ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৬ || পাপড়ি রহমান

ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৬ || পাপড়ি রহমান

শেয়ার করুন:

০৬.
হুডি সাথে না নিয়ে বেরোলে আজ দামাল হাওয়ার টানে নির্ঘাত উড়ে যেতাম। বাইরে বের হয়েই অনুভব করলাম হাওয়ায় কাচের গুঁড়োর পরিমাণটা আজ খুব বেড়েছে। তাই সে ঘচ করে অনায়াসে বিঁধে যাচ্ছে ত্বকের ভিতর। এই হাওয়ার টান শ্রাবণের ভরা নদীতে ভাসমান অবস্থায় যে-রকম তীব্রভাবে অনুভূত হয়, ঠিক তেমনি।

চারপাশে মানুষজন নেই বললেই চলে। মানুষ নেই তাতে কী? আছে কাঠবিড়ালিদের নির্ভার বিচরণ। কী নির্ভীক ওরা! আমি ক্যামেরা তাক করতেই আমাকে দেখার বাসনায় নাকি পোজ দেয়ার সদিচ্ছায় লেজ নাড়িয়ে মুখ ব্যাদান করে কত কান্ডই না করল! এদের গায়ের রঙ বেশিরভাগেরই মিশমিশে কালো। দুই-একটা গাঢ় বাদামী, হালকা বাদামী উঁকি মেরেই গেল মিলিয়ে। রেখে গেল ওদের ফুলোফুলো লেজের নান্দনিক অঙ্গভঙ্গি।

পাতারা ঝরছে অবিশ্রাম। মেইপল আর সজনে নাকি? বাংলাদেশের সজনেপাতাদের মতো বিছিয়ে আছে গোলাকার হলদেটে পাতার স্তূপ। তবে সজনেপাতা হয় ছোট ছোট। আর মেইপলপাতা হাতের তালু বা তালুর মাপ ছাড়িয়ে আরও খানিকটা জায়গা নিয়ে নিজেদের মেলে দেয় পরিপক্ব হলে।

আকাশের গায়ে নানারকম করে মেঘেদের জ্যামিতিক নকশা কাটা। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এই দেশে বুঝি মেঘেরাও জ্যামিতি জানে? কী জানি, জানতেও পারে। অবিশ্বাস করি কী করে?

শীতের পুকুরের মতো শান্ত হয়ে থাকা বাড়িগুলি ধীর পায়ে পেরিয়ে আসি। পেরোতে পেরোতে থমকে দাঁড়াই। চারপাশকে সুন্দর করে তোলার কী দারুণ ইচ্ছা এদের! বাড়িগুলি যে বহুকালের পুরাতন সে-রকম কিছু বোঝা যায় না। ফুল আর গাছ আর আলো দিয়ে সযতনে সাজিয়ে রাখা। শীতেও মোটামুটি সতেজ-শক্ত থাকবে এরকম কণ্টকপর্ণী গাছের আধিক্য। আদতে এই শহরের সবখানেই যতন। হয়তো এই শাদারা জানে, যতনেই শুধু মেলে রতন।

নওল কিশোরেরা সামারড্রেস পরে কী দিব্যি হেঁটে যাচ্ছে! অধিক বয়সী দুই যুগলের গায়ে বদমেজাজি হাওয়াকে আটকে দেবার পোশাক।  এদের হাতে ধরে রাখা কুকুরের গলার চওড়া বেল্ট। বেল্টের শেকলবন্দীরা বান্দরমুখো বা বিড়ালমুখো। ওদের লাগাতার ঘেউঘেউ। হাতে ধরে রাখা বেল্ট থেকে মুক্তির আশায় ওরা হয়তো আরও জোরেশোরে ঘেউঘেউ জুড়ে দেয়। আমি সভয়ে পাশ কাটাই। অন্যের পোষ্যকে বিশ্বাস করি কোন সাহসে? যেখানে নিজের পোষ্যরাই বিট্রেয়াল চিরকাল!

এখানে আসার পরপরই চপিংবোর্ডের ওপর ছুরি পিছলে গিয়ে বাম হাতের মধ্যমা কেটে জেরবার অবস্থা হয়েছিল। এই কাটা মানে কী আর যেইসেই কাটা নাকি? আঙুলের মাথায় একটুকরা মাংস ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে টিটেনাস নিতে হয়েছিল। তবে যে ডাক্তার আমার কেটে যাওয়া আঙুলের চিকিৎসা করেছিল, তাকে আমরণ ইয়াদ রাখতে হবে। দীর্ঘদেহ, টিকালো নাক, নীলাভ নয়ন, মোলায়েম শাদা রঙে ভারি খুবসুরুত চেহারা। ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে তার দারুণ স্মার্ট লুক। আমার পরনের শার্টের হাতা গুটিয়ে নিয়ে আলগোছে ফুটিয়ে দিয়েছিল সুঁই। আচ্ছা, সবদেশেই বুঝি টিটেনাসের ইঞ্জেকশন দেয়া হয় একেবারে ফুল ঝরে পড়ার কায়দায়? লাইফে পয়লাপরথম টিটেনাস নেয়া অনভিজ্ঞ আমি জানব কী করে? ওই ডাক্তারের সাথে ফের মোলাকাত হবে এ-রকম নিশ্চয়তা থাকলে বান্দরমুখো বা বিড়ালমুখোদের আক্রমণকে স্বাগত জানানো যেত। কিন্তু নিশ্চিত কিছুই নয় জেনেও নতুন করে পাগল কে বনতে চায়? কেইবা জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার রিস্ক নিতে চায়? ফলে বিড়ালমুখো আর বান্দরমুখো সারমেয়র দলকে আমি সন্তর্পণে পাশ কাটিয়ে যাই।

এখানে যেন কোনো পথের শেষ নাই। পথ এখানে ফুরায় না। কিন্তু হারিয়ে যায়। এক পথ হারিয়ে যায় অন্য পথের মাথায় বা লেজে। কিছু কিছু পথ কোমর বাঁকিয়ে উঠে গেছে আকাশ-অভিমুখে। হয়তো ওদের মেঘদল স্পর্শ করার বাসনা রয়েছে। কিংবা মেঘেদের সাথে মিশে গিয়ে মেঘ হয়ে ঝুলে থাকবার মনোবাঞ্ছায় ওইসব পথ আকাশমুখী হয়েছে। আমি কী করে জানব পথেদের মনের খবর? আমি কি কোনোদিন জানতে পেরেছি মানুষের মনের আসল খবর? জানতে তো পারি নাই!

০১ অক্টোবর ২০২৫


ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you