের একটি দিন। এই দিনটিরই পূর্বাপর ডক্যুমেন্টারি ডি ব্রাউনের গোটা বইটা। ছাপা হয় ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে। অসংখ্য গোত্রগুরু-ধর্মগুরুর মর্মন্তুদ লড়াই-পরাজয় ও যুদ্ধ/সন্ধির ঘটনা, টালবাহানা, অ্যামেরিকান কর্তৃক সন্ধিশর্ত লঙ্ঘন এবং আদিবাসীদের স্বভূমি ও স্বগোত্র রক্ষার মরিয়া প্রচেষ্টার বয়ান বইটির প্রতিবেদনোপজীব্য। বইটি পড়ে এতদবিষয়ে একপেশে অ্যামেরিকান প্রোপ্যাগ্যান্ডা সম্পর্কে প্রথম সজাগ হওয়া এবং ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ম্যুভি নির্বিচারে দেখনোপভোগ থেকে সতর্ক-সবিবেক সাবধান হওয়ার শুরু। যদিও ক্রমশ ওয়েস্টার্ন ঘরানার ম্যুভিজগতে টেক্সট্যুয়্যাল অল্টার্নেইট পার্সপেক্টিভ হাজির হতে শুরু করে। যেমন, স্মরণ হচ্ছে, টারান্টিনোম্যুভি ‘ডি-জ্যাঙ্গো আনচেইন্ড’ তেমনই একটা ছবি, কিংবা নাম করা যাক অপেক্ষাকৃত রিসেন্ট ‘দ্য ল্যোন রেইঞ্জার’ ম্যুভিটার। মোদ্দা কথা, নায়কের ও প্রধান প্লটের পজিশন শিফ্টিং ঘটছে এবং নাট্যিক ঘটনা/অ্যাকশনও পরিবর্তিত হতেছে এ-তাবৎকালীন প্রচারধন্য ওয়েস্টার্ন পপ্যুলার ন্যারেটিভগুলোর। ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ধাঁচ এক্সপ্লোর করে টেক্নিক্যালি ইংরেজি সিনেমায় এইটে ইউটিলাইজ করা হয়েছে এবং হচ্ছে বিভিন্ন সব উপায়ে। এন্তার ম্যুভির নাম নেয়া যাবে মেমোরি থেকে; যেমন : ‘ড্যান্সিং উইথ দ্য উল্ফস’, ‘দ্য পোস্টম্যান’—দুইটাই কেভিন কস্টনারের সিনেমা; সাই-ফাই সিনেমাতেও অধুনা ন্যারেটিভের ফর্ম্যাট হিশেবে এইটে ব্যবহৃত হতে দেখা যাচ্ছে : ‘অ্যাভাটার’, ‘রিড্ডিক’, ‘ইলিসিয়্যম’ প্রভৃতি সিনেমার নাম ঝটাপট মনে পড়ছে। মোদ্দা কথাটা হলো, দুষ্ট হঠিয়ে শিষ্ট প্রতিষ্ঠা। তা, মানবেতিহাস তো এই দুই বাইন্যারি অভিজ্ঞতার বাইরে বেরোতে শেষমেশ পারছে না, চাইছে যদিও খুব করে, কিন্তু মনুষ্য অভিজ্ঞতা বাইন্যারি শিষ্ট-দুষ্ট মন্দ-ভালো যুগ্ম থেকে বেরোতে পারবে বলেও মনে হয় না; তাহলেও, তৎসত্ত্বেও, পরিসর বাড়ানো সম্ভব এ-দুইয়ের, তথা যাবতীয় যুগ্ম-বৈপরীত্যের, অস্তিত্ব মেনে নিয়েও। হচ্ছেও আজকাল, পরিসর সম্প্রসারণ, যুগ্ম-বৈপরীত্য প্রকল্পনা পাশ কাটায়াও। মনে করা যাক ২০১২ সালে রিলিজ-পাওয়া অ্যামেরিকান ‘গ্যালোয়াকার্স’ ম্যুভির কথা। আদৌ লিনিয়ার নয় এর ন্যারেটিভ, ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন টেক্নিক প্রযুক্ত হয়েছে এখানেও অভূতপূর্ব মুনশিয়ানার সঙ্গে, এবং অপরাপর অনেক ম্যুভিই সৃজিত হয়ে চলেছে ইদানীং ইন্সপায়ার্ড বাই ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন ম্যুভিটেক্নিক। ‘ম্যাশেট’ ম্যুভিটার নামও মনে পড়বে, এবং একই ম্যুভির নির্মাতা ভ্রাতৃদ্বয়ের যাবতীয় ম্যুভিকর্ম, রোড্রিগ্যেজ ব্রাদার্স, অথবা টারান্টিনোসমগ্র, অথবা আরও-আরও ম্যুভিগুলো। রক্তারক্তি, নৃশংসতা, বিস্তর যুক্তিবিচ্যুত দৃশ্যকলার উপস্থাপন, নৈতিকতা-ধসানো মন্তাজ প্রভৃতি মিলিয়ে এইধারা ছায়াছবিগুলো শৈল্পিক ও বাণিজ্যিক ক্ল্যাসিফিকেশনের আওতায় আবহমান মেরুদূরত্ব নস্যাৎ করতে চেয়েছে। এর অভিঘাতও পড়তে শুরু করেছে সিনেমায়, শিল্পকলার অন্যান্য ঘরগেরস্তালিতেও।
৭
পর্বতবাসী অকৃত্রিম হৃদয়াচারের মনুষ্যগোষ্ঠী নিয়া, তাদের প্রতি সিভিলাইজেশন কর্তৃক কৃত অন্যায় নিয়া, আরেকজন সোচ্চার হয়েই ছিলেন গানে আজীবন; তিনি জন ডেনভার। গোটা ক্যারিয়ার জুড়ে ডেনভার অনেকানেক গান রচেছেন পর্বতাঞ্চল উপজীব্য করে, সেসব গানশ্রবণ শ্রোতা হিশেবে আমাদের কাছে একেকটা সাংগীতিক সুখদ অভিজ্ঞতা। বাংলা গানে এই ব্যাপারটা, পাহাড়বাসী নিয়া গান মুসাবিদা, ডেনভার বা ইংরেজি অপরাপর গানের ন্যায় এত ঐতিহ্যবৈভবপূর্ণ না-হলেও অত্যন্ত সুচারু করেছেন অঞ্জন দত্ত। বাংলাদেশের ব্যান্ডগানে এই জিনিশটা, পাহাড়-সমুদ্র প্রভৃতি বিষয়ক গানবাজনা, আদ্যোপান্ত অনুপস্থিত। ননব্যান্ডের কাছে এইটা আশাও করা যাচ্ছে না। ব্যান্ডের সূত্রপাতকালীন প্রভাবশালী দলগুলো উঠে এসেছিল সমুদ্র-অরণ্যবর্তী বিভাগীয় শহর চিটাগং-খুলনা থেকে। যেমন ‘সোলস’ দলটার কথাই ধরা যাক। অথচ ওই এলাকাটা তাদের গানবাদনে গরহাজির। কেন-যে, আল্লা মালুম। যেটুকু হয়েছে—যেমন সোলসের একটা গানে দেখা যায় ‘আইয়ো-না আইয়ো-না, আঁরার দেশত্ আইয়ো-না আইয়ো-না / ফাহাড় আছে সাইগর আছে…অফুরান ভালোবাসা আছে তুঁয়ারার লাই’ ইত্যাদি লিরিক্স তো পর্যটন কর্পোরেশনের প্রোমো ধরনের; বা একই দলের আরেকটা গান হ্যারি বেলাফন্টের অতিবিখ্যাত ওই ‘জ্যামাইকা ব্লুজ’ অবলম্বনে : ‘সাগরের ওই প্রান্তরে সুনীল পর্বতচূড়ায় চাঁদ জাগে / জলপথে আমি দেই পাড়ি / ভিড়ি চাঁদজাগা ওই বন্দরে / চলেছি ব্যথার মন নিয়ে / ফিরব না অনেকদিনেও আমি / ভারী হৃদয় নিয়ে পিছু দেখি / ফেলে-আসা সেই মনটাকে’…এই গানটাও সুন্দর, অনুসৃতিনির্ভরতা সত্ত্বেও সুন্দর পরিবেশনা নাসিম আলী খানের, তবে আমাদের অভিপ্রেত সমুদ্দুর তো ওখানে নেই;—সেসব অনুসৃজনের এফোর্টগুলোও কন্টিনিউ করে নাই আর। ফিডব্যাকের একজোড়া গান আছে, যেখানে সমুদ্রজলরাশি আভাসিত হয়, লিরিক্স লিখেছেন এবং গেয়েছেন মাকসুদুল হক; ‘মাঝি-৮৮’ ও ‘মাঝি-৯১’ শিরোনামে সেই গান-দুটো পরিচিত; বন্যা আর ঘূর্ণিঝড় উপজীব্য হয়েছে সেখানে, সেইসূত্রে যেটুকু সমুদ্র; পয়লাটাতে এই-রকম পঙক্তিপত্র : “ভোরবেলা তোর ঘুম ভাঙিল গাঙচিলের ডাকে / ওই ডাকে তোর মরণ আইব মানুষ কী জানে! / ও মাঝি রে! জলে দেহ ভাসাই নিলো কঠিন সমুদ্রে / নাও বুঝি তোর ভাঙল তীরে / সঙ্গে আইলো কে?”…এবং দোসরাটায় এমন কথামালা : “মাঝি তোর রেডিও নাই বইলা জানতেও পারলি না / আইত্যাছে ভাইঙ্গা এত বড় ঢেউ / সারা বাংলাদেশ জানল মাঝি তুই তো জানলি না রে”…এই দুই গানের সুরকারুকার্য অভিনিবেশে একবার শুনে দেখবেন যে এইটা বাংলাদেশের মাটিপানির সুর নাকি ইন্ডিয়া-আম্রিকা-আফ্রিকার ভুবুজেলাবাদ্য; উস্তাদ, অকৃত্রিম বাংলা বলিয়াই মনে হইল তো! বলা বাহুল্য, মাঝি নিশ্চয় সমুদ্রান্বিত পেশাগোষ্ঠীর সদস্য না। কাজেই নিবন্ধের প্রতিপাদ্যপ্রামাণিক গান ফিডব্যাকেও পাওয়া গেল না। বাংলাদেশের ‘দলছুট’ ব্যান্ডের একটা গানের শিরোনাম ‘বঙ্গোপসাগর’—‘কী আমাকে দিয়েছিলে বঙ্গোপসাগর / কী আমাকে দিয়েছিলে কক্সেসবাজার / কী আমাকে দিয়েছিলে নোনা জলহাওয়া / আমার সন্তান সে-তো তোমার কাছে পাওয়া’, ‘সাইমন অ্যান্ড গার্ফাঙ্কেল’ ছায়ানুসারে সঞ্জীব চৌধুরীর লিরিক্সে বাপ্পা মজুমদারের গাওয়া;—তা, সেইখানেও বক্ষ্যমাণ নিবন্ধের বক্তব্যখোরাক-সমর্থনকারী কিছু নাই; কিন্তু গানটা ভালো, বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া অবশ্য ‘ওই ঝিনুকফোটা সাগরবেলায়’ মনভেজানো রোম্যান্তিক গানবাজনা বাংলাদেশে বেশুমার এবং যথেষ্ট মনকাড়া। প্যাকেজনাটক/টিভিফিকশন যেমন। পশ্চিমবঙ্গের প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কিছু গানে সমুদ্র অবশ্য একভাবে এসেছে, সেইটা বাংলার রূপকথার আদলভাঙা সাগরচিত্র; স্মরণ করুন প্রতুলেরই ‘ডিঙ্গা ভাসাও’ গানটা : ‘ডাঙ্গার টানে পরান ছিল বাঁধা / কেন রে বন্ধু এতকাল / গরজি গুমরি ডাকে শোনো / ওই তরঙ্গ উথালপাথাল’…; কিংবা যেমন : ‘খোকন দিলো সাগর পাড়ি / সেই সাগরে হাঙর ভারি…ঝড়-তুফানে খোকন ডরায় না’…ইত্যাদি। কিন্তু এই খোকন মেইনস্ট্রিম মধ্যবিত্তের ড্রিমহিরো, পর্বতবাসীদের সুখদুঃখ লইয়া তার কি-বা যায়-আসে? নেপালি ছেলের বেশভূষা বা দার্জিলিং-ক্যালিম্পঙের বোঁচানাসা ছেলে/মেয়ের মুখ নিয়ে সেই হিরো অঞ্জনের গানে এসেছে বেশ অনেকবার।
৮
বাংলা গানে, কবিতায়, এমনকি গোটা বাংলা সাহিত্যে একাধটা পাহাড়চূর্ণ সুলভ হলেও সমুদ্র অনুপস্থিত বললেই চলে। যেটুকু সমুদ্র, লক্ষ করে দেখো, রোম্যান্সের ব্যাকড্রপ হিশেবে, যেন কষ্টকল্পিত। সরাসরি অভিজ্ঞতাজাত সমুদ্র অ্যাবসেন্ট। কৌতূহল হলে একবার চাটগাঁইয়া স্থানীয় সংগীতক্ষেত্র ঢুঁড়ে দেখতে পারো। লুসাই পাহাড় বা কর্ণফুলি নদী ইত্যাদি যতটা নামপদ হিশেবে গানে হাজির হতে দেখা যায়, ‘লুসাই ফাহাড়ত্তুন নামিয়া রে যার্গই খর্ণফুলি…’, সেভাবে এগুলো প্রসারিত হতে দেখি না ভাবব্যঞ্জনায়। যেমন লুসাই পাহাড় থেকে নেমে এসে কর্ণফুলি নদী বয়ে চলেছে চাটগাঁর মাঝ দিয়া—গানে এই চিত্র ফুটতে দেখি। কিন্তু সমুদ্রে যেয়ে মেশামেশির পরে এই কর্ণফুলির হালহকিকত পাই না জানতে। বাংলা গানে সমুদ্র কই? সমুদ্রের নুন ও লাবণ্য? সমুদ্রের স্বাদ? সমুদ্রপৃষ্ঠাবলি দৃশ্যপটে নেই কেন? সমুদ্রঝঞ্ঝা? নাই। ইংরেজি গানে যে-অর্থে সমুদ্রসমাহিত অভিভাব সুলভ, বাংলায় সেই জিনিশ বিলকুল গরহাজির বলতে গেলে। শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব জুটি, নিশ্চয় আমাদের মনে পড়বে, একদা চাটগাঁইয়া গান গেয়ে দেশ মাতায়েছিলেন। ওই দুই চিরস্মরণীয় শিল্পীর সুবাদে তখন শোনা হয়েছিল চট্টগ্রামের অনেক অঞ্চলগীতিকা। খানিকটা নাট্যরঙ্গপূর্ণ চটুল গান বাছাইয়ের প্রতি শিল্পীদ্বয়ের ঝোঁক সত্ত্বেও রচনাগুলো চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ববহ। চট্টলার লোকগানেও সমুদ্র যদি থাকত তো অনুমান করি সেই সমুদ্র গোটা ভূখণ্ডের গানে-সাহিত্যেও ঝলমলানো রক্তের সঞ্চার ঘটাত। পর্বতাঞ্চলের আদি অধিবাসীদের গানে-লোকগল্পেও শক্তিশালীভাবে সমুদ্র রয়েছে বলা যাবে না। ভাটিয়ালী গানে যেটুকু নদী, কিংবা সারিগানেও, অন্তত সমুদ্রমৎস্যজীবীদের গানে সেটুকু সমুদ্র থাকবে না কেন, অবাক ব্যাপার।
৯
দ্রুত কয়েকটা কারণ, সত্যি হোক অথবা মিথ্যা, ভাবা যাক। অন্তত আন্দাজ করা যাক। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নাই সে-অর্থে, একজন য়্যুরোপিয়ান-অ্যামেরিকানের যে-অর্থে আছে। হেমিংওয়ের আখ্যানে যে-সমুদ্র, সেই সমুদ্র তো আমাদের মানিক-মল্লবর্মণে নাই। কিংবা বাখ-মোৎসার্ট-বিতোফেন-চাইকোফোস্কির মিউজিকে তথা গোটা ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যালে যে-সমুদ্র, সেই সমুদ্র তো আমাদের উপমহাদৈশিক/হিন্দুস্তানি ধ্রুপদে নাই। কিন্তু কেন? প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অপ্রতুলতা? তাহলে তো সমুদ্রতটবর্তী জনপদে, যেমন ধরা যাক চাটগাঁইয়া গানে-লোকগল্পে, সেই সমুদ্র বহাল থাকবার কথা। নাই। চাটগেঁয়ে লোকেদের তো যুগযুগান্ত সমুদ্রাভিজ্ঞতা। কাজেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অজুহাত ধোপে বেশিক্ষণ টিকবে না। মানিক ব্যানার্জির ‘সমুদ্রের স্বাদ’ গল্পে যে-পরিস্থিতি বর্ণিত, অত্র ভূখণ্ডের পাতি-মধ্যবিত্ত বলয়ের লোকেদের একই পরিস্থিতি। সমুদ্রদর্শন বেশিরভাগেরই অ্যাফোর্ডেবিলিটির বাইরে। সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলোয় না, বাড়ুজ্যের প্রোক্ত গল্পের মেয়েটির বা তার বাপের দশা, সাধ্য হবার আগেই বৃত্ত পুরো হয়ে আসে। সে-সূত্রে পেটি-মিডলক্লাসের গানে-কবিতায় সমুদ্রাভিঘাত অনুপস্থিত। অতিকল্পনায় কিংবা ক্যালেন্ডারপাতায় দেখা সাগরের ছবিই বাংলা কবিতায় এসেছে মোটা দাগে। একটা ব্যাপার তো মনে হয় এ-ই যে, যে-জিনিশ জনপদের ইকোলোজিতে নেই, সে-জিনিশ জনগোষ্ঠীর রক্তে-ধমনীতে অ্যাডপ্টেড হয় না। ব্যাপারটা ভালো বোঝা যাবে একটাকিছু উদাহরণ দিলে;—হ্যাঁ, যেমন, শহরে বা ঊনশহরে বেড়ে-ওঠা আমাদের ভূখণ্ডের মানুষজন ওই-অর্থে নৌকা বা মাঝি ইত্যাদি বিষয়ব্যাপারের সঙ্গে সরাসরি রিলেটেড না-হয়েও কথাবার্তায় বা তাদের দৈনন্দিন ইডিয়মে এবং বিশেষভাবেই তারা যখন কবিতা বা গান বা চিত্রকলা করে তখন প্রোক্ত অনুষঙ্গগুলো স্বয়ংক্রিয় উঠে আসে। কিন্তু সমুদ্র বা নাবিকের দেখা পাওয়া তাদের কথায়-লেখায় বিরল; এমনকি যারা নাবিকের পাশে বসে বার-কয়েক সমুদ্রভ্রমণে গেছে, তারাও উপমার প্রয়োজনে নৌকা বা মাঝি টানে, জাহাজ/সি-ভেসেল বা ম্যারিনার নয়। একদিনের বা একপুরুষের সমুদ্রবিলাস দিয়া সাহিত্য হয় না। নাড়ির ভেতরে যা নাই তা আনুষ্ঠানিকভাবে এলেও আসতে পারে, কিন্তু সংগীতে-সাহিত্যে একটা জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক স্মৃতিচেতনাই ক্রিয়া করে অবচেতনে। এখন, বলা যাবে না যে আমরা সমুদ্র পছন্দ করি না বলেই শিল্পে তা আনি না; না, আমরা সমুদ্র পছন্দ করি, প্রচুরভাবেই তা করি বলে এত ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ পড়ি, বিদেশি কি ইংরেজি সাহিত্য পড়ার বড় কারণের মধ্যে একটা হলো সমুদ্র। সফেন সমুদ্রের সবিস্তার শব্দচিত্র। রক্তে আমাদের আদি সেই জলকল্লোল/সমুদ্রস্পন্দন তো আছেই, কিন্তু সমুদ্রছবিটা আমাদের জলস্মৃতিতে নেই, আছে নদীদৃশ্যাবলি। সিকস্তির দৃশ্য, নদীভাঙনের আওয়াজ, বন্যাতোড় ও কুলুকুলু জলতরঙ্গ আমাদের আবহমান জাতিরক্তে আছে, সমুদ্রার্কেস্ট্রা নাই। কিন্তু বদ্বীপের সমুদ্রশহরের লোক্যাল লোকেরা আবার এতটাই নিবিড় সমুদ্রান্বিত, ফলে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে চোখ তুলে ব্যাপ্ত জলরাশির দিকে তাকানো হয়ে ওঠে না তাদের। ফুরসত হয়ে ওঠে না তাকানোর, সমুদ্রনির্ভর জীবন ও জীবিকা সত্ত্বেও সমুদ্রান্ধ লড়াকু লোক্যাল ভূমিবাসীরা প্রাত্যহ প্রাণধারণের চাপে সমুদ্রসখ্য সম্ভোগ করে উঠতে পারে না।
১০
আমাদের এই মৃত্তিকাজাত পুরাণেও সমুদ্র ওই-অর্থে নেই বলতে হবে। মধুসূদন দত্ত প্রণীত মহাকাব্যে যে-সমুদ্র, জলরাশির প্রতি রাবণের যে স্বগতোক্ত সংলাপমালা, সবই তো য়্যুরোপাশ্রিত। আইরিশ লোকাখ্যান বা স্ক্যান্ডিন্যাভিয়্যান মহাকাব্যের যে-সমুদ্র, যেমন ‘বেয়্যুলফ’ বা যেমন ‘গিলগামেশ’, অথবা ল্যাটিন বা রোম্যান কি গ্রিক পুরাণস্থিত সমুদ্রের যে বিস্তার, তা তো অত্র ভূখণ্ডের আখ্যানে/উপাখ্যানে নেই। বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনিতে, মনসাপুরাণে, এরই আধুনিক অবিনির্মাণ শম্ভু মিত্র প্রণীত ‘চাঁদ বণিকের পালা’ নাট্যপরিসরে যে-জলোল্লেখ, সেসব তো স্রোতস্বিনী নদী বা নদ বড়জোর। আসলে এই ভূখণ্ডের বাসিন্দারা স্থলজন্মা, স্থলবর্ধিত, স্থলবিকশিত, স্থলাভ্যস্ত। স্থলে তথা ডাঙায় এরা বাঁচে, বেড়ে ওঠে, এদের উড্ডয়ন ও ডানা-গুটায়ে জিরোনো, সর্বান্তিমে এদের অস্তগমন সমস্তকিছু স্থলচিহ্নিত। অথবা আরেকভাবেও কথাটা ভাবা যায়, সেইটে এ-ই যে, এ-ভূখণ্ডবাসীরা আদতে জলেই বাস করে, অগাধ ও অপরিমেয় জলে, সেই জল অদৃষ্টের পুরস্কার ও পরিহাস উভয় অর্থেই গণ্য। ঘরের সনে এদের গলুইয়ের বা পৈঠার দূরত্ব অল্পই। ফলে ঠিক ঘটা করে এদের সমুদ্রাভিযাত্রা নাই, যেহেতু সমুদ্রেই শয্যা তাদের। ইংরেজরা তাদের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য ঐতিহাসিক সুযোগ-সুবিধের সুবাদে একটা গ্রাহ্য ব্যবধানে থেকে সমুদ্রকে সুস্থিরে দেখতে পারে, যেইটা আদি থেকে এতাবধি এখানকার লোকজন পারে না। সাহিত্যে, শিল্পে, গানে-বাদনে এসবেরই ছায়াপাত। সংগত কারণেই আমাদের সাহিত্যে, আমাদের কবিতায়, আমাদের সংগীতে সমুদ্র নাই; ইকোলোজি নিশ্চয় এর একটা কারণ, অন্তত সংগীতের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আমলে নেয়া যায় বৈকি; ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক নর্থের দিক থেকেই তো, ওদিকটায় সমুদ্র কই? কিংবা আউলবাউল চারণকবিয়ালেরা মাঠেঘাটে-নদীতীরে-হাওরে হেঁটে বেড়িয়ে গেয়ে ফিরেছে, সেসব তাই তাদের পদাবলিতেও সংকুলান করে নিয়েছে স্থান। সমুদ্র নাই ঠিকই, কিন্তু নদী আছে, তরঙ্গিনী আছে তার তপস্বী সমেত, প্রভূতভাবেই আছে নদীর সৌকর্য ও সিকস্তি।
১১
হিন্দি কিংবা বাংলা ছায়াছবিস্ক্রিনে যে-সমুদ্র অথবা পাহাড় আমরা আধুনিকযুগে দেখি, বিস্তর দেখে থাকি রঙ্গেবিরঙ্গে, সেই অভিজ্ঞতা আরও শোচনীয়। অকহতব্য হলেও অত্র অনুচ্ছেদে উহা আলবৎ কহতব্য। তটরেখা ধরে নখরা করছে নায়ক ও নায়িকা, পাহাড়ের ঢালু গড়িয়ে বেদম উদ্ভ্রান্ত পলায়নরতা নায়িকা বা নায়ক, বাকিটুকু পর্দাকাঁপানো গুণ্ডাতাড়িত অতিনাটুকেপনা। বাণিজ্যিক ম্যুভিতে কেবল এই সিনারিয়ো হলে তেমন উল্লেখের দরকার হতো না; আমাদের শিল্পমণ্ডিত মণ্ডামিঠাই সিনেমারাজিতেও সমুদ্র-পাহাড় অতিরেকের বেশি কিছু না, আগাগোড়াই ছিন্নকর্তিত, কাটপিস প্রায়শ, অহেতু। তবে একটা ছায়াছবিতে, সাতিশয় সুখের সংবাদ যে সেইটা বাংলা ছায়াছবি, পাহাড় সসম্ভ্রম সুপরিস্ফুট হতে দেখেছি আমরা। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, সত্যজিৎ রায়ের, এই সিনেমায় পাহাড় দেখতে পেয়েছি ত্রিস্তরা, রায় একাধিক ফ্রেমে পাহাড়টাকে এমনভাবে ক্যাপচার করেছেন যাতে একসঙ্গে এক-পজিশনে দাঁড়ায়ে তিনটে লেয়ার ধরা পড়েছে। এহেন পোয়েটিক ট্রুথ সম্বলিত পাহাড়, চলচ্চিত্রকাব্যিক পর্বতরাজির দৃশ্যরচনা, বাংলা ছায়াছবিনিসর্গে নেই বললেই চলে। এর অনেক অনেক পরে ‘লেটস্ গো, চলো’ ম্যুভিতে একবার অঞ্জন দত্ত খানিকটা পাহাড় আমাদেরে দেখায়েছেন স্মরণ হয়।
১২
জীবনানন্দের কবিতায় বিশালতা নিয়াই সমুদ্র উপস্থিত; যদিও সবটাই প্রায় বিদেশবিভূঁইয়ের, আমাদের সমুদ্র তো নয় জীবনসমুদ্র, কবির কল্পনা-অ্যান্টেনায় জীবন ধরেছেন ভুবনের বিপুলা সামুদ্রিক ভাইব্রেশন। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় নিমহাজির সমুদ্র; রবি নদীটাকেই সমুদ্রজ্ঞানে প্রেজেন্ট করেন বলেই মনে হয়, সেইটা ‘রাশি রাশি ভারা ভারা’-র ‘সোনার তরী’-তে হোক কি ‘ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা’-য়। এর বাইরে যে-সমস্ত মহান কবি ও কবিতা, তা-সবের অন্তর্গত সমুদ্রকল্লোল না-থাকলেও শব্দ ও ছবিরূপে সমুদ্র রয়েছে অবশ্য। রোম্যান্সরূপক সমুদ্র। বুদ্ধ বসুর সমুদ্র তো কবিতার স্যোপ-অপেরা টাইপেরই; বিষ্ণু দুনিয়াদারির বাইরেকার কোনো সমুদ্র হয়তো-বা এনেছেন যা আমাদের মাথার তার ছিঁড়ে যাবার কারণে থেকে গেল অধরা আজও; সুধীনও তথৈবচ। ও, আচ্ছা, প্রেমেন মিত্তিরের ‘সাগর থেকে ফেরা’?—আ ম’লো যা! তা না-হয় মেহসুস হলো, কিন্ত ফররুখ আহমদ,—‘সাত সাগরের মাঝি’?—হ্যাঁ, জীবনানন্দে যেমন থমকাতে হয় এই সমুদ্রসাক্ষাতে, যেমন নুয়াতে হয় মাথা ও হৃদয় শ্রী মধুসূদনের সুবিশাল জলরাশিতটে, তেমনি সমুদ্রের খাতিরে ফররুখে এসে একটুখানি তিষ্ঠোতে হবেই আপনাকে। এর বাইরে, অ্যানিথিং এল্স্? ধরা যাক উৎপলকুমারের ‘পুরী সিরিজ’ কিংবা শক্তির কক্সেসবাজার ভ্রমণোত্তর প্রকাশিত কবিতার বইটা। শামসুর রাহমানে তেমনি এসেছে একটা সাগরছবি, কিন্তু প্রতীচ্য সমুদ্র বৈ বঙ্গোপসমুদ্র তো নয় সেইটা; তা, পাওয়া কি যায় এই-তাবতে, যে-সমুদ্রটা আমরা এই নিবন্ধে পেতে চাইছি, সেই সসাগরা বাংলা? সাগর সর্বত্র সর্বভূখণ্ডে এক-ও-অভিন্ন, সর্বমহাদেশবাদী এহেন বিবৃতিওয়ালারা আপাতত অন্য বটতলা বাছিয়া ক্যানভ্যাসিং শুরু করুন, হেথা নয়, এই নিবন্ধাওতার বাইরে, অন্য কোথাও।
১৩
অথচ, না, আমাদেরও ছিল বটে একদিন জাহাজ ও নৌবাণিজ্য, আছিল বটে আমাদেরও সমৃদ্ধ সুদিন, ছিল দিন সমুদ্ররঙিন। কবেকার ধূসর অতীত থেকে কানে এসে পশে এতদঞ্চলের রাজতনয় বিজয় সিংহের নাম। ‘মধুকর ডিঙা লয়ে না-জানি সে কবে’…কে সে ? কেবলি স্মৃতিপুণ্য পুরাণগাথার সওদাগর চাঁদ…লক্ষ্মী সওদাগর…এরা বুঝি ইতিহাসপ্রামাণ্য নয়? একদিন এই নিচুভূমির বৃহদাংশই ছিল সংযুক্ত সমুদ্রের সনে—এ তো কষ্টকল্পিত কোনো গুলগপ্পো নয়; এই দেশের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়িয়া থাকা হাওর সেই চিহ্ন বহন করছে আজও। শতবর্ষ পূর্বেও এই হাওর দিয়া জাহাজ আসা-যাওয়া করত অত্র জনপদে, যেত সমুদ্রান্তরে এই নিধুয়া পাথার লোকালয়ের কোলাহল ও নৈরব্য বয়ে নিয়ে, এখনও অত্র তল্লাটের অনেক গেরস্তবাড়ির ভেতর জাহাজি পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন মলিন হয়ে যায়নি নিশ্চয়; এখনও অনেক বাড়ির পরিচয়সংক্ষেপ ‘জাজিয়া বাড়ি’ হিশেবে। এবং এতদঞ্চলে এই ‘হাওর’ শব্দটাই ধরে রাখেনি কি ত্রিকালপ্রাচীন সমুদ্রসংশ্রবের সেই স্বর্ণোজ্জ্বল সুতো?—সাগর > সায়র > হাওর; ব্যাপারটা ঠাহর হয়? এবং আমাদের লোকালয়গুলোর সঙ্গে একদা সামুদ্রিক সংযোগ কেমন ছিল, জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ আর ‘বনলতা সেন’ কবিতাবই দুইটাতে সেই ইতিহাস অন্তরঙ্গ রঙতুলিতে আঁকা আছে; যেমন আছে আমাদের সনাতনী নিত্যকৃত্যাদিতে।
১৪
হ্যাঁ, বৃহদাংশ উপমহাদেশের জনসাধারণ সমুদ্রসীমা ডিঙাত না এই সেদিন পর্যন্তও; কালাপানি পার হলেই ম্লেচ্ছ/অস্পৃশ্য গণ্য হতে হতো সমাজে এই ঊনিশ শতক পর্যন্তও; খুব বেশিদিন হয়নি, রিসেন্ট ফেনোমেনাই বলতে গেলে, রবিবাবুর ঠাকুদ্দা কালাপানি ক্রস করার বেয়াড়াপনার দায়ে সমাজধিক্কৃত ও অভিমানে স্বেচ্ছায় চিরনির্বাসিত হয়েছেন দেখতে পাবো। মধুসূদনের ঘটনাটা আঁখিপল্লব খুললেই যেন দেখে ওঠা যায়। কিন্তু ওই রিচ্যুয়্যালশাসিত জলাবদ্ধতা গ্রাহ্য হতো না সামাজিক পরিসরে অন্ত্যজ/দলিতদের মধ্যে; এদেরে পেটের দায়েই সমুদ্র-অরণ্যজঙলা দাবড়ে বেড়াতে হতো; উদরের উনোনে ব্যাঘ্রমামা আর হায়েনা-হাঙর প্রভৃতি নিতান্ত মামুলি উৎপাত; তাছাড়া মাতব্বর ধর্মরক্ষকদের রক্তচক্ষুও ওভারল্যুক করত গরিবগুর্বোর জৈবনিক গতিবিধি। জীবনসমাজে ম্লেচ্ছ যারা, তাদেরে ফের ম্লেচ্ছ করবে কে! এই হার্ডকোর হরিজন (মহাত্মাজির অনারে সর্ববর্ণধর্মের গরিবদেরে এখানে আদুরে হরিপুত্তুর ডাকা) ছাড়া আরেকটা জাতের মনুষ্যগোষ্ঠীর কাছে এই রিচ্যুয়্যাল/সংস্কারের কোনো দরদাম বা বালাই ছিল না; তারা মুসলমান। বস্তুত মোহামেডান রাজপাটের আমলেই বৃহত্তর ভারতবর্ষে বেগবান হয় সমুদ্রগতায়াত, জোরেশোরে সূচিত হয় সমুদ্রবাণিজ্য। বঙ্গাভ্যন্তরীণ ও বঙ্গবহিরস্থিত গোটা উপমহাদেশের সমুদ্র-ইতিহাস বিষয়ে একজন বাঙালিরই বরাতে জেনেছি বিশদে, জেনেছি তার আজীবনের লেখাপত্তরের একাংশের সুবাদে, যেগুলো বাংলায় লিখে রেখে গেছেন তিনি। ইংরেজি বিদ্বৎসমাজে শ্রেষ্ঠতা আদায় করেছেন অশীন দাশগুপ্ত পনেরো থেকে আঠারো শতকের ভারতীয় সমুদ্র-ইতিহাস তথা সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিবরণ ও বিশ্লেষণ গ্রথিত করে। এই কাজে তিনি পথিকৃৎ হয়ে আছেন ইতিহাসানুশীলকদের মধ্যে একটা আলাদা জ্ঞানখননের পথ আবিষ্কার করে; এবং পথটা সামুদ্রিক,—বিশেষভাবেই ওলন্দাজ, ফরাশি আর ইংরেজ কোম্প্যানিগুলোর দালিলিক সংগ্রহের সূত্র ধরে এই পথের হদিস পাওয়া যায়। এইসব ঐতিহাসিক উৎসখনিত জটিল প্যাঁচপয়জার অশীনবয়ানে এত অনবদ্য ও উপভোগ্য, উপন্যাসাখ্যানও হার মানবে এর নান্দনিক পাঠাকর্ষণের কাছে, যেন থ্রিলার পড়ার অভিজ্ঞতা। ভারত-মহাসাগরের সমুদ্রবণিক, বঙ্গোপসাগর ও বাঙালির সমুদ্রজৈবনিক গৌরবগরিমাগাথা, বাঙালি ব্যতীত উপমহাদৈশিক অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সমুদ্রসংবাদ, সর্বোপরি গোটা এশিয়ার রঙ্গমঞ্চে ভারতীয় এবং বাঙালির সমুদ্রজ্ঞান ও সমুদ্রপ্রজ্ঞাপ্রসূত ঐতিহাসিক তাৎপর্যগুলো অশীন দাশগুপ্ত বরাতে জেনে নেয়া যায়। এই চিরস্মর্তব্য মহোদয়ের বাংলা লিখনশৈলী ও বয়ানতরিকা আশ্চর্য অনন্য ও অননুকরণীয়।
১৫
অশীন দাশগুপ্ত পড়েই কিঞ্চিৎ সমুদ্রাগ্রহী হওয়া; তার আগে অবশ্য সত্যেন সেন প্রণীত মশহুর ‘মশলার যুদ্ধ’ বইটাও মনে গেঁথে গেছিল। বোঝা গেল না-হয়, কিন্তু পাহাড় বিষয়ে বইপত্তর, কেমন তোমার পাহাড় সংক্রান্ত পড়াশোনা? পাহাড়পথে এতদঞ্চলের পদচিহ্ন নাই? পালকাপ্য শব্দটা তাহলে এল কোত্থেকে? কেন চর্যাচর্যবিনিশ্চয়/চর্যাপদাবলির পরে বেঙ্গলের/এতদঞ্চলের কবিতায়-গানে পাহাড়ের দেখা আর পাই না? অ্যানিওয়ে। অশীন দাশগুপ্ত বরাতে একটা ব্যাপার এদ্দিনে জেনে ফেলা গেছে যে সমুদ্র-ইতিহাস মানে সমুদ্রের ইতিহাস নয়, কেননা সমুদ্রের কোনো ইতিহাস হয় না, এতদঞ্চলের মানুষগোষ্ঠীর ইতিহাস অধিকতর বস্তুসত্যিনিষ্ঠ উপায়ে জানবার একটা সোর্স হিশেবে এখানে সমুদ্রপথে দেখাদেখির চেষ্টাটা চালানো। সমুদ্র-ইতিহাস বস্তুত জনগোষ্ঠী বিকাশেরই বিশেষ একটা পর্ব। সমুদ্র-ইতিহাস মানে সমুদ্রের সনে মানুষের, এবং ভাইস্-ভার্সা, মানুষের সনে সমুদ্রের সম্পর্ক। দুনিয়ার অ্যালিয়েন্যাশন মকুব করে দিয়েছে এই সমুদ্র। দূরটাকে কাছে এনে মানুষের নৈকট্যাভিপ্সা সাফল্যমণ্ডিত করেছে এই সমুদ্র। বত্তমানের কবিয়ালেরা অবশ্য মুঠোফোনকোম্প্যানির মাল্টি-কর্পোরেট ক্যাপিট্যালের স্তুতিগাথা গাওয়া ছাড়া, মার্ক জাকার্বার্গের জন্য জয়ধ্বনি তোলা ছাড়া, এ-বাবতে তেমনকিছু কইতে অসমর্থ। সমুদ্রশাসন, সমুদ্ররাজনীতি, সমুদ্রসাম্রাজ্য প্রভৃতি শব্দ ও তৎনিষ্কাশিত অবধারণগুলো বুঝে নেয়া যায় অশীন দাশগুপ্ত মারফতে। এ তো ননফিকশন-কা বাত্, ইয়ার, সম্পর্ক প্রতিপাদন নিয়া কাজ করে যে-মাধ্যম তথা আখ্যানগল্প-কবিতা-উপন্যাস ইত্যাকার ওয়াগনের খবরান্তর নাই? তা আর বলতে! বেঙ্গলের সৃজনশীলতা বাতায়নপাশে গুবাকতরুর লাইন দেখিয়াই নিদ্রিত। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা শর্টস্টোরি মনে পড়ে অবশ্য, রক্তসন্ধ্যা, সপ্তগ্রামের বণিক মির্জা দাউদের হজফেরতা রাস্তায় ভাস্কো-দা-গামার তুলনারহিত নৃশংস দস্যুবৃত্তির ঘটনা নিয়া কাল্পনিক গল্পই লিখেছেন তিনি ইতিহাসের ভিয়েনে। এর বাইরে সেই কালিকট বন্দরে গামাগিরির ভালো-মন্দ কতশত রোমহর্ষ ঐতিহাসিক ঘটনা পানির তলায় চাপা আছে, সেইদিকে বাংলাবাজদের নজর নাই? কেন, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়?—কোনটা?— ‘ভাস্কো দা গামার ভাইপো’? অবশ্য সমুদ্রাখ্যান একেবারেই-যে নাই, তা তো বলা হচ্ছে না; আনএক্সপ্লোর্ড অর্ণবরাজ্য পুরাটাই, বলবার চেষ্টা আর শোনাবার কথাটা তা-ই।
১৬
কিন্তু বাংলার কবিগীতিকার আর সাহিত্যিকেরা সামুদ্রিক ইতিহাস দিয়া ভেরেণ্ডা ভাজিবেন? জনি ডেপের অভিনয় দেখেই জীবন সুখেশান্তিতে কাটিয়া যাইছে বাছাদিগের। পাইরেটস্ অফ দ্য ক্যারিবিয়্যান দেখে লেগে পড়ো চুটিয়ে বেহদ্দ কবিতাপাইরেসিকম্মে। এই জাতির দ্রষ্টা কাব্যকারেরা আবার যাহাতে কলহ হইবার চান্স বিশেষ নাই, তাহাতে ঠিক ‘ইন্টারেশ্ট’ পান না। আজিকালি কবিরা খুবই ‘রাজনীতিচৈতন’; ঘর হইতে দুই-পা না-ফেলিয়াই তারা তামাম দুনিয়া দেখিয়া ফালান, ছন্দ-ফন্দ বুঝিয়া কাজ নাই, গদ্যস্পন্দে নাকি ছন্দ থাকে না! রাম রাম! অতএব লেখো শপিং ম্যল, পিংপং বল্, মেনেক্যুইন আর মদের পিপা, ‘বাড়ির পাশে আর্শিনগর’ না-লিখে লেখো কোকাকোলাক্যানপ্রতিম প্রমীলার ফ্ল্যাট, ধকল কম আবার নকলও বলবার মতো ছুঁতো খুঁজবে না কেউ, সোজা রাস্তায় সরাসরি সৃজনশীল। বৈশ্বিক রাজনীতি মারাতে চাও? গ্লোব্যাল পোলিটিক্স? পয়দা করো প্রোট্যাগোনিস্ট একটা; হাও কাম্! কবিতায়! হ্যাঁ, কবিতায়; কিংবা গানেও; শুধু চরিত্রের নাম রেখো গফুরের জায়গায় গ্যাব্রিয়েল, উহাতেই কিল্লা ফৌৎ, লোকে নাম দেখিয়াই ইন্টারন্যাশন্যাল সমঝিয়া পাইবে; কে হায় নামেরে ন্যাংটো করে লাগাতে যায় কামের খোঁজপাত্তা! পাহাড়-সমুদ্র ধুইয়া পানি খাইবার টাইম বাংলার মুকাদ্দার-কা-সেকান্দার কবিগীতিকার সাহিত্যসংস্কৃতিসিপাহীদের নাই। ইউটিউবে আর কোকস্টুডিয়োতে গান শুনে দুপদাপ বসে পড়ো কম্পোজিশনে, একটা দামি বিদ্যুতগিটার হাতে নিয়া গিমিক আর গিটকিরি মেরে যাও, ভুবনের সনে যুক্ত করো মন্দাক্রান্তা বাংলা। মামলা ‘ডিশমিশ’।
১৭
অবশ্য সাম্প্রত কবিতায়, বাংলাদেশে, বেশ অভিনূতন অনুষঙ্গ প্রবেশিছে, এবং উপভোগ্য উপায়েই প্রবেশিছে, এমনকি রুখুশুখু পর্বত-উপত্যকা-অধিত্যকাও। ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন বই-লিট্রেচার-সিনেমাবাহিত হয়ে এসব পরিবহন হচ্ছে এই সময়ের অ্যালিয়েন্যাশনের, নিহিত নৈসঙ্গের, বিবিক্তির, বিষাদের, বিবমিষা আর বিদ্রোহের। এইভাবে নিরুদাহরণ—উদাহরণ-দৃষ্টান্ত লিস্টিহীন—কথা কয়া পার পাবানানে। জ্বে, আইজ্ঞা, জানি। কিন্তু সফরে বেরোব, বোঁচকা বান্ধা বাকি আভি তক, আবার জিগায় এক্সাম্পল! রোড টু বরেন্দ্রভূম। অথবা রাস্তা মাপো বগুড়াভিমুখে, লেট্’স্ টেইক দ্য রোড টু পুণ্ড্র! চ!
১৮
“চলো অঞ্জন ছুটিতে দার্জিলিঙে / টেলিগ্রাফের তারেই নাচুক ফিঙে / ছেলেবেলা তার ছন্দেই একাকার / চলো অঞ্জন গিটারটা দরকার”—ইত্যাদি গুনগুন-গুঞ্জন জঙ্গলে গাছে আর পত্রপল্লবে। এই একটা জায়গায় যেতে চেয়েছি, গিয়েছিও, বহুবার। প্রতিবার হোস্ট হয়েছেন অঞ্জন। শ্রোতৃহৃদয় জয় করেছেন অনায়াসে। এক নয় দুই নয়, একের-পর-এক গানে এসেছে স্পেস ও প্লেসগুলো। অঞ্জনের শৈশবকালীন অবসেশন। সুমনজি খুব-একটা দার্জিলিঙাসক্ত না-হইলেও অঞ্জনের সম্মানে এই গানটা গেয়েছেন। তবে অঞ্জন ঘুরিয়াফিরিয়া দার্জিলিঙ আর নেপালি ছেলের প্রেম গেয়ে গেল, মনোরমভাবে—একঘেয়ে একটুও মনে হয় নাই আজতক—গেয়ে গেল কাঞ্চনজঙ্ঘার গান। কাকুতিমিনতি আজও ভুলি নাই সেই-যে ক্যালিম্পং পাহাড়ের পাদদেশে সেই রোজগারতল্লাশে বেরোনো শহরে-নির্বাসনদণ্ডিত যুবকটির—সেই শঙ্কর হোটেল, যার ভাড়া ট্যুরিস্ট লজের চেয়ে কম, আমরা গেলে যেন ওই শঙ্কর হোটেলে উঠি সেই মিনতি দিয়ে রেখেছে ছেলেটা আহা কবে থেকে—যেখানে কাজ করে সেই যুবকের বাগদত্তা, যার বিয়ে বস্তির কাঁচাপয়সা-কামানো ড্রাইভার জিগমির সঙ্গে হয়ে যাবার আশঙ্কায় ভীত সর্বদা গানের সেই শহরদণ্ডিত যুবকটি, তার সেই হৃদি-হুহু অনুরোধবার্তা নিয়া আমরা যাব তো ওই মেঘপ্রবাহিতা পাহাড়ের দেশে। সেই কাঞ্চনের কাছে। যাব সেই ঘুম নাম্নী পৃথিবীর শীর্ষ স্টেশনে। জরুর যায়েঙ্গে। এইসব নিয়া কবে-যে লিখব আমরা, হায়, না-লিখতে পারলে তো হুরপরীদের সহবতও রকিং লাগবে না হ্যাভেনে যেয়ে। এইটুকু প্রণাম, জীবনকে, এইটুকু কৃতজ্ঞতা জানায়ে যেতে হবে তো পৃথিবীকে। জরুর যায়েঙ্গে। লেট্’স্ গো, অঞ্জন, চলো…
১৯
স্যাল্যুট যদি জানাতেই হয় অঞ্জন দত্তকে, একশো-একটা কারণ দরকার হবে না সেজন্যে, একটা কারণেই তা জানানো যায়, এবং সেইটা এ-ই যে, কীর্তনভাঙা আধুনিক বাংলা গান বানান নাই তিনি। এইটা বাংলা গানশ্রোতার জন্য সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা তো অবশ্যই। কীর্তন নয়, শ্যামাগান নয়, এমনকি চিরাচরিত ঐতিহ্যশ্রদ্ধেয়া বাউল-ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালিও নয়। এমন ঘটনা তো বঙ্গীয় সমস্ত সুমহান-স্বল্পমহান সংগীতকারদের বেলায় ঘটেছে যে, তারা বাউল-কীর্তন প্রভৃতির বাইরে যেয়েও অধুনাকালীন বাংলা গান কম্পোজ করেছেন। হ্যাঁ, এক্সপেরিমেন্ট অথবা কারো কারো ক্ষেত্রে প্রায় স্বভাবজ সহজতায় এমন হয়েছে যে তারা বাউল-কীর্তনের বাইরে বেরিয়েছেন নিজেদের রচনায়। ফের বাউলেও প্রত্যাবর্তন করেছেন, পুনঃপুনরাবর্তন করেছেন ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালিতেও। অঞ্জনে শ্যামা-বাউল-কীর্তন ছাড়াই গান স্বতঃস্ফূর্ত ঘটেছে। একটাবারের জন্যও অঞ্জনে এমনকিছু ফরেন বা আরোপিত মনে হয় নাই। কিন্তু পরদেশি সুরের আবহমণ্ডিত। অপিচ উহা বাংলা গানই তো হয়েছে। একই অভিজ্ঞতা আমরা আরেকভাবে পেয়ে আসছিলাম বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে।
২০
এইটা কি ঠিক যে, এহেন অভিযোগ তো অঞ্জন প্রসঙ্গে বেশিরভাগেরেই উত্থাপিতে দেখা যায়, অ্যাংলিসাইজড বাংলা গানই তিনি রচিয়া গিয়াছেন ঘুরিফিরি? অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ক্ষয়িষ্ণু কম্যুনিটির ডক্যুমেন্টারি অঞ্জনের গানমণ্ডলের একটা বড়সড় জায়গা জুড়ে রেখেছে, এ তো অস্বীকারের জো নাই, এ স্বীকার করাই বরঞ্চ গরিমাব্যঞ্জক শিল্পীর জন্য। গোটা বাংলা গানেরও এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। বাংলা গানে, বিশেষত বাংলা ছায়াছবি কি হিন্দি ফিল্মি গানাবাজানায়, এই বিশেষ অংশের লোকগোষ্ঠীর উল্লেখ অনুষঙ্গ হয়েছে কেবল, মূল প্রসঙ্গ কদাপি নয়। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কালচার/সাবকালচার সর্বদা ঠাট্টাতামাশার আইটেম হতে দেখা গিয়েছে গানে। এইটা আমরা হামেশা ভারতীয় বলিউডি সিনেমাগানে লক্ষ করে থাকব। অঞ্জন সম্ভবত সর্বপ্রথম এই দিকটায় তীব্র টর্চ তাক করলেন। রক্তমাংশের মানুষগুলোকে, বেদনা-ভালোবাসা আর গানপ্রমত্ত কলকাত্তাইয়া ফিরিঙ্গি সাবার্বানিটি তথা তাদিগের যাপনচিত্র, অঞ্জন একদম গোড়া ধরে তুলে আনলেন তার গানে। মমতায়, ধ্যানে, এবং সফলভাবে। এই দিগন্তের ছবিটি অঞ্জন না-এলে বাংলা গানে অগোচর-অদেখা থাকিয়া যাইত। কিছু মায়া রয়ে যেত স্পর্শগোচরাতীত চিরকাল। উই গট অঞ্জন, ভাগ্যিস!
২১
যদিও কবীর সুমনের গানের ন্যায় লিরিক ও টিউনের সুসিদ্ধ জোড়বাঁধা বাঙলায়ন অঞ্জনগানের বৈশিষ্ট্য নয়, কিন্তু বলা যাবে না যে অঞ্জনের গান-গায়ন-পরিবেশন বাংলায় বেখাপ্পা হয়েছে। একদম নয়, বিন্দুমাত্র অসমঞ্জস মনে হয় না অঞ্জনের সুরমূর্ছনা, একটুও অবঙ্গ-অনাহূত নয় অঞ্জনগানাবাজানা। ঝটিতি তিন-চারটে এক্সাম্পল মনে করা যাক। সুমন ও অঞ্জন উভয়েরই এমন কয়েকটা গান আছে যেগুলো শুনলেই ঠাহর হয় এরা আহৃত হয়েছে ইংরেজি লিরিক/টিউন হইতে; এবং বলা বাহুল্য, উভয়ে অ্যাক্নোলেজ করেন উৎসগানগুলোর অনুপ্রেরণা বা ছায়াবলম্বন। কয়েকটা গান যেগুলো উভয়েই অনুসৃজন করেছেন, উদাহৃত হতে পারে এখানে সে-কয়টাই প্রসঙ্গক্রমে। যেমন বব ডিলানের একটা গান কবীর সুমন করেছেন ‘চাইছি তোমার বন্ধুতা’ নামে বাংলান্তরিত, অঞ্জন একই গান করেছেন ‘বব ডিলানের গান’ শিরোনামে ‘কেউ গান গায়’ অ্যালবামে। যে-গানটা আন্তর্প্রেরণা হিশেবে কাজ করেছে এই দুই গানেরই নেপথ্যে, ‘অল আই রিয়্যালি ওয়ান্ট টু ডু’, সেইটির সঙ্গে মেলায়ে শুনে দেখুন, টের পাবেন বব ডিলানের গানটা উপলক্ষ মাত্র, মোদ্দাকথায় এরা বাংলা গানই বেঁধেছেন দুইজনে, এবং মৌলিক, বব ডিলানের যোগসূত্র সুমনের বাঁধা গানটাতে তো দূরস্থিত, অঞ্জনের ওয়েস্টার্নাইজড গায়ন ও পরিবেশনভঙ্গির কারণে বেশ বুঝতে-পারা গেলেও। লক্ষণীয় যে, একই কথার/বাণীভিত্তির গানত্রয় একই দিনে একই সময়ে একই বৈঠকে পরপর শুনে গেলেও শ্রোতার শ্রবণজগতে এর অভিঘাত পড়ে আলাদাভাবে। ব্যঞ্জনাগত দিক থেকে তিন গানের—একটি ইংরেজি ও দুইটি বাংলা—তিন ধরনের এফেক্ট ও/যদিও সমান মর্যাদার উপভোগ্যতা। বাংলান্তরণের এহেন নজির কবীর সুমনে বেহতর পাওয়া যাবে, যেখানে একইসঙ্গে বিস্ময় ও শিল্পকৌতূহল জাগে এ-ভেবে যে এমন গান তো শুধু বাংলাতেই সম্ভব, ইংরেজিতে এই লিরিকের কাছাকাছি গান থাকবার সংগত কারণ অনুপস্থিত। মনে এমন হয় থেকে-থেকে। এতটাই রূপান্তরিত ও এতটাই মৌলিক হয়ে ওঠে ক্ষেত্রনির্বিশেষে সেই অনুপ্রেরণাকারী গানগুলো সুমনের হাতে পড়ে। ‘হেই মিস্টার ট্যাম্বুরিনম্যান’ সুমনের হাতে পড়ে হয়ে যায় নিষ্কণ্টক বাংলা আস্থায়ী-সঞ্চারী রীতিমানা ‘ও-গানওলা, আর-একটা গান গাও’; অথবা যেমন ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ হয়ে যায় ‘প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা’ বাণীচিত্রের আদ্যোপান্ত মুক্তস্বচ্ছ হাওয়াবাতাসের আধুনিক বাংলা গান। সুমনের হাতে এমনিভাবে নিরুপদ্রব বাংলা হয়েছে বেশকিছু ইংরেজি গান, উদাহরণত পল রোবসন বা পিট সিগার প্রমুখ যুগন্ধর গাইয়েদের গান। অঞ্জনও সুন্দর শস্য ফলিয়েছেন এই ধারায়। ‘ইফ নট ফর য়্যু’, ববি ডি-র অতি জনপ্রিয় ওই গানটা, অঞ্জন দত্ত ‘তুমি না থাকলে’ শীর্ষক রূপান্তর ঘটায়েছেন; দত্ত শুধু প্রাথমিক আইডিয়াটাই নিয়েছেন, সুরের হারাম ছায়াটাও মাড়ান নাই, ভীষণ স্ফূর্তিময় হয়েছে গোটা গানটা। ম্যালভিনা রেইনোল্ডসের একটা দারুণ সুন্দর গান অঞ্জন অনুসৃজন করেছেন : ‘লিটল বক্সেস্’, বাংলায় হয়েছে—“ছোট ছোট মন বড় হয়ে যায় / ছোটদের জন্ম দিয়ে যায় / তারা বড় হয়ে ঢুকে পড়ে সব / ছোট বাকশের ভেতরে”…ইত্যাদি। ডেনভারের গান অনুসৃজন করেছেন, ‘সানশাইন’ গানটা, ‘রোদ্দুর’—‘কী ভীষণ মিষ্টি ভোরের বেলায় / রোদ্দুর চোখে গেলেই কান্না পায়’…ইত্যাদি কথায়। কিংবা ডেনভারের ‘দিস্ ওল্ড গিটার’ গানটা স্মরণ করা যাক, অঞ্জন যেইটেকে ‘এই বুড়ো পুরনো গিটার’ পঙক্তিতে গেয়েছেন, বোঝা যায় অঞ্জনের কব্জি ও অঙ্গুলি বাংলা আধুনিক গানে একপশলা আলাদা বারিপাতের জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছে। গেয়েছেন ওয়েস্টার্ন কাঠামোটা আত্মসাৎ করেই, কিন্তু অনাত্তিকৃত অবস্থায় একটা টুকরাও নয়, ফলে বাংলা হবার পথে একটুও অপরিচয়ের আগল রয়ে যায় নাই, ডিস্টিঙক্ট একটা সাউন্ডস্কেপ উঠিয়ে এনেছেন অঞ্জন এইভাবে ক্রমে। এবং কী বিস্ময়বিতত কৌশলে তিনি ইংরেজি কান্ট্রিমিউজিকটাকে এঁটেছেন বাংলা গানের কুলুকুলু গঙ্গা-পদ্মা-যমুনায়! ডেনভার-সিগার ছাড়াও আমাদের কানে-শোনা কান্ট্রিসিঙ্গারদের মধ্যে জিম রিভস উঁকি দিয়া যান যেন অঞ্জনগানে ফিরে ফিরে। এবং জনি ক্যাশ প্রমুখ; অবশ্য শোনা থাকে যদি শ্রোতার, এই সিঙ্গারদের কান্ট্রিমিউজিক, তখন বুঝতে পারবেন বাংলায় যে-একটা আত্তীকরণ বা ইন্টার্নালাইজেশন ইত্যাদি কথা আমরা বলি, জিনিশটা আসলে কেমন।
২২
যে-কথাটা আমরা জানি কিন্তু ভুলিয়া যাই কাজের বেলায় যে দুনিয়ায় সুর তো সাতটাই। সাত সুরে বাঁধা সারাটা দুনিয়া, তামাম জাহান, সাত তথা সৌভাগ্যপ্রতীক অঙ্কটা সাংগীতিক অভিজ্ঞতায় কেমন সৌসাম্য বিধান করে চলে গোটা দুনিয়ার মধ্যে! একজন সংগীতশিল্পী এই সুবিধাটা পান এবং সেইসঙ্গে হ্যাপাটাও পোহান। অসুখ/অসুবিধার দিকটা হলো, অপরের সুর নকলের ভয় পদে পদে; এবং সমুজদার তৎক্ষণাৎ খুঁত ধরবেন সুরের/নোটের নকলানুসৃতিজনিত। হরবোলা যদি না-হন শিল্পী তার স্বভাবে, এহেন বদনাম আখেরে তিনি স্কন্ধ হইতে ঝেড়ে ফেলতে পারেন তার কাজ দিয়েই। অঞ্জন যেমন পেরেছেন। অঞ্জন ইন্সপায়ার্ড হয়েছেন ইংরেজি গান দ্বারা, যাকে বলে একেবারে অন্ধ অনুকৃতি তা কিন্তু করেননি একদম। অসদুপায় অবলম্বন করতে যেমনটা হামেশা দেখে গেছি আমরা একসময় ব্যান্ডমিউজিশিয়্যানদের, অনেকটা ট্রেন্ডি টেন্ডেন্সিই যেন হয়ে ওঠে এইটা ব্যান্ডগানের মেইনস্ট্রিমে, যেইটা আবার কেউ-কেউ ফিউশন নাম দিয়া বা আরও অনেকেই দ্যাখো ‘ছুঁচো ফিচারিং সিংহ’ ফর্মুলায় ইদানীন্তন জায়েজ করতে চেষ্টা চালাইছেন। অঞ্জন দত্তে এইসব রোগব্যামোমুক্ত অরিজিন্যাল বাংলা টিউন লভ্য। অরিজিন্যালিটির ব্যাপারটা, বাহুল্য বলা, গানে-বাজনায় ঠিক আক্ষরিক অর্থে নেয়া বাতুলতা। আমরা এখানে অরিজিন্যাল শব্দটাকে/কন্সেপ্টটাকে উয়িদিন প্যারেন্থেসিস্ কোট-আনকোট কল্পনা করে নেব।
২৩
বলা যাবে না যে অঞ্জন দত্ত পুরোদস্তুর ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিসিঙ্গারের ঘরানায় গেয়ে গেছেন, অন্য কোনো ঘরানা-বাহিরানা তার গানে উঁকি দেয় নাই বলা যাবে না মোটেও, মনোযোগী ও নিয়মিত অঞ্জনশ্রোতা ব্যাপারটা আলবৎ খেয়াল করে থাকবেন। জন ডেনভার বা জিম রিভস্ বা জনি ক্যাশ বা পিট সিগার বা উডি গাথ্রি প্রমুখ সিঙ্গার-স্যংরাইটার মিউজিশিয়্যান যেই-অর্থে ফোকআর্টিস্ট/কান্ট্রিসিঙ্গার, অঞ্জন দত্ত সেই নিরিখে পৃথক পরিচয়ের হকদার। একবাক্যে অরিয়েন্ট করাইতে যেয়ে এমনটা আমরা প্রায়শ বলে ফেলি যে অঞ্জন ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিস্যং ফলো করেছেন। মুখ্যত ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিমিউজিকের আদরার আড়ালে অঞ্জন অন্যবিধ অনেক সংগীতশাখা তার সৃজনকাণ্ডে গ্রাফ্ট করেছেন। অঞ্জনের থিয়েটার এক্সপেরিয়েন্স তার গানে ব্যাপক প্রভাব রেখে গেছে। এছাড়া জ্যাজ প্রভূত পরিমাণে এসেছে, স্যাক্সোফোন প্রভৃতির সংগতে একপ্রকার সফ্ট জ্যাজ, এবং সূক্ষ্মশৈল্পিক পরিমিতিবোধসম্পন্ন ব্লুজ। উদাহরণফর্দ উঁচিয়ে ধরার মওকা এখানে কম, পরিসর দিয়া আঁটানো যাবে না, টাইম দিয়াও কুলিয়ে ওঠা যাবে না, আর তার দরকারও অত জোরালো নয় বোধহয়, স্রেফ দুইয়েকটা নামোল্লেখে একটু ধর্তাই রেখে এগোনো যাক আপাতত। থিয়েট্রিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স তো ঘন ঘন লভেছি অঞ্জনে। একেবারে ডেব্যু পর্যায়ের ‘ম্যারিয়্যান’ থেকে শুরু করে ‘রঞ্জনা’ এবং অন্যান্য অনেক, প্রায় প্রতিটা অ্যালবামেই সুলভ ওই-ধরনের নাট্যিক রকঘরানা, ‘কলকাতা-১৬’ অ্যালবামে একটা ক্র্যাশ-রকেরই যেন পার্ফেক্ট প্রেজেন্টেশন যায় পাওয়া : ‘হাফ-চক্লেট’ নামে সেই গানটাকে চেনা যাবে। নরম নীলবর্ণ ব্লুজের তো ছড়াছড়ি অঞ্জনে : ডেলায়লা-স্যামসন নিয়া গানটা ছাড়াও রয়েছে ব্যাপকসংখ্যক গানে ব্লুজ নোটের প্রয়োগ। উল্লেখ্য, অঞ্জন গোটা একটা অ্যালবামই করেছিলেন আস্ত, ব্লুজ কম্পোজিশনে স্বরচিত ইংরেজি গান, পূর্ণ কলেবর সেই সংকলনের নামটাই ‘ব্যান্ড্রা ব্লুজ’। যারা ব্যান্ড্রা ব্লুজ শুনেছেন, তারা জানেন যে অঞ্জন স্বরচিত ইংরেজি গান নিঃশঙ্ক গেয়ে দেখায়েছেন তিনি আর-যা-হোন নকলনবিশ নন। নিন্দুকদের চিত্ত তো চিরপ্রতিক্রিয়াচিকীর্ষু, কাজেই তাদিগের কথাবার্তা বাদ থাক। আরেকটা ধারা অঞ্জনের গানগুলো পুষ্টিহৃষ্ট করে রেখেছে, সেইটা হলো গির্জাগানের ধুন; চার্চের কয়্যার মিউজিক অঞ্জন অত্যন্ত সুচারু ও সুপ্রয়োগোপায়ে নিজের গানে এঁটে নিয়েছেন। ক্যালিপ্সো, ফ্ল্যামেঙ্কো, বলড্যান্স ও ব্যালে প্রভৃতির রিদম অঞ্জনমিউজিকের অনুষঙ্গরূপে এসেছে ফিরে-ফিরে। এবং, সবশেষে উল্লেখ করা হচ্ছে বলে সর্বনিম্নোল্লেখ্য নয় মোটেও, পাহাড়ি সুরকাঠামো অঞ্জনের একটা ফ্যাসিন্যাশন, ব্যবহারও করেছেন অজস্র জায়গায় এবং অত্যন্ত সুন্দরভাবে।
২৪
শৈশবের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ, এবং ইশকুলবেলাটা, অঞ্জন দত্তের কেটেছে পাহাড়ে। সেখানকার বোর্ডিং ইশকুলে, দার্জিলিঙে, পড়াশোনো করেছেন। ফলে এসবের একটা ভালো প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে তার রচনায়, মিউজিক কম্পোজিশনে, গানে। এবং, বলা বাহুল্য, অভিনয় ও ম্যুভিনির্মাণ অঞ্জনের মূল ক্ষেত্র হবার কথা ছিল বলে জেনেছি আমরা তারই ইন্টার্ভিয়্যু মারফতে, মৃণাল সেন ম্যুভিট্রুপে অঞ্জন রেগ্যুলার ক্রুদের মধ্যে একজন, যেমন বাদল সরকারের থিয়েটারট্রুপে, ইন্সিডেন্টালি মিউজিকেই তিনি বিখ্যাতি কুড়িয়ে ফেলেন ম্যুভিনির্মাণে আসার আগে, সেমি-অল্টার্নেইট সিনেমায় অ্যাক্টিংটা যদিও করছিলেন তিনি মৃণাল ছাড়াও গৌতম-ঋতুপর্ণ-অপর্ণা প্রমুখ মেইকারদের ম্যুভিচিত্তিরে, নিজের ম্যুভিনির্মাণটা শুরু করেন সংগীতজীবী হিশেবে ক্যারিয়ারে সাফল্য অর্জনের পরেই। কিন্তু সেখানেও, স্বরচিত ম্যুভিকীর্তিগুলোতেও, পর্বতাচ্ছন্ন অঞ্জনের দেখা পাবো ঘুরেফিরেই। জিনিশটা ঘটে তখনই যখন প্যাশন ও প্রোফেশন ব্লেন্ডেড হয়ে যায় সৃজনোদ্যোগী মানুষের জীবনে। এইসব অঞ্জনজৈবনিক তথ্যাদি বৃহদাংশেই আমরা ক্রমে জেনে উঠেছি নানান সূত্রে, কখনো অঞ্জনজবানিতে, কখনো সংবাদপত্রপ্রতিবেদনবাহিত তথ্যোপাত্ত বর্ণনা মারফতে। এমনকি, কবীর সুমনের ন্যায় এত সুষম নন্দনধন্য উপায়ে না-হলেও, অঞ্জন গোড়া থেকেই লিরিক্সের ভেতর স্বীয় পরিপার্শ্ববাস্তবতা তথা আত্মজীবনোপাদান লগ্নি করেছেন যেখানে তথা যেইসব গান থেকে এই-নিবন্ধে-চিত্রিত অঞ্জনমুখের গোটা আদলটা পাওয়া যায়। জেনেছি এইভাবে, গানটেক্সট থেকে, এবং অন্যান্য উৎস থেকে। জেনেছি অঞ্জনগানে, হ্যাঁ, জেনেছি যে তিনি ইংরেজি ক্রিশ্চিয়ান পাদ্রীদের তত্ত্বাবধানে চালিত দার্জিলিঙের শিক্ষালয়ে কৈশোর কাটানোর সুবাদে সেখানকার ন্যাচারের সঙ্গে অরিয়েন্টেড-অ্যাক্যুয়েইন্টেড হয়েছেন বালক বয়সে। এ-সমস্ত তথ্য অঞ্জনগান উপভোগে-অনুপভোগে হেরফের ঘটায় না হয়তো, মজা খানিকটা বাড়তে পারে এই কিসিমে জেনে এবং ভেবে, এ-সমস্ত কিচ্ছুটি কাজেই নেসেসারি কিছু না।
২৫
হায় রে কান্না, হায় রে কৈশোর, হায় রে যুগান্তরের ঘূর্ণিপাক…হায় হাহাকার, হায় হাসি, হায় দেবদারু…অঞ্জন দত্তাধিকৃত রোদ্দুর ও বৃষ্টিদুপুর…ছেলেবেলার সেই পাতাচরা পাহাড়…সেই বুড়ো পুরনো গিটার…সেই মেসবাড়ির ক্যারামবোর্ডের ঘুঁটি ও স্ট্রাইকার…সেই মিস্টার হল্…অঞ্জনই প্রথম শুনিয়েছিল সেই ব্র্যান্ডির নেশায় লাল-হয়ে-যাওয়া দুইটা চোখ আর নিকোটিনে-হলদে-হয়ে-যাওয়া দশটা আঙুলের পিয়ানোবাদকের গল্প…ওইখানেই তো প্রথম : লর্ড আ’য়াম ওয়ান, লর্ড আ’য়াম টু / লর্ড আ’য়াম থ্রি, লর্ড আ’য়াম ফোর / লর্ড আ’য়াম ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস্ অ্যাওয়ে ফ্রম হোম…হায় বিপন্ন অপরাহ্ন, হায় বিষণ্ন ধুলোওড়া দিন, হায় বিদর্ভ শহরতলির বিলীয়মান গাড়িশব্দের গোধূলি…নট অ্যা শার্ট অন মাই ব্যাক / নট অ্যা পেনি টু মাই নেইম / লর্ড আই ক্যান্’ট্ গো ব্যাক হোম দিস্ অ্যাওয়ে / দিস্ অ্যাওয়ে, দিস্ অ্যাওয়ে, দিস্ অ্যাওয়ে, দিস্ অ্যাওয়ে / লর্ড আই ক্যান্’ট্ গো ব্যাক হোম দিস্ অ্যাওয়ে…হায় নীলাভা ঘাসপোকা, হায় টিলা ও টুনটুনি, হায় অঝোরা হাহাজারি…ইফ য়্যু মিস্ দিস্ ট্রেন আ’য়াম অন / য়্যু উইল নো দ্যাট আ’য়াম গ্যন / য়্যু ক্যান হিয়ার দ্য হুইসল ব্লৌ, অ্যা হান্ড্রেড মাইলস্ / অ্যা হান্ড্রেড মাইলস্, অ্যা হান্ড্রেড মাইলস্, অ্যা হান্ড্রেড মাইলস্, অ্যা হান্ড্রেড মাইলস্ / য়্যু ক্যান হিয়ার দ্য হুইসল ব্লৌ, অ্যা হান্ড্রেড মাইলস্…অঞ্জনের দৌত্যে এ-গান পয়লা পশেছিল কর্ণে, মর্মে যেয়েও বিঁধিয়াছিল বটে, এরপর কত কত কণ্ঠেই-না হলো শোনা এই গানখানা, আরও কত কত গান এরই ছায়াবলম্বনে, এরই সুরানুসৃতিতে, এরই ভাবানুসরণে…একাধিক শুনেছি বাংলাতেই, অঞ্জন তো শ্রেষ্ঠ অনুসৃজন এর মধ্যে, নো ডাউট, আরেকটা শুনেছিলাম খুবই ধীরলয়ের করুণসুন্দর এক নারীকণ্ঠে এই গানের সুরাশ্রিত কথাকলি, লিরিক্সটা আজও গুনগুনানো যায় : ‘তুমি কি ভুলেছ নাকি মনে রেখেছ / তুমি একটুখানি বলে যাও না’—বাংলাদেশে সেই ক্যাসেটযুগের কত কত গানের জন্যই এখন কান্না পায়, টিউবে সার্চ দেই, নামজাদাদেরে পাই কিন্তু নামহীনাদেরে পাই না—এই গানটা গেয়েছিলেন সম্ভবত পলি সায়ন্তনী, ইনি বেশিদিন না-গাইলেও বেশকিছু সুন্দর গান গেয়েছিলেন, হিটও হয়েছিল তার গাওয়া দুইটা অডিওক্যাসেট। ডলি সায়ন্তনীর কনিষ্ঠ সহোদরা পলি, যদ্দুর জানতাম তখন। দুজনের একজনকেও তো দেখি না আজ আর। ডলি বরং অনেক বেশি ছিলেন অডিয়োইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িয়ে। অ্যানিওয়ে। ‘ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস্’ গানটা হিন্দিতেও শুনেছি মনে পড়ে। এবং ইংরেজিতে তো অনেকের কণ্ঠে এখন শোনার সুযোগ অবারিত। তখন ক্যাসেটে শোনা যেত ‘কিংস্টন ট্রায়ো’, অতঃপর ‘পিটার, প্যল অ্যান্ড ম্যারি’, হেডি ওয়েস্ট প্রমুখ। ববি বেয়ারের গাওয়া ভার্শনটাও সুন্দর। কম সুন্দর নয় জোয়্যন বায়েজ ভার্শনটি। ইংলিশ ফোক টিউনগুলো অল্প বাদ্যযোজনা নিয়ে এত ভয়াবহ অতিজাগতিক বিষাদ কেমন করে যে এমনতর ছড়াইতে পারে! ইংলিশ কান্ট্রিমিউজিক ছড়িয়ে দেয় আকাশে-বাতাসে এত অনন্য অতুলনীয় মেলাঙ্কলিয়া! আজকের ইংরেজি গানবাজনার সঙ্গে সেই টিউনগুলো চট করে মেলানো যায় না। আর এমনও মনে হয় যে, এদের জীবনে এত দুঃখগাথা, মার্সিয়ামাতমধ্বনি, ছিল তবে! হ্যাঁ, ছিল বৈকি। কত যুদ্ধজঙ্গ-গৃহদাহ-অরণ্যবাস-খুন-জখম-পলায়ন-বিতাড়ন পেরিয়ে এরা আজ এইখানে এসে থিতু হয়েছে, ইংরেজি পিরিয়ড ম্যুভিগুলোতে এইসব ইতিহাসের পপ্যুলার একটা ভার্শন তো আমরা অনায়াসেই পেয়ে যাই। আইরিশ ফোক টিউনগুলো তো অনেক বেশি এমন দুঃখবিষাদমন্দ্রিত। “শুধু এই গানটা, একটাই গান প্রতি শনিবার / তারিখটা যা-ই-হোক হোক-না সে যে-কোনো মাস / পার হয়ে গেছি কত হাজার-হাজার মাইল / তবু থামেনি তো কোনোদিন আমাদের চলার ক্লাস”…আহা! ‘পাহাড়ের গন্ধ আমার নাকে-মুখে / ব্র্যান্ডির নেশায় তোমার দু-চোখ লাল’…ওয়ান্ডার্ফুলি ডিফ্রেন্ট ইট ওয়াজ, ‘মিস্টার হল্’, ইনস্পায়ার্ড বাই দিস্ পার্টিক্যুলার স্যং টাইটল্ড ‘ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস্ অ্যাওয়ে ফ্রম হোম’। গানটা পাওয়া যাবে ‘কেউ গান গায়’ অ্যালবামে। শোনা মাত্র প্রেমে বেঁধে ফেলার মতন গান একটা। অঞ্জন এই-রকম আরও কাজ করেছেন তো, সকলেই জানেন, বব ডিলানের ছায়ানুসৃত, অথবা পিট সিগারের, বা ডেনভার ও অন্যান্য কয়েক মহাজনের কান্ট্রিমিউজিকের অবলম্বী সৃজন সেসব, শুনলেই মন ভালো হয়ে যায়, মেলাঙ্কলিয়ায় ছেয়ে ফেলে চরাচর আমাদের, আজও। গুনে দেখতে গেলে কবেকার গান সব! বছর ঊনিশ-কুড়ি তো হবেই। কিংবা তার দ্বিগুণও।
২৬
অঞ্জন দত্ত গানটা গাইতে এসেছেন মুখ্যত কবীর সুমনের পথ ধরে, সুমনের সফলতায় প্রাণীত হয়ে, এবং সুমনগানের আধুনিক গীতরচনা আর সুরবাঁধা ব্যাপারটা একটা ধারাই তো হয়ে ওঠে অচিরাৎ। সেই ধারা নিয়া ডামাডোল তো কম হয় নাই, বিচিত্র উপায়ে হেয় করার ধারাবাহিক কাণ্ড সচল থাকতে দেখেছি আমরা টানা প্রায় দেড় থেকে দুই দশক, কিছুতেই নিশান অর্ধনমিত হয় নাই অবশ্য স্বাধীন সার্বভৌম নতুন বাংলা গানের। শরিক হয়েছেন এই নিশানের গোড়ায় বাংলা গানের তরুণ মেধাবী সমস্ত কারিগরেরা, শামিল হয়েছেন শ্রোতারা, বাজার ও বিপণনব্যবস্থাও ক্রমে এই ধারাটাকে সমঝে চলতে শুরু করে। এইচএমভি ও আশা নাম্নী দুই ইন্ডিয়ান গানকোম্প্যানি, এবং আরপিজি ইত্যাদি, একের-বাদে-এক অনেকানেক নবীন গান-করিয়ে শিল্পীকলাকুশলী সামনে নিয়া আসার রীতিমতো প্রকল্প গ্রহণ করে এই সময়টাতেই। সুমনের ‘তোমাকে চাই’ ইনকন্সিভ্যাব্লি হিট করার পর নচিকেতার ‘চল যাব তোকে নিয়ে’, অঞ্জনের ‘শুনতে কি চাও’ এবং পরের বছর ‘পুরনো গিটার’, মৌসুমী ভৌমিকের ‘এখনো গল্প লেখো’ বা তার আগের ‘তুমি চিল হও’ প্রভৃতি প্রকাশিত হতে থাকে একঝাঁক পায়রার ন্যায় পাখসাট তুলে এবং প্রত্যেকটাই একেকটা পতপতে পতাকা বাংলাগানের পাল্টানো সময়পর্বের। এরপর অসংখ্য নতুন গান, নতুন সুর, নতুন ভঙ্গি, নতুন ভাষা গানে গানে পেয়েছি আমরা হাতের চেটোয়। সেইসব দিন আজ কেমন সুদূরের, অন্য কোনো জন্মের, অন্য সময়ের বলে মনে হয় মাঝে মাঝে। একসঙ্গে এত নতুন গাইয়ে, এদের প্রত্যেকেই যার যার মতো করে নিজের সেরা কাজটা দিয়েছেন উজাড় করে; এমন হয়েছিল অনুমান করি এর আগে একবার মাত্র এবং সম্ভবত সেই সময়টাকে আমরা বাংলা গানের স্বর্ণযুগ বলে থাকি। সুমন ও সুমনানুসৃত সুরের-কথার-ভাবের-ধারার বাংলা গান তুলনামূলকভাবে সেই চিহ্নিত স্বর্ণযুগের চেয়ে কতটুকু কোয়ালিটেইটিভলি আলাদা, কোথায় এবং কেমন করে আলাদা, এ নিয়ে এখন আস্তে আস্তে ভাবনাভাবনি নিশ্চয় শুরু হবে। এইটে শুরু করা জরুরিও মনে হয়। কেননা আবার এসে গেছে একটা স্ট্যাগ্ন্যান্ট কালসন্ধ্যা বাংলা গানে। কেমন চর্বিতচর্বন আর বৃত্তঘূর্ণিপাক পুনরায়। এমনিতে সুমন অবশ্য তার স্বীয় কক্ষপথে এখনও সচল ও ফলিয়ে চলেছেন স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশন, অঞ্জন যদিও ম্যুভিডিরেকশন ও অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত ও সফল, নচিকেতা অ্যালবাম করছেন না অনেকদিন, কোথাও হয়তো-বা বাংলা গানবাজনা আরেকটা ডিপার্চারের অপেক্ষায় দিন গুনছে।
২৭
অঞ্জন কখনো গোপন রাখেন নাই ঋণ তার। গুরুদক্ষিণাকার্পণ্য অঞ্জনের মধ্যে দেখি নাই আমরা। অ্যালবামে এপিঠ বিপিঠ মিলিয়ে দশটা গান থাকলে একটা গান অবশ্যই রাখতেন অঞ্জন তার তরুণদিনের পথ-দেখানো সংগীতকম্প্যাস্ সুমনকে ট্রিবিউট জানিয়ে। এ-পর্যন্ত প্রকাশিত অঞ্জনের অ্যালবামগুলোতে এই ধারাবাহিকতার ব্যত্যয় ঘটতে দেখা যায়নি। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে যে, সুমনের ডেব্যু অ্যালবামের অব্যবহিত বছর-দুয়েকের মধ্যেই অঞ্জন শুরু করেছেন, বয়সেও খুব-যে আকাশ-পাতাল ফারাকের এমনও তো নয়, একজন সদ্য সিক্সটিওয়ানে স্টেপডাউন করেছেন ও অন্যজন পাড়ি দিয়েছেন সিক্সটিসেভেন, এইটুকু তো অলমোস্ট সমানবয়সী, কাজেই অঞ্জন অবলীলায় চেপে যেতে পারতেন অনুপ্রেরণাঋণ। অঞ্জন করেননি তা, অ্যালবামের পর অ্যালবামে স্মরণ করেছেন নিজের জীবনে এবং একইসঙ্গে নতুনদিনের বাংলা গানের জীবনে সুমনের অবদান। তখন তো অঞ্জন যেমন, মৌসুমী প্রমুখ অন্যরাও, সুমনও নবীন গানশিল্পী। মিডিয়ামাদারির খেলায় বাংলা গানের লেবেল কখনো সমাজবদলের গান কখনো জীবনমুখী ইত্যাদি অংভং নানাকিছু সাঁটা হচ্ছিল, কিন্তু ঘুণাক্ষরেও এইগুলোকে আধুনিক বাংলা গান বলে পরিচয়দানে রাজি হচ্ছিলেন না বাংলাগানবোদ্ধা বিকট পণ্ডিতেরা। কারণ অজানা হলেও অননুমেয় অবশ্য নয় এই স্বীকৃতিকৃপণতার নেপথ্যে। একটা হলো, অনুমান করি, সুমন ও তৎস্রোতের নতুন গানবাজনা আধুনিক বলিয়া আখ্যায়িত হইলে এতকালের স্বর্ণযৌগিক হিমাংশু-ভূপেন-সন্ধ্যা-মান্না-হেমন্ত-হৈমন্তী প্রমুখের তরফদারি-করে-বেড়ানো বোদ্ধা গানালোচক-গানবেনেদিগেরে গোল্ডেন এইজের নিউ অরিয়েন্টেশন এক্সটেন্ড করা জরুরি হয়ে পড়বে। কেঁচে-গণ্ডুষের ভয়েই হয়তো উনারা প্রাণপণ রেজিস্ট করতে চেয়েছেন নতুন ও জেন্যুয়িন শিল্পস্রষ্টার অনুপ্রবেশন। যদিও জয় শেষতক, দুনিয়া ও আখেরাতে, বর-পাওয়া বীণাপাণির ক্যান্ডিডেটের। সুমন তো, অঞ্জন ও তার সতীর্থ সহযাত্রীরা তো, মঞ্জিল-এ-মকসদে পৌঁছাবেনই।
২৮
‘নানা কথা নানা সুরে / গান নিয়ে ঘুরে ঘুরে / সুমনের কাছে এনে দিয়েছে / এই বুড়ো পুরনো গিটার’—ডেব্যু অ্যালবামের ঠিক পরের অ্যালবামে নামগীতিকার গানে এই ছিল অঞ্জনের কনফেশন। অন্য কয়েক গানেও, ‘পুরনো গিটার’ অ্যালবামে, ছিল সুমনের উল্লেখ। সুমনের গানের রেফ্রেন্স। যেমন ‘ক্যালসিয়াম’ গানটায় : ‘সুমন বলছে পারো যদি / অন্য ছবি আঁকো / অঞ্জন বলছে টিভি দেখো না।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তদ্দিনে সুমনের সেকন্ড ভেঞ্চার ‘বসে আঁকো’ মুখ দেখে ফেলেছে আলোর; লভেছে বিপুল সমাদর আমাদের ন্যায় শ্রোতাদের, মিডিয়ার যথাস্বভাব মুখভেঙচানি সহ। অঞ্জনের প্রথম সংকলনে একটা আস্ত গান ছিল সুমনকে নিয়ে। সেই গানটা ব্যালাডধর্মী, দীর্ঘ, বর্ণনাত্মক। স্মৃতি খুঁচিয়ে বের করে এনে এইখানে বসাই কয়েকটা লাইন সেই গানটার : “তোমার কথা শুনতে ভালো লাগে / অনেকেই বলে / শোনায় তোমার কথা আমায় প্রায় / তাই শুনলাম তোমার কথা / গান শোনার ছলে / শুনলাম তোমাকে চাই / অনেক কথা কত কথা কথকতার সুরে / ভরে গেল ভেতরটা আমার / ইচ্ছে হলো বলতে কথা সুরের তালে তালে / আমার ইচ্ছে হলো বাজাতে গিটার। / মন আমার…/”—খেয়াল করে শুনলে এই ‘মন আমার’ উচ্চারণটা আরেক ব্যঞ্জনা হাজির করে কানে, ফ্রেঞ্চ ‘ম্যন অ্যাম্যর’ কথাটার মানে এই বাংলায় জানে না পাব্লিক বিরল, ‘হিরোশিমা, ম্যন অ্যাম্যর’ ম্যুভিটা দেখে নাই এমন বাঙালি বিরলপ্রাপ্য, ম্যন অ্যাম্যর…ডিয়ার কমরেড…‘প্রিয় বন্ধু’ অর্থের ফরাশি এক্সেন্ট অঞ্জন দত্তের গানটায় লভ্য, ওই ‘মন আমার’ উচ্চারণের সময় ইল্যুশনটা ইচ্ছে করেই দিয়েছেন চারিয়ে,—এই বিশেষ গানটা, প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, সে-সময়ের নতুন গানে এত সংখ্যক লোকের অংশগ্রহণ কেন ও কোন গোপন রহস্যের কারণে ঘটেছিল, খানিকটা ব্যাখ্যা করে। এখানে অঞ্জন সুরে সুরে নিজের সহসা গানপ্রবেশ ও নতুন গানের প্রবর্তনা সম্পর্কে বলতে বলতে যেন পুরো ওই টাইমটার গানক্ষিদে নিয়ে বলে ফেলেছেন। অঞ্জন বলছেন, যেমন, ‘গানটা আমার গাইবার এই ইচ্ছেটা-যে ছিলনাকো / কানটা ছিল শুধুই শোনার / অভ্যেসটা ছিল কথার তালে কথার জবাব দেবার / কথা কেড়ে নেবার স্বভাব; / তোমার কথার সূত্র ধরে পথ হারিয়ে নতুন করে / ইচ্ছে হলো কথাটা বলার / কথায় কথা বাড়ে / তাই বলছি ছোট্ট করে / আমার ইচ্ছে হলো বাজাতে গিটার।’—এইটুকু হলো সমাপনী স্তবক গানটার। তার আগের অংশে অঞ্জন পুরো পরিস্থিতি বিবৃত করে এসেছেন অবশ্য যে কেন ও কোন পটপ্রেক্ষায় তিনি এলেন দুম করে গাইতে গিটার কাঁধে, সেই অংশটুকু অঞ্জনেরই সেল্ফ-স্টেইটমেন্ট হয়ে থাকে নাই শুধু, হয়ে উঠেছে সেই সময়ের একঝাঁক নবপ্রবেশিত ও প্রায়-আগন্তুক গানগেরিলার দর্শানো কারণপত্র। ফলে এর পুরোটা এইখানে উদ্ধার করি স্মৃতি নিংড়ে : ‘গানের কোনো প্রস্তুতি নেই নেই-যে শেকড়বাকড় / মালকোষ কি পিলু ভৈরবী / গলায় আমার নেই-যে কোনোই রেওয়াজ করার স্বভাব / এই অভাব আমার থাকবে চিরদিন। / আমার শুধুই ছিল ও আছে কাঠখোট্টা বাস্তবটা / দিবারাত্রি আপোস আর আপোস / রবীন্দ্র কি গণসংগীত কোনোটাই ঠিক দিচ্ছিল না / বুকের ভেতর রেগে ওঠার রোষ।’ ঘটনা, গানের বিবরণাংশে, এইটুকুই। কিন্তু কোনো কথা বাকি রইল বুঝি বলতে? এইটাই, ইন-শর্ট ও ইন-ফ্যাক্ট, রিজন ও র্যাশন্যাল বিহাইন্ড নতুন কথার নতুন সুরের বাংলা গানের প্রবর্তনার। এই নিয়ে একসময়, ইন স্যম-আদার প্যারা, আরেকটু হয়তো বলতে উদ্যত হওয়া যাবে।
২৯
বলা হচ্ছে যে-সময়টার কথা, সেইটা আসলে কোন শতাব্দী? কোন রাজার আমল অথবা কোন নায়ক-নায়িকা বা বাংলা কোন সিনেমা তখন চলছিল মহাসমারোহে প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ করিয়া ঢাকা ও ভারতীয় বঙ্গে? এই খোঁজপাত্তাগুলো দরকার হবে একটু পরে। যেমন আমরা খানিক মনে করতে চেষ্টা করব, কোন ধরনের গান আমরা শুনছিলাম তখন, অথবা মান্না-ভূপেন ও মহীনের ঘোড়াগুলি (এই জায়গায়, এই ঘোড়াদেরে নিয়া, আলাদা রেস্কোর্স রিক্যোয়ার্ড হতে পারে মনে হয়) কিংবা আইপিটিএ প্রভৃতির গান আমরা কীভাবে নিচ্ছিলাম তখন, এইসব নিয়া খানিক আলাপও দরকার হতে পারে। এবং, বলা বাহুল্য, সময়টা লাস্ট সেঞ্চুরির নব্বইয়ের দশক। একেবারে গোড়াটা। বাংলাদেশের সিনেমাহল্ ভরে কেবল সাপুড়ে কাহিনির বীণ-বাজানো বই। হিন্দি ফিল্মিগানার বাংলান্তর কুমার শানুর কণ্ঠ ভর করে ঘরে ঘরে, বাসে ট্রেনে, চাদোকানে, এমনকি বন্ধুবান্ধবীর কলেজ-ফাংশানে। ‘কেয়ামত স্যে কেয়ামত তাক’, ‘সাজন’, ‘দিল্’, ‘আশিকি’, ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’, ‘ছায়া পেয়ার কা’, ‘ফুল ঔর কাঁটা’, ‘সড়ক’, ‘রাং’ ইত্যাদি সিনেমাগানের বাংলা ভার্শানে দেশকাল-সন্তানসন্ততি সয়লাব। বাংলাদেশের ব্যান্ডগান অবশ্য তখন উল্লেখযোগ্য তুঙ্গস্পর্শী। বিশেষ বলা বাহুল্য তরুণ মহলেই। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যান্ড নিয়াও আলাদা প্যারা লাগবে। এছাড়া আরও কিছু জিনিশ বলে নিতে হবে। যেমন তখন টুপাক শাকুর আর বাবা সায়গল এদের গান আমরা খুব শুনতাম। কলোনিয়্যাল কাজিন্স ও অন্যান্য। লং ড্রাইভে তো লা-জওয়াব এইসব গানই, যেমন, ‘লংড্রাইভ যায়েঙ্গে ফুলস্পিড লায়েঙ্গে / কোই রোকেঙ্গে না হাম / গানাবাজানা খানাপিনা / গাড়ি-ম্যে হো-গা স্যনম / আ যা মেরে গাড়ি-ম্যে ব্যেট যা’…তারপর লাকি আলি কিংবা জাল জুনুন ইত্যাদি। সেই বিপন্ন মহাক্ষণে এলেন সহসা ডালপালা উথলিয়া, আসলে যেন উদয়িলা, বাংলা গান ও গঞ্জনার অশেষ-অপরূপ ভুবনডাঙায় সুমন ও তার সারথীরা। ল্যান্ড করলেন অঞ্জন।
৩০
বাংলার বর্ষাবিলোড়িত সংস্কৃতির স্যাঁতসেঁতে-টেন্যর গানাবাজানার সঙ্গে অঞ্জনের চিনপরিচয় ঢের পরে এসে পরিণত বয়সে ঘটেছে, এই কারণেই হয়তো তার গানে তার গিটারে তার গায়নে তার গলায় বাংলা ব্যঞ্জিত হয়েছে ভিন্ন কায়দায় ভিন্ন ফ্লেভ্যর নিয়ে। এমনকি, অঞ্জনগান খেয়াল করে শুনে গেলে এহেন তথ্য খুব-একটা আশ্চর্য ঠেকে না বৈকি, তিনি রবীন্দ্রসাহিত্য তথা গীতবিতানের সঙ্গে অ্যাক্যুয়েইন্টেড হচ্ছেন বাংলা গান গাইবার ব্যক্তিগত প্যাশন থেকে যখন ইংরেজি লিট্রেচার নিয়া মাস্টার্স/অনার্স করছেন তখন। ফলে বাংলা গান পেয়েছে একটা স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত স্বর, দার্জিলিঙের কুয়াশা ও রোদ্দুর মোড়ানো গলা, সতেজ সহজতাজাত কথাচিত্রের লিরিক্স। স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অফ ইমোশন্স, ওঅর্ডসওঅর্থ বিবৃত, অঞ্জনগানে রিকালেক্টেড হতে দেখা যায় আগাগোড়া। খালি স্মৃতিরোমন্থনেই কম্ম সারা নয়, যেমনটা দেখা যায় এমনকি ইংরেজি অনেক মশহুর কান্ট্রিসিঙ্গারের মধ্যে, যেমন জিম রিভস্ বা প্যাট ব্যুন প্রমুখ; অঞ্জন সমকালের বিস্মৃতিও চারিয়ে দিতে পেরেছেন স্মৃতির সঙ্গে, ফেলে-আসা মাণিক্যের সঙ্গে বর্তমান-থাকা ছাইপাঁশ পুরে রেখেছেন সমান মমত্ব ও গুরুত্ব সহকারে, তার গানে। এইখানেই কথাটা পাড়া যাক যে অঞ্জনের গানগুলোকে ঠিক কান্ট্রিস্যং বলা যাবে না, কান্ট্রিস্যং বলতে অ্যাপোলিটিক্যাল যে-একটা ধারানুসৃতি ইংরেজি গানে দেখি, অঞ্জনের গান ওই জিনিশ না। অ্যাপোলিটিক্যাল নন অঞ্জন, উচ্চকিত পোলিটিক্যালও নন, কথা বলতে যেয়ে কোথাও রেয়াত দিতে দেখা যায় না তাকে। এইটা আলবৎ বোধগম্য যে কবীর সুমন যে-অর্থে তীব্র ও গভীর-গভীরতর পোলিটিক্যাল, যদিও, অঞ্জন দত্ত ওই-অর্থে পোলিটিক্যাল নন। পোলিটিক্স অঞ্জনের গানে এত সুসম্পৃক্ত-সংলিপ্ত থাকে যে ধরা প্রায় যায়-কি-যায়-না আলগোছ ধরনটা গানে থাকিয়া যায়। এর ফলে শ্রোতার নিকট অনেকসময় মনে হতে পারে যে এই মিউজিকে রাজনীতিচৈতন্য অনুপস্থিত। প্রকৃত প্রস্তাবে একদম উল্টো। অঞ্জনের গানে যে-অ্যাভেন্যুগুলো ঘুরেফিরে এসেছে, যে মানুষ ও মর্মসমূহ, এতদিন সেসব উপেক্ষিতই ছিল বাংলা গানে। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সাবার্ব কম্যুনিটির কথাটা আগেই বলা হয়েছে এ-নিবন্ধিকায়, এছাড়াও রয়েছে যেমন লজেন্সবিক্রেতা ফেরিওয়ালা মানুষটার বাস্তব ও স্বপ্নজগৎ, মুর্গি-ড্রেসিং কাজে জড়িত মজুর বালক, ট্রাফিক আইল্যান্ডের ফুলবিক্রেতা রাজু-রানী-র্যাম্বো, কর্মজীবী কিশোরী জয়িতার স্বপ্নভাঙা যাপনের ইতিবৃত্ত, বয়ঃসন্ধিকালীন কৈশোর-তারুণ্যের টানাপোড়েন, রোজগেরে বাপ-মায়ের একলা ফ্ল্যাটের স্কুলপড়ুয়া শিশুর বিষণ্নতা, চা-দোকানের চাকুরে ছেলেটার লাঞ্ছনাকাহন এবং সবকিছু ছাপিয়ে এদের বেড়ে-ওঠার অদম্য উত্থানগাথা। কাজেই বিরাজনৈতিক নয় অঞ্জনের গান, অরাজনৈতিক তো নয়ই। যে-জনগোষ্ঠীটা তার গানের আওতা, তারা গাণিতিকভাবে হয়তো অত বড় ও ব্যাপকাংশ নয়, মেইনস্ট্রিম হয়তো নয় তারা, সাধারণদৃষ্ট লোচন-আলোচনের বাইরেই ছিল অঞ্জনগানে এদের প্রেজেন্স ও আনাগোনা লক্ষ করার আগ পর্যন্ত।
৩১
যদিও বস্তি এসেছে বাংলা গানে, শ্রেণিবৈষম্য ও বঞ্চনা-মাৎস্যন্যায় ইত্যাদি পিকচারাইজ করার গরজে, সেই বস্তিও তো ভৌত অবকাঠামোগতানুগতিকতার সীমানায় ঘুরপাকরত বস্তি। এমনকি সুমনের গানের বস্তিতেও যতটা আবয়বিক অস্তিত্ব মনুষ্য প্রজাতির, ততটা হার্দ্যিক জটিলতা নাই যেন। সুমনগানে যতটা শরীর আছে ততটা হৃদয় নেই বস্তিমানুষের, যতটা সামষ্টিক উপস্থিতি আছে ততটা ব্যষ্টিক পর্যায় নিমহাজির, বিপ্লব ও যৌথখামার প্রভৃতি অভীপ্সার পার্পাস্ সার্ভ করতেই যেন সুমনের বস্তিজনমনিষ্যি ব্যস্তসমস্ত। অঞ্জনের বস্তিতে হৃদয়সংবাদ লভ্য। অঞ্জন অনেক বেশি ইন্ডিভিজ্যুয়্যাল অ্যাপ্রোচ ধরে ডিল করেছেন তার বস্তিমানুষগুলোকে। এতদিনকার বাংলা গানে, সেইটা বাউল-ফোক-ফকির-সুফি-কীর্তন-গণসংগীত যত-যা-কিছুই হোক, এই বস্তিহৃদয় মিসড-আউট ছিল। বলতে কেন দ্বৈধ হবে যে এমনকি কবীর সুমনের গানেও প্রত্যাশিত বস্তিহৃদয় এক্সক্লুড রয়ে গেছিল। অঞ্জন গোটা ব্যাপারটা ধারণ করলেন।
৩২
বস্তি ছিল বরং বাংলাদেশের ব্যান্ডগানে, বেশ লক্ষযোগ্য রকমেই ছিল, এখন অবশ্য ক্রমশ উধাও বলতে হবে। সেই-সময়, বিগত শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশক জুড়ে, ব্যান্ডগানে একটা আর্বান স্লাম-অ্যারিয়া কাভারেজে এসেছিল লক্ষ করা যাবে। সেইটা আবছাভাবে হলেও, অর্ধপরিস্ফুট কথাভাগের ননলিরিক্যাল লিরিক্স হলেও, বোঝা যাইত ওইটা স্লাম নগরচিত্র। সত্তরের গোড়া থেকে আজম খান, পিলু মমতাজ, নাজমা জামান, ফিরোজ সাঁই কিংবা জানে আলম ও ফেরদৌস ওয়াহিদ প্রমুখের পরিবেশনায় এই চিত্র যতটা হাজির, ক্রমে এটি থিতিয়ে এলেও, অলমোস্ট স্তিমিত হয়ে এলেও, নব্বইতে এসে বেশ-কয়েকটা ব্যান্ড যথেষ্ট দরদের সঙ্গে একটা স্লাম-আর্বেইনিটি লিরিক্সে এনেছে। এক্ষেত্রে চাইম, সিম্ফোনি, ফিডব্যাক এমনকি প্রমিথিউস ও এলআরবি-ও উল্লেখ করা যাবে। এবং কৌতূহলকর ব্যাপার এইখানেই যে, সেই স্লাম-স্পেসিফিক অনুষঙ্গবহুল কথাচিত্রের গানবাজনা ঢাকা সহ অন্যান্য ডিভিশন্যাল ও ডিস্ট্রিক্ট টাউনগুলোর মিডলক্লাস ড্রয়িঙরুমগুলোতে গৃহীত হয়েছিল;—মূলত ওরাই ছিল ওই গানের ক্রেতা(শ্রোতা)গোষ্ঠী/অডিয়্যান্স। তখনকার ঢাকায়, এবং অন্যান্য ডিস্ট্রিক্ট টাউনগুলোতে, যে-বস্তি ছিল এখনও ওই বস্তিই আছে, বরং বহরে-গতরে বেড়েছে, কিন্তু মধ্যবিত্ত-বলয়ের ব্যান্ডগানে এই বস্তির/গেটোর হাজিরা/রেপ্রিজেন্টেশন উধাও; পরিবর্তে ব্যান্ডগুলো ঝুঁকেছে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ খুঁজবার বেমক্কা লালনগিরিতে/লালনানুশীলনে। হেন মরমিপনা কাজের-কাজ কি না, তা আজিকেই জিজ্ঞাসা-আকারে এখানে উঠছে না। আর এই নিবন্ধে এতদপ্রসঙ্গে অধিক বাক্যখর্চা বাহুল্য ও অতিপ্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এইটেই স্বীকার্য যে এই অনুচ্ছেদ অত্র রচনায় একদম প্রক্ষিপ্ত। শুধু লক্ষ করিয়া যাওয়া যাক যে সেই-সময়কার মধ্যবিত্তের সঙ্গে বস্তিবিত্তের লোকেদের একটা আশনাই না-হোক মুখ-দেখাদেখি ছিল, পরস্পর পরিচয়াভিপ্রায় ছিল, বর্তমানে যা নাই।
৩৩
অঞ্জন নিজে তার গানবাজনাকে ‘নাগরিক লোকগান’ বলতে চেয়েছেন, বলেছেনও, লক্ষ করা যায়। কিন্তু নগরের অক্ষরদক্ষ/বর্ণজ্ঞানী ইন্টেলেক্টদের কথা মাথায় রেখে এই গান, না অনক্ষর-অল্পাক্ষর গরিষ্ঠাংশের ছবি বিবেচনায় রেখে এইটেকে দেখব? ফোক মিউজিক, তথা লোকগান, অঞ্জনকথিত নাগরিক লোকগানের বাইন্যারি অপোজিশন তবে? এই প্রশ্নটা আপাতত না-তুললেও চলে। যে-ব্যাপারটা ভাবায় সেইটে এ-ই যে, নগরে-বাস-করা ব্যাপকাংশ জনগোষ্ঠী গ্রামপতনের প্রত্যক্ষ ফল হিশেবে গেল-শতকের আশির দশক পর্যন্ত উদ্বাস্তু-উন্মূল, অন্তত বাংলাদেশের রাজধানী ও অন্য গুটিকয় জেলাশাহরিক সচিত্র প্রতিবেদন মাথায় রেখে এই চিত্রটা ভাবিতব্য, ফলে তাদের ভেতর লোকমানস-লোকচৈতন্য-লোকৈতিহ্যগুলো অগোচর নয়। নগর কলকাতাতেও এহেন প্রতিবেদনের অন্যথা হবে না আন্দাজ করা যায়। এবং মনে রাখতে হবে যে অঞ্জনের সৃজনপ্রস্তুতি, বিকাশ ও বেড়ে-ওঠার যাবতীয় অ্যারেঞ্জমেন্ট তার, ওই সময়টাতেই। কিন্তু অচিরে এপার-ওপার দুইপারের বাংলাতেই নিরঙ্কুশ গ্রামস্মৃতিশূন্য/শেকড়ভাবালুতাবর্জিত শুদ্ধ-অর্থে শাহরিক যুবাগোষ্ঠীর দেখা পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে এমনকি ছিঁটেফোঁটা গ্রামপ্রেম নাই, গ্রামফ্যাসিনেশন থাকবার কোনো যুক্তিবাস্তবিক ভূমি তাদের নেইও। ওই শ্রেণির জন্য গান বাংলায়, বিশেষত নগর কলকাতায়, কই? আছে, এদ্দিন ছিল না যদিও, এসে যাচ্ছে অচিরেই চন্দ্রবিন্দু, ফসিলস, ক্যাক্টাস, পরশপাথর, ভূমি প্রভৃতি ব্যান্ড। কলকাতার চিত্রপ্রতিবেদন এইটা। বাংলাদেশে এই চিত্র অবিকল অনুরূপ নয়, এ নিয়ে বক্ষ্যমাণ নিবন্ধকারের কতিপয় বীক্ষণ ও আন্দাজ রয়েছে বলা যায়, বিস্তারে কহতব্য পরবর্তীকালে কখনো কোথাও সময় ও সুযোগ ঘটে উঠলে। এখানে এইটুকু সংক্ষেপে বলে রাখা যাক যে মেট্রো কলকাতায় সেই-অর্থে গ্রাম গরহাজির, অনেকদিন হয় সেখানকার গ্রামচিহ্ন অন্তর্হিত, মহানগর ঢাকায় এখনো অগোচর নয় গ্রামচিহ্ন।
৩৪
লক্ষ করার ন্যায় ব্যাপার হচ্ছে এ-ই যে, পাহাড়ি মিউজিক বলতেই আমরা ঝটাপট ঝুমুর বুঝিয়া থাকি এবং নজরুল থেকে হাল-জমানার অর্ণব তক ঝুমুর তালেই পাহাড়ি গানের সমগ্র ধরতে চেয়েছি, একচেটিয়া মাদল আর একপেশে বাঁশি ইত্যাদি কয়েকটা বাদ্যযন্ত্রের বাইরে তেমনকিছু প্রয়োগ করতেও ওইভাবে দেখা যায়নি কাউকে। যে-কোনো কারণেই হোক বাংলায় সাঁওতাল সংগীতটা আনা হয়েছে মেইনস্ট্রিমে বেশি, কিন্তু সাঁওতালগানের বাইরেও তো বিশাল পাহাড়াঞ্চল ও বিস্তর ব্যাপক-বিচিত্র গানবাজনা তাদের। সাঁওতাল বরঞ্চ সমতলের ব্যাপার। অঞ্জন ঝুমুরবিটের বাইরে যেয়ে পাহাড় এঁকেছেন সুরে তার, পাহাড়ের গাছপাখিনিসর্গনরনারীনিঃসৃত সুরচ্ছবি অঞ্জন তার গানে গেঁথে তুলেছেন অভূতপূর্ব তরিকায়। সেইভাবে দেখতে গেলে একটা গানই নিরীক্ষ্য অঞ্জনসমগ্রে যেইটেকে সরাসরি পাহাড়ি বিটের পর্যায়ে ফেলা যায়। সেই গানটা ‘কাঞ্চন’। “একটু ভালো করে বাঁচব বলে / আর একটু বেশি রোজগার / ছাড়লাম ঘর আমি ছাড়লাম ভালোবাসা / আমার নীলচে পাহাড়” ইত্যাদি। এই গানটার গল্প অল্পকথায় এর আগের একটা প্যারায় সম্ভবত করেছি আমরা। যা লক্ষণীয় এখানে তা এ-ই যে অঞ্জন গানটাতে এমন একটা আবহ তৈরি করেছেন এবং ধরেও রেখেছেন আগাগোড়া সে-আবহ শুধু পিয়ানো-গিটার আর ড্রামস্ দিয়ে। এতদসত্ত্বেও বাঁশি ও ধামসা মাদলের এফেক্ট অপরিমেয়ভাবেই এসেছে দেখা যাবে। এবং, আন্ডাউটেডলি, গানটা গ্র্যান্ড সাক্সেস্। নির্মাণশৈলীর বিচারে উদাহরণীয় বললেও অত্যুক্তি হয় না।
৩৫
বাংলা গানে এর আগে বেশ ভিনপাহাড়ের বীণ বেজেছে যেমন ভূপেন হাজারিকার সৃজিত সুরে ও কথায় মিউজিকে। সেইটাও বঙ্গ মুলুকের পাহাড়প্রতিবেশ নয় তা তো বলাই বাহুল্য। অহমিয়া তালের ও লয়ের গান আমরা হাজারিকার দৌলতে পেয়েছি বাংলায়। সেইটা মাহুৎবন্ধুর জন্য কোনো-এক অহমিয়া নারীর জবানে প্রেমার্তিগাথায় হোক অথবা কাঁপাকাঁপা আলাহিদা-আনজানা আদলে সুরবাহার-করা/ইম্প্রোভাইজড অন্যান্য গানে, ‘হে দোলা’ হোক বা ‘গঙ্গা’, ব্যাপারটা আসলেই ছিল অচিন পাহাড়ের হাওয়া, বাংলা গানে বেশ অচিনা রাগিণী দিয়েছিলেন উপহার তিনি, দিতে পেরেছিলেন যথেষ্ট সফলতার সঙ্গে। ব্যাপারটা খেয়াল করা যাবে যে, এ-দেশের রঙ্গপুর/রংপুর অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের কুচবিহার এলাকার সুরসাযুজ্য। দুইখানেই ভাওয়াইয়া, ঠাট ও ছায়া আলগ যদিও। ওইদিককার কুচবিহার আর এদিককার রংপুর এলাকা—ভাওয়াইয়া কেমন কায়দায় যেন দুইদিকে দুই রূপ সূক্ষ্মভাবে রেখেছে ধরে; এইটা আজবও নয় অবশ্য। তফাতের দিকটাও ভূগোলগত ও জনজীবনজীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত করে বুঝে নেয়া যায়—এদিকটায় প্লেইনল্যান্ডে এবড়োখেবড়ো পথে গরুগাড়ি আর ওদিকটায় পাহাড়িয়া খাঁড়াই-ঢালাই বেয়ে হাতিবাহন উভয় অঞ্চলের সাউন্ড-ও-টিউনস্ক্যাপ গড়েপিটে নিয়েছে দেখতে পাবো। ওখানকার লোকে হাতি নিয়া পাহাড়ে যেয়ে মালসামান বহন করে যুগযুগান্ত ধরে, এখানে গরুগাড়ি ক্যাঁচক্যাঁচাইয়া যায়-আসে একই পার্পাসে; এর ফলে এ-দুই জায়গার গায়নশৈলীতে এর ছাপ আছে। এছাড়া আরেকজনের নামোল্লেখেই কিবোর্ড দম নেবে এক্ষণে, যে-জন সত্যিকার অর্থেই ডিফ্রেন্ট টিউনস্কেপ ইন্ট্রোডিউস্ করেছিলেন বাংলায়, হিন্দিতেও অবশ্যই, তিনি শচীন দেব বর্মণ। কবীর সুমন এই মিউজিক-লিজেন্ড নিয়ে কথা বলতে যেয়ে এক টেলিভিশনকথিকায় কিচ্ছুটি বাগবিস্তার না-করে কেবল কানের লতি চিমটি কেটে বলেছিলেন যে শচীনকর্তা ‘ইজ অ্যান অ্যাক্ট অফ গড’; বলেছিলেন যেন সংগীত বিষয়ক সাধারণীকৃত আলাপালোচনায় শচীনকর্তাকে ঢালাও কথালাপের বাইরে রেখে আলাপ চালানো হয়, কেননা তিনি হচ্ছেন ‘অ্যান অ্যাক্ট অফ গড’। সুমন নিজেও অবশ্য একটা পাহাড়ছবি নিয়ে এসেছেন বাংলা গানে, সেইটা আরেক ব্যাপার, সেইটা পাহাড়জনপদের মুক্তির গোঙানি ও গর্জমান জঙ্গলজনগোষ্ঠীর অস্তিত্বরক্ষণক্ষুব্ধ রক্তচক্ষু। সুমনকে এই পাহাড় ও এই জঙ্গল ভিশ্যুয়ালাইজ করবার জন্য আলাদা অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে হয়নি কিছুই। তিনি গেয়েছেন যেহেতু বহমান মূলধারাটার টনক নাড়াতে, মেইনস্ট্রিমের পায়াভারিক্কি ভাব ও অমার্জনীয় অপরাধগুলো দুনিয়ার সামনে আনতে, কাজেই সুমনের পাহাড় ও সুমনের জঙ্গল প্রতিরোধে-ও-প্রেমে এক ভিন্ন চারিত্র্যের ব্যাপার।
৩৬
অবশ্য পার্বত্যাঞ্চলিক সংগীতের ধুন এসেছে গণসংগীতেও। মূলত ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গ ও সংলগ্ন প্রদেশরাজ্যগুলোতেই গণসংগীতের গোড়াপত্তন ও বিকাশ। সংগঠনসামর্থ্য লগ্নি করে আইপিটিএ এবং অন্যান্য অনেকানেক ব্যক্তিশিল্পীর একক প্রচেষ্টায় নির্মিত ও পরিবেশিত গণসংগীত ঐতিহাসিক তরঙ্গবিক্ষুব্ধ রাজনীতিপৃষ্ঠভূমে গোটা বাংলায় বিস্তার লাভ করেছে অতি দ্রুত, প্রসার ঘটেছে প্রায় গোটা উপমহাদেশে এইধারা গান ও গায়নকৌশলের। সম্মেলক গণসংগীতের বাইরেও যাদের এ-ধারার গান শুনেছি, বিশেষত রুখোশুখো পর্বত ও লালমাটিঘেঁষা যাপনচিত্র-জীবনকথা যাদের গানে বেশ সংকুলান করে নিয়েছে স্থান, তাদের অন্যতম যেমন অজিত পাণ্ডে; তেমনি একটা পর্যায়ে এসে মেইনস্ট্রিম মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ব্যবহার করে নাগরিক মধ্যবিত্তীয় লোকালয়েও যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছেন যেমন প্রতুল মুখোপাধ্যায়; বেশিরভাগ গণসংগীতশিল্পীই অবশ্য অল্টার্নেটিভ প্ল্যাটফর্ম থেকে রেকর্ড প্রকাশ করে গেছেন, ততোধিক অবশ্য রেকর্ডই বের করেন নাই, অসংখ্য গণসংগীতশিল্পী গানটাকে শানিয়ে নিয়ে ফিজিক্যালি ম্যুভ করেছেন মনুষ্য সংসারে। এরা সকলেই গুপ্ত লোকালয়গুলো প্রকাশ্য করে তুলেছেন তাদের গানে। যেমনটা তাদের গানবাহনে চেপে আমরা বারবার বেড়াতে পেরেছি পাহাড় থেকে পাহাড়ে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সলিল চৌধুরীর এ-ধারার গানেও পাহাড় উঁকি দিয়েছে প্রতিবাদমুখর চেহারায়। বিজয় মাহাতো প্রমুখের গণসংগীতে এসেছে বিদ্রোহঝুমুর, শৈলেন বলের গানেও বনজঙ্গলঘেরা পাহাড়জনপদ এসেছে। এছাড়া সাধারণভাবে একটা কথা তো বলে নেয়া যায়ই যে গণসংগীতে মোটের ওপর অরণ্যজনজাতির জীবন ও লড়াই মিলেছে, শ্রেণিসংগ্রাম ও নক্সালাইট ইত্যাদির প্রত্যক্ষ অভিঘাতে জোতদার প্রতিরোধ আন্দোলনকর্ম উদ্বুদ্ধকরণ প্রভৃতি এসেছে, মেইনস্ট্রিমের পাহাড়-জঙ্গল সেভাবে ঠিক আসে নাই। কিন্তু যাকে আমরা বলতে পারি স্থির-অচঞ্চল আবহমান পাহাড়ি নিসর্গ, ঝর্ণা নিরবধি, নস্ট্যালজিয়্যাশ্যামল বনভূমি, টিলা-পাহাড়-বনজঙ্গলের স্বতন্ত্র একটা ভাষা, সমস্ত বঞ্চনা ও পীড়ন সত্ত্বেও পাহাড়ের নিজের একটা সম্পন্ন ছন্দ, অনন্য রিদম, সরল ও বিজ্ঞাপনবীতস্পৃহ পাহাড়হৃদয়, এবং সর্বোপরি শুশ্রূষাসামর্থ্য জঙ্গলাকীর্ণা পাহাড়ের—এই সবকিছু অনবদ্য রঙে-রেখায় এঁকে দেখালেন অঞ্জন সুরে-সুরে গিটারের রিফ মিলিয়ে। সেইটা মাইনর ডেকোর্যাটিভ এলিমেন্ট হিশেবেই হোক অথবা গানের ভিত্তিভিটে, সেই গিটারবাহিত কর্ডক্লাস্টার/নোটসিক্যুয়েন্স অঞ্জনের গানে এতটা হার্মোনাইজড হতে পেরেছে কেবল রক্তদ্রাবী মিউজিক্যাল জেন্যুয়িনিটির কারণেই। মিউজিক্যাল ইনজেন্যুয়িনিটি থাকলে পরেই এমনভাবে দেশ-বিদেশ একাকার করে দেয়া যায়। আর না-থাকলে যা হয়, তা তো নব্বই-পরবর্তী কলকাতার বাংলা গানে ভালোভাবেই দৃষ্টিগোচর, বড়জোর কবীর সুমনের কপিক্যাট হয়ে স্টেজে ও অ্যালবামে বেঁচে থাকবার প্রাণান্ত কোশেশ করে চলেছে আধুনিক কলকাতার বাংলা গান। অঞ্জন এই ফাঁড়া কাটায়ে উঠতে পেরেছিলেন গোড়াতেই।
৩৭
ইন্ট্রেস্টিং ও খানিকটা অ্যাস্টোনিশিং মনে হতে পারে শুনে যে বাদ্যযন্ত্রযোজনার ক্ষেত্রে বাংলা গানে অঞ্জন দত্ত অন্তত একটা-হলেও শ্রবণাকর্ষক সংযোজন ঘটিয়েছেন। কবীর সুমন যেমন একচ্ছত্রভাবে গিটার ও হার্মোনিকার সৃজনদীপ্ত ও বহুল ব্যবহার ফলিয়ে তুলেছেন বাংলা গানে, যে-ব্যাপারটা সুমনের আইকোনিক অরিয়েন্টেশনমার্ক হয়ে উঠেছে এবং সুমনকে এক-ঝটকায় ভিড়ের বাইরে এনেছে একেবারে গোড়া থেকে, স্যাক্সোফোন যন্ত্রটাও অঞ্জনকে তেমনিভাবে চেনায়ে দ্যায় এক-লহমায়। স্যাক্সোফোন যন্ত্রটা বাংলায় মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট হিশেবে প্লেব্যাকে কমিক ইউজ হলেও মূলধারা গানবাজনায় এর ব্যবহার বলতে গেলে একেবারেই ছিল না। সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে, যেমন বিবাহানুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলা বা মহাসমারোহে-প্রেক্ষাগৃহে-মুক্তিপ্রাপ্ত-নাচেগানে-ভরপুর বাংলা ছায়াছবির রিকশাযোগে প্রোমোশন্যাল লিফলেট বিতরণ প্রভৃতি কাজে এবং যাত্রাপ্যান্ডেলে, ট্র্যাম্পেট-ক্ল্যারিনেটের সঙ্গে স্যাক্সোফোন যন্ত্রটাও কখনো কর্ণগোচর হতো বটে। সেইটেকে প্যারোডির বেশি কিছু হইতে তেমন উদ্যোগী দেখা যায়নি, দেখা যাবার কথাও না। অঞ্জনই প্রায় প্রথম বলা যায় বাংলা গানে স্যাক্সোফোন বাদ্যযন্ত্রটাকে কৌলিন্যের আসন করে দেন। অসংখ্য গানে, ‘স্যামসন’ থেকে শুরু করে একাদিক্রমে ‘ম্যারিয়্যান’ কিংবা ‘জেরেমির বেহালা’ প্রভৃতি ইম্প্রোভাইজেশনে, স্যাক্সোফোন দুর্দান্তভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যাবে। একটা আনকা বাদ্যযন্ত্র বাংলা গানে সুচারু ব্যবহারের পথিকৃতের দাবিদার অঞ্জন দত্ত। সম্ভবত অঞ্জনই বাংলা গানে এ-পর্যন্ত প্রথম ও একমেবাদ্বিতীয়ম স্যাক্সোফোনপ্যাশনেইট সিঙ্গার। স্যাক্সোফোনের এমন বুদ্ধিসৃজিত ব্যবহার/প্রয়োগ বাংলা গানে অক্ষয় দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। যদিও তথ্যসুতো হিশেবে হলেও উল্লেখ কর্তব্য হবে যে স্যাক্সোফোন ইন্সট্রুমেন্টের অসাধারণ সুপ্রয়োগ অঞ্জনেরও আগে থেকে বাংলাদেশের একটা ব্যান্ডের গায়ন-বাদনে দেখা যাবে, সেই ব্যান্ডের নাম ফিডব্যাক, সেই ব্যান্ডের তৎকালীন লিড্-ভোক্যালের নাম মাকসুদুল হক। স্মর্তব্য ‘গীতিকবিতা-২’ তথা ‘ধন্যবাদ হে ভালোবাসা’ গানটা, মাকসুদেরই লেখা ও গাওয়া, তাছাড়া আরও কতক গানে স্যাক্সোফোন প্রযুক্ত হয়েছে দুর্দান্ত সুন্দরভাবে। এরপর মাকসুদ যখন ফিডব্যাক থেকে বেরিয়ে নিজের কায়দায় ব্যান্ড-সোলো সংমিশ্রণে ক্যারিয়ার রিশেপ-আপ করবেন, তখন লক্ষ করা যাবে স্যাক্সোফোনপ্রীতির কারণে জন ট্র্যাভিস্ নামের একজন বিদেশি বাদককে দলে ভেড়াতে একদম পুরোদস্তুর ব্যান্ডসদস্য হিশেবে—এক্সপায়ার করেছেন অনেকদিন হয় ইনি—যিনি ছিলেন একজন দুর্ধর্ষ স্যাক্সোফোনপ্লেয়ার। কাজেই ফিডব্যাক এবং পরবর্তীকালে মাকসুদের ‘ঢাকা’ ব্যান্ডে স্যাক্সোফোনপ্রয়োগ বাংলা গানের স্মৃতিনিষ্ঠ শ্রোতা মাত্রেই ইয়াদ করে উঠবেন নিশ্চয়।
৩৮
একজন স্যাক্সোফোনিস্ট অঞ্জনগানে একদম গোড়ার দিকে ক্যারেক্টার হিশেবে এসেছে। না, বাদ্যযন্ত্র হিশেবে তো ঘুরেফিরে এসেছেই আগাগোড়া, ক্যারেক্টার বলতে বোঝানো হচ্ছে গানের টেক্সট্যুয়্যাল প্রোট্যাগোনিস্ট, গানের ভেতর অঙ্কিত মুখ্য চরিত্র বলে যেইটারে, সেই-অর্থে ‘স্যামসন’ চরিত্রটা বাংলা গানে এক স্মরণার্হ সংযোজনী সৃজন। গানের আখ্যানভাগে দেখা যায়, স্যামসন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এক স্যাক্সোফোনবাদক, হোটেলের বলরুমে স্যাক্সোফোন বাজায়েই নিতিকার গ্রাসাচ্ছাদন ও পানাহার তার, পানাসক্তই বলা যায় তাকে, এবং প্রেমপ্রত্যাখ্যাত ওয়েস্টার্নাইজড দেবদাস ভার্শন। গানের আখ্যানভাগ লতিয়ে উঠেছে মিল্টনের অতিবিখ্যাত ওই ‘স্যামসন অ্যান্ড অ্যাগোনিস্টাস’ ভর করে। প্যারাডাইস লস্ট, হায়! ডে-লায়লা আছে,—আছে এমনধারা লাইন : “সস্তা হিন্দি মদে গেছে বিছানাটা ভিজে / ধুয়েমুছে গেছে যৌবন / স্যামসন আর তার সঙ্গী স্যাক্সোফোন / … / ক্রুশবিদ্ধ যিশু ক্যালেন্ডার থেকে কাঁদে / তারই মতো স্যামসনও আটকে পড়েছে এক ফাঁদে”…ইত্যাদি। ফিরিঙ্গি ইন্ডিয়ান আবারও। এবং স্যাক্সোফোন। ‘কলকাতা-১৬’ অ্যালবামে একটা গান আছে যেখানে উপস্থিত হন খোদ জন কোল্ট্রিন—অবশ্যই লিরিক্সের বাণীভাগে—“জানলা আমার সকালবেলা শোনায় ভৈরবী / আর সন্ধেবেলা শুধু জন কোল্ট্রিন / গানের সুরে রেশারেশি-দ্বেষাদ্বেষী নেই / আমার গানের জানলা গোটা পৃথিবী”…ইত্যাদি। কোল্ট্রিন থাকলেও মাইলস ডেভিস নেই, ছিদ্রান্বেষীর উক্তি, কিন্তু তাতে তেমন কিচ্ছু যায়-আসে না আদৌ। অঞ্জনের স্যাক্সোফোনপ্রণয়ের নমুনা হিশেবে এভাবে একাধিক গান সামনে এনে দেখানো সম্ভব। অবশ্য দরকার হবে না আর, সো-ফার, মনে হয়।
৩৯
প্রধানত অঞ্জন গিটারটাই বাজিয়ে থাকেন, এবং আরেকটা বাদ্যযন্ত্রের যোজনাও সুখদ, অত্যন্ত হার্মোনাইজড হতে দেখি সেই যন্ত্রটাও অঞ্জনগানে, সেইটা হলো মাউথ-অর্গ্যান। কবীর সুমনকেও যন্ত্রটা বাজাতে দেখি। ইন্ট্রেস্টিং একটা ব্যাপার এ-ই যে, যে-বাদ্যযন্ত্রটা বাংলা গানে এই সেদিনও গরহাজির ছিল, বর্তমানের বাংলা আধুনিক ও অন্যান্য সর্ববিধ গানে সেই বাদ্যযন্ত্র তথা গিটার মুখ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে! এখন ভাবাই দুষ্কর গিটার ছাড়া বাংলা গান। হোক তা অ্যাক্যুস্টিক বা ইলেক্ট্রিক, লিড বা ব্যেস বা রিদম, ক্ল্যাসিক্যাল বা ফ্ল্যামেঙ্কো বা ফ্ল্যাটটপ বা আর্কটপ, বাংলা গানে গিটার এখন অনিবার্য। অঞ্জনের গিটারবাদন কখনোই গান-ছাপিয়ে-ওঠা ক্যারিশমা-কার্দানি কিছু মনে হয় না। বাংলা গানে বেশিরভাগ মিউজিশিয়্যানকেই দেখা যাবে এই স্কিল-শোভিনিস্টের হামবড়াই ভূমিকায়। এইক্ষেত্রে কবীর সুমন নমস্য সর্বাগ্রে, যিনি যন্ত্রটা গানের অনুবর্তী করার পথ দেখিয়েছেন; সবাই করে উল্টোটা, গানকেই ইন্সট্রুমেন্ট-অনুবর্তী করে তুলতে দেখা যায় বেশি। সুমন ও অঞ্জনের ঝোঁক সবসময় বাদ্যযন্ত্রকে গানবর্তী রাখার দিকেই, গানকে বাদ্যযন্ত্রানুবর্তী করার দিকে নয়। ঠিক অনুরূপ ব্যাপার দেখা যাবে ডেনভারে এবং ডিলানেও। কোহেনেও। বর্ণিত তথা নামোল্লেখকৃত প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই তাদের তন্বিষ্ট শ্রোতৃবর্গ অনুযোগ করেন একঘেয়ে পুনঃপুনরাবর্তপ্রবণতার; এবং এর পেছনে তাদের/শিল্পীদের গিটারপ্রয়োগ অংশত দায়ী বলে মনে করেন তারা। আসলেই কি তাই? নিজের সিগ্নেচার তৈয়ার করা শিল্পী মাত্রেই ব্যাপারটা দেখা যাবে যে, একবার ভাওয়াইয়া গাইলেন তো পরেরবার বৈচিত্র্যমোহে ভাঙড়া গাইতে শুরু করলেন, এহেন পল্লবগ্রাহিতা তাদিগেরে দিয়ে হয় না। তারা তাদের ঘরানার ভিতরে থেকেই নিজেদের নিশান সমুন্নত করে রাখেন, বাহির আবাহন করেন নিজের ঘরানায়, স্বায়ত্ত গায়নভঙ্গির সুতো একবার পেয়ে গেলে ফের ইতিউতি দৌড়াদৌড়ি বৃথা বাতুলতা। যারা আরাধ্য পথের হদিস পায় না, তাদিগেরে অগত্যা মাধুকরী বৃত্তির জয়গান জিন্দেগিভর গাইতেই হয়। কিন্তু অঞ্জন দত্ত, কবীর সুমন, বব ডিলান, জন ডেনভার, লেনার্ড কোহেন প্রমুখ বাগগেয়কার তো পল্লবগ্রাহী নন; সুরের স্থল-জল-অন্তরীক্ষ ভ্রমণবিহারকালে তারা তাদিগের স্বোদ্ভাবিত সুরধারণযন্ত্রখানা সঙ্গে নিতে ভোলেন না। সাগরপারের হাওয়া যেমন রবীন্দ্রনাথ ধরেছেন তার গীতবিতানের গানপঙক্তি ও স্বরলিপিতে, তেমনি সুমন-অঞ্জনও। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জন ডেনভারকে প্লেবয় ম্যাগাজিনে এক ইন-ডিটেইল্ড ইন্টার্ভিয়্যুতে এহেন প্রশ্ন করা হয়েছিল যে ডেনভারের বেশিরভাগ গানের স্টার্ট-আপ এবং টেম্পো পূর্বানুবৃত্তিপ্রবণ, রিপিটিশাস, অলমোস্ট ইমিডিয়েট-আগে-গাওয়া আপনকার কোনো সুরছাপ পরিলক্ষিত হয়, এবং এমনটা ঘটে থাকে মূলত গিটারবাদনে ভ্যারিয়েশনের অভাব থেকেই; ডেনভার স্বীকার করেছিলেন যে এরচেয়ে বেশি গিটারওয়ার্ক তার গানে এসেনশিয়্যালও নয়, সেইসঙ্গে এমনটা আক্ষেপও করেছিলেন যে একটু ভালো করে গিটারটা তালিম করা থাকলে নিজের গানগুলো অনেক অন্যরকম হতো নিঃসন্দেহে। একইভাবে কবীর সুমনও অনেকবার অনেক জায়গায় বলেছেন যে তিনি গিটার শিখেছেন পরিণত বয়সে যেয়ে প্রায় চল্লিশ বয়সসীমান্তে, এবং যন্ত্রটা আরেকটু দখলে এলে গানটা আরও উপভোগ্য-উন্নত হতো হয়তো, তবে এ-ও কবীর স্বীকার করেন যে এরচেয়ে বেশি গিটারদখল ওঁর গানের জন্য জরুরিও নয়; এবং উল্লেখ না-থাকলেও সকলেই জানবেন যে, কবীর সুমন নিজের গানের সঙ্গে ব্যবহৃত অলমোস্ট সমস্ত ইন্সট্রুমেন্ট নিজে প্লে করতে পারেন, করেনও বলা বাহুল্য, অ্যারেঞ্জ তো স্বয়ং করেনই। ইন-ট্রু-সেন্স, বাংলা গানে কবীর সুমন সর্বার্থে একজন বাগগেয়কার;—আর বাগগেয়কার তিনিই যিনি নিজের রচনায় গীতি-টিউন-সংগীতসৃজন সহ প্রয়োজনীয় সমস্তকিছুই নিজে করে থাকেন। অঞ্জনকেও আমরা বাগগেয়কার বলতেই পারি। নিশ্চয় লক্ষ করব যে সুমন ও অঞ্জন উভয়ের গানেই সিন্থেসাইজার ব্যবহৃত হয় মেধাদীপ্ত উপায়ে; সেই সিন্থেসাইজার দিয়ে নতুন টিম্বার জেনারেইট করা হয়েছে বেশিরভাগ সময়, রেয়ার্লি অন্য কোনো ইন্সট্রুমেন্ট ইমিটেইট করার গরজে এটি ব্যবহৃত হয়েছে, শেষোক্ত ইমিটেশন করার সোজাসাপ্টা রাস্তাতেই সিন্থেসাইজার বেশি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়; সুমন বিশেষ করে সিন্থেসাইজার ব্যবহারের পাশাপাশি অরিজিন্যাল যন্ত্রটা গানে লাগিয়েছেন। যন্ত্রানুষঙ্গ যথাসাধ্য পরিমিত রেখে, কথারূপের সঙ্গে যন্ত্রায়োজন যেন সাংঘর্ষিক না-হয় সেদিকটায় খেয়াল রেখে, দুইজনেই সৃজন করেন গোটা গানটা। বাদ্যযন্ত্রায়োজনটা তাদের গানে এসেছে গোটা গানটার স্থাপনায় সাপোর্ট যোগাতে, মেইন গ্রাউন্ড নয় মিউজিক সেখানে, এদের গানে কথাপ্রাধান্য লক্ষযোগ্য। তবে এর মানে আবার এ-ও করা যাবে না যে এহেন কথাপ্রাধান্যের ফলে গানটা বা মিউজিকটা মার খেয়েছে; একদম নয়, বরঞ্চ অনেকদিন ধরে বাংলা গানে কথাগৌণ দরিদ্র পরিস্থিতির নিরসন হয়েছে বহুলাংশে এদের হাতফের্তা হয়ে। এখানে উল্লেখ্য, অঞ্জনগানে লিরিক্স/কথা/বাণী যতটা-না বাঁধুনিঋদ্ধ ও পোলিটিক্যালি/ফিলোসোফিক্যালি স্ট্রং, তারচেয়ে বেশি বরং ইমোশনের স্ট্রিং নখে কেটে কেটে একটাকিছু টুংটাং তোলা, নাগরিকের সুরতন্ত্রীতে একটুকু ছোঁয়া লাগিয়ে গল্পটা জাগায়ে তোলা;—মানুষেরই গল্প, মানবজমিন আবাদের আখ্যান ও অনাবাদের রামপ্রসাদী বয়ান; সমস্তই করেন তিনি গিটারের কয়েকটা আঁচড়ে, গুটিকয় রেখাকারুকীর্তিত পঙক্তিতে।
৪০
গানের প্রয়োজনে, কবিতার প্রয়োজনে, সাহিত্যের প্রয়োজনে রচয়িতার যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা বা যাপন তথা শিল্পীর অটোবায়োগ্রাফিক উপাদান রচনায়/শিল্পে প্রযুক্ত হয়ে আসছে আদিকাল থেকেই। গানের ক্ষেত্রে আমরা রবীন্দ্রনাথ-নজরুল প্রমুখের গীতিকবিতা হাতে নিয়েও খুঁজে বের করতে পারব ওই আত্মজৈবনিকতা, পারব অন্যান্য সংগীতকারদের রচনা থেকেও খুঁজে দেখতে এবং তুলে আনতে, কিংবা গ্রামের/শহরের অনামা ফোক/পপ/ম্যাস-কালচারের সঙ্গে জড়িত অন্য মহাজনদের কাজেও ঘটনাটা দুর্লক্ষ হবে না। আরেকটু পরবর্তীকালের, বলতে গেলে এই সেদিনের, সলিল চৌধুরী প্রমুখের কাজের ভেতরেও প্রবণতাটা—আত্মজৈবনিক সূত্র-সারাংশ প্রয়োগের প্রক্রিয়া ও কৌশল—লক্ষ করব। তবে এসব ক্ষেত্রে, এতক্ষণ উল্লেখকৃত সংগীতকারদের কাজে, অটোবায়োগ্রাফিক এলিমেন্টস অনেক খুঁজেমেগে বের করে দেখাতে হয়; এরপরও হলফ করে বলা যাবে না বেশিরভাগ সময় যে এইটা কাব্যিক কোনো ছদ্মজৈবনিকতা, নাকি রিয়্যালি মিউজিশিয়্যানের আত্মজীবনাংশ; রেফ্রেন্সটা তারা আদৌ স্পষ্ট করতে পারেন না বা চান না হয়তো-বা। তারপর এল গত শতকের নয়ের দশক, যখন বাংলা গানে আবির্ভাব ঘটল সুমনের এবং সুমনেরই ট্রেইল ধরে একদল গায়কের/শিল্পীর, যারা ভালো-বা-মন্দ যেমনই গেয়ে থাকুন-না-কেন অটোবায়োগ্রাফিক টোন ও টেক্নিকটা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন; অটোবায়োগ্রাফিক টোন, আত্মকবুলতি, আপনজৈবনিক স্বর বাংলা গানে একটা আদল গড়ে তোলে এই সময়েই। এর আগে যেই জিনিশটা গানে এসেছে কালেভদ্রে, ফর-অ্যা-চেইঞ্জ, এক্ষণে সেইটাই হয়ে ওঠে ক্যারেক্টারিস্টিক্স; মুখ্যত অটোবায়োগ্রাফিক রেফ্রেন্সগুলোকে এডিটিংপ্যানেলে যেয়ে সেল্যুলয়েডের মতো গ্রথনের গরজে যেন পোয়েটিক ডিকশন ও টেক্নিক অ্যাপ্লাই করা হয় এই সুমনপ্রবর্তিত-ও-সুমনোত্তর নবপ্রবাহের বাংলা গানে;—এত বহুল-ও-ব্যাপকব্যবহৃত এই কৌশল, এ-পর্বের গানে এমনভাবে এসেছে যে এমনকি বাংলা কবিতায়ও বোধহয় এত অটোবায়োগ্রাফিক প্রচুরতা পাওয়া দুষ্কর হবে। সুমন ছাড়াও অঞ্জন, নচিকেতা, মৌসুমী ভৌমিক প্রমুখ এই লিরিকমণ্ডলের আওতাভুক্ত। অচিরেই দেখব আমরা, বাংলা গানে এই আত্মজৈবনিকতা নানামাত্রিক বাঁক ও বিস্তৃতি নিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে গড়ে-ওঠা ব্যান্ডগুলোতে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’-র পরে—ওরা অবশ্য প্রবণতাগত বিচারে আত্মজৈবনিক না-হলেও গুটিকয় আত্মজীবনসূত্রাঙ্কিত পঙক্তিকীর্ণ গান ওদেরও রয়েছে—মেধাদীপ্ত দলগুলোর মধ্যে ‘চন্দ্রবিন্দু’ অন্যমাত্রিক দ্যোতনা ধারণ করে লিরিক্স লিখেছে দেখনদারি-ও-বয়ানকারির সহযোগে, সেখানকার আত্মজৈবনিকতা আলাদা আলাপের প্রসঙ্গ। সুমন-অঞ্জনের পরে চন্দ্রিল-উপলের ‘চন্দ্রবিন্দু’ গোটা বাংলা গানের কন্টেক্সটে এক উজ্জ্বল উদয়। এর বাইরে ‘ক্যাক্টাস’ ইত্যাদি ট্র্যাশ, ‘ভূমি’ কিংবা ‘ফসিলস’ প্যারোডি অলমোস্ট। দুর্বল মিউজিক আর প্যারোডি লিরিক্সের ব্যান্ডে কলকাতা ছাওয়া।
৪১
আত্মজৈবনিকতার কৌশল কবীর সুমন ও অঞ্জন দত্ত দুইজনেই ব্যবহার করেছেন নিজেদের রচনায় ব্যাপক ও বহুলভাবে; দুইজনের প্রয়োগের ধরন, বলা বাহুল্য, দুইভাবে দেখতে পাই। সুমন যখন কোনো সামাজিক অসংগতি/বিকলন নিয়া গান করছেন, দেখব যে, সেই বিকলন/অসংগতির সঙ্গে অক্লেশ-অনায়াস ইতিহাস/ইতিহাসাংশ জুড়ে নিচ্ছেন; রচনার প্রাথমিক প্রণোদনাটুকু হয়তো রচয়িতারই কোনো ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাজাত, অচিরেই লিরিক্সের শরীর ব্যাপ্ত হয়ে যেতে দেখি ইতিহাসের শামিয়ানাতলে। সেই ইতিহাস শুধুই বাংলার নৈব চ, জনপদের কথা ধারণ করেও সেই ইতিহাস জনপদান্তরের, কালের কল্লোল গতরে নিয়েও রচনাটা হয়ে উঠতে চায় কালান্তরের, কবীর সুমনের গান যেন গোটা মানবাভিজ্ঞতাই নিতে চায় নিজের কণ্ঠে। এমনকি সুমনের প্রেমগানেও লক্ষ করব এই প্রবণতা। সাময়িক কোনো অভিঘাত থেকে বেরোনো গান মুহূর্তেই কালিদাসের কাল বা গৌতম বুদ্ধ অথবা যিশুর সময়খণ্ড ভ্রমণ করে আসে। এইখানেই অঞ্জনের আত্মজৈবনিকতা আলাদা আদলে হাজির থাকতে দেখি। অঞ্জন বরঞ্চ অনেক বেশি স্থানিক, অনেক বেশি কালিক, তা সত্ত্বেও লক্ষ্যভেদী নিঃসন্দেহে। একেবারে ব্যক্তিগত তথা পারিবারিক ইতিহাসটাও অঞ্জনের গানে সর্বজনীন উচ্চারণের পরিব্যাপ্তি পায়; যেমন, ‘উপড়ে গেছে শেকড় আমার বনেদিয়ানার / আমি ছিন্নমূল’—‘দেবলীনা’ গানে এই উচ্চারণসূত্রে, এবং অন্যত্র অনেক জায়গায় মিলবে একই রিয়্যালাইজ্যাশন, যেন অঞ্জনেরই জীবন প্রতিরেখায়িত হয়। ব্যাপারটা আমরা আস্তে আস্তে জেনেছি এক-সময়ে যে, অঞ্জন কলকাতার পুরনো বনেদি গৃহে জন্মেছেন, তদ্দিনে বনেদিয়ানা আভা হারাচ্ছে এতদঞ্চলে, অঞ্জন নিজেদের পরিবারে সেই ক্রান্তিদৃশ্য অবলোকন করেছেন, দেখেছেন কেমন করে কেরানি বনবার বৃহত্তম বনেদ গড়ে উঠল ক্রমে। একেবারে ফ্যামিলি লেভেলের এহেন দেখাদেখি অঞ্জনের নানা গানে গ্রথিত, বোঝা-প্রায়-যায়ই-না এতটাই নির্লিপ্ত অন্তর্লীন স্বর সেই গ্রথনের; পরবর্তীকালে দেখব, অঞ্জনের যাবতীয় ম্যুভিনির্মিতির একটা আকর হবে এই ইশ্যুটাই,—‘দত্ত ভার্সাস দত্ত’ এর বড় উদাহরণ। অবশ্য অঞ্জনের আত্মজৈবনিক ম্যুভির উদাহরণ হিশেবে ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’ ছায়াছবিটা আরেক মর্তবার সংযোজন; ‘রঞ্জনা…’ ম্যুভিটা বাংলা গানের নবপর্যায়দিনের বায়োগ্রাফিও বটে, যেখানে কবীর সুমন ও নতুন গানপ্রবর্তনা শাঁসমূলসমেত উদযাপিত। অঞ্জনের রচনায় যেসব বিষয়াশয় এবং কুশীলব ঘুরেফিরে উপস্থাপিত হতে দেখি, এরা একটা দাগাঙ্কিত ছোটবৃত্তের অনুষঙ্গ ও অধিবাসী; নিজের নৈকট্যবোধে জারিত করে অঞ্জন এদেরে প্রেজেন্ট করেন তার শ্রেণির কাছে, এবং অনুভবদ্রবণীয় করে তোলেন ছোটবৃত্তীয় ওই প্রান্তনিহিত প্রান্তিকের সংবেদ-বেদনার প্রতিবেদন। মোটা দাগে অঞ্জনের গানে এইভাবে ব্যাপারটা ঠাহর করা যায়। এর বাইরেও অবশ্য কথা আছে। যদি বলা হয় স্থানিকতার বাইরে যে-একটা আন্তর্জাতিকতা, তা কি নিতান্ত গরহাজির অঞ্জনরচনায়? না, তা-ও সমুপস্থিত বৈকি। তিন-চারটে উদাহরণ তো চটজলদি তুলে দেখানোই যায়। একটামাত্র উদাহরণ দেখতে চেষ্টা করি। সহস্রাব্দসূচনালগ্নে ইন্ডিয়ার উড়িষ্যা রাজ্যের ঝাড়খন্ড অঞ্চলের প্রত্যন্ত কেওনঝড় গ্রামে উগ্র ধর্মবণিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানত্রয়ী বিজেপি-শিবসেনা-আরএসএস তথা বজরঙ্গী দানবদিগের মদতে অস্ট্রেলিয়ান তিন মিশনারি পিতাপুত্রকে গাছের সঙ্গে বেঁধে কেরোসিন ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়। গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইন্স, মাইকেল স্টুয়ার্ট স্টাইন্স এবং ফিলিপ স্টুয়ার্ট স্টাইন্স—‘বাপের সঙ্গে দুই নাবালক ছেলে / পুড়ছি আমিও তোমায় সঙ্গে নিয়ে’—কবীর সুমনও ঘটনাটা নিয়া গান বেঁধেছেন দুর্ধর্ষ তরিকায় এবং স্বভাবজ সহজতায় সেই গানের শেষে যেয়ে সুমন বলছেন : “আমার ধর্ম তোমায় জানিয়ে যাই / গানের দিব্যি আমি প্রতিশোধ চাই / আমার বোধের হাতিয়ারে শান দিয়ে / পুড়ছি আমিও তোমায় সঙ্গে নিয়ে।” এইবার দেখি একই ঘটনা নিয়ে অঞ্জন কী নিরাসক্ত ও মরাটে মাছের চোখে বেদনাজারিত স্বরে খ্রিস্টীয় সৎকারগাথার শ্লোকসুর বাহন করে অসাধারণ লিরিক্স রচেছেন ও সুর করেছেন : “অস্ট্রেলিয়ার থেকে উড়িষ্যা / দূরত্বটা কত জানি না / তবে যিশুর থেকে রামের দূরত্ব / নেই-যে কোনো আমি জানি তা”…তারপরে যেয়ে অঞ্জন বলছেন : “দু-হাজার বছর আমার সভ্যতা / ইতিহাসটা বড়ই লজ্জার / সেই আকাশভরা লজ্জা বুকে নিয়ে / শুরু নতুন শতাব্দী আমার / যেখানে ক্রুশকাঠে কেউ কেরোসিনে পোড়ে / যেখানে গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইন্স আরেকটা নাম / … / বাড়ছে প্রেমের সৈনিকদের তালিকা / জানছি আমি ফিরে ফিরে বারবার / যেখানে ছ-বছরের শিশুও একটা শহিদ / যেখানে ফিলিপ স্টুয়ার্ট স্টাইন্স আরেকটা নাম / … / তাই মানুষ খুঁজে যাই উড়িষ্যায় / সেই মানুষ খুঁজে যাই অযোধ্যায় / সেই মানুষ খুঁজি ভ্যাটিক্যান শহরে / এই মানুষ খুঁজে পাই কেওনঝড়ে।”…গানটার সুর অভাবিতপূর্ব অসাধারণ, খ্রিস্টীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শ্লোকসুর উপানুসরণ করে, আলেল্যুয়্যা…আলেল্যুয়্যা…। খানিকটা কি ধরা যায় এই উদাহরণ থেকে অঞ্জনের অনন্যতা? যায় না?
৪২
তা ঠিক বটে যে অঞ্জনলিরিক্স পাঠবস্তু/টেক্সট হিশেবে তেমন উৎরোয় না; এইটা আমরা টের পাই লিরিক্সের কথাভাগ গোটা গানায়োজন থেকে বের করে এনে যখন পড়তে শুরু করি তখনই, তার আগে নয়, অঞ্জনের সুর ও স্বরায়োজনে একবারও মনে হয় না গানের কোথাও এতটুকু খামতি। কিন্তু দুনিয়ায় গান ও কবিতার মধ্যে এইখানে একটা পার্থক্য মনে হয় সূচিত রয়ে যায়; ব্যাপারটা এ-ই যে, সুরাশ্রিত শিল্পকর্ম গান,—এর শরীরে কথা/বাক্যসংস্থান কবিতার আদলে থাকে না। গানের ক্ষেত্রে সুরটাই নির্ভর/মুখ্য; কথা/বাক্য/পঙক্তি গানে সাপোর্টিভ রোল প্লে করে থাকে। কবিতায় যেহেতু পঙক্তিই নির্ভর/প্রধান, কাজেই গানের পৃথকত্ব প্রণয়নের প্রাথমিক পথ/পন্থাটাই হলো সুর। কবিতার ইতিহাসে এহেন সময় এসেছে, আমরা দেখেছি, যখন রীতিমতো আন্দোলন/ম্যানিফেস্টো দিয়া কবিতাদেহ থেকে সুরপাখনা ছাঁটার কাজ করতে কবিদেরকে;—স্তেফান মালার্মে প্রমুখ ফরাশি সিম্বোলিস্ট কবিদের কথা আমাদের মনে পড়বে এতদপ্রসঙ্গে। যে-সাতটা সুর ভর করে গানের উড্ডয়ন, সা রে গা মা পা ধা নি, সেই সপ্তক তো অর্থোর্ধ অ্যাবস্ট্র্যাকশনের চূড়া। কাজেই কবিতা যেভাবে ছন্দে/গদ্যস্পন্দে কার্য সমাধা করিয়া থাকে, স্বভাবতই গানের কাছে তেমনটা আশা আমরা করি না। পাই যদি কখনো, কবিতার কারুকাজ গানের গতরে, তো সেইটা বাড়তি পাওনা। বাংলা গানের আবহমান প্রেক্ষাপট মনে রেখে, এবং যেটুকু শ্রুত ইংরেজি গানবাজনা আমাদের, এই পৃথক গানধর্ম বুঝতে হবে। একটা উদাহরণ হিশেবে রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’ বা নজরুলের লিরিক্সসংকলন সামনে রেখে দেখানো সম্ভব কোথায় যেয়ে গান ও কবিতা আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ-নজরুলেরও অনেক গীতপঙক্তি কবিতা হিশেবে টেকসই, বলা বাহুল্য, গানগুলোর মূল ঝোঁক পঠনের দিকে ততটা না-হলেও। কবীর সুমন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম এক্ষেত্রে। সুমনের গান, লক্ষ করা যাবে যে, আগাগোড়াই অক্ষরবৃত্তস্পন্দিত। সুমনের গানদেহ প্রধানত পয়ারে বাঁধা; একদম প্রথানুগত পয়ারের চাল সুমনগানে লক্ষণীয়। সেহেতু কবীর সুমনের গান শ্রাব্য হিশেবে যেমন সুখকর, পাঠ্য হিশেবেও অনুরূপ উপভোগ্য। অঞ্জনের গান, মোটা দাগে বাংলা ও অন্যান্য ভাষার গান, পাঠ্য হিশেবে অত উপভোগ্য হয়তো নয়। হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক বলুন, অথবা বাউলফকিরি কি লোকজ অন্যান্য সংগীতধারা আদৌ কথাপ্রাধান্যবহ নয় বরং কথাগৌণ তথা তান/সুরপ্রধান। কথাপ্রাধান্য বলতে এখানে কথাশক্তি কিংবা শক্তিশালী লিরিকের ব্যাপার বোঝানো হচ্ছে; কেননা বাংলা গান মূলত কথা-লতানো, কথার অবলম্বন ছাড়া বাংলা গান আবার ঠিক দাঁড়ায় না।
৪৩
বার্লিনদেয়াল ভাঙার পঁচিশপূর্তি হচ্ছিল, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে, এ-ঘটনা উপজীব্য করে গ্যুগলওয়ালারা একটা ডুডল বানায়েছে, দেখে মনে পড়ল ওইসময়কার পত্রপত্রিকার পয়লাপাতার সচিত্র লিডনিউজ। ইশকুল-কুষ্মাণ্ড আমরা তখন। এঁচোড়ে পাকনা। যা-কিছু বর্তনে পেয়েছি, গিলেছি গোগ্রাসে। যা-কিছু লভি নাই, তা-কিছু সম্পর্কেও একটা আখাম্বা আন্দাজ করে নেবার মতো প্রতিভার অধিকারী ছিলাম। ওই-সময়কার গোটা জেনারেশনটাই ছিল এমন। কারণও ছিল। সুযোগ ছিল বাস্তবে গরহাজির, অবহিত হবার মওকা খুবই লিমিটেড, ফলে অল্টার্নেটিভ ওয়েতে তেমনধারা আন্দাজশক্তি ছিল অবারিত অপরিমেয়। উদাহরণ দেই একটা। আমাদের কালের ছোকরাদের সিনেমা দেখার পন্থা/উপায় একটাই—পিঠের ছালবাকলা হারানোর ঝুঁকি নিয়ে চুরিচামারি করে প্রেক্ষাগৃহে যেয়ে আগ্নেয়গুহার ন্যায় গ্রীষ্মগনগনে একটা আজদহা কামরার ভিড়ে মাফলারে মুখ ঢেকে সিনেমা দেখা। ইন্টার্ভ্যালে, তথা হাফটাইমে, প্রেক্ষাগৃহের পেশাবখানার বোঁটকা ঝাঁঝওয়ালা জায়গায় সেঁধিয়ে থেকে পরবর্তী ঢিশুম-ঢিশুম আওয়াজ কানে আসা অব্দি কোনোমতে প্রাণধারণ। বছরে তিন-চারবারের বেশি রিস্ক তো কোনো সৈনিকের পক্ষে নেয়া বাস্তবিক অর্থেই দুঃসাধ্য। ফলে আমাদেরে একটা বিকল্প সবসময় খুঁজে নিতে হয়েছে। পেয়েছিও অনেক বিকল্প। প্রতিবন্ধীকে আপনি সুযোগ না-দিলেও সে তার প্রাণের গরজে একটা উপায় বের করে নেবে। এক্ষেত্রে আমাদের ছিল ছায়াছবির লিফলেট-পোস্টার দেখে আন্দাজ করে নেবার রাস্তা আবিষ্কার। সিনেমাহলের সামনে অতিকায় হোর্ডিং থেকে আমরা স্টাডি করতাম গোটা ম্যুভিটির অন্দরবাহির। তথায় অঙ্কিত একাধিক নায়কের/নায়িকার চেহারা থেকে বের করে নিতাম আসল নায়ক/নায়িকা কে হবে, কে শেষ রিল পর্যন্ত টিকে থাকবে এবং কে/কারা বারো রিলের আগেই মারা যাবে, কে শেষমেশ নায়িকাকে পাবে। ডাবল পার্ট নিয়াও অনুমান করে নিতে পারতাম, ট্রিপল পার্ট সম্পর্কে কালেভদ্রে সিদ্ধান্ত সঠিক ও অভ্রান্ত প্রমাণ হতো। বছর-কয়েকের ভেতর আমরা আরেকটা পথ বের করে ফেলব অবশ্য অল্টার্নেটিভ সিনেমাদেখার। সাময়িক পত্রিকা মারফতে সেই সিনেমাকাহিনিরেখা জেনে নিয়ে একটা বারফট্টাই মেরে বেড়ানো ছোকরা বান্ধবমহলে। এক্ষেত্রে শোভা দে স্মরণীয়। উনার চেহারা ও ভাবভঙ্গি যেমন উত্তেজক লাগত, উনার ইংরিজিটাও ওই বয়সে বেশ সুখ দিয়েছে আমাদিগেরে। স্টারডাস্ট আর সিনেব্লিৎস পত্রিকাদুটো আমাদের অনেকেরই সিনেমাতৃষ্ণা মেটায়েছে বিকল্প উপায়ে। এখনও অসংখ্য সিনেমার স্টোরিলাইন বলে যেতে পারি, কিন্তু সিনেমাটা হারাম এক-অক্ষরও দেখি নাই। কিন্তু মনে পড়ছিল অঞ্জনের একটা গান। অঞ্জন দত্ত রচিত ও সুরারোপিত ও অঞ্জনকণ্ঠনির্গত সেই গান। বার্লিনদেয়াল অপসারণের টোয়েন্টিফিফথ অ্যানিভার্স্যারি মুহূর্তে। গ্যুগলের ডুডল দেখে। সেই গানে একটা লাইন ছিল এমন : “পারিনি সহজ করে বুঝিয়ে দিতে কেন ভাঙা হলো বার্লিনের দেয়ালটা”…। গানটা ভালো, সুন্দর, এভার্গ্রিন। অঞ্জন সবসময় শিশুদেরে নিয়ে, শিশুদের সম্বোধন করে, শিশু উপজীব্য করে গান বেঁধেছেন। কোনোটাই কিন্তু ছড়াগান নয়। একদম পার্ফেক্ট অ্যাডাল্ট কম্পোজিশন হয়েছে সেগুলো। বড়দের ভাবাবার মতো গান। বিশেষ করেই কিশোরদের নাজুক বয়সপর্বের টানাপোড়েনগুলো অঞ্জন বাংলাগানে দুর্ধর্ষভাবে এঁকেছেন। অদ্বিতীয় অঞ্জন এই জায়গাটায়। এই গানেও তা-ই। গানটার টাইটেল ‘পারিনি’। একটা-কোনো শিশুসন্তানকে লক্ষ্য করে একজন পিতা সন্তানের-প্রতি-পিতার-সত্যিকারের-দায়িত্বপালনে ব্যর্থতার আক্ষেপ/খেদটুকু বলছেন গানে গানে। এবং তখন একটা ঘটনা প্রায় নিত্য খবর হতো পত্রিকাগুলোতে—গৃহপরিচারিকার কাজে নিয়োজিত শিশুকন্যা-নির্যাতন গৃহকর্ত্রীর হাতে। এমনই একটা ঘটনা সম্ভবত এই গানের সূত্রমুখ। যদিও অন্তিম পঙক্তিতে যেয়ে ব্যাপারটা ধরা যায়, এর আগে নয়। টুকটুকি নামের এক চৌদ্দবছর বয়সের মেয়ে আত্মহত্যা করে। এতটা ভালো করেছেন অঞ্জন গানটা যে অসহায় লাগে শুনতে যেয়ে, নিজের সন্তানের মুখ মনে পড়ে যায়, কান্না পায় নিজেরও শৈশব নিয়ে। এইটা অঞ্জনগানের একটা কমনদৃষ্ট প্রভাব যে, এর অভিঘাতে নিজের শৈশবের শোকে, নিজের ঘুড়িবাহাদুরির কৈশোরশোকে, কান্না পায় ফিরে ফিরে। এইটা অঞ্জনসংগীতের একটি বিশেষ সনাক্তিচিহ্ন। এই গানে, যে-কোনো ভালো গানের ক্ষেত্রে এইটা থাকতেই হয়, সমকালীন রাজনীতিও অনুপস্থিত নয়। কিন্তু সরবও নয় সেই উপস্থিতি। খুব আলতো উচ্চারণে কঠিন কথাগুলো বলা হয়ে যায়। এইটাও অঞ্জনগানের স্বভাব। অল্পাঘাতে অনেকটুকু অনুক্ত রেখে অনেকটুকু বলে ফেলা। বার্লিনের ব্যাপার তো বলা হলোই এ-গানে, বলা হলো অসাম্প্রদায়িকতা বা সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিশিখন শিক্ষাচার, তেমনি অ্যামেরিকা-গান্ধিজি-হিংসা-অহিংসা ইত্যাদিও অবলা থাকে না। কাদের দেশ ছিল অ্যামেরিকা? রেড-ইন্ডিয়ানদের কথা জানবে না আমার মেয়েটা? ‘আমারে কবর দিও হাঁটুভাঙার বাঁকে’—সেই উন্ডেড নি ময়দানে শেষ রেড-ইন্ডিয়ান লড়াইটা, সেই মরিয়া মাতৃভূমি-ফেরানোর লড়াই, সেই অ্যামেরিকার প্রতিশ্রুতিভঙ্গের পর প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, প্রতারণার সেই আধুনিক ডিপ্লোম্যাসি—জানবে না আমাদের সন্তানটা? গানটার লিরিক্স খেয়াল করি : “পারিনি শেখাতে তোকে সত্যি ভালো কথা কোনো / গাইতে একটা সত্যি ভালো গান / পারিনি বোঝাতে তোকে ঈশ্বর-আল্লা / একই ভালোবাসার নাম / শুধু পারি খুব সহজে তোকে বুঝিয়ে দিতে আমি / দেশপ্রেমের মানে পোখরান / # / পারিনি ঢোকাতে তোর ছোট্ট মনে-মাথায় / বড় হয়ে ওঠার সম্বল / পারিনি শেখাতে তোকে মাঝেমধ্যে দিতে / একটা ছোট্ট গাছের গোড়ায় একটু জল / শুধু পারি খুব সহজে তোকে বুঝিয়ে দিতে আমি / হকার মানে জঞ্জাল / # / পারিনি সহজে তোকে বুঝিয়ে দিতে কাদের / দেশ ছিল অ্যামেরিকা / পারিনি সহজ করে জানিয়ে দিতে কেন / ভাঙা হলো বার্লিনের দেয়ালটা / শুধু পারি খুব সহজে তোর মনে গেঁথে দিতে / বেশি টাকা মানে ভালো থাকা / # / পারিনি বোঝাতে কেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে / মনের ভেতর গান্ধিজি / পারিনি চেনাতে তোকে সে তোর বন্ধু / নাকি সে তোর বাড়ির ঝি / তাই পারছি না বোঝাতে কেন গলায় দড়ি দিলো / চোদ্দ বছরের টুকটুকি।”…এদ্দিন পরে, বার্লিনদেয়াল সরানোর পঁচিশপূর্তিমুহূর্তে, এই গানটা শুনতে যেয়ে দেখতে পাবো যে ইত্যবসরে আমরাও সন্তানের পিতা হয়ে গেছি। কিন্তু, মহোদয়গণ, পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে এই কয়-বছরে। আমাদের বাপগুলো পয়সা দিয়া পালে নাই আমাদেরে, প্রাণ দিয়ে পেলেছে, দুইহাতে জাপটে ধরে দুনিয়া চেনায়েছে, বুক দিয়া আগলে রেখে প্রেম ঢুকায়েছে খালিপেটে নাকেমুখে। আমাদের বাপগুলোও তো সফল বাপ বলা যাবে না, আবার আমাদের মতো সন্তানপালনে ব্যর্থ বাপ না একদম। আমরা সক্কলে একটাভাবেই পোলাপান পালছি। পয়সা দিয়ে পড়াচ্ছি, পয়সায় খাওয়াচ্ছি-পরাচ্ছি, পয়সায় প্রেমের ম্যুভি দেখাচ্ছি সকাল-সন্ধ্যা, পয়সায় পটুয়াখালী-বরিশাল-কক্সেসবাজার কিংবা পাতায়াদ্বীপ ভ্রমণ করাচ্ছি। পয়সায় পালছি, পয়সায় পুষছি, পয়সায় ঘুম পাড়াচ্ছি রোজ। বয়স বাড়ছে আমাদের। তরতরিয়ে বেড়ে উঠছে আমাদের মেয়েটা, আমাদের ছেলেটা, বাপের আঙুল ধরে সকালবেলা রাস্তাধারের চা-দোকানে বাপের সঙ্গে বড়দের মতো ছদ্মগম্ভীরমুখে ঠোঁট-পোড়ানো গরমাগরম পরোটা-চা না-খেয়েই। বালিশের তলা থেকে, ওয়ার্ড্রোবের ওপরতল থেকে, এক-দুইটা নোট নিয়ে একলাটি নিঃসঙ্গ-অ্যালিয়েন চোখে কোচিং যাচ্ছে আমার মেয়েটা, আমার ছেলেটা, বাপের কালনিদ্রা ভাঙছে না। বাপের দায় এখন ওয়ার্ল্ডব্যাংক বা আইএমএফের বেশি কিছু তো না। টাকা জোগানো আর পিরিয়ডিক খবরদারি বা ধামকিধমকি। কিন্তু পয়সা দিয়ে পড়ালে, কেবলি পয়সায় সন্তান পুষিলে, তারা তো গ্যুগলের গুণকীর্তনই শিখবে কেবল, গ্যুগলের অন্তরালের গুগ্লিবলগুলো তো বইয়ের পাতায় কোনোকালেই ক্রিস্টালক্লিয়ার থাকিবে না লেখাজোখা। আমরা কি অমন গুণধর সন্তান সামলাইতে পারব? অঞ্জনের গানের হাহাকারটুকু কখনো কখনো ঘুম থেকে ডেকে তোলে আমাদেরে, হিম করে ফেলে মশারির তলে দেহধমনী ও রক্ত আমাদিগের, সময় কেবল সময় নিয়েই চলে আমাদের হাত থেকে কেড়ে। ওই শোনো, অঞ্জনের আক্ষেপক্রন্দনমেশা আকুতি, অঞ্জন গাইছে : “পারিনি, আমি পারিনি, পারিনি, পারিনি, পারিনি / বোঝাতে পারিনি, পারিনি, পারিনি, পারিনি, পারিনি।”…
৪৪
অঞ্জনের লিরিক্স খেয়াল করলে একটা ব্যাপার বোঝা যায় যে এগুলো চলচ্চিত্রিক দ্যোতনাবাহী। পিক্টোরিয়্যাল কোয়ালিটির দিক থেকে অঞ্জনের লিরিক্স চমৎকার; পার্ফেক্টলি ভিশ্যুয়্যাল এফেক্ট হাজির করে শ্রোতার সামনে এবং সুস্থায়ী ইম্প্রেশন রেখে যায়। যে-কোনো অঞ্জনগান হাতে নিয়ে এইটা পরীক্ষা করে দেখা যাবে। সেই গান হোক ‘রঞ্জনা’, বা ‘মালা’, হোক ‘দেবলীনা’ বা ‘কাঞ্চন’,—কথাগুলো, গানগাত্রের বাণীচিত্রগুলো, পরম্পরাআকারে সেল্যুলয়েডিক সিক্যুয়েন্স হাজির করে যেন। সুস্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে চোখের সামনে। ফ্রেম-টু-ফ্রেম ছবিগুলো শ্রোতা দেখতে পায়। এবং নাট্যিক ঘনঘটা হাজির করে শ্রোতার চোখে। এমন অনেক গান রয়েছে অঞ্জনের, যেগুলো ম্যুভিস্ক্রিপ্টে রূপদান/রূপায়ণ সম্ভব। যেমন একটা গান আছে বিবাহবিচ্ছেদ/সেপার্যাশন নিয়ে, একদম শুরুর দিককার অঞ্জনের অ্যালবামগুলোতে এই গান লভ্য, ‘দুটো মানুষ’ সেই গানের নাম, একটা দারুণ ম্যুভিসিক্যুয়েন্স অফার করে। তেমনি আরও অনেক গান, যেমন ‘কলকাতা-১৬’ অ্যালবামের “একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে / থাকবে না সাথে কোনো ছাতা” ইত্যাদি গান এতদপ্রসঙ্গে স্মরণ হবে। এইখানেই কথাটা রাখা যাক যে, অঞ্জনের গান দেখার, তাকিয়ে দেখার রস অঞ্জনগানে অ্যাভ্যাইল করে শ্রোতৃবৃন্দ; ওদিকে কবীর সুমনের গান উপলব্ধির। সুমনের গানে লিখিত কথাভাগে ব্যক্ত যতটা, তারচেয়ে ঢের বেশি অব্যক্তাংশ। গূঢ় উপলব্ধির জগৎ সৃজন করেন সুমন। অঞ্জনগান তাকিয়ে দেখার গান, দৃশ্যায়নঋদ্ধ জানালার গান, সুমনের গান বোধিদীপ্তিময়।
৪৫
থিম্যাটিক ট্রিটমেন্টের দিক থেকে অঞ্জনগানে বৈচিত্র্যপ্রাচুর্য উল্লেখের দাবি নিশ্চয় রাখে। স্থানিকতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকতা যেভাবে এসেছে সে-বিষয়ে একটুকু বলা হয়েছে প্যারাপূর্বে, এখানে ফের একটা এক্সাম্পল উঠিয়ে এনে চেষ্টা করা যাক আরেকটু পরিস্কার করতে। একটা গান আছে অঞ্জনের ‘আমার জানলা’ শিরোনামে, এর কয়েকটা লাইন শুনলেই এতদ্বিষয়ে বেশি কিছু বলতে হবে না আশা করি। পঙক্তিগুলো এমন : “আমার জানলা দিয়ে যায় না দেখা ইসলামাবাদ / শুধু দেখি আমি রোজ আমার পাশের বাড়ির ছাদ / একটা হলদে শাড়ি শুকোচ্ছে আজ মোজার রঙটা নীল / আজ পৃথিবীটা বড়ই রঙিন”…এই গানেই খানিকটা আগায়ে যেয়ে পাওয়া যাচ্ছে : “জানলা আমার মানে না আজ ধর্মের বিভেদ / জানলা জাতীয়তাবাদের পরোয়া করে না / জানলা আমার পুব না পশ্চিমের দিকে খোলা / জানলা সে-তো নিজেই জানে না”…ইত্যাদি। বিষয়বৈচিত্র্যের উদাহরণ চয়নের সময় একইভাবে দেখাতে হবে পেশাজীবনে লব্ধ অঞ্জনের অভিজ্ঞতা কীভাবে সাবলীল স্বতঃস্ফূর্তি নিয়ে এসে যুক্ত হচ্ছে গানে। পেশাগত জীবনে অঞ্জন কলকাতার মেইনস্ট্রিম কমার্শিয়্যাল বাংলা সিনেমাপাড়ায় নিজের জমিটুকু পোক্তকরণে লড়াই করে আসছিলেন আগাগোড়া, আমরা জানি, গানে সেই লড়াই জায়গা করে নিয়েছে সেন্স অফ হিউম্যর সমেত; ‘রাজা রায়’ গানটার স্মৃতি নিশ্চয় মনে পড়বে : “একটা চান্স দিয়ে দেখুন না / একটা সুযোগ, বেশি নয় / প্রমাণ করব এই আকালেও / বোম্বাই সব নয়, বেঁচে আছে বাংলা / বেঁচে আছে রাজা রায়।” তেমনি আরেকটা গান মনে পড়ছে এ-মুহূর্তে, যেখানে ম্যুভি-ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের সরস ও অন্তরঙ্গ-নিবিড় ছবি ধৃত, ‘দুষ্টু গান’ শিরোনামে সেই গানে আছে এমন সমস্ত কথাকলি : “নির্দেশকের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এমন ছবি বানাবে / সারাদেশ জুড়ে সক্কলে একসাথে ট্যাঁরা হয়ে যাবে / সুস্থ চিন্তাভাবনা নিয়ে কমার্শিয়্যাল কেতায় / এমন ছবি সম্ভব একমাত্র কলকাতায় / প্রযোজক শুধু একটা কথাই বারবার বলে যান— / ‘একটা দুষ্টু গান ঢোকান-না দাদা দুষ্টু গান ঢোকান / কারণ দুষ্টু গান ঢোকালে / প্রমাণ করে দেবেন আপনারা ভালো ছবিটাই চলে…।” এই গানে উল্লেখকৃত দুষ্টু গান নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ছিল ক্যাবারে ড্যান্স, বর্তমানে এরই নাম আইটেম স্যং, ম্যাসালা ম্যুভি না-বানালে ইমার্জিং সিনেমাস্বাপ্নিকদের দশা ও দুর্ভাবনা কী হতে পারে সেই কাণ্ড উপজীব্য করে গোটা গানটা আবর্তিত। ম্যুভি নির্মাণের অভিজ্ঞতা ও অভিনয়বীক্ষা অঞ্জনের গানে এইভাবে এসেছে বহুবার বহুভাবে। এসেছে উত্তম-সুচিত্রা যুগের বাংলা ছায়াছবির লীলাচূর্ণ, অপর্ণা বা মৃণাল সেনের ছায়ানুষঙ্গ, সত্যজিৎ রায় বা ঋত্বিক ঘটক অনুষঙ্গ, সর্বোপরি অ্যাংরি-ইয়াংম্যান চরিত্রাভিনেতা অঞ্জন দত্তের ম্যুভিনির্মাণ বিষয়ক দীর্ঘদিবস-দীর্ঘরজনির লালিত স্বপ্ন ও সক্রোধ গোঙানি এই সিরিজের গানে স্থান সংকুলান করে নিয়েছে সিরিয়াসলি। নিজে ওতপ্রোত জড়িত ছিলেন অঞ্জন গত শতকের এইটিজে সূচিত গ্রুপ-থিয়েটার ম্যুভমেন্টের সঙ্গে, বাদল সরকারের দলে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন, এসেছে সেই-সূত্রে প্রসেনিয়াম ও ননপ্রসেনিয়াম থিয়েটারের প্রসঙ্গ, পথনাটক ও সফদার হাশমি ইত্যাদি কোনো প্রসঙ্গই গানে সন্নিবেশ করা থেকে বিরত থাকেননি অঞ্জন। ফলে স্পষ্টত বাংলা গান সমৃদ্ধ হয়েছে বৈচিত্র্যবিভায়; এমন বেশকিছু বিষয়াশয় অঞ্জন বাংলা গানে ইন্ট্রোডিউস করেছেন যা কবীর সুমন বা আর-কেউ করার কথা ভাবেন নাই।
৪৬
অঞ্জনের গানে একদম গোড়া থেকে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়। ব্যাপারটা এ-ই যে, বিপ্লবের জন্য ঘনঘন মোহমায়া গানে তিনি প্রকাশ করেন নাই। বিপ্লবের জন্য কৈশোরক ভাবালুতা ও ভারাতুরতা কলকাতার বাংলা গানে নব্বইয়ের দশক থেকে যেন কুললক্ষণ হয়ে দেখা দিতে থাকে; এবং, বলা বাহুল্য, ব্যাপারটার পত্তনি কবীর সুমনের হাতে। যদিও সুমন অত্যন্ত কবিতায়তনিক মুনশিয়ানার সঙ্গে ব্যাপারটা সামলেছেন, সুমনানুকারীরা তা পারেন নাই সংগত কারণে; লেজেগোবরে করে ফেলেছেন ওই-সমস্ত বাজারমুখো তস্যানুসারীরা। তা সত্ত্বেও বলতে হবে, নব্বইয়ের দশকে এসে নতুন দিনের বাংলা গানের নামে সুমন আদতে গেয়েছেন সত্তরের দশকের স্বপ্নগাথা; অ্যানশিয়েন্ট না-হলেও বক্তব্যের দিক থেকে, রাজনৈতিক দর্শনগত বক্তব্যের বিচারে, সেগুলো পুরানাকালীন তো অবশ্যই; সাম্যের স্বপ্ন সুমন যখন ফোটাচ্ছেন গানে, যেভাবে এবং যে-চিত্রকল্পে ফোটাচ্ছেন, সেইটা বাংলা গানমণ্ডলে নয়া আমদানি হলেও দুনিয়ার আর্থসামাজিক রাজনীতি তখন ওইধারা আদ্দিকালিক কেতাবি সাম্যস্বপ্নে এঁটে উঠছে না। ব্যাপারটা ঠাহর করে উঠতে উঠতে সুমনের নিজের প্রাইম টাইম চলে গেছে; গেল শতকের অন্তিম দশকে অভিষিক্ত কবীর সুমন যৌথখামারের প্রচারপত্রনির্গত রোম্যান্তিক রাগী চিন্তাচৈতন্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন একবিংশ শতকের প্রথম দশকে, এই তো সেদিন মাত্র, যখন দুই যুগেরও অধিক কাল ব্যেপে চেপে-বসা বাম মৌরসিপাট্টা ভাঙন-কবলিত। সুমনের বোধোদয় ঘটেছে দেরিতে, এর ফলে তার রচনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে/হবে কি না, গানের বিষয়াশয়গত কন্টিন্যুয়িটি ব্যাহত হবে কি না—হলে কেমন করে এবং সম্ভাব্য কোন কোন ক্ষেত্রে হবে—এতদবিষয়ে ব্যাখ্যা-বাগবিস্তার এইখানে অভিপ্রেত নয়। এখানে বলবার কথাটুকু হলো, অঞ্জন শুরু থেকেই বিপ্লব বিষয়ক কোলকেত্তাই দিবাস্বপ্ন দরিশন থেকে মোহমুক্ত। অনেকটাই নির্ভাবালু ভঙ্গিতে ফেলে-আসা রাজনৈতিক লিপ্ততা-তৎপরতাগুলো অঞ্জন দেখতে চেয়েছেন নিজের রচনায়। এবং নব্বইয়ের দশকে আবির্ভূত অঞ্জন সত্তরের মুক্তিচিন্তা গানে এস্তেমাল করা থেকে বিরত থেকেছেন, সম্ভবত, সচেতনেই। ক্রিটিক করেছেন বরঞ্চ খুবই মৃদু টোনে, তথাপি স্পষ্টত তথা দার্ঢ্য সহকারে, যেটুকু অতিদেখাজাত ভুলত্রুটিবিচ্যুতি বিপ্লবখোয়াবের সেটুকু কবুল করে এসেছেন গোড়া থেকেই। অঞ্জন যা করেছেন শুরুতে,—শ্রেণিশত্রু সনাক্ত করার কায়দায় একটা আখাম্বা ‘আদার’ তৈয়ার করে এগোনোর রাস্তা অঞ্জন নেন নাই,—সুমনকে সেই রাস্তা ধরতে দেখা যায় শেষে এসে। এই একটা পয়েন্টে এগিয়ে যদি রাখতেই হয় কাউকে তো থাকবেন—সুমন নন—অঞ্জন দত্ত। সুমনগানে এতদপ্রাসঙ্গিক উদাহরণ তো শ্রোতারা ঝটাপট স্মরণ করে উঠবেন,—‘মরব দেখে বিশ্বজুড়ে যৌথখামার’ ইত্যাদি কিসিমের উচ্চারণে অত্যন্ত মহত্তর সুমনগান বলাই বাহুল্য,—অঞ্জন থেকে এক-দুইটা উদাহরণ বরং বাজানো যাক। আত্মজ নীল দত্তের শৈশবকাণ্ড অবলোকনকেন্দ্রে রেখে অঞ্জন দত্ত একটা গান বেঁধেছিলেন ‘নীল’ শীর্ষক; সেই গানের গুটিকয় চিহ্ন ধরে একটু কথা পাড়া যাক। গানটা ধরে এগোলে দেখা যাবে যে প্রথানুবর্তী পোলিটিক্যাল এক্সার্সাইজ আমাদের আবহমান রঙনির্ণায়ক চৈতন্যকেও প্রভাবিত করে ফ্যালে কেমন উদ্ভট কায়দায়; ব্যাহত হয় আমাদের দৈনন্দিন ভোক্যাব্যুলারির স্পন্টেনিটি। তিন-চারলাইনে একটু উদ্ধৃতি সাঁটা যাক : “লাল একটা মোজা পরে ছেলেটা / রেলিঙে দুলে যায় / লাল আজকে আমার কাছে রাজনীতি / বড় হয়ে গেছি যে হায় / কী করা যায়!” এতদসত্ত্বেও অঞ্জন অ্যাপিল রাখছেন আজীবন হেসে যাবার; ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলা অঞ্জনের কথাগুলো আমাদের ওপর জেঁকে-বসা লারেলাপ্পা লাইফ ও নির্বিকার পোলিটিক্যাল ডোমিন্যান্সের দিকেই দৃষ্টিপাতের তাগিদ দ্যায়। কিংবা আরেকটা গানে যেমন এই পঙক্তিগুলো : “অন্য কিছু-একটা করব বলে / সবাই চরস খেলাম কেউ চুল কাটিনি / লাল বইটা লুকিয়ে পড়ার সময় / ভবিষ্যতের কথা কেউ ভাবিনি / শুধু মসজিদ থেকে ভেসে-আসা বেসুরো / প্রার্থনা লাগছে ভালো কেন জানি না / মনে পড়ে যাচ্ছে ফেলে-আসা ব্যথা / ফেলে-আসা কথা আটাত্তরের।” স্বচ্ছ স্বাভাবিকতা আর সেল্ফ-রিয়্যালাইজ্যাশনের উচ্চারণ। লক্ষ করা যাবে এই গানে এবং অন্যান্য অনেক গানেও অঞ্জন ‘মুক্তির দশক’ বলিয়া খ্যাত কলকাতার দিনযাপনগুলোকে অযথা মহিমান্বিত না-করে দেখতে চেষ্টাশীল পরিবর্তিত সময়ের দৃষ্টি দিয়ে। এক্ষেত্রে সুমনের গান সবসময় সেই সময়টাকে গ্লোরিফাই করে এসেছে। এবং সুমন নতুন সহস্রাব্দে এসেও পুরনো পন্থার সশস্ত্র বিপ্লবের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রাখেন, সেই সশস্ত্র বিপ্লব সংঘটনের সঙ্কল্পনা নিয়া রাখঢাকহীন সরাসরি আহ্বানও ধ্বনিত হতে শুনব কবীর সুমনের প্রতিনিধিত্বশীল অনেকানেক গানে, জগদ্দল হয়ে চেপে-বসা বাম পার্টিপোলিটিক্সে জেরবার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এই বিপ্লবপ্রেমার্তি/বিপ্লবপনা থাকার কারণে কবীর সুমনের গান দ্রুত প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে কি না, পারতপক্ষে টেক্সট্যুয়াল প্রেজেন্টেশনের সময় তিনি নামোচ্চারণ না-করলেও বিশেষ একটা পার্টির প্রতি ক্রিটিক সত্ত্বেও সুমনের আস্থা/আশা-ভরসা আবডালে থাকে না নিশ্চয়, এসব নিয়ে এখানে কথা পাড়বার দরকার নাই হয়তো।
৪৭
কবীর সুমন ঠিক যে-অর্থে এবং যতটুকু কবি, লক্ষ করব, অঞ্জন দত্ত ঠিক সে-অর্থে এবং ততটুকু গল্পকার যেন। গল্পের-পর-গল্প শুনায়ে যেতে, দেখা যাবে, অঞ্জন দত্ত অক্লান্ত। শ্রোতা হিশেবে আমরাও কথকেরই ন্যায় ক্লান্তিহীন গল্প শুনতে এবং গল্প বলতে। এইখানেই ঠিক খেয়াল করা যাবে যে অঞ্জন দত্ত স্বরচিত গল্পগুলোর জন্য সুর চয়ন করেছেন যতটা আবশ্যক গল্পবয়ন অব্যাহত ছন্দে এগিয়ে নিতে,—ঠিক ততটাই। সুরের চারপাশে গল্প বুনেছেন না-বলে ভালো হয় যদি বলি যে গল্পের স্পেসগুলো সুরে ভরেছেন তিনি। সিক্যুয়েন্সগুলো একত্র গ্রথনে ব্ল্যাঙ্ক স্পেস যতটা সাধ্য সুরে ফিলআপ করেছেন। চয়ন করেছেন সুর, সুরসৃজন না-বলে সুরচয়ন বলা ভালো, অঞ্জনের ক্ষেত্রে সুরচয়ন শব্দটা আমরা সচেতন ও সদর্থ প্রয়োগ বলিয়া সাক্ষ্য দিচ্ছি। ইংরেজি সুর, ফর্ম্যাট ও ট্যাম্পলেট তো বটেই, নিয়েছেন; এমনকি হিন্দি ও অন্যান্য অবাংলা প্রাদেশিক ইন্ডিয়ান টিউনগুলোর অবয়ব ও আদলও অঞ্জনের নিকট সাদরে হয়েছে গৃহীত। গল্পটায় এত মজে থাকে শ্রোতা, অঞ্জনলিখিত গল্পের, বাকি ব্যাপারগুলো সবসময় দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয়-চতুর্থ চিন্তা হিশেবে ঢের পরে মাথায় আসে। একটা উদাহরণ হস্তে নেয়া যাক। ‘দূর গগন-কি ছাও মে’ ম্যুভিতে কিশোরকুমার একটা গান গেয়েছিলেন ‘রাহি তু মৎ রুখ যা না’, অঞ্জনকে এই গানেরই মিউজিক্যাল টেম্পো ফলো করতে দেখা যায় ‘খাদের ধারের রেলিঙটা’ গানে। এই কুড়ানো সুর গানটাকে যে গতি ও রিদম দিয়েছে, এরপর এ নিয়া আর কোনো প্রশ্ন শ্রোতার মনে উদয় হয় না যে কেন হিন্দি সিনেমাগান তথা কেন বঙ্গপ্রোথিত ‘শেকড়ের সুর’ বা ভাটিয়ালী-ভাওয়াইয়া-রামপ্রসাদী-কীর্তনাঙ্গ নয়। কিংবা অঞ্জন সুর চয়ন করেছেন প্রধানত ইংরেজি গান থেকে, সেখানেও শ্রোতা হিশেবে একবারও আপনার উসখুশ হয় না অনুসৃতি ইত্যাদি কারণে। লেনার্ড কোহেন ‘সিস্টার্স অফ মার্সি’ গেয়েছেন, অঞ্জন গেয়েছেন ‘শুনতে কি চাও তুমি’; তা সত্ত্বেও অঞ্জন দত্ত কোহেনের বা আর-কারোর কপিক্যাট নয় কখনো।
৪৮
গোবিন্দ নামের এক দোকানবালকের গল্প বলেছেন অঞ্জন একটা গানে;—“গোবিন্দকে মেরেছে তার মালিক / গোবিন্দ কাঁদছে রাস্তায় / গোবিন্দর পাশেই একটা শালিক / গোবিন্দকে সাহস যোগায়”;—একদম ছোট্ট নির্মেদ একটা গল্প, দুই-স্তবকের মাত্র; এই লিরিক্স উদাহরণ হিশেবে নিয়ে দেখানো যায় যে স্টোরিটেলার হিশেবে অঞ্জনের বিশেষত্ব কোথায় এবং কতটুকু। অঞ্জন তুলিকার টানে ক্যানভ্যাসে গোটা গল্পটাই আঁকতে চান, সংকেত ও প্রতীকে বিমূর্ত-করা কাব্যিকতা তার অন্বিষ্ট নয়। লিনিয়ার গল্পই বলেন অঞ্জন, রৈখিক চিত্রকলার আশ্রয়েই তিনি তার যা-কিছু করার নিতে পারেন করে, তবে সেসব ক্যানভ্যাসেও অবর্ণনীয় বর্ণের বহুবর্ণিলতা আমাদের নজর কাড়ে। দেখব যে এই টিস্টলে মজুর-খাটা বালক গোবিন্দর পোর্ট্রেইট আঁকতে যেয়ে অঞ্জন এঁকে ফেলেন একটা শালিকেরও বৃষ্টিজীর্ণ ‘বিবর্ণ রোগা ইচ্ছের’ রঙ ও দিনযাপন;—অনেক আগে এক কবি, জীবনানন্দ দাশ, যেমনটা ক্যানভ্যাসে এনেছিলেন কবিতা-আকারে যেই শালিকটিরে,—যেন অঞ্জন সেই একই বিস্ময়বিপন্ন সৌন্দর্যবেদনা গানে এঁকে ফেলেন একটানে : “নামে ঝড় নামে বৃষ্টি ভেঙে যায় গাছপালা / ভেসে যায় আমার শহর / শালিক পাখিটা হারায় তার রাতের আস্তানা / ভিজে জবজবে সর্দিজ্বর;”—গল্পগুলো এই-রকমেই বিভ্রম তৈরি করে শেষে, এ-ই শিল্পবিভ্রম অঞ্জনের, এবং অনবদ্য অলমোস্ট সমস্ত গানে। এমন অজস্র মোরগপালকের স্পর্শাতুর ছবি ছড়িয়ে আছে অঞ্জনের গানের পর গানে, এহেন অনিন্দ্য গল্পের হৃদয়-বিবশ-করা আলেখ্য অঞ্জনতুলিকায় যেন অনায়াসলভ্য। উদাহরণফর্দ লম্বা না-করে একটামাত্র ছবি সেঁটে এ-প্যারা পারায়ে যাই : ‘আকাশভরা সূর্যতারা’ গানে একটানে একটা লাইনে এক সম্পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রচিত হতে দেখি : “হয়তো কালো ইটের ফাঁকে / বটপাতাটা জিভ ভেঙচায় / পাড়ার নেড়ি বাচ্চাটাকে / মুখে করে হাঁটতে শেখায়;”—এই সিনেমা আমৃত্যু-আজীবন দেখে যাবার মতো ঐশ্বর্যমণ্ডিত।
৪৯
বয়ঃসন্ধিক্ষণের ছেলেমেয়েরা তাদের নাজুক নন্দন ও অসহায়তা সহ অঞ্জনগানে স্পেস পেয়েছে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে। এই কাজটা বলা যায় অঞ্জনের একলার কন্ট্রিবিউশন আধুনিক বাংলা গানে। এর আগে এই বয়সগ্রুপের মানুষগোষ্ঠী নিয়া যা-কিছু গানগল্প হয়েছে তা-সব মূলত উপদেশাত্মক ও নীতিকথাজ্ঞাপক। এই বিশেষ ক্রান্তিসেতু অতিক্রমণরত মানুষেরা তাদের উন্মেষকালীন মন ও শরীর নিয়ে, তাদের ব্যক্তিবিকাশের শুরু-সোপানে, একেবারেই নিরাশ্রয় এবং অনিকেত একটা যাপনের ভিতর দিয়া যায়। এই অ্যাডোলসেন্ট বয়ঃসীমার কিশোরকিশোরীরা বস্তিবিত্ত-মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সর্বত্র সর্বশ্রেণিতেই নিগৃহীত, অভিভাবকীয় ও সমাজপ্রাতিষ্ঠানিক অমনোযোগ-অবমূল্যায়ন-অবহেলার শিকার, সর্বত্রই যেন তারা ব্যক্তি নয় শিশু হিশেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। এদের শ্রম ও মেধা বাজারে বিকোলেও সমাজকর্তা তাদেরে স্বীকার করতে চায় না, আইনবিধিগত বিচারে এরা শিশু হলেও জৈবমানসিক বিচারে এরা মোটেও শিশু না, ব্যক্তি-হয়ে-ওঠার এক সন্ধিলগ্ন অতিক্রমণরত বরং। লক্ষ করে থাকব যে সর্বসন্নিকট তুলনীয় কবীর সুমনের গানে এই শ্রেণিগোষ্ঠীটা ক্ষুণ্ণিবৃত্তির লড়াইয়ে একেকজন শরিক লড়িয়ে হিশেবে এসেছে, এদের চিত্তবৃত্তির টানাপোড়েন কবীরজির গানে সেভাবে নেই। ঝটাপট স্মরণ করা যায় ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’ প্রভৃতি অনবদ্য কথাভাগের সুমনগান। ঘুড়ি উড়াবার বয়সে ছেলেটা প্যাডেল-হাতল পায়ে-হাতমুঠিতে চেপে রিকশা ঠেলে ফ্যামিলির গ্রাসাচ্ছাদন যোগায়, আর তার মন পড়ে রয় ঘুড়ির ভোঁকাট্টায়—এ-পর্যন্ত সহি ঠিকঠাক; রচনার শেষপাদে যেয়ে মেলে লেখকের উইশফুল থিঙ্কিং, ইচ্ছাপূরণের চাপে ভেস্তে যায় একটু-হলেও রচনামান, যখন রচয়িতাকে এহেন পঙক্তি ছুঁড়তে দেখা যায় : “বয়স বারো কি তেরো রিকশা চালাচ্ছে / মুক্তির ঘুড়ি তাকে খবর পাঠাচ্ছে” এবং অন্যান্য। রচয়িতার যৌবনকালীন স্বপ্ন নওল কিশোরের উপর আরোপ করার দৃষ্টান্ত কবীর সুমনে এইটাই প্রথম/শেষ নয়। আদারোয়াইজ শিশুশ্রমিকটি বিড়ি ফুঁকত, কৈশোরকালীন অপরাধকাণ্ডে জড়ায়ে পড়ত, মুক্তির ঘুড়ি নিয়া ভাবনাভাবনি কিশোরের পক্ষে বেমানান বাস্তবিক। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানে যে-শিশুটা, তারও গতিক তথৈবচ। অঞ্জন সর্বপ্রথম বাংলা গানে এই নিরাশ্রয় নির্মীয়মাণ-ব্যক্তিসত্তার মানুষগোষ্ঠীটাকে এত দরদ দিয়ে এনেছেন যে এখন পর্যন্ত অঞ্জনের তুলনা এক্ষেত্রে এককভাবেই অঞ্জন। উদাহরণ চয়ন করতে গেলে পাছে ব্যাপ্তি দীর্ঘ হয়ে যায়, এমনিতেই নিবন্ধ বহর ও দৈর্ঘ্যে বেয়াড়া ধাঁচে বেড়ে চলেছে, এক-দুইটা গানের নামোল্লেখ করা যাক শুধু : ‘চ্যাপ্টা গোলাপ’, ‘পনেরোতে এসে’, ‘রুবিনা রুপারেল’, ‘জয়িতা’ প্রভৃতি এ-ধারার অনবদ্য গানগুলোর মধ্যে কয়েকটা।
৫০
বাংলা গানে ব্যক্তিনামরূপ ধরে ক্যারেক্টার দাঁড় করানো, কথাসাহিত্যে যেমনটা হামেশা করা হয়ে থাকে, খুব নতুন না-হলেও পুরনোও বলা যাবে না। বাংলা গানে অঙ্কিত বলিষ্ঠ চরিত্রগুলো নিয়া আলাদা অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে। এই নিবন্ধের অভিমুখ ওইদিকে ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না আপাতত। পুরনো নয়, যে-অর্থে ইংরেজি কান্ট্রিমিউজিকে এইটা আদি থেকেই চলে-আসা ট্রেন্ড হিশেবে দেখতে পাওয়া যায় সে-অর্থে তো নয়ই, বাংলা গানে এইটে ট্রেন্ড হিশেবে নতুনই বলতে হবে। যদিও রবীন্দ্রনাথের গানে এক-দুইটা উদাহরণ লক্ষ করব, রবিগানে এ-ধারার উজ্জ্বলতর উদাহরণ সম্ভবত একটিই : ‘কৃষ্ণকলি’; জুড়ি মেলানো মুশকিল ওই-সময়ের গানে এই কৃষ্ণকলির। নজরুলের হামদ্-নাত্ পর্যায়িক লিরিকে এবং শ্যামাসংগীতে এসেছে মিথিক্যাল ক্যারেক্টার বেশকিছু। চল্লিশের পর স্বদেশিয়ানার অভিঘাতে এক-দুইটা গানে ‘ক্ষুদিরাম’ প্রমুখ রিয়্যাল-লাইফ হিরোদের নিয়া গান বাঁধা হয় দেখতে পাই। গণসংগীতে ব্যক্তিনামপদ লতিয়ে গান রচা হয়েছে বেশ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক। ওই-সময় ইংরেজি গানের ক্যারেক্টারগুলো বাংলা গানে বেশ সুচারুভাবে অভিযোজিত হয়েছে, যেমন—জন হেনরি, বোকা বুড়ো প্রভৃতি। সলিল চৌধুরীর কয়েকটা ক্যারেক্টারচিত্রণ গোচরীভূত হয়। মান্না-ভূপেনেও দুইয়েকটা আছে। এর পরবর্তীকালিক নতুন দিনের বাংলা গানে এই ধারাটা আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য পুষ্টি পেতে শুরু করে। বাংলাদেশের ব্যান্ডগানে গোড়া থেকেই এর নজির পাওয়া যায়। আজম খানের উত্থানপর্বেই আছে এইটা। ‘সালেকা-মালেকা’, ‘আলাল-দুলাল’, বা বিরতিকালের পরে ফিরে এসে ‘অনামিকা’ আজম খানের এ-ধারার কাজে ঔজ্জ্বল্যের চিহ্নবাহী। ফিডব্যাকের ‘মৌসুমী’, হ্যাপি আখন্দ স্মরণে শ্রদ্ধাগান ‘পালকি-১’ এবং অন্যান্য উল্লেখযোগ্য। এমনকি এলআরবি-রও ‘ঊর্মিলা চৌধুরী’ শিরোনামের গান সহ ‘মাধবী’, ‘মেঘনাদ মজুমদার’ ইত্যাদিও উদাহরণযোগ্য। ‘নগরবাউল’/‘ফিলিংস’ তথা জেমসেরও রয়েছে এ-ধারার ‘মান্নান মিয়া’, ‘হুমায়রা’, ‘সুস্মিতা’, ‘নাগরআলি কুঙ্কুম’ প্রভৃতি। এছাড়া প্রায় সমস্ত ব্যান্ডেরই রয়েছে এ-ধারার গানমালা। কবীর সুমন অন্য ধাঁচে ক্যারেক্টার অ্যানিমেইট করেছেন, অত্যন্ত বলিষ্ঠ ক্যারেক্টারাইজ্যাশন, যদিও কবীরের ক্যারেক্টারগুলো ব্যক্তিবিশেষের বাইরে বেরিয়ে সমষ্টিই হয়ে উঠেছে সবসময়। যেমন কবীর সুমন যখন ‘অর্চনাদের পাশেই যেন আয়েশারা থাকতে পারে’ বলেন, তখন অর্চনা বা আয়েশা যতটা-না ব্যক্তি তারচেয়ে বেশি কওমের দ্যোতক হয়ে ওঠে। কিন্তু কবীর সুমন অনন্য আরেকটা জায়গায়, সেইটে এ-ই যে, তার মতো এত ট্রিবিউট-স্যং দুনিয়ায় দ্বিতীয় কেউ বেঁধেছেন বলা যাবে না আরও বহুকাল। সুমন বাংলার প্রায় সমস্ত লোকজ-লোকান্তরিত কবি ও রাজনীতিবিদ, স্বদেশের ও বহির্দেশের কীর্তিমান ব্যক্তিবর্গ, সামাজিক অন্যায় ও নিগ্রহ-দুর্নীতির ভিক্টিম ব্যক্তিসাধারণ নিয়ে একের-পর-এক অনবদ্য সব গান হাজির করেছেন; সেসব গানে ইম্যাজিন্যাশন নয়, ফ্যাক্ট প্রাধান্য পেয়েছে ও মান্যতা আদায় করে নিয়েছে; একেকটা সামাজিক-রাজনৈতিক সন্দর্ভ হয়ে উঠেছে সেই গানগুলো, উপস্থাপিত ব্যক্তিরা বাহন হয়েছেন সুমনের তথা আমাদের বক্তব্য প্রকাশের। অঞ্জন দত্ত এ-ধারার গান রচনায় ভিন্নতা আনয়নের দাবিদার এখানে এবং এ-মর্মে যে, তার গানে ক্যারেক্টারগুলো যেন কল্পনা আর বাস্তবতার মিলমিশ নিয়ে একদম ঘরোয়া, আদর-অনাদর-প্রেম-অপ্রেম-স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ-হতাশ্বাস সবকিছু নিয়েই রক্তমাংশের অতিসাধারণ মানুষের চেহারাই ফুটিয়ে তোলে শেষমেশ, ছোটগল্পের সপ্রাণ চরিত্রগুলোর মতো। নচিকেতাও সমসাময়িক গানে এই কাজটা করেছেন সুচারু। ‘শতাব্দী’, ‘রাজর্ষি’, ‘নীলাঞ্জনা’, ‘অনির্বাণ’ প্রভৃতি নচিকেতা চক্রবর্তীর কাজ হিশেবে উল্লেখাবশ্যক অনবদ্য। অঞ্জনের গানে দেখা-পাওয়া বেশকিছু চরিত্রের নাম উল্লেখ করা যাক : দেবলীনা, মালা, স্যামসন, জেরেমি, মিস্টার হল্, মিসেস মুখার্জি, কাঞ্চন, আলীবাবা, রাজা রায়, হরিপদ, রমা, ম্যারিয়্যান, রঞ্জনা প্রভৃতি একেকটা নাম উপজীব্য করে একেকটা গান, একেকটা আলাদা আখ্যান।
৫১
অঞ্জনগানে একঘেয়েমি কিংবা তার গানসৃজনে পুনঃপুনরাবৃত্তি/রিপিটেশনের দেখা যারা পান, তাদের সনে এক-দুইটা বাকবিনিময়ের মওকা রাখতে পারলে মন্দ হয় না। মায়েস্ত্রোদের কাজে যে-জিনিশটা অবিলম্বে একজন অভিনিবেশকারীর নজরে আসে, সেইটা তাদের সিগ্নেচার; নিজস্ব মোহর ও মুদ্রা, স্বাক্ষর, সিলছাপ্পড়, টিপছাপ যা-ই বলি না কেন প্রবেশরাস্তাতেই দৃষ্টিগোচর হয় শিল্পমগ্ন যে-কোনো স্রষ্টার কাজে। ব্যক্তির স্বাক্ষর, যদি নিজেকে নিদ্রিত রেখেও দস্তখত দ্যায় সে, সেইটা তারই এবং অন্যানুরূপ নয়; কিন্তু রচনাক্রিয়ায় টিপছাপ/স্বাক্ষর/সিলমোহর তৈরি করে ওঠা তা-বড় অনেক সৃষ্টিশীলের পক্ষেও সহজসাধ্য নয়। সিগ্নেচার তৈরি করতে পেরেছেন যারাই, তাদের ক্ষেত্রে একঘেয়েমি/রিপিটেশনের একটা আপাত অভিযোগ উঠতে দেখা যায়; নির্মোহ নজরে শিল্পকর্মের/ললিতকলার বিচার শেষ-পর্যন্ত স্বর্ণপ্রস্তরঘট বলা বাহুল্য। ফলত সুমনভক্তরা ক্লেইম করেন অঞ্জন পুনরাবৃত্তিজীর্ণ, রবীন্দ্রভক্তরা দাবি করেন নজরুল রিপিটিশাস, লেনার্ড কোহেনের অনুরাগীরা একই অভিযোগ তোলেন বব ডিলানের বিরুদ্ধে। প্রকৃত প্রস্তাবে ব্যাপারটা আপন সিলছাপ্পাজনিত। প্রোক্ত অভিযোগকারীদিগের পাল্টাবাড়ির চাতাল থেকে একই অভিযোগতর্জনী উঁচাইতে দেখব কথিত পুনরাবৃত্তিবিহীন শিল্পীদের দিকে তাক করে। কাজেই এ-ধারা চাপান-উতোর তথা পাল্টাপাল্টি প্রথমত ধোপে টেকানো মুশকিল, দ্বিতীয়ত-তৃতীয়তও তদ্রুপ, শেষ-পর্যন্ত ঘটনাটা আসলেই-যে কী তা আল্লা জানেন হয়তো। অঞ্জন পুনরাবৃত্তিশীল, যে-অর্থে লালন, যে-অর্থে লেনন, যে-অর্থে দ্বিজেন্দ্রলাল, যে-অর্থে রামপ্রসাদ, যে-অর্থে রাধারমণ, যে-অর্থে লেনার্ড কোহেন, যে-অর্থে রবীন্দ্রনাথ, যে-অর্থে ডিলান, যে-অর্থে সুমন পুনরাবৃত্তিশীল।
৫২
সুরের বৈচিত্র্য নিয়া আলাপ সঞ্চালন বক্ষ্যমাণ নিবন্ধকারের সাধ্যাতীত, অসঙ্কোচে স্বীকার্য; বৈচিত্র্য যত বহুধাবিস্তৃত হোক না কেন, অসীম নয়, বৈচিত্র্যও অত্যন্ত সসীম। রবীন্দ্রনাথের বা নজরুলের, বাঙালির আধুনিক গানের অভ্যস্ত অভিজ্ঞতার বর্তনে এই দুইজনাই তো ঘুরেফিরে কমন উদাহরণ, অথবা আরও-আরও যত স্টলোয়ার্ট মিউজিশিয়্যান সকলেরই টিউন/সুরবৈচিত্র্য বহুপরিক্রমা সত্ত্বেও সসীম। অঞ্জনের সুরবৈচিত্র্যও ওইদিকটা মাথায় রেখে বিচার্য। তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া যাক অঞ্জন সুরবৈচিত্র্যরহিত অথবা অত্যল্প বৈচিত্র্যের মালিক, ধরা যাক অঞ্জনের সংগীতযোজন ও গীতাখ্যসৃজন পৌনপুনিক পুনরাবৃত্তিময়। কিন্তু গানের বিষয়বৈচিত্র্য গূঢ় নজরে দেখতে গেলে দেখব অঞ্জন যথেষ্ট বৈচিত্র্যপ্রবাহ প্রস্তুতকারক সংগীতজ্ঞ। অন্তত কবীর সুমনের ন্যায় বিষয়বৈচিত্র্যে অঞ্জনও পৃথক পরিচয়ের মর্যাদা আদায় করে নেন। বৈচিত্র্যের ব্যাপারটা আরেকভাবেও বোঝার চেষ্টা করা যাইতে পারে। যেমন সংগীতে তেমনি বাংলাভাষী কবিতায় একটা ব্যাপার লক্ষ করা যাবে যে, আধুনিক যুগপর্যায়ের আগে, ধরা যাক রোম্যান্তিক কবিতা ও গানের অধ্যায়ে, কবি ও গীতরচয়িতারা যে-অর্থে বিচিত্রগামী,—আধুনিক বাংলা গান ও কবিতাভাণ্ডারীরা ঠিক সে-অর্থে বিচিত্রগামী নন। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল প্রমুখ কবি-গীতপ্রণেতাগণ প্রেমগান লিখেছেন, ঈশ্বর ও নিরীশ্বর উভয় চেতনার গান লিখেছেন, শ্যামাসংগীত লিখে ফের মার্সিয়া-হামদ্-নাত্-গজল্ রচেছেন, ঋতুগান লিখেছেন, জঙ্গ আবাহনমূলক বীরবন্দনাগানও লিখেছেন, স্বাদেশিক কওমের কল্যাণার্থী গীতি লিখে ফের আংরেজ রাজারও প্রশস্তি ফেঁদেছেন কেউ-বা, রাগের গান লিখেছেন আবার বৈরাগ্যও বাদ দেন নাই। কিন্তু আধুনিক শিল্পকলানুশীলক অবদায়কবৃন্দের কাছ থেকে একই কিসিমের বৈচিত্র্য দাবি করে বসলে তো হবে না। ওই যুগ অবসিত হয়ে এখন আধুনিক যুগও অতিক্রম করতে লেগেছে শেষের সোপান। এখন এমনকি সিনেমাগান বা নাটকের গান বা যাত্রাপালার গান প্রভৃতি বিভাজনরৈখিকতা প্রাসঙ্গিক না আর। রচয়িতা তার নিজের গানটাই ক্রিয়েট করেন সম্পূর্ণাঙ্গ রচনা হিশেবে, এরপরে সেই সৃজিত রচনা নানা মাধ্যমিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। সিনেমায়, গীতিনৃত্যনাট্যে, কিংবা বাজারের বাহারী ডিম্যান্ড ফ্যুলফিল করতে ব্যবহৃত-হওয়া গানটা আয়োজিত হয়েছিল মুখ্যত রচয়িতার ক্যাথার্সিস ঘটাতে। এখনকার চৈতন্যোন্মেষ একই ব্যক্তির হাতে প্রেমপর্ব-পূজাপর্ব-নর্তনপর্ব-কীর্তনপর্ব অনুমোদন করে না। আধুনিক বাংলা গানের গোড়ার দিকে যেমনটা দেখা যাইত যে একই শিল্পী/রচয়িতা ব্যক্তিক নৈসঙ্গ নিয়া গান সৃজনের অব্যবহিত পরেই রচিয়া উঠছেন গণজাগরণী মিছিলসংগীত কিংবা দারিদ্র্যসঙ্গিন দেশাত্মবোধের গান, ভক্তিমূলক ভজনের অ্যালবাম স্বর্ণযুগী শিল্পীদের প্রত্যেকেরই রয়েছে গণ্ডায় গণ্ডায় এবং সমানুপাতিক চকচকে ব্যবসাও, নতুন দিনের বাংলা গানে সেই ধারানুসৃতি নিছক বিরক্তি কিংবা হাস্য উর্দ্রেক করে শ্রোতৃকর্ণে। এইসব পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় রেখে বলা যায় যে অঞ্জনের গানসৃজনে বৈচিত্র্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। আর আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাব না যে বিচিত্রিগামিতা আদৌ সর্বত্রগামিতা নয়; এমনকি এতদপ্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি যিনি বিচিত্রগামী, তথা ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ, তিনিও তো সর্বত্রগামী নন।
৫৩
কোনো-না-কোনো পরিচিত ইংরিজি গানের ছায়াসুরাশ্রিত অঞ্জনগানের সুরগুলো;—বটে, সেইটা আধুনিক বাংলা গানের নয়া যাত্রাপথের মোড়ে মোড়ে, বিভিন্ন ব্যক্তিশিল্পীর হাতে এবং কালে-কালান্তরে, একটা সাধারণ অভিযোগ এবং আখেরে এইটাই নতুনতর সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধি হিশেবে গ্রাহ্য ও গৃহীত হয়েছে। একই অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এককালে অংশত রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে, নজরুলের ক্ষেত্রে, এবং বিংশ শতকের মধ্যভাগে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বা সলিল চৌধুরী প্রমুখ যুগন্ধর সুরস্রষ্টাদের ক্ষেত্রেও। কবীর সুমনের আমলে এসে বাঙালির গান নিয়ে ব্যবসাবাণিজ্যিক নানা পাঁয়তারা বাড়লেও সংগীতের সুর-স্বর-কাঠামো প্রভৃতি নিয়া আলাপালোচনা অ্যাবসেন্ট হয়ে যাবার ফলে কবীরজির ক্ষেত্রে সেভাবে অভিযোগটা আনীত হয় নাই। কিন্তু কবীর সুমনের রচনাসমগ্র বস্তুত ইংরেজি গানেরই লিরিক-লাবণ্য দুইহাতে টেনে নিয়েছে, পেয়েছে জীবনরসাঢ্য পুষ্টি ও আলো। সুমনের প্রায় সমস্ত গানের আইডিয়া কোনো-না-কোনো পুরনো জনপ্রিয় ইংরেজি গানের ন্যারেটিভ থেকে আহৃত। দোষের কিছু নয় সেটা, আলবৎ, স্বাভাবিকের চেয়েও অধিক স্বাভাবিক বলা ভালো বরং। মনে পড়বে আমাদের নিশ্চয় যে, একদা আধুনিক বাংলা কবিতার বেলায় একই ঘটনাই ঘটেছিল। পঞ্চপাণ্ডবের আমদানিকৃত মডার্নিটি নিয়া কাকতর্ক জুড়ে বসবার জরুরৎ অতটা নাই, মীমাংসিত কথাটা জ্ঞাত সকলেই যে সেই পাঁচজনার ফরেন ইনভেস্টমেন্ট ‘বাংলা কবিতা’ ব্যাপারটাকে একটানে হাজারদুয়ারি করে দিতে পেরেছিল। কবীর সুমন যা করেছেন, গত শতকের তিরিশের দশকে আবির্ভূত কবিরা তা-ই করেছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, ইংরেজি সুরানুসৃতিজনিত কড়াচক্ষু অভিযোগ শুধু অঞ্জনের ক্ষেত্রেই ওঠে; এবং অভিযোগের তর্জনী তোলেন খোদ কবীর সুমন! মানতেই হবে যে আইডিয়ার আত্তীকরণ ও সুরের অভিযোজন ঘটাবার কিমিয়া কবীর সুমনের ন্যায় দ্বিতীয় কারোরই নাই নিকট-দশকগুলোতে; এককালে যেমন রবীন্দ্রনাথের ছিল দৈত্যোচিত অনুরূপ ক্ষমতা।
৫৪
‘খাদের ধারের রেলিঙটা…আমার শৈশবের দার্জিলিঙটা’—‘রাহি তু মৎ রুখ যা না’—‘দূর গগন-কি ছাও মে’ সিনেমায় কিশোরকুমার কর্তৃক গাওয়া—গানের সুরপল্লবিত—তথ্যটা আমরা জ্ঞাত। উদাহরণ হিশেবে এই হিন্দি গানের সুর মনে রেখে অঞ্জনের গানটা আরেকবার শুনে গেলে যে-কথাটা বলতে চাইছি তা খানিকটা ক্লিয়ার হবে। অঞ্জনের নির্বাচিত অবলম্বন/উৎসগানে এমন একটাকিছু সবসময় থাকে যা তার ঈপ্সিত/অভিপ্রেত সংগীতের বেদনাটা ফুটিয়ে তোলে। অত্যন্ত সতর্ক ও সচেতন নির্বাচন বলেই মনে হয় প্রায়শ। নচিকেতা চক্রবর্তীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গানে হিন্দি সিনেমার সুরপ্যাটার্ন এসেছে, বেশিরভাগ সময়ে সেইটা প্যারোডি হয়েছে, ধুমধাড়াক্কা আখাম্বা বান্দরনর্তন হয়েছে, বেদনাটা নাই বলেই নচির হিন্দিবিহার বেদ হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। এইভাবে দেখতে পারলে অঞ্জনের ইংরেজি টিউন আহরণের ব্যাপারটা ন্যায়ের নজরে দেখা যাবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারলেই বোঝা যাবে বব ডিলানের সুরফর্ম্যাট বসানো সত্ত্বেও অঞ্জনের গান কোথায় নিধুয়া ব্যঞ্জনা ধারণ করে রাখে। এবং, বলা বাহুল্য, বব ডিলান নয় শুধু; অঞ্জন বেদনাবাহক যে-কোনো সংগীতের সুরটুকরো গ্রহণ করেছেন, কাজে লাগিয়েছেন আপন বেদ প্রণয়নে, ফলে ব্যাপারটা প্যারোডি হয়ে ওঠে নাই আর-যা-হোক। ‘শুনতে কি চাও তুমি সেই অদ্ভুত বেসুরো সুর / ফিরে পেতে চাও কি সেই আনচান-করা দুপুর / দেখতে কি চাও তুমি সেই খেলনাওলাটাকে / তার খেলনা দোতারা সে বাজাচ্ছে কবে থেকে’—এই গানের সঙ্গে লেনার্ড কোহেনের ‘সিস্টার্স অফ মার্সি’ মিলিয়ে শুনে দেখলেই ধরা যায় ইংরেজি গানের সঙ্গে অঞ্জনের কোথায় আত্মীয়তা আর কোথায় পৃথকতা। বাংলার সকরুণ বেহালা আর বেহাগের ঔদাস্য শোনা যায় না শেষোক্ত দত্তায়িত সংগীতটায়?
৫৫
বাংলায় এক-দুইটা ব্যাপার ভারি গোলমেলে ঠেকে ভাবতে যেয়ে; এর মানে এ-ও নয় যে রেস্ট-অফ-দি নিরানব্বই-আটানব্বই নিরঙ্কুশ নিঃসন্দেহ-স্বাভাবিক; অ্যানিওয়ে, ব্যাপার এ-ই যে, রবীন্দ্রনাথ যখন দুনিয়ার নানা দেশের নানা ভাষের সুর এনে বাংলা গানে পোরেন, তখন সেইটা আমরা ‘ভাঙাগান’ বলিয়া আলাদা মাহাত্ম্য প্রচার করি; হোক সেইটা আইরিশ লোকসুর বা স্কটিশ বা উত্তর-দক্ষিণ ভারতীয় ফোক/উচ্চাঙ্গ কোনোকিছু,—মূল সুরের সঙ্গে মিলিয়ে শুনে কেউ যদি সেইটেকে নকলবৃত্তি বলিয়াই বসে, কেমন করে ঠেকাবেন তারে! তেমনি নজরুলের ক্ষেত্রেও পারস্য সুর অভিযোজনের ব্যাপারটা আলাপে আনা যায়। কিন্তু সুর ও গানমণ্ডলে ঘোরাফেরাকারী যে-কেউই স্বীকার যাবেন যে ব্যাপারটা আসলেই স্বাভাবিক। যদি কাজী কিংবা ঠাকুরের আমদানিবাণিজ্য কুনজরে না-দেখি, যদি সমারোহে স্বাগত করি তাদেরে, তাহলে ব্যান্ডের অনেক উন্নত অ্যাডাপ্ট্যাশন ও অঞ্জন দত্তের রচনাবলি ইংরেজিয়ানা বলিয়া পাশ কাটাতে চাই কেন! খোদ রবীন্দ্রনাথকেও এক-সময় জেনারালাইজ্যাশনের হেন জুলুম সইতে হয়েছে, এইটা আমরা ঠাকুরের নানান চিঠিচাপাটি এবং সংগীত-বিষয়ক নিবন্ধ-প্রবন্ধ-নোটগুলো থেকে টের পাই। বিশেষত সংগীতে তখনকার দিনে নামডাকওয়ালা ফ্যামিলিগুলো রবির গানগুলোকে গানই মনে করতেন না, আধুনিক কবিতা নামে ডেকে সেগুলোকে একপাশে ঠেলে রেখে উনারা উনাদের সান্ধ্যাহ্নিক সারতেন রোজ; হাজারেবিজারে এভিডেন্স হাজির করা যাবে এই কথাটার পক্ষে, এলেবেলে ফ্যামিলি না একটাও, ইনক্লুডিং দিলীপ কুমার রায়ের পরিবার ও অনুরাগী ফলোয়ারগোষ্ঠী। ইন কোর্স অফ টাইম, রবির সংগীত সাফল্যমণ্ডিত হলো তো! অঞ্জনের বা ব্যান্ডের শ্রোতাসমাজ যথেষ্ট ক্ষমতায়িত বুড়ো নয়, এইটা কারণ হতে পারে এহেন রবিতোষণ তথা ব্যান্ড/অঞ্জন-নগণ্যকরণের পেছনে। এবং যদি তা-ই হয়, তাহলে তো অঞ্জনের বা ব্যান্ডের ভবিষ্যৎ অন্ধকার তথা তাদিগের মহাকাল অচিরেই হবে হাতছাড়া! কারণ এই পুজাআচ্চা-নামাজকালামের দেশে বুড়ারা গান শোনে না; খালি বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম ও সংস্কৃতিসম্মত রবীন্দ্র-নজরুলকর্ম করে বেড়ানো স্বদেশি বুড়াদের আবার্ধক্য পুণ্যিকাজ। যৌবনে যে-গান আপনি শুনেছেন, যৌবনাবসানে সেই গান আপনি মুখেও আনছেন না, কাজটা ভালো করছেন? যৌবনের গান অস্বীকার করা মানে কিনা আপনার গোটা জীবনের গৌরবটাকেই ডিনাই করছেন আপনি; বিলকুল বুঝতেই পারছেন না আপনি যে এর মধ্য দিয়া বাতিল করে দিতেছেন খোদ নিজেরও অস্তিত্ব! বয়সকালে বড়ে-উস্তাদজি তো শুনবেন অবশ্যই, তিতা লাগলেও বয়োবৃদ্ধের স্ট্যাটাস-সিম্বল তো রক্ষিতেই হয়; কিংবা আলবৎ শুনবেন আরও যত ছুটা-শাকিল বা মেজো-নবাব বা দাউদ ইব্রাহিম, শুনবেন বটে সেতারে-সরোদে-তানপুরায় মারিয়ো পুজোর মহান সৃষ্টি ভিটো কোর্লিয়োনি আর তার পুত্তার মাইকেল কোর্লিয়োনির আলাপ ও ঝালা। মাইন্ড ইট, উস্তাদজি কিংবা ঠাকুর-কাজীরা কেউই কিন্তু বুইড়ারা গাইবার জন্য সুর করেন নাই। ইয়াদ রাখবেন, বুড়ারা দুনিয়ার সবকিছুতেই স্মৃতিপ্রিয় ও অসহনীয় রোমন্থনপ্রবণ, যৌবনের জলমেশানো পুতুপুতু কথাবার্তা আপনারে বেঁধে-ধরে শুনাবারেও মুখর তারা, নাছোড়বান্দা আত্মযৌবনশংসার উদ্গাতা, খালি মিউজিক অ্যাপ্রিসিয়েশনের বেলাতেই তাদিগের যত বজ্জাতি রিজার্ভেশন ও ভান! এই খাসিলত ভয়াবহ হারে কেবল বাংলার বুড়াদের মধ্যেই দৃষ্ট। দুনিয়ার অন্য কোথাও এহেন ভণ্ড ও সংগীতমিথ্যুক বুড়ো প্রজাতি বিরল। সদাপ্রভু ওই-সমস্ত বুড়াদের মঙ্গল করুন, সংগীতে হেদায়েত নসিব করুন বুড়া-ভাম ভুবনভোলা বাংলার।
৫৬
কৌতূহল তবু রয়ে যায় একটা ব্যাপারে, সেইটে এ-ই যে, সমাজ-রাজনৈতিক বন্ধ্যা কাণ্ডকারখানা দত্তসংগীত মোকাবেলা করেছে কি না—করে থাকলে কেমন তরিকায়—নাকি বিলকুল এড়িয়ে গেছে? হ্যাঁ, এড়িয়ে যায় নাই, মোকাবেলা করেছে বৈকি। কিন্তু সুমনের গান যেভাবে ব্যাপারটা ধারণ করে, যে-কায়দায় ক্যাথার্সিস ঘটে সুমনগানের, অঞ্জনের ভাবানুষঙ্গ ও বয়নকৌশল সেই নিরিখে দৃষ্টিগ্রাহ্য ধরনেই পৃথক। সুমন প্রকাশ্য ময়দানে বিদ্রোহপ্ররোচনা জাগান, পোলিটিক্যাল প্যাম্ফলেটের আহ্বানবাক্য প্রচারিতে শোনা যায় সুমনের অসংখ্য গানে, বহু জায়গায় সেই ইস্তেহারধর্মী হাঁকডাকের সঙ্গে রাষ্ট্ররিয়্যালিটির ব্যাপক গ্যাপ সত্ত্বেও। পূর্বে যা ছিল গরিমার, তথা স্ট্রিট-রেভোল্যুশনের দশকে যা ছিল স্বপ্নাঞ্জনদীপ্ত অমিত সম্ভাবনার, অধুনা কালক্রমে সেইটাই বিষপুষ্প হয়ে উঠেছে—এই সিচ্যুয়েশন অঞ্জনের অ্যানালিসিসে উঠে আসতে দেখি। মৃদু, যদিও অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ্য, মনোলীন উচ্চারণে। একটা গানের নমুনা খানিকাংশে নেয়া যাক : “তুমি আসবে বলে তাই / আমি স্বপ্ন দেখে যাই / আর একটা করে দিন চলে যায় / সুদিন আসবে বলে ওরা আগুন জ্বালায় / আর বেকার কিছু মানুষ মরে যায় / দেখবে বলে আকাশটাকে মাথা উঁচু করে / শুধুই নোংরা কালো ধোঁয়া দেখে যায় / কাছে আসবে বলে অন্ধকারে হাতড়ে মরে ওরা / তবু শরীর দুটো থাকে আলাদা”…ইত্যাদি। বিপ্লবের এই ফিউটিলিটি, মিছে মরীচিকার পিছে এমনধারা মায়াবশত পশ্চাদ্ধাবন, অঞ্জনের অনেক গানেই ইঙ্গিতবহ বয়ানে ব্যক্ত হতে দেখি। কিন্তু তৎসত্ত্বেও অঞ্জন অগত্যা আশা করে যান, ওই গানেই নিরর্থ অপ্টিমিজমের অসহায় মুখ অঞ্জন নিজেই প্রকাশ করেন এবং ডেলিবারেইটলি : “আমার মনটা তবু আশা করে যায় / এই মনটা তবু ভালোবাসতে চায় / এই মন আশা করে যায়।” নিরুপায়ের মতো অনপনেয় মনুষ্য স্বভাবে দিনবদলের প্ররোচনাপূর্ণ আহ্বানে ব্যাকুল ও ব্যতিব্যস্ত হন এমনকি অঞ্জনও, হন মুহূর্তের জন্য ভ্রমাচ্ছন্ন, ঠকবেন সুনিশ্চিত জেনেও অগ্নিনিমজ্জন, অন্তিমে এর হঠকারী ফলাবর্তন পূর্বাভিজ্ঞতাভুক্ত যদিও। কবীর সুমনের গানে শেষতক বিপ্লবের শুভবাদী কীর্তন শুনতে পাই। জিনিশটা খারাপ না, ভালো, আলবৎ উচ্চাঙ্গ। সুমনের গান সমস্ত অবসাদ ঝেড়ে ফেলে দৃপ্ত উজ্জীবনের বার্তাবাহী, এবং এইখানেই সুমন উপভোগ্য; অন্যদিকে অঞ্জনে যেন অবশেষে নিরাশাকরোজ্জ্বল অবসাদের একটা রাগরেশ রহিয়া যায়, এই রেশটা মানবনিয়তি না-হলেও অনেকটা কাছাকাছি; ঠিক এখানেই অঞ্জন অনন্য।
৫৭
বলা হয়ে থাকে যে, ন্যাচারাল ক্যালামিটি বা অন্য কোনো দুর্দৈবে ডাব্লিন নগরী নিকেশ/ধ্বংস হয়ে গেলে পরে জেমস জয়েসের আখ্যান থেকে গোটা শহরটা আবার বানায়ে নেয়া যাবে। এখন, যদি এভাবেই চিন্তা করি, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো দুর্ঘটের জেরে বাংলা গানের আবহমানতা ব্যাহত হয়ে গেলে বা বাংলা গানের ধ্বনিচিত্র অবলুপ্ত হয়ে গেলে পরে অঞ্জনগানের মানচিত্ররেখা ধরে চিরায়ত বঙ্গের সুরমহল পুনরুদ্ধারের উপাদান খুঁজে নেয়া যাবে কি? রিপ্লাই নিগ্যাটিভ। না, যাবে না। তার দরকারও হবে না। কাছাকাছি সময়ের শিল্পী কবীর সুমনের রচনাভাণ্ডার থেকে সেইটা টায়-টায় পারা যাবে। এর কারণটাও বোধগম্য। অঞ্জনগানে কথাভাগের ইডিয়ম থেকে একটা পারম্পর্যবহ স্বদেশচেহারা পাওয়া গেলেও সুরের ইডিয়ম প্রচলার্থে দেশজ নয়। জেনারালাইজ্যাশন হলেও কথাটা মানিয়াই লওয়া যাক। বা, আসলে ব্যাপারটা বাণী কিংবা সুরের জন্য নয়, ব্যাপারটা গায়কির জন্য মনে হয়। ইংরেজি কান্ট্রিমিউজিকের গায়কিটা অ্যাডপ্ট করার ফলে অঞ্জনপ্রযুক্ত অতিচেনা বাতাবরণের সুরটাকেও মনে হয় যেন অচিনপুরের বর্ণগন্ধগীতিছন্দায়িত। ধরা যাক ‘ক্যালসিয়াম’ গানটার উদাহরণ। ছড়াগান যেমন হয়, নার্সারি রাইম, পিওর্লি গানটা তা-ই। জিনিশটা আদপেই বিদেশি নয়। কিন্তু ওই আপনা মাংশে হরিণের সুনাম ও সমস্যা হাজির থাকে যেহেতু, অঞ্জনেরও গলার বা গায়কির পূর্বসূরি না-থাকার কারণে ব্যাপারটাকে স্ট্রেইঞ্জার/ভিনদেশি বলিয়াই বিভ্রম হয়। একইভাবে ‘ভেংচি কেটে দ্যাখ’, ‘হরিপদ’ প্রভৃতি লিরিক্সের সুরবিন্যাস ব্যবচ্ছেদে একই থিসিস পাওয়া যাবে। ব্যাপারটা জাতিগত স্বভাবমুদ্রা। আপাত অচেনা তাবৎকিছুই আমরা আনবাড়ির বলে চটজলদি সিদ্ধান্ত টেনে ফেলি বিপজ্জনক ওই মুদ্রাদোষে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কবীর সুমন ও অন্যান্য মুখপাত্রপ্রতিম মিডিয়ামানবদের মুখ-হড়কানো কথাবার্তা। ভ্রান্ত প্রচার সহজেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। একেকজন শিল্পী জীবনপ্রান্তে যেয়েও দেখেন তার একজীবনের কাজগুলো ভুলবোঝাবুঝি থেকে এক্সপেক্টেড মুক্তিটুকু লভিল না।
৫৮
লাট্টু ও লেত্তি ধীরে এবার করতলে ফেরাব, বলা বাহুল্য, পকেটে পুরে নেব। অঞ্জনের অভিষেক-অ্যালবাম ‘শুনতে কি চাও’ ১৯৯৪ সালে বের হয়। সেই বছরেই সুমনের চতুর্থ সংকলন ‘গানওলা’ বাজারে এসেছে (এইটা আসলে সুমনের থার্ড অ্যালবাম হিশেবে কাউন্ট করা বাঞ্ছনীয়; যদি ‘ইচ্ছে হলো’ সংকলনটাকে এর-আগের তিনটে অ্যালবামের বাছাই অ্যান্থোলোজি হিশেবে ক্যাল্কুলেশনের বাইরে রাখা যায়), অ্যানিওয়ে; এবং এই নিবন্ধকার সহ বাংলাদেশের বহু সুরমূর্খ গানকাঙাল ওই বছরেই পুলসিরাতের সাঁকো তথা মাধ্যমিক পরীক্ষা পার হবার পাঁয়তারা করছে দুরুদুরু বক্ষে আল্লারাসুলের নাম নিয়ে; এই নাইন্টিননাইন্টিফোর বছরটা বাংলা গানের ইতিহাসে একটা তাৎপর্যবহ বছর; অনেক সাংগীতিক ঘটনা এই বছরেই সংঘটিত হয়, যে-ঘটনারাজি পরের কয়েক বছরের গানচিত্রে ব্যাপক প্রভাব রাখবে। এই বছরেই ফিডব্যাক নিয়া আসবে ব্যান্ডমিউজিকসিনে এখনোব্দি অপ্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালবাম ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’, যে-অ্যালবাম গোটা বাংলা ব্যান্ডসংগীত তৎপরতাকে এমন-একটা দার্ঢ্য দেয় যা আজও মূল্যায়িত হয় নাই; যদিও এর আগে থেকেই ফিডব্যাক বাংলাদেশের নতুন দিনের গানে তিন-তিনটে অ্যালবামে নিজেদের প্রতিভাস্বাক্ষর রেখে এসেছে, ব্যাপক সাফল্য লভেছে ক্যাসেটকোম্প্যানিগুলোর বিজনেস-খতিয়ানে এবং সর্বোপরি মিউজিকের ক্রিটিক্যাল অ্যাক্লেইমগুলো তরুণ ও যুবাশ্রেণির শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরেছে;—উল্লাস, মেলা এবং জোয়ার ফিডব্যাকের তিনটা মাইলস্টোন—বঙ্গাব্দ-১৪০০ দিয়েই ফিডব্যাক দুনিয়াজোড়া বাংলাগানে ব্রেক-থ্রু ঘটায় এই চুরানব্বই সালে, যে-বছর বাংলা আরেকটা নতুন শতাব্দীতে পা রাখতে চলেছে, ফিডব্যাকের অ্যালবামনাম থেকে শুরু করে ক্যাসেটপ্রচ্ছদ ও বক্তব্যভাষ্য সহ সর্বত্র বঙ্গাব্দ-কোমেমোরেইটিং ব্যাপারটা হাজির এবং সর্বোপরি লিরিক্সের অভাবিতপূর্ব নতুন দিগন্তদর্শন। মোদ্দা কথায়, এই যিশুবর্ষ উনিশশচুরানব্বই ফিডব্যাকের বঙ্গাব্দমুক্তি এবং অঞ্জন দত্তের আবির্ভাবের জন্যই মিউজিকামোদীদের কাছে এভার-রিমেম্ব্রিং।
৫৯
তো, অভিষেকবর্ষের পর থেকে একটানা ২০০১ পর্যন্ত অঞ্জন দত্ত অব্যাহতভাবে অ্যালবাম প্রকাশ করেন; প্রকাশকালের যথাসম্ভব ক্রমানুসারে অ্যালবামগুলো স্মরণার্হ : ‘শুনতে কি চাও’ প্রকাশের অব্যবহিত পরের বছরেই রিলিজ পায় ‘পুরনো গিটার’; এরপর থেকে একাদিক্রমে ‘ভালোবাসি তোমায়’, ‘কেউ গান গায়’, ‘চলো বদলাই’, ‘হ্যালো বাংলাদেশ’, ‘কলকাতা-১৬’, ‘বান্দ্রা ব্লুজ’, ‘অসময়’ এবং অ্যালবাম-প্রকাশবিরতির দীর্ঘযুগ শুরুর প্রাক্কালে শেষ পূর্ণাঙ্গ ‘রং পেন্সিল’ অ্যালবামটা শ্রাব্য সংগীতাভিজ্ঞতা হিশেবে স্পেশ্যালি উল্লেখযোগ্য। অবশ্য লম্বা এই বিরতিকালে সিনেমায় এবং সিনেমার জন্য অঞ্জন টুকটাক গান করেছেন দেখতে পাবো, বেশ কয়েকটি সিঙ্গেল্স বের হয়েছে ইতিউতি, কিন্তু গোটা অ্যালবাম একটাও না।
৬০
টানা বারো-তেরো বছর অঞ্জন দত্ত নতুন গান তৈরি/প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকে শেষে ২০১৪ সালে এসে একটা অ্যালবাম করেন ‘ঊনষাট’ নামে। অ্যালবামটা বাংলাদেশ থেকে বের হয়। এই দীর্ঘ স্থগিতকালের ব্যাপারে একটি টিভিইন্টার্ভিয়্যুতে কৈফিয়ৎ দিয়ে রেখেছেন অঞ্জন। তদ্দিনে শিল্পী পদার্পণ করেছেন ঊনষাট বছর বয়সসোপানে। একটা সময়ে এসে অঞ্জনের মনে হতে থাকে যে, তিনি জানাচ্ছেন, তার রচনাগুলো বয়সের বিশেষ একটা জায়গায় যেন-বা আটকিয়া আছে। সেই সীমান্তাবর্ত উত্তীর্ণ-কৈশোর, উঠতি-তরুণ অথবা বড়জোর টগবগে যুবা বয়স অব্দি। এর বাইরের বেদ ও বেদনা কাভার করছে না গানগুলো, অন্তত খোদ অঞ্জনের এমনটাই মনে হতে থাকে। একই সেই বেলা-রমা-জয়িতা-রঞ্জনাদের নিয়া গাওয়া তারুণ্যঝকমকা গানগুলোই শুনতে চায় শ্রোতারা ফিরে ফিরে। এহেন চক্কর থেকে বেরোনোর জন্য অঞ্জন নতুন গানরচনা প্রায় ছেড়েই দেন বলিয়া আমাদেরে জানান। দশকাধিক এই অন্তর্বর্তীকালে তিনি সিনেমা বানিয়েছেন একে একে বেশকিছু, সিনেমার জন্য টুকটাক গানও রচেছেন, তবে অ্যালবাম প্রকাশ থেকে স্বেচ্ছায় বিরত রেখেছেন নিজেকে। যে-মুহূর্তে এসে মনে হয়েছে যে এইবার উত্তীর্ণ-পঞ্চাশ পরিণত বয়সের কিছু কথা গানে বলবার মতো জোর তৈরি হয়েছে ভেতরে, সে-মুহূর্তেই নতুন গান বাঁধতে ফের বসেছেন অঞ্জন এবং এভাবে এক-সময় অ্যালবাম ‘ঊনষাট’ রিলিজ পেয়েছে। অ্যালবামের গানগুলো অঞ্জনের আদি টিপছাপ নিয়েও নতুন মোড়ে দাঁড়ানো। পরিবর্তিত সময়ের স্বপ্নভঙ্গ ও পরিব্যাপ্ত অবসাদের কথিকা গানগুলোতে ততোধিক অবসন্ন ও গোধূলিক্লিষ্ট সময়ক্লিন্ন স্বরে গেয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে সুর ও কথার কারিকুরি নিয়াও রচয়িতা ভাবিত হতে চাইছেন না যেন-বা ইচ্ছে করেই, যেন নতুন সময়ের পাঁচালি নির্মাণ করতে চাইছেন দাশরথীর ধাঁচ যুগপৎ ভুলে এবং মনে রেখে, লেনার্ড কোহেনের ইনফ্লুয়েন্স ও ইনস্পিরেশন না-রেখেঢেকেই, দিনগত অপরাধস্বীকারের মতো করেই নিজের কথাগুলো বলে যেতে চাইছেন অঞ্জন, একেবারে ভাবালুতালেশহীন নির্বিকার স্বীকারোক্তি ধারার কবিতা বা কনফেশন্যাল পোয়েট্রি যেন অঞ্জন দত্তের ঊনষাটের পদাবলি। দীর্ঘ কথিকাটাকে একটা মামুলি গতিতে গেয়ে যেতে যেটুকু যন্ত্রানুষঙ্গ না হলেই নয়, নেহায়েত সেটুকু সংগীতায়োজন। অল্প কথায় এ-পর্যন্ত ঊনষাট-পেরোনো অঞ্জনের গল্প গোটায়ে নিতে হচ্ছে এখানে; এই অ্যালবামে, এই নিবন্ধে, সেলিব্রেইট করি ফিরে ফিরে আমাদের স্বর্ণগৈরিক কৈশোর ও তূর্ণানিশীথা তারুণ্য।

পোস্টস্ক্রিপ্ট : রচনাটা ফার্স্ট পাব্লিশ হয় সেপ্টেম্বর দুইহাজারপনেরোয়, দেখতে দেখতে একযুগ হয়ে গেল, পাব্লিশ করেছিল ‘লাল জীপের ডায়েরী’। শিরোনাম ছিল ‘অঞ্জন দত্ত, ওয়েস্টার্ন সিনেমা, কাঞ্চনজঙ্ঘা-ক্যালিম্পং ও অন্যান্য দৈত্যদানো’। বর্তমান প্রকাশকালে এর পূর্বনাম বদলে ফেলা ছাড়া আর কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পাদনা সাধিত হয় নাই। কিছু মুদ্রণপ্রমাদ সারানো সম্ভব হলো শুধু। উল্লেখ্য, রচনাটা ড্রাফ্ট ও ফার্স্ট পাব্লিশের সময় থেকে একযুগ দেড়দশক পরে এসে এখন লক্ষ করব অঞ্জন দত্ত সংক্রান্ত দশাসই বই বেরিয়ে গেছে একাধিক। বই বেরিয়েছে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়া উভয় জায়গা থেকে। সেগুলি বিস্তারিত, অতিকায় এবং অথেন্টিক। তুলনায় এই রচনা আদৌ অঞ্জন দত্ত সংক্রান্তও নয় খেয়াল করব। বরং এইটা বাংলা গানে পাহাড়-সমুদ্র অনুসন্ধানের এক যাত্রা। আর উদযাপন করা। টাইম সেলিব্রেইট করা। তাতে তথ্যগত অথেন্টিসিটি চেক অ্যান্ড ব্যাল্যান্স করা আবশ্যক মনে করি নাই। কিছু রচনা থাকে মেমোরিনির্ভর, এইটা তেমন এক। রচনার আদি শিরোনাম ও বর্তমান শিরোনাম দুনোখানেই রচনাটির রেইঞ্জ ও ফোকাস সম্পর্কে একটা আইডিয়া পাওয়া যায়। লেখকের অভিপ্রায় ছিল সময়ভ্রমণ, অগোচর নিশ্চয় নয় আদ্যোপান্ত রচনায় লেখকের অভিপ্রায়। তা ব্যক্তিকেন্দ্রী নয়, এমনকি নয় বিষয়ান্বেষীও। কড়চা। বাংলায় এই টাইপের রচনাগুলো কড়চা নামেই বিদিত। অঞ্জন দত্ত, অথবা পাহাড়সমুদ্র, সংগীত ও অন্যান্য সমুদয় বিদ্যাই জীবনটা আরেকটু ঘনভাবে যাপনের একেক অনুষঙ্গ। জরুরি, কিন্তু অনুষঙ্গ। প্রসঙ্গ জীবন। অনির্বচন। দ্য প্রিভিয়াস টাইটল ‘অঞ্জন দত্ত, ওয়েস্টার্ন সিনেমা, কাঞ্চনজঙ্ঘা-ক্যালিম্পং ও অন্যান্য দৈত্যদানো’ ইজ রিনেইমড অ্যাজ ‘গানের কথা গানের সুর শৈলশহর সমুদ্দুর’। সাইন্ড, সিল্ড অ্যান্ড ডেলিভার্ড অন দুইহাজারছাব্বিশের ফার্স্ট অফ জুন।
গানপারে অঞ্জন দত্ত
গানপারে কবীর সুমন
জাহেদ আহমদ রচনারাশি
- গানের কথা গানের সুর শৈলশহর সমুদ্দুর - June 1, 2026
- বলকলম - May 21, 2026
- প্রতিবর্ত সংলাপিকা - May 5, 2026

COMMENTS