গাছের পাতার কণ্ঠস্বরে, পুষ্ট আমের সবুজে এসেছে পঁচিশে বৈশাখ। প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। আবার রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করে নানামুখী অভিযোগ, মিথ্যাচারও প্রচার হচ্ছে সমাজে। বিভাজিত মন থেকে, না-জানার অভিপ্রায় থেকে উচ্চারিত হচ্ছে নানান অভিযোগ, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বলয় কিংবা জ্ঞানচর্চার বাইরে, বিশ্বসাহিত্যের আলোতে, বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির স্তরে স্তরে রবীন্দ্রনাথ থাকবেন। আমার মনে হয় কোনো প্রকার সাংগঠনিক তৎপরতা, প্রচার, আয়োজন দিয়ে কবিকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় না কিংবা বাঁচিয়েও রাখা যায় না। কবি বেঁচে থাকেন তাঁর ভাষা-কল্পনা-স্বপ্ন-দার্শনিকতার জোরে। কাব্যই কবির বেঁচে থাকার প্রদীপ। রবীন্দ্রসাহিত্যের সর্বাংশে আছে ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’। বাংলাকে, বাংলার প্রকৃতিকে, প্রাকৃতজনকে, মৌলিক বাংলাদেশকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন। তাঁর গানের জ্ঞান ও সুরের গভীরে সানন্দ বিচরণ করলে মন-আত্মা শান্ত হয়, মানবিক হয়।

দুর্দিনে-দুঃসময়ে রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে প্রাণশক্তি সঞ্চয় করে বাংলার সমাজ শক্তিমান হয়েছে। সুখে-দুখে-সন্তাপে রবীন্দ্রনাথ হয়েছেন আশ্রয়। গানের মহারূপে সতত-নিরত আশ্রয় খুঁজেছে বাঙালি। সুচেতন চিত্তের কাছে রবীন্দ্রনাথ একটা শিক্ষালয়। বাংলার পরম্পরাগত জ্ঞা ন ও ঐশ্বর্যকেই তিনি সাহিত্যে ধারণ করেছেন। পাশ্চাত্যের জ্ঞান দিয়ে নয়, বহুধা বিভক্ত সমাজকে তিনি স্বদেশী সমাজের ধারণায় একত্র করতে চেয়েছেন। কিন্তু পারেননি। না-পারলেই তাঁর সাহিত্য ব্যর্থ হয়ে যাবে এটা কোনো কথা হতে পারে না। তাঁর চিন্তাটা তো আছে। সেই চিন্তায় অবগাহন করলে বাংলাদেশের সময় ও সামাজ পরিস্থিতিকে অনুভব করা যায়।
“এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি / রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।” এই সমাজসত্যকেই রবীন্দ্রনাথ প্রচার করেছেন। “মুক্ত করো ভয়, / আপনা মাঝে / শক্তি ধরো, / নিজেরে করো / জয়। দুর্বলেরে / রক্ষা করো, / দুর্জনেরে হানো, নিজেরে দীন / নিঃসহায় যেন / কভু না জানো।” একজন কবি মূলত একটা জাতির আত্মপরিচয়কে সামনে নিয়ে আসেন। জাতির ইতিহাস-ঐশ্বর্য, মুক্তির আহ্বান রচনা করাই তাঁর কাজ। ৮০ বছরের কবিজীবনে রবীন্দ্রনাথ সেই দার্শনিক কথাটি প্রচার করেছেন।
পঁচিশে বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ সাত মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
গানপারে রবীন্দ্রনাথ
- পুষ্ট আমের সবুজে এসেছে পঁচিশে বৈশাখ || সরোজ মোস্তফা - May 7, 2026
- বিদায়, কবি আনিসুর রহমান বাবুল! || সরোজ মোস্তফা - April 20, 2026
- কবিতা নাই কেন? - March 28, 2026

COMMENTS