টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার বেরিবাইদ ইউনিয়ন ৫ নং ওয়ার্ডের জাঙ্গালিয়া গ্রাম। জলছত্র ২৫মাইল বাজার হতে পূর্বদিকে কাঁচা রাস্তা ধরে এগোলেই শালবন। আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, দুপাশে সারি সারি জারুল, সেগুন আর শাল গজারির বন। চারদিক সুমসাম নীরবতা, পাখপাখালির গান। কিছুদূর হাঁটলেই মন জুড়িয়ে আসে। এই সবুজে বাঁচে জাঙ্গালিয়া উত্তরপাড়ার পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ। এখান থেকে ডাক্তার দেখাতে হাবি নামে একজন লোক আসে। তাকে আমি চাচা বলে ডাকি। মাঝে মাঝে আসতে আসতে তার সাথে সখ্য গড়ে ওঠে৷। হাবিচাচাকে সবসময় দেখে আসছি সাদা পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরিধান করতে। তিনি তার পাঞ্জাবির নাম রেখেছেন জয়নিশানা। অথবা কোথাও এই নামে কোনো পাঞ্জাবির নাম নেই। হয়তো তার কাছেই সত্যের মতো মিথ্যে পুড়ছে।
হাবিচাচার যেহেতু আদা, কলা, আনারস আরও কি কি জানা নাই এইসবের বাগান আছে। তাই একদিন তাকে আমি বললাম—চাচা, আমারে কিছু আদা দিয়েন।
বলল—আদা তো এখন কাঁচা আছে, একটু শুকিয়ে দিতে হবে। কারণ কাঁচা আদা বেশিদিন টিকবে না।
আমিও বললাম—ঠিক আছে, দিয়েন।
তারপর একদিন তিনি প্রায় তিনকেজির কাছাকাছি আদা নিয়ে আসলেন। আমাকে দিলেন। এরপর ডাক্তার দেখিয়ে বের হয়ে যাবার সময় আমার কাছ থেকে ওষুধ নিলেন। ওষুধ দেয়া শেষে আমি শুধু বললাম—চাচা, আদার দাম কত? দিয়ে দেই।
সে ভীষণ রাগ করল। আমি বললাম—আমি বুঝতে পারিনি।
তারপর তাকে ‘ফুলের ফসল’ বইটা উপহার দিলাম। যেহেতু সে কবিতা ভালোবাসত।
কবিতায় আসলে দেশান্তরী হবার গল্পও আছে আবার প্রচারবিমুখ জীবনের গল্পও আছে। যেমন গৌতম বুদ্ধ আর জীবনানন্দ দাশ। কবিতা এক পৃথক আয়না। বইটা হাতে নিয়ে হাবিচাচা কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে পড়লেন। পরে বইটা বন্ধ করে আমাকে একটা গল্প বললেন। তাদের ওইখানে একজন বৃদ্ধ লোক ছিলেন যিনি সবসময় মাথায় ছাতা ধরে রাখতেন। অদ্ভুত ধরনের বলা যায়। তিনি নাকি অনেক কিছুই জানতেন কিন্তু কাউকেই কিছু বলতেন না। কিংবা শেখানোর যে-ব্যাপারটা সেটা তিনি করতেন না। তার যত কথা সব নাকি শালবৃক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলতেন।
আমিও বলি তাই—পাতাঝরা তবল, বাজাও, দৃশ্যরা বাজুক তুমুল অরণ্যশোভায়। মাঝে মাঝে এইরকম আমারও মনে করে যে কোনোকিছুই না লিখি। নিজের জমানো কথাগুলো একদিন এইভাবে বৃক্ষের কাছে গিয়ে বলে আসি। মনে হয় একবার সত্যচরণ হয়ে দেখি—বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘আরণ্যক’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র সত্যচরণ, যে কিনা অরণ্যের বৃক্ষের সাথে মনে মনে কথা বলত। আবার মনে হয়—টিম নোলসের মতো হতে, যে কিনা বৃক্ষের সাথে কোনোকিছু না লিখে, বরং গাছের ডাল দিয়ে ছবি বা ছাপ এঁকে নিজের শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তুলত।
হতে পারি না কিছুই, কিছুই না হওয়ার ভেতর মানুষের অত্যন্ত নিকটে গিয়ে দেখেছি—মানুষের রয়েছে আপন করার কত অধিকার। আজ ঈশানে শুকতারা পড়ে আছে যেন দূরের কোনো মুদ্রিত গ্রামে। স্বপ্ন দু-চোখে আমার। তবুও স্বপ্নের মধ্যে বনটিয়াদের বলতে পারছি না—পাতার রঙ সবুজ কেন?
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- বনটিয়ার গলাকাটা গান || শুভ্র সরকার - May 29, 2026
- যে গান ছোট হয়ে আসে || শুভ্র সরকার - May 24, 2026
- পাখিদের মৃত্যু আকাশ নেয় না, মাটিকেই নিতে হয় || শুভ্র সরকার - May 20, 2026

COMMENTS