লিখছিলাম। বলকলম দিয়ে। এই-যে বললাম, লিখছিলাম বলকলম দিয়ে—এই বলাটা কী বাহুল্য হয়ে গেল না? আজ থেকে একযুগ দুইযুগ পেছনে গেলে এইটা বাহুল্য হতো মনে হয়;—কিন্তু বর্তমানে এ আর বাহুল্য নয়, রীতিমতো সংবাদ বটে এই জ্ঞাপন যে একটু আগে একটা বাঁশগাছের শরীর হইতে প্রস্তুত-করা কাগজপিঠে লিখছিলাম প্লাস্টিকবডি বলকলম দিয়ে। এখন কাগজে নয় স্ক্রিনে কম্পোজ করা হয় এমনকি ইথিওপিয়ার নিটাল গ্রামে বসে একটা-কোনো প্রকল্পপ্রস্তাবনা থেকে প্রেমগান। কবিতা লেখেন কবি জীবনানন্দভূমিতে বসে কিবোর্ড খটখটিয়ে ল্যাপটপ/নোটপ্যাডে, এখন এমনকি শিশুর হাতেখড়িও হয় এই কিবোর্ড ব্যবহারপূর্বক। যদিও হাতেখড়ি বিষয়টার নামের সঙ্গে জড়িত হস্ত উপস্থিত পরিবর্তিত যুগেও, খড়ি নাই, স্লেট তো বহু আগেই হাওয়া। গাওগেরামের বাচ্চারা আজকাল ইশকুলের প্রথম দিন থেকেই খাতা-কলম বগলে নেয়, স্লেট-পেন্সিল নয়।
ক্যায়া কারেগা সা’ব, জমানা বিগড় গয়ি! বিলকুল বদল গয়ি হামারা চাইল্ডহুড ডেইজ, অদ্য প্রযুক্তিস্ফীতির দিনে প্যাপিরাস ও পেন প্রায় বিলুপ্ত হতে লেগেছে, এখনকার বাচ্চারা এমনকি মিষ্টিও খায় বেছে বেছে পরিমিত। আমরা তো রসগোল্লার সার্বক্ষণিক উপস্থিতির অপ্রতুলতা হেতু বিবিধ বিকল্প বের করার ফিকিরে ব্যস্ত থাকতাম সারাদিন, ধুতুরাবিচিও মুখে ফেলতে দ্বিধা করে নাই আমার শৈশববন্ধুরা তাদের বৈজ্ঞানিক মনের প্রাবল্যে, মিষ্টতা পরখিতে হেন দ্রব্য নাই যাহা আমাদের জিভ চেখে দেখে নাই। আর টক খেতাম উপর্যুপরি দিনভর যা-ই পেতাম হাতের কাছে। বেড়ে উঠেছি বিচিত্র সব ফল খেয়ে, পাতা খেয়ে, ফুল খেয়ে খেয়ে। হ্যাঁ, আজ্ঞে, ভুল বকছিনে। এই দিনলিপির ধারাভাষ্যকার স্বয়ং অন্তত কয়েক বস্তা তেঁতুলপাতা সাবড়েছে তেঁতুলের অনুপস্থিতিসিজনে, মেটাতে তেঁতুলের স্বাদ পাতায়, একেবারে কম করে হলেও কয়েক রেকাবি জবাফুল খেয়েছি মধু চোষার লোভে। বিশেষত মরিচজবাফুল, ঝুমকোও বাদ পড়েনি ইটিঙের আওতা থেকে। এই মানবসভ্যতায় আমরাই পুষ্পখেকো-পত্রখেকো বংশের শেষ প্রজন্ম ভেবে আজকাল বেশ গর্বই হয়। এত অজস্র ফুল রয়েছে রক্তে-শিরায়-ধমনীতে মিশে, এত সবুজ-সালোক পল্লব, আমাকে ফেলে দেবে হেলায়—হেন সুন্দরী নিঠুরা আজও জন্মায়নি পৃথ্বীধামে।
একটু আগে, এই ধরো দোয়াতের কালির মতো সুগন্ধিকৃষ্ণা রাত্রির প্রথমভাগে, লিখছিলাম বলকলম দিয়ে। দেখি কী, ইয়া আল্লা, একেবারে তলানিতে কলমের কালি! কিন্তু দ্য নাইট ইজ স্টিল ইয়াং! অগত্যা…। আহা! ভালোই সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছিল কলমটা। খুব মিহি চিকন আর মসৃণ আঁক দিত। গোটা-গোটা হরফ জন্মাতো, ফুটফুটে হাঁসছানার মতো, কলমের একেক খোঁচে। এখন সব স্মৃতি হয়ে গেল। নতুন আরেকটা জুটাতে হবে, সেটাতে অভ্যস্ত হতেও সময় লাগবে, এবং কলম বাগাতে দ্বারস্থ হতে হবে কোনো সদাশয় কিবোর্ড-অভ্যস্ত অথচ কলমশৌখিন সহকর্মীর। একযুগের চাকরিজীবনে একটা কলম খরিদেরও মুরদ হলো না আমার! ভাগ্যিস, অল্প কয়েকজন গরিবদরদি সহকর্মীর সদয় সহযোগ না-পেলে এ-জীবন করুণ হয়ে উঠত কলম হারাতে হারাতে আর কলম কিনতে কিনতে!
যা-হোক, কলমের কী আদৌ কোনো গুণ আছে লেখা ভালো করার পেছনে? লেখা খারাপ হলে সেখানে থাকে নাকি কলমের কারসাজি কিংবা অসহযোগ? কলম কী লেখা ভালো অথবা মন্দ করার পেছনে কলকাঠি নাড়ে? কে জানে, হতেও পারে। সেই-যে বলে-না, হামেশা আমাদের চারপাশের লোকে বলে এমন, অমুকের কলম খুব শক্তিশালী! বা, বলে, জোর আছে জবর তমুকের কলমে! ধুর মিয়া, এইসব কথা তো অত আক্ষরিক নিতে নেই। ভাবার্থ বুঝতে হয়, বাছাধন! দুনিয়াটা ভাবের…
দুনিয়াটা ভাবের! তা না তো কী? কিংখাবের? কে জানে আব্বু, অত তত্ত্বকথা আমি বুঝি না। আমার কনশাসনেস অত ক্রিটিক্যাল না, আমি জিন্দেগি নিঃশেষ করে ফেললাম ম্যাজিক্যাল স্টেজে থেকে, পাওলো ফ্রেইরি আমাকে গুরুত্ব সহকারে সম্মান করলেও তাঁর বঙ্গপুঙ্গব চ্যালারা আমাকে নায়্যিভ বলে সেমিনারে তাচ্ছিল্য করে। এইসব নিয়াই মনের দুঃখে আমার বেঁচে থাকা আর বলকলমে মাঝেমাঝে ফরিয়াদ টুকে রাখা। আমি ভাই ফ্রেইরি বুঝি না, আর ফ্রেইরিবিধুর উহু-আহা স্তবকীর্তনীয়াদের সনে এ-জন্মে হইল না বনিবনা। আমি বুঝি বাতাসের ত্বক, বুঝি কোন বাতাস মসৃণ খুব, কোনটা-বা ভারী পারদ, কোন বাতাস সুমিষ্ট অথবা কাঁচামিঠে খরখরে। আমি ঝড়কে বলি সুন্দর বাতাসের বাও, মৃদুমন্দ হাওয়াকে ভাবি টুংটাং তবলা-প্রস্তুতি। আমি বরাহপুত্রবধু ও মিহিরপত্নী খনার দেশের মানুষ, আমি ষড়ঋতুর ধুলো ও বাতাসের গতিবিধি দেখে আবিষ্কার করি জীবনের প্রয়োজনীয় তত্ত্ব ও সূত্রাবলি, জিভ কেটে ফেলা হবে জেনেও কথা না-বলে থাকা আমাকে দিয়ে হয় না। আমি জানি, একদিন সমস্ত কোনাকানাচের বাতাস গিয়ে একটা-কোনো বড় ময়দানে জড়ো হবে। তারপর হবে সেই গ্র্যান্ড উইন্ড শো…হবে নাকি!
দিস ইজ ইট, ইয়েস! আলবৎ! এইসব লাগামছাড়া মাতাল প্রলাপের মূল্য নাই কোনো। যদি পারো, ভাবো তবে গঠনমূলক কিছু। কেন ভাই, ধ্বংসমূলক ভাবনা বুঝি নিতান্ত মূল্যহীন! সম্প্রতি দিনদুনিয়ার খোঁজতালাশ রাখেন আপনি? ইয়ে হাত মুঝে দে দো ঠাকুর! আব তেরা কেয়া হোগা রে কালিয়া! ঠিশিয়া…ঠিশিয়া…ঢিশুম-ঢিশুম…(অ্যাকশন-রিফ্লেকশন প্রভৃতির ফাঁকা আওয়াজ)। সম্প্রতি ডিসকার্সিভ আলোচনায় কিছুই প্রকাশ হয় না, সাবভার্সিভ সমালোচনা আর ভাষা ও সিন্ট্যাক্সপ্রক্রিয়া আমতা-আমতা ভরাকলসিবাদী মিটিমিটি-মুচকিহাস্যঋদ্ধ মঞ্চালোচকদের সত্যি বড় বিপাকে ফেলে দিয়েছে।
এখন, কথা হলো, গুরুর ইচ্ছায় গানবাদ্য। তবে হোক, গঠনমূলক ভাবনাই হোক, জ্বি-হুজুর জ্বি-হুজুর!…ওয়াহ-ওয়াহ! কেয়া বাত! বহৎ খুব! সোভানাল্লা! আদাব-আদাব!…শুরু হোক গুরুর খেদমতে পেশকৃত মুজরো! যেই ভাবা সেই কাজ, শুরু করে দিলাম ঝড়ের জায়গায় দখিন-পবন লিখতে। হ্যাঁ, এই তো, অ্যায়সি মাইল্ড হো-না চাহিয়ে! সেই নেসেসারি প্রুফটুকু, সুধী পাঠক ও প্রিয় সখাসখি, নিজজ্ঞানে কেটে নিয়েন!
জাহেদ আহমদ ২১ মে ২০১৩
- বলকলম - May 21, 2026
- প্রতিবর্ত সংলাপিকা - May 5, 2026
- দ্য ভিয়্যুফাইন্ডার - May 4, 2026

COMMENTS