
০৫.
ভোরের হাওয়ায় কে যেন কাচগুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়েছে। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে ত্বকমাংস ভেদ করে ওই কাচগুঁড়ো হাড়ের একেবারে ভিতরে ঢুকে যেতে চায়। এতে করে আপাদমস্তক কেঁপে ওঠে। খুব বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না এ-রকম কাঁপন সহ্য করে।
আজ প্রথমবারের মতো একা একা বাসার বাইরে গেলাম। গাড়ির আয়েশি আয়োজন পাশ কাটিয়ে পদব্রজে। হাওয়ারা হেলছেদুলছে। সকালের ওই কাচকাচ অনুভূতি আর টের পাওয়া গেল না। নানা রঙের মানুষের মিছিল। কিন্তু সবাই যেন নির্জনতা উপভোগ করতেই বের হয়েছে। সবার হাতেই কিছু না কিছু রয়েছে। কুকুর নইলে বাচ্চা। তুষার সাথে আলাপ অঞ্চিত খুব উপভোগ করে। বলে বসলো—
‘কুত্তারবাচ্চা ইজ আ ব্যাড ওয়ার্ড’…
আমি হাসতে হাসতে মারা যাই শুনে, আমি বলেছি কুত্তা কিংবা বাচ্চা এই দুই জিনিস নিয়ে এরা বের হয়। অঞ্চিত ভেবেছে আমি বলেছি—
‘কুত্তার বাচ্চা!’
পায়ের নিচে বাজে মর্মর। রাশি রাশি মৃত পাতা পদশব্দে ভেঙেচুরে যায়। মেইপল বৃক্ষদের ছায়াঘন পাতায় ওই মৃতেরা বিন্দুমাত্র ফাঁকফোকর রাখে নাই।
বয়সী মেইপলের পাতার রঙ বেগুনী। যারা কচিকচমা তাদের পাতা সবুজে ভরপুর ও ঘনত্ব কম। বয়সী মেইপলের পাতা পুরুট। অনেকটা রাবারপ্ল্যান্টের পাতাদের মতো। আচ্ছা, এত বিপুল পাতার ভার বয়ে এরা কী করে এতটা সটান থাকে! কাণ্ড চারফুট লম্বা হতে না হতেই মেইপল মেলে দেয় আট বাহু। যেন এই পৃথিবীকে আলিঙ্গন করতে চায়। নিবিড় আলিঙ্গন ছাড়া বাঁচা অর্থহীন। আমিও তাই-ই মনে করি। অথচ আমাকে আলিঙ্গন দেয়ার মতো মানুষ সংখ্যায় কমতে শুরু করেছে। এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
তীব্র প্রেম মুছে দিয়ে চলে যাওয়া শেষ প্রেমিকটিকে আমি হয়তো কোনোদিনই আলিঙ্গন করতে পারব না।
ভালোবেসে দেখিয়াছি ছেলেমানুষেরে…
ঘাসগুলি কে রোজ যত্ন করে ছেঁটে দেয় এখানে? কাউকে তো দেখি না এ কাজ করতে। তবুও কী সাজানোগোছানো লন। যেখানেসেখানে রয়েছে মাটির ঢিবি, সেসব তেমনি রেখেই সেজে উঠেছে এই শহর! এমনকি একটা গাছকেও কোথাও রোপন করে বা ছেটেছুটে কৃত্রিম সৌন্দর্যের বড়াই এরা করতে চায় নাই।
হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খাই এক শ্বেত রূপসীর সঙ্গে।
অঞ্চিত হেসে বলে—‘হাই। ইটস মাই গ্র্যান্ডমাদার’…
এই লন্ডন সিটিতে যার সাথেই দেখা হয়, অঞ্চিত তাকেই বলে আমি ওর কী হই। এই আনন্দবার্তা ও সবার সাথেই শেয়ার করতে চায়।
শ্বেত রূপসী বলে, ‘ইয়োর গ্র্যান্ডমাদার ইজ টু ইয়াং’…
বলেই আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। আমিও হাসি।
বলে, ‘আই অ্যাম এইটি নাউ’…
আমি হাত মিলিয়ে বলি, ‘কনগ্র্যাচুলেশন্স!’
‘আই অ্যাম গ্রিক। আই কেম হেয়ার ফ্রম গ্রিস বিফোর সিক্সটি ইয়ার্স।’
তারপর বলে, ওর দুইটা ছেলে। ও একা থাকে। আমাদের বিল্ডিঙের ৫/১০-এ।
আর আমরা ১০/ ১০০২।
আমরা ১০ তলা আর ও ৫ তলায়। আমি নাম জানতে চাই। ও ‘লিসা’।
এদিকে আমার নাম নিয়ে পড়ে বিভ্রাটে। কিছুতেই ‘পাপড়ি’ বোঝে না লিসা।
আজম খানের পাপড়ি কিছুই বুঝত না। আর এখানে লিসা বোঝে না পাপড়ি কি জিনিস!
আমি বলি, ‘প্যাটল। অ্যা পার্ট অব ফ্লাওয়ার।’
লিসা খুব মজার উচ্চারণে বলে—পাপাড়ি?
অঞ্চিতও আমাকে বলে—পাপাড়ি রামান।
অঞ্চিতর ব্রিটিশ এক্সেন্ট শুনতে ভারি ভালো শোনায়।
লিসা বলে, ‘আগামীকাল এসো।’
সন্ধ্যা নামেনি তখনও। বলে, ‘গুডনাইট।’
আমি লিসাকে বলতে চাই—
সন্ধ্যা নামিলো শ্যাম তোমারও আশায়…
লিসার সাথে আরও কথাবার্তা হয়। যেমন ও আমাকে বলেছে ওর ছেলে আমার বয়সী, তাই ও আমার মা। আমি বলেছি, ‘না। তুমি আমার ফ্রেন্ড!’
শুনে ও আনন্দিত হয়েছে।
লিসা খুবই স্মার্ট। পরনে প্যান্ট আর স্কিনটাইট গেঞ্জি। চুল বয়কাট করা। সামান্য ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটে।
দুইকথা বলার পরই লিসা বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেছিল—ওর হাজব্যান্ড মারা গ্যাছে নয় বছর হলো।
লিসার কণ্ঠ ভেজা। যেন মেঘলা বিকেল ভর করে আছে ওর কণ্ঠে। মানুষের কণ্ঠ কেন কারো জন্য ভিজে ওঠে আমি তা জানি। স্পষ্ট করেই জানি।
চিরঘুমে মরে আছে লিসার হাজব্যান্ড। ওই লোকটাকে কেন যেন আমার ঈর্ষা হয়। ঈর্ষা হয় ওর নিবিড় ঘুমের জন্য। আরেকটি ঈর্ষা জেগে উঠতেই আমার নয়নে জমে ওঠে অশ্রু!
চিরঘুমন্ত মানুষের জন্য জাগ্রত কোনো মানুষ যদি আকুল হয়ে কাঁদে, তবে সে বড় ভাগ্যবান…
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৫ || পাপড়ি রহমান - May 22, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৪ || পাপড়ি রহমান - May 15, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৩ || পাপড়ি রহমান - May 7, 2026

COMMENTS