রবীন্দ্রনাথের পারস্য যাত্রা || সরোজ মোস্তফা

রবীন্দ্রনাথের পারস্য যাত্রা || সরোজ মোস্তফা

শেয়ার করুন:

পারস্যের রাজা রেজা শাহ পাহলভীর ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩২ সালে পারস্যে ভ্রমণ করেন। কবি হাফিজের প্রতি মগ্ন প্রেম, পারস্যের সংস্কৃতি, শিরাজ ও পার্সিপোলিস দর্শন কবিকে এই ভ্রমণে প্রাণিত করে। না-হলে সত্তর বছর বয়সের ক্লান্ত শরীর নিয়ে মরুর বুকে যাত্রা করতেন না। ১১ এপ্রিল ১৯৩২ সালে তিনি কলকাতার দমদম বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেন। কলকাতা থেকে বোম্বে, এবং সেখান থেকে জাহাজে করে কবি পারস্যে পৌঁছান।

মূলত রাজার অতিথি হয়ে কবি গেছেন কবিকে দেখতে। প্রচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও দেশ দেখতে। দেশের রাজা, দেশের গভর্নর, কবি-সাহিত্যিক বিশিষ্ট ব্যক্তিরা কবিকে সংবর্ধিত করবেন—এটা তো স্বাভাবিক। কবি যখনই যেখানে ভ্রমণে গেছেন সে-দেশ-সমাজ সম্পর্কে জেনে নিয়েছেন। প্রতিটি ভ্রমণের আগে কবি প্রস্তুতি নিতেন, সে-দেশের ইতিহাস, ভূগোল, জনপদবৃত্তান্ত সম্পর্কে জেনে নিতেন। তিনি বাবুরনামা পড়েছিলেন এবং বাবুরের অনেক মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন তাঁর লেখায়। এই ভ্রমণে ঘুরে ঘুরে বিস্মিত হয়ে পারস্যের জীবন, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের আচার-আচরণ, ভদ্রতা, খাবার, আতিথেয়তা, ধর্ম-দর্শন-মতাদর্শ ও জীবনযাপনপদ্ধতিকেই অবলোকন করেছেন। তিনি জানতেন, ‘প্রাচীন সভ্যতা সাহিত্য সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান পারস্য’। ফার্সি সাহিত্যের মহৎ কবিরা সুর ও পঙক্তিতে পৃথিবীর সমাজকে নতুন বোধ ও উপলব্ধিতে পৌঁছে দিয়েছেন। ১৭ এপ্রিল কবিকে শিরাজের গবর্নর বিরাট এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিয়ে গেলেন। সেখানে অভিজাতমণ্ডলি, কবি-সাহিত্যিক, আমলাবৃন্দ কবিকে উদ্দেশ্য করে যে মানপত্র পড়লেন তাতে কবির মনে হলো : শিরাজ-নাগরিকদের হয়ে একজন যে অভিবাদন পাঠ করলেন তার মর্ম এই—“শিরাজ শহর দুটি চিরজীবী মানুষের গৌরবে গৌরবান্বিত। তাঁদের চিত্তের পরিমণ্ডল তোমার চিত্তের কাছাকাছি। যে উৎস থেকে তোমার বাণী উংসারিত সেই উৎসধারাতেই এখানকার দুই কবিজীবনের পুষ্পকানন অভিষিক্ত। যে সাদির দেহ এখানকার একটি পবিত্র ভূখণ্ডতলে বহু শতাব্দীকাল চিরবিশ্রামে শয়ান তাঁর আত্মা আজ এই মুহূর্তে এই কাননের আকাশে ঊর্ধ্বে উত্থিত, এবং এখনি কবি হাফেজের পরিতৃপ্ত হাস্য তাঁর স্বদেশবাসীর আনন্দের মধ্যে পরিব্যাপ্ত।”

অভ্যর্থনায় রবীন্দ্রনাথ খুবই মুগ্ধ ছিলেন। এই আভিজাত্যের চাকচিক্য, প্রশংসা কিংবা বিনয়মহলে কবি বিহার করছেন ফার্সিভাষার মহৎ কবিদের সাথে। সেদিন সন্ধ্যায় সেখানে গিয়ে কবির মনে হলো : ‘আপনারা যে ভাষায় আমাকে সম্ভাষণ করলেন সে আপনাদের নিজের, … আমি সশরীরে এখানে উপস্থিত। বঙ্গাধিপতি একদা কবি হাফেজকে বাংলায় নিমন্ত্রণ করেছিলেন, তিনি যেতে পারেন নি। বাংলার কবি পারস্যাধিপের নিমন্ত্রণ পেলে, সে নিমন্ত্রণ রক্ষাও করলে এবং পারস্যকে তাঁর প্রীতি ও শুভকামনা প্রত্যক্ষ জানিয়ে কৃতার্থ হল।’

ব্যাবিলনীয়, আকামেনীয়, সাসানীয় সভ্যতার এই পারস্যভূমিকে, ঐতিহ্যকে জানার ও দেখার আগ্রহ বহুদিন ধরে লালন করেছেন কবি। এই সুযোগে পারস্যকে জানা হলো। তিনি যেখানেই গেছেন ভারতীয় সমাজের সাথে সে-সমাজের ব্যবধান ও ঐকতান খুঁজেছেন। কিংবা সভ্যতা ও মানবিকতার পথে অন্তরায় দেশিয় ও সামাজিক সূত্রগুলোকে খুঁজে দেখেছেন। শিবাজি শহরের গভর্নরের সাথে আলাপকালে কবি এই বিষয়টির প্রতি নোটিশ করেছেন : ‘আজ সকালে হাফেজের সমাধি হয়ে বাগানবাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেবার কথা। তার পূর্বে গবর্নরের সঙ্গে এখানকার রাজার সম্বন্ধে আলাপ হল। একদা রেজা শা ছিলেন কসাক সৈন্যদলের অধিপতি মাত্র। বিদ্যালয়ে য়ুরোপের শিক্ষা তিনি পান নি, এমন-কি পারসিক ভাষাতেও তিনি কাঁচা। আমার মনে পড়ল আমাদের আকবর বাদশাহের কথা। কেবল যে বিদেশীর কবল থেকে তিনি পারস্যকে বাঁচিয়েছেন তা নয়, মোল্লাদের আধিপত্যজালে দৃঢ়বদ্ধ পারস্যকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রতন্ত্রকে প্রবল ও অচল বাধা থেকে উদ্ধার করেছেন।

আমি বললুম, দুর্ভাগা ভারতবর্ষ, জটিল ধর্মের পাকে আপাদমস্তক জড়ীভূত ভারতবর্ষ। অন্ধ আচারের বোঝার তলে পঙ্গু আমাদের দেশ, বিধিনিষেধের নিরর্থকতায় শতধাবিভক্ত আমাদের সমাজ।

গবর্নর বললেন, সাম্প্রদায়িক ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে যতদিন না ভারত একাত্ম হবে ততদিন গোলটেবিল-বৈঠকের বরগ্রহণ করে তার নিষ্কৃতি নেই। অন্ধ যারা তারা ছাড়া পেলেও এগোয় না, এগোতে গেলেও মরে গর্তে প’ড়ে।’

অবশেষে কবি হাফিজের সমাধি দেখতে বেরোলেন। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় কবির দরগায় তিনি এসেছেন। ছোটবেলা থেকে তিনি হাফিজ পড়ছেন। কবির মর্মে গেঁথে আছে হাফিজ। হাফিজের সমাধিতে এসে কবির মনে হচ্ছে ‘পিতার তীর্থস্থানে আমার মানসঅর্ঘ্য নিবেদন করতে।’ পিতার মুখেই প্রথম শুনেছেন প্রিয় কবির কবিতা। কবির ভাষায় : ‘একদিন দূর থেকে পারস্যের পরিচয় আমার কাছে পৌঁচেছিল। তখন আমি বালক। সে পারস্য ভাবরসের পারস্য, কবির পারস্য। তার ভাষা যদিও পারসিক, তার বাণী সকল মানুষের।

আমার পিতা ছিলেন হাফেজের অনুরাগী ভক্ত। তাঁর মুখ থেকে হাফেজের কবিতার আবৃত্তি ও তার অনুবাদ অনেক শুনেছি। সেই কবিতার মাধুর্য দিয়ে পারস্যের হৃদয় আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল।’

কবি যেদিন হাফিজের সমাধিতে এলেন সেদিন নূতন রাজার আমলের সমাধিসংস্কার চলছে। পুরোনো কবরের উপর আধুনিক কারখানায় ঢালাই করা জালির কাজের একটা মণ্ডপ তুলে দেওয়া হয়েছে। এই দৃশ্য রবীন্দ্রনাথের মোটেও পছন্দ হলো না। কবির মনে হলো হাফিজের কাব্যের সঙ্গে এটা একেবারেই খাপ খায় না। ‘লোহার বেড়ায় ঘেরা কবি-আত্মাকে মনে হল যেন আমাদের পুলিস-রাজত্বের অর্ডিনান্সের কয়েদী।’

কবি মাজারের ভিতরে গিয়ে বসলেন। সমাধিরক্ষক কবির সামনে একখানি বড়ো চৌকো আকারের বই এনে উপস্থিত করলে। হাফিজের মাজারের এই নিয়ম। এই বই আসলে হাফিজের কাব্যগ্রন্থ। সাধারণের বিশ্বাস এই যে, কোনো-একটি বিশেষ ইচ্ছা মনে নিয়ে চোখ বুজে এই গ্রন্থ খুলে যে কবিতাটি বেরোবে তার থেকে ইচ্ছার সফলতা নির্ণয় হবে। নিয়ম মোতাবেক কবিও একটি পৃষ্টা খুললেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : ‘যে পাতা বেরোল তার কবিতাকে দুই ভাগ করা যায়। ইরানী ও কয়জনে মিলে যে তর্জমা করেছেন তাই গ্রহণ করা গেল। প্রথম অংশের প্রথম শ্লোকটি মাত্র দিই। কবিতাটিকে রূপকভাবে ধরা হয়, কিন্তু সরল অর্থ ধরলে সুন্দরী প্রেয়সীই কাব্যের উদ্দিষ্ট।

প্রথম অংশ। মুকুটধারী রাজারা তোমার মনোমোহন চক্ষুর দাস, তোমার কণ্ঠ থেকে যে সুধা নিঃসৃত হয় জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমানেরা তার দ্বারা অভিভূত।

দ্বিতীয় অংশ। স্বর্গদ্বার যাবে খুলে, আর সেইসঙ্গে খুলবে আমাদের সমস্ত জটিল ব্যাপারের গ্রন্থি, এও কি হবে সম্ভব? অহংকৃত ধার্মিকনামধারীদের জন্যে যদি তা বন্ধই থাকে তবে ভরসা রেখো মনে ঈশ্বরের নিমিত্তে তা যাবে খুলে।

বন্ধুরা প্রশ্নের সঙ্গে উত্তরের সংগতি দেখে বিস্মিত হলেন।’

এই সফরে রবীন্দ্রনাথ ইরানের প্রায় সব শহর এবং ইরাকের বাগদাদ ঘুরে দেখেছিলেন। কবির সাথে কবি পুত্রবধু, কবির সচিব অমিয় চক্রবর্তী ছিলেন। ভ্রমণের ভেতরেও তিনি পরিবর্তিত পারস্যকেই আবিষ্কার করেছিলেন। প্রাক্তন মহরম ও বর্তমান মহরমের চিত্রও কবির লেখায় উঠে এসেছে। ‘আজ মহরমের ছুটি, সবাই ছুটি উপভোগ করতে বেরিয়েছে। অল্প কয়েক বছর আগে মহরমের ছুটি রক্তাক্ত হয়ে উঠত, আত্মপীড়নের তীব্রতায় মারা যেত কত লোক। বর্তমান রাজার আমলে ধীরে ধীরে তার তীব্রতা কমে আসছে।’

বয়সের ক্লান্তি কবিকে ম্লান করেনি। পারস্য যেভাবে মানবতা ও সভ্যতাকে গ্রহণ করেছিল—রবীন্দ্রনাথ সেটাই মুগ্ধ চিত্তে বর্ণনা করেছেন।  ইরান থেকে ফেরার সময় কবি ইরানের জনগণ ও রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন, তাদের অভিবাদনের উত্তর দিয়েছেন। সেই দরদি লেখায় পারস্যদেশের প্রতি, জনগণের প্রতি কবির অকুণ্ঠ ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা ও পক্ষপাতের কথাই উচ্চারণ করেছেন। কবি লিখেছেন: ‘আজ শেষ পর্যন্ত তোমাদের কাছে বিদায় নেবার সময় এসেছে, কৃতজ্ঞতায় ভরা আমার এই হৃদয়খানি তোমাদের দেশে রেখে গেলাম…অবশেষে দেখা গেল নবজাগরণের আলোকরশ্মি। এই মহাদেশের অন্তরের মধ্যে একটা স্পন্দমান জীবনের কম্পন ক্রমেই যেন নিবিড় আত্মোপলব্ধির মধ্যে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। এই পূর্ণ মুহূর্তে আজ আমি কবি তোমাদের কাছে এসেছি নবযুগের শুভপ্রভাত ঘোষণা করতে, তোমাদের দিগন্তের অন্ধককার ভেদ করে যে আলোক ফুটে উঠেছে সেই আলোককে অভিনন্দন করতে—আমার জীবনের মহৎ সৌভাগ্য আজ তোমাদের কাছে এলাম। জয় হোক ইরানের।’


সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
গানপারে রবীন্দ্রনাথ

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you