ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-১০ / তুমি কি আমাদের ভরসা করতে পারো? || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর

ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-১০ / তুমি কি আমাদের ভরসা করতে পারো? || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর

শেয়ার করুন:

প্রিয় পৃথিবী মা,
মানবজাতি তোমার অগণিত সন্তানদের মধ্যে কেবল একটি প্রজাতি মাত্র। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের অধিকাংশই লোভ, অহংকার ও ভ্রান্তিতে অন্ধ। আর সত্যিকার অর্থে অল্প ক’জনই তোমাকে আমাদের মা হিসেবে চিনতে সক্ষম। এই সত্য উপলব্ধি করতে না পারার দরুন আমরা তোমার অনেক ক্ষতি করেছি। তোমার স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য করেছি বিপন্ন। আমাদের বিভ্রান্ত মন তোমাকে শোষণ করতে আমাদেরকে উসকে দেয় এবং ক্রমাগত আরও বেশি বিভেদ ও অশান্তি সৃষ্টি করে। এর ফলে তুমি ও তোমার বুকে জন্ম নেওয়া সকল প্রাণ আজ ক্লান্তি, চাপ ও যন্ত্রণায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। তবুও গভীরভাবে তাকালে আমরা এটাও বুঝতে পারি, আমাদের করা সমস্ত ক্ষত ও ধ্বংসকে ধারণ করে রূপান্তরিত করার মতো অপরিসীম ধৈর্য, অসামান্য সহিষ্ণুতা এবং অফুরন্ত রূপান্তরের শক্তি তোমার মধ্যে বিদ্যমান। আর যদি সে রূপান্তর-প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি বছর সময় লাগেও তারপরও তুমি পিছপা হও না।

লোভ ও অহংকার আমাদের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদার সীমা ছাড়িয়ে গেলে সহিংসতা ও অপ্রয়োজনীয় ধ্বংসযজ্ঞ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। আমরা জানি, যখন কোনও প্রজাতি অস্বাভাবিক দ্রুততায় বিকাশ লাভ করে এবং তার স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে, তখন অনিবার্যভাবে সৃষ্টি হয় ক্ষতি ও বিপর্যয় এবং অন্য প্রজাতির অস্তিত্বও হয়ে পড়ে বিপন্ন। প্রকৃতির ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের জন্য তখনই উদ্ভূত হয় নানা কারণ ও পরিস্থিতি, যা শেষ পর্যন্ত সীমা অতিক্রম করা প্রজাতির ধ্বংস ও বিলোপ ডেকে আনে। অনেক সময় এই ধ্বংস বাইরের কোনও কারণ ও পরিস্থিতির জন্য ঘটে না বরং তা সাধিত হয় সেই প্রজাতির নিজেদের ভেতর থেকেই। আমরা জানি, যখন আমরা নিজেদের প্রজাতি কিংবা অন্য কোনও প্রজাতির জীবের প্রতি সহিংসতা চালাই, তখন মূলত আমরা নিজেদের প্রতিই সহিংস হয়ে উঠি। আর যখন আমরা সকল জীবকে রক্ষা করতে শিখি, তখনই আমরা সত্যিকার অর্থে নিজেদের রক্ষা করতে শিখি।

আমরা বুঝি যে, সবকিছুই অনিত্য এবং কোনও কিছুরই আলাদা স্বতন্ত্র স্বরূপ নেই। তুমি আর পিতা সূর্য মহাবিশ্বের অন্য সব কিছুর মতোই ক্রমাগত পরিবর্তনশীল; তোমার অস্তিত্ব গঠিত হয়েছে অসংখ্য “তুমি-নও” উপাদান দিয়ে। এই কারণেই আমরা জানি, চূড়ান্ত সত্যের স্তরে তুমি জন্ম ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বে, অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের সকল সীমার বাইরে। তবুও, প্রিয় মা, আমাদের দায়িত্ব তোমাকে রক্ষা করা, তোমার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, যাতে তুমি এই সুন্দর ও মূল্যবান রূপ নিয়ে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারো। তা কেবল আমাদের সন্তান-সন্তদিরদের জন্য নয়, বরং তা আগামী পাঁচশ মিলিয়ন বছর এবং তারও বহু দূরের ভবিষ্যতের জন্য। আমরা তোমাকে রক্ষা করতে চাই, যাতে তুমি আলো, সৌন্দর্য ও জীবনের চিরন্তন প্রতীক হিসেবে সৌরজগতের বুকে দীপ্তিমান রত্ন হয়ে যুগের পর যুগ টিকে থাকতে পারো।

আমরা জানি, তুমি চাও, আমরা যেন এমনভাবে জীবনযাপন করি, যাতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসা অনুভব করতে পারি এবং জাগিয়ে তুলতে পারি মননশীলতা, শান্তি, স্থিতি, করুণা ও ভালোবাসার শক্তি। আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার এই আকাঙ্ক্ষা আমরা পূরণ করব এবং তোমার ভালোবাসার ডাকে সাড়া দেব। আমাদের গভীর বিশ্বাস, এই শুভ শক্তিগুলোর বিকাশ ঘটিয়ে আমরা পৃথিবীর দুঃখ কমাতে সহায়তা করতে পারব এবং হিংসা, যুদ্ধ, ক্ষুধা ও রোগব্যাধি থেকে জন্ম নেওয়া যন্ত্রণা লাঘবে অবদান রাখতে পারব। আমাদের নিজেদের দুঃখ লাঘব করার মধ্য দিয়েই আমরা তোমার দুঃখ লাঘব করব।

 

প্রিয় মা,
এমন অনেক সময় এসেছে যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে আমরা গভীরভাবে কষ্ট পেয়েছি। আমরা জানি, যখনই আমরা কষ্ট পাই, তখন তুমি আমাদের মধ্য দিয়েই তোমার কষ্ট অনুভব করো। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি তোমার শাস্তি নয়, তোমার ক্রোধের প্রকাশও নয়। এগুলো এমন কিছু প্রাকৃতিক ঘটনা, যা সময়ে সময়ে ঘটতেই হয়, যাতে করে প্রকৃতির ভারসাম্য পুনরুদ্ধার হয়। উল্কাপাতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য কখনও কখনও কিছু প্রজাতিকে ক্ষতি ও বিলোপের বেদনা সহ্য করতে হয়। হে প্রিয় মা, সেই মুহূর্তগুলোতে আমরা তোমার দিকেই ফিরে তাকিয়েছি এবং জিজ্ঞেস করেছি যে, আমরা তোমার স্থিতি ও করুণার উপর ভরসা রাখতে পারি কি না? তুমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দাওনি। পরে অপরিসীম মমতায় আমাদের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিয়েছ, “হ্যাঁ, অবশ্যই, তোমরা তোমাদের মায়ের উপর নির্ভর করতে পারো। আমি সবসময় তোমাদের পাশে থাকব।” কিন্তু তুমি আবার এও বলেছিলে, “প্রিয় সন্তানরা, তোমাদের নিজেদেরই নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করতে হবে, তোমাদের মা পৃথিবী কি তোমাদের উপর নির্ভর করতে পারে?”

প্রিয় মা, আজ আমরা তোমাকে আমাদের দৃঢ় প্রত্যুত্তর জানাই, “হ্যাঁ মা, তুমি আমাদের ওপর ভরসা রাখতে পারো।”


তিক নাত হান অনুবাদ
জয়দেব কর রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you