সকালে ফেইসবুক খুলে দেখি মহান ইচক দুয়েন্দে লোকান্তরিত হয়েছেন। একজন লেখক লোকান্তরিত হলে সমাজের ভেতরে যতটা আক্ষেপ উচ্চারিত হওয়ার কথা ততটা আজকাল আর দেখা যায় না। তাহলে শূন্যতাটা কার? মুষ্টিমেয় সহচরদের? পরিবারের?
সমাজ সংবেদনশীল না-হলে, লেখককে না-ধারণ করলে এইসব সাহিত্যযাপন একান্ত ব্যক্তিগত। ইচক দুয়েন্দের মতো লেখকের ক্ষেত্রে এই কথা আরো সত্য। তাঁর মৃত্যুতে গড়াগড়ি খাবেন কবি মাহবুব কবির, তাঁর মৃত্যুতে হাহাকার করে উঠবেন কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদ, তাঁর মৃত্যুতে পদ্মাপাড়ের অসীম কুমার দাস আরো নীরব হয়ে যাবেন, ফ্যানের বাতাসে শূন্যতার বিমূর্ততা দূর করতে পারবেন না কবি টোকন ঠাকুর কিংবা সুব্রত আগাস্টিন গোমেজ। তাহলে লেখকের শূন্যতাকে, স্মৃতিকে, দর্শন ও দার্শনিকতাকে লেখকেরাই বহন করে।

ইচক দুয়েন্দে হলেন বাংলা সাহিত্যের একজন নিরীক্ষাধর্মী ও স্বাতন্ত্র্যবাদী কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক, অনুবাদক এবং প্রকাশক। কবিরা, লেখকেরা, সহচরেরা তাঁকে কচিভাই ডাকতেন। কচি তাঁর ডাকনাম। এই কচি শব্দকে ভেঙেই তিনি ইচক করেছেন। দুয়েন্দে নিয়েছেন লোরকার স্প্যানিশ মিথ থেকে।
মগরার ছোট শহরে থেকেও বকুলতলার আড্ডায় নব্বুই দশকের মাঝামাঝি কবি মাহবুব কবিরের মুখেই তাঁর নাম প্রথম শুনেছি। আড্ডায়-বিচরণে কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদ প্রেম ও মগ্নতায় কতবার যে তাঁর নাম উচ্চারণ করেছেন—এই নথি আর কে লিখে রাখে। একসময় তিনি শামসুল কবীর নামেও লেখালেখি করতেন। প্রথাগত গল্পের বাইরে গিয়ে চেনা বাস্তবতাকে তিনি ভিন্ন দর্শনে, রূপকে ও মনস্তত্ত্বের আলোকে তুলে ধরেছেন।

তাঁকে কোনদিন দেখিনি। না-দেখেও মানুষকে ভালোবাসা যায়। মাহবুব কবিরের মুখেই কচিভাই সম্পর্কিত গল্পগাথা শুনেছি। তাঁর সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিনের নাম ‘প্যাঁচা’। এই নামে প্রকাশনালয়ের অধিকর্তাও তিনি। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সাংগঠনিক প্রতিভায় আশির দশকের শেষ লগ্নে ঢাকা শহরের তরুণদেরকে আকর্ষণ করেছিলেন। রাজশাহী ছেড়ে সম্ভবত আশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকার শাহবাগের সাহিত্যআড্ডায় আবির্ভূত হন। নিরীক্ষামুলক, স্বতঃস্ফূর্ত, সংবেদনশীল পিজির আড্ডায় প্রচুর ধুম্র গেলা হতো। আড্ডায় তিনি ছিলেন অধিনায়কের মতো। চারপাশের সহজ সহচরদের গান শুনাতেন। রবীন্দ্রসংগীত। কোনো রকম কারণ ছাড়াই নব্বুইয়ের কবিরা এই আড্ডায় মজে মিশে গিয়েছিলেন।
ইচক দুয়েন্দে যতটুকু লিখেছেন, ততটুকুই তাঁর স্টাইল ও অভিজ্ঞান। সাধনার প্রকৃতিই তাঁকে ঢাকাবাদিতা থেকে দূরে রেখেছিল। তাঁর গল্প কিংবা কবিতা তাঁর মতোই আড়ালপ্রিয়। মানুষের মৃত্যু অনিবার্য কিন্তু জীবনযাপনটা একান্ত। জগতকে দেখার মতো একান্ত। পদ্মা নদীর মতো বিশাল চোখে একান্ত দৃষ্টিতেই পৃথিবীতে দেখে গেছেন ইচক দুয়েন্দে।
১৭ মে ২০২৬
ব্যানারে ব্যবহৃত প্রতিকৃতির শিল্পী কৌশিক সরকার। অন্য দুই ইমেইজ ওপেন সোর্স থেকে নেয়া।—গানপার
সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
- স্বাগত দুয়েন্দে || সরোজ মোস্তফা - May 19, 2026
- দার্শনিকতা, দৃশ্যকল্প, পরিহাস ও এক অপরিমেয় চোখ || সরোজ মোস্তফা - May 18, 2026
- রবীন্দ্রনাথের পারস্য যাত্রা || সরোজ মোস্তফা - May 15, 2026

COMMENTS