প্রিয় ধরিত্রী মা,
আমরা নিজেদের নাম দিয়েছি হোমো স্যাপিয়েন্স—‘বুদ্ধিমান মানুষ’। মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর আগে, ওরোরিন টুগেনেনসিস নামের প্রাচীন বানরাকৃতির জীব থেকে আমাদের এই প্রজাতির পূর্বসূরিরা আবির্ভূত হয়েছিল, যারা প্রথমবারের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখেছিল, যার ফলে তাদের হাতও নানা কাজে ব্যবহারের জন্য মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। যখন তারা ধীরে ধীরে যন্ত্র ব্যবহার করতে ও পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শিখল, তখন তাদের মস্তিষ্কও ক্রমে বিকশিত ও বিস্তৃত হতে লাগল। প্রায় ষাট লক্ষ বছরের দীর্ঘ বিবর্তনের পথে তারা ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হলো হোমো স্যাপিয়েন্স-এ। কৃষিকাজ ও সমাজব্যবস্থার উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এমন কিছু নতুন সক্ষমতা অর্জন করলাম, যা আমাদের প্রজাতিকে অনন্য করে তুলল। আমরা আত্মসচেতন হয়ে উঠলাম এবং মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান ও ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। তারপরও আমরা এমন কিছু বৈশিষ্ট্যও বিকশিত করেছিলাম, যা আমাদের প্রকৃত স্বভাবের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের অজ্ঞতা ও দুঃখের কারণে আমরা নিষ্ঠুরতা, সংকীর্ণতা ও হিংস্রতার পথে চলেছি। কিন্তু সাধক, বোধিসত্ত্ব ও বুদ্ধ হওয়ার সাধনায় আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা শুধু নিজেদের প্রজাতির জন্য নয়, সমস্ত জীবের কল্যাণে সহানুভূতিশীল, দয়ালু ও রক্ষক সত্তা হতে পারি। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই সাধক, বোধিসত্ত্ব ও বুদ্ধতে পরিণত হওয়ার সেই ক্ষমতাও আছে। মা, ব্যতিক্রমহীনভাবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই জাগ্রত সত্তায় রূপান্তরিত হওয়ার, তোমাকে রক্ষা করতে পারার এবং তোমার সৌন্দর্য সংরক্ষণ করতে পারার সম্ভাবনা নিহিত আছে।
আমরা মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ বা খনিজ, যা-ই হই না কেন, আমরা সকলে তোমারই সন্তান, তোমারই দেহের অংশ, আর তাই আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আছে জাগরণের স্বভাব। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা প্রায়ই আমাদের মানসিক চেতনা নিয়ে অহংকার করি। আমরা গর্ব করি আমাদের শক্তিশালী দূরবীন নিয়ে, যা দিয়ে আমরা দূরবর্তী গ্যালাক্সি দেখতে পারি। কিন্তু অল্প কয়েকজনই উপলব্ধি করে যে, আমাদের এই চেতনা আসলে তোমারই চেতনা। তুমি নিজেই তোমার সন্তানদের মাধ্যমে মহাবিশ্বকে উপলব্ধি করছ, নিজেকে গভীরভাবে চিনে নিচ্ছ। আমরা নিজের সচেতনতার ক্ষমতা নিয়ে যেমন গর্ব করি, তেমনি ভুলে যাই যে আমাদের মানসিক চেতনা সীমাবদ্ধ—আমাদের অভ্যস্ত চিন্তার প্রবণতা আমাদের ক্রমাগত বিভাজন সৃষ্টি করে। আমরা জন্ম ও মৃত্যু, অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব, ভেতর ও বাইর, ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে পার্থক্য টানি। তবু এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা গভীরভাবে দর্শন করেছেন, জাগ্রত চেতনতার মনকে সাধনার মাধ্যমে বিকশিত করেছেন, এবং এইসব অভ্যাসগত প্রবণতাগুলোকে অতিক্রম করে ভেদহীন প্রজ্ঞা অর্জন করেছেন। তারা নিজেদের ভেতরে ও চারপাশে সেই চূড়ান্ত মাত্রাকে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদের অদ্বৈততার অন্তর্দৃষ্টির দিকে পরিচালিত করে, সব বিচ্ছেদ, ভেদাভেদ, ভয়, ঘৃণা ও হতাশাকে রূপান্তরিত করে বিবর্তনের পথে তোমার ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
প্রিয় ধরিত্রী মা,
তোমার উপহার দেওয়া অমূল্য সচেতনতার শক্তির জন্য আমরা নিজেদের অস্তিত্বকে চিনতে পারি, বুঝতে পারি তোমার ও মহাবিশ্বের ভেতরে আমাদের প্রকৃত অবস্থান। এখন আমরা আর অজ্ঞের মতো মনে করি না যে, আমরা মহাবিশ্বের প্রভু। আমরা জানি, মহাবিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ক্ষুদ্র, প্রায় তুচ্ছ; তবু আমাদের মন সেই মহাবিশ্বের অসংখ্য জগৎকে ধারণ করতে সক্ষম। আমরা জানি, আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, তবুও আমরা একে দেখি মহাবিশ্বের অসংখ্য বিস্ময়ের এক অনন্য প্রকাশ হিসেবে। আমরা জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়েছি, এবং ধীরে ধীরে আবিষ্কার করেছি বাস্তবতার সত্য স্বরূপ, যে বাস্তবতায় নেই কোনও জন্ম বা মৃত্যু, নেই কোনও অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব, নেই বৃদ্ধি বা ক্ষয়, নেই সম্পূর্ণ সমতা, নেই সম্পূর্ণ ভিন্নতাও। আমরা উপলব্ধি করছি যে, একের মধ্যেই সব নিহিত, বৃহত্তম সত্তাও ক্ষুদ্রতমের মধ্যে অবস্থান করে, এবং ধূলিকণার প্রতিটি কণাতেই সমগ্র মহাবিশ্ব বিরাজমান। এই আন্তঃঅস্তিত্বের অন্তর্দৃষ্টির আলোয় আমরা তোমাকে ও আমাদের পিতাকে আরও গভীরভাবে ভালোবাসতে শিখছি, এবং একে অপরকেও ভালোবাসতে শিখছি। আমরা জানি, এই অদ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গিই আমাদের সকল ভেদবুদ্ধি, ভয়, ঈর্ষা, ঘৃণা ও হতাশাকে অতিক্রম করতে সাহায্য করতে পারে।
শাক্যমুনি বুদ্ধ ছিলেন তোমারই সন্তান, যিনি বোধিবৃক্ষের তলে পূর্ণ জাগরণ অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই পৃথিবীই আমাদের প্রকৃত ও একমাত্র নিবাস; ওই স্বর্গ, সমগ্র মহাবিশ্ব, এমনকী চরম সত্যের পরম মাত্রাকেও তোমার সান্নিধ্যেই, এইখানেই স্পর্শ করা যায়। প্রিয় মা, আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, অসংখ্য জন্মজন্মান্তর ধরে আমরা তোমার সঙ্গেই থাকব। আমাদের প্রতিভা, শক্তি ও স্বাস্থ্য তোমার সেবায় নিবেদন করব, যেন তোমার মাটির বুক থেকে আরও অসংখ্য বোধিসত্ত্ব জন্ম নিতে পারেন।
তিক নাত হান অনুবাদ
জয়দেব কর রচনারাশি
- ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৯ / জাগ্রত মানুষ || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর - May 18, 2026
- ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৮ / পিতা সূর্য, আমার হৃদয় || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর - May 9, 2026
- ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৭ / তোমার চূড়ান্ত স্বরূপ : না মৃত্যু, না ভয় || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর - May 4, 2026

COMMENTS