মানুষ ও যন্ত্রের ভবিষ্যৎ || আহমদ সায়েম

মানুষ ও যন্ত্রের ভবিষ্যৎ || আহমদ সায়েম

শেয়ার করুন:

ক্ষমতা বলেন, শাসনব্যবস্থা বলেন কিংবা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন—সবকিছুর ভেতরেই মানুষের ইচ্ছার একটি গোপন ভূমিকা থাকে। আমরা যা মেনে নিই, তা-ই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়; আর যা প্রত্যাখ্যান করি, সেটিও কোনো-না-কোনোভাবে ইতিহাসে থেকে যায়। পৃথিবীতে আজ যে প্রযুক্তিগত বাস্তবতা দাঁড়িয়ে গেছে, তা হঠাৎ একদিনে তৈরি হয়নি। মানুষের ভেতরে এই ক্ষমতা, এই নিয়ন্ত্রণ, এই কল্পনার বীজ বহু আগে থেকেই ছিল।

হাজার বছর আগেও মানুষ সময়কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে—স্মৃতির ভেতর দিয়ে, ভবিষ্যৎ কল্পনার ভেতর দিয়ে। শতবর্ষী কোনো বৃদ্ধ তার বাল্যকালের গল্প বলতে পারতেন, আবার অনাগত দিনের ভয় কিংবা স্বপ্ন নিয়েও ভাবতে পারতেন। অর্থাৎ মানুষের ভেতরে “আগে” ও “পরে” দেখার যে মানসিক প্রযুক্তি, তা সবসময়ই ছিল।

আজ ২০২৬ সালে এসে প্রযুক্তি সেই চিন্তাশক্তিকেই যেন বাহ্যিক রূপ দিয়েছে। আমাদের হাতের বানানো যন্ত্র এখন আমাদের ভাবনাকেও আপডেট করে দিচ্ছে। আমরা যা একসময় কেবল কল্পনা করতাম, এখন তা চোখের সামনে ঘটতে দেখি।

এই আপডেটকে মেনে নেব কি নেব না—তা হয়তো আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা হতে পারে। অনেক কিছু আমি বুঝি না, ধরতেও পারি না। কিন্তু তাতে পৃথিবী থেমে থাকে না। থাকার কথাও নয়।

সময়কে নিতে পারলে আমরা সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যাই। আর নিতে না পারলে! তখন উন্মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে কথা বলি। গণতান্ত্রিক পৃথিবী অন্তত সেই সুযোগটুকু এখনো দেয়। দশজনের একজন হয়তো আপনার পক্ষে কথা বলবে, আপনার ভয়কে সত্যি বলবে। তারপরও পৃথিবী এগিয়ে যাবে তার নিজের গতিতে।

আমাদের প্রজন্ম “না” শব্দটার সঙ্গে খুব পরিচিত। কতকিছুর বিরুদ্ধেই ‘না’ বলতে বলতে একসময় মানুষ দাঁড়িয়েছে! এখন দেখি, সেই “না” বলা মানুষগুলোর অনেকে আবার সেই নতুন ব্যবস্থাকেই ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন। খারাপ লাগে না, বরং হাসি পায়। মনে হয়—এই স্বীকারোক্তিটা যদি আরও দুই বছর আগে আসত, তাহলে হয়তো আজকের এই হাসিটাও অন্যরকম হতো।

জীবন এমনই। কেউ শুনে বদলায়, কেউ দৃশ্য দেখে বদলায়, কেউ রূপান্তর দেখে কৌশল বদলায়—তবু মুখে স্বীকার করে না। কেউ স্বেচ্ছায় নতুনকে গ্রহণ করে, আবার কেউ সময়ের চিত্র দেখার পর প্রদর্শনীর নাম বদলে দেয়।

আমি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—অ্যাআই—নিয়ে কথা বলছি।

নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ৩৫তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনের একটি সেমিনারকে ঘিরে এই ভাবনার শুরু। কথাসাহিত্যিক পারমিতা হিমের সঞ্চালনায় ‘কলম ও কৌতূহল’ শিরোনামের একটি আলোচনা আয়োজন হয়েছিল। অতিথি ছিলেন রাজু আলাউদ্দিন, দীপেন ভট্টাচার্য, আশরাফ কায়সার এবং সাদাত হোসাইন। সকলেই লেখক। সকলেই বাংলা ভাষার লেখকতায় নিযুক্ত।

সেদিনের আলোচনা কেবল প্রযুক্তি নিয়ে ছিল না; বরং মানুষ তার নিজের সৃজনশীলতা হারাবে কি না—সেই গভীর ভয়, দ্বিধা ও সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে এসেছিল।

পারমিতার প্রশ্ন ছিল—“সৃজনশীল লেখাপত্রে অ্যাআই কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?”

দীপেন ভট্টাচার্য বললেন, যারা এখনো অ্যাআই ব্যবহার করেননি, তারা হয়তো বুঝতেই পারছেন না এটি কত ভয়ঙ্করভাবে সহায়তা করতে পারে। একবার কেউ যদি এর কাছ থেকে এক-দুই লাইনও নেয়, তারপর তা থেকে দূরে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। নেশার মতো টেনে রাখবে।

রাজু আলাউদ্দিন বিষয়টিকে দেখলেন অনুবাদের ভেতর দিয়ে। তিনি বললেন, অনুবাদ কেবল ভাষান্তর নয়; এটি গভীরভাবে সৃজনশীল একটি কাজ। ভাষার শরীরের ভেতরে যে অনুভূতি, সংস্কৃতি, নিঃশ্বাস, ছায়া—তা কি যন্ত্র সত্যিই ধরতে পারবে?

তিনি জেমস জয়েসের উদাহরণ টেনে বললেন, কিছু কিছু অনুভূতি মানুষের পক্ষেই প্রকাশ করা সম্ভব। যন্ত্র হয়তো বাক্য গঠন করতে পারবে, কিন্তু অনুভূতির অন্তর্গত কম্পন কি সত্যিই ছুঁতে পারবে?

দীপেন ভট্টাচার্য সঙ্গে সঙ্গে বললেন—“অ্যাআই সেই জায়গাটাও অলরেডি ছুঁয়ে ফেলেছে। এখনই যা দেখছি, সামনে আরও অনেক দূর যাবে।”

সাদাত হোসাইন কথাটিকে অন্যভাবে দেখলেন। তিনি বললেন, অ্যাআই থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজে লেখায় সময় দেন, কারণ তিনি লেখাটাকে ভালোবাসেন। কিছু মানুষ তার কাছে পৌঁছায় শুধুই তার লেখার জন্য।

তারপর তিনি খুব সাধারণ অথচ অসাধারণ একটি উদাহরণ দিলেন।

তিনি বললেন, ছোটবেলায় গ্রামে তারা আউশ বা আমন ধানের ভাত খেতেন। ঘরের মুরগি লাল ডিম দিত। পরে এল ব্রয়লার মুরগি, সাদা ডিম, চকচকে বাজার। মানুষ খুব দ্রুত সেদিকে ঝুঁকে পড়ল। দেশি জিনিস কম দামে ছেড়ে দিয়ে সবাই নতুন জিনিস কিনতে শুরু করল।

কিন্তু দীর্ঘ সময় পরে কী হলো?

মানুষ আবার “অরগানিক” শব্দটার দিকে ফিরল। আবার দেশি ডিম, কালো গুড়, পুরনো ধানের চাল—এসবের মূল্য বাড়তে লাগল।

সাদাত হোসাইন বললেন, “অ্যাআই হয়তো অনেক দূর পৌঁছাবে। কিন্তু একটা সময় মানুষ আবার দোকানে গিয়ে খুঁজবে—সাদাত হোসাইনের আসল বইটা আছে?”

এই কথাটার ভেতরে এক ধরনের গভীর মানবিক বিশ্বাস ছিল। যেন মানুষ শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই ফিরবে।

আশরাফ কায়সার আলোচনাটিকে আরও ব্যক্তিগত জায়গায় নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, “আমি দেরি করে এলাম, পারমিতার সঙ্গে কথা বললাম, আপনাদের সামনে এসে যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করলাম—এটা কি অ্যাআই করতে পারবে?”

হয়তো পারবে না। অন্তত এখনো না।

কারণ মানুষের ভেতরে কেবল তথ্য থাকে না; থাকে সংকোচ, দ্বিধা, ভুল, ঘাম, হাসি, চোখের ভাষা—যা কোনো যন্ত্রের পক্ষে পুরোপুরি ধারণ করা এখনো সম্ভব হয়নি।

দীর্ঘ সময় ধরে সেই বিতর্ক চলল। দর্শকরাও যুক্ত হলেন। সাহিত্য, প্রযুক্তি, অনুভূতি, ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে আলোচনা যেন ধীরে ধীরে মানুষের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করল।

বাইরে বেরিয়েও আলোচনা থামেনি। আবার কুলদা রায় ও দীপেন ভট্টাচার্যকে একই টেবিলে পেয়ে অ্যাআই প্রসঙ্গেই নতুন তর্ক শুরু হলো।

কোন কোন জায়গায় অ্যাআই ভয়ঙ্কর দক্ষ হয়ে উঠছে, সে-বিষয়ে দীপেন ভট্টাচার্য অনেক ইতিবাচক দিক তুলে ধরলেন। আমি খুব গভীরভাবে বিষয়টি বুঝি না, তাই চুপচাপ শুনছিলাম।

হঠাৎ কুলদা রায় একটি কবিতাকে অ্যাআই দিয়ে গান বানিয়ে শোনালেন। খুব-একটা ভালো লাগেনি। কারণ সেখানে সুর ছিল, কাঠামো ছিল, কিন্তু যেন আত্মার কিছু অনুপস্থিতি ছিল।

কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা আমাকে সত্যিই বিস্মিত করল।

টেবিলে রাখা একটি বইয়ের এক পৃষ্ঠার ছবি তুলে তিনি অ্যাআইকে বললেন সেটি কম্পোজ করে দিতে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর প্রায় নির্ভুলভাবে পুরো লেখাটি টাইপ হয়ে গেল।

আমি থমকে গেলাম।

কারণ এই একটি কাজই বহু মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিয়ে করে থাকেন।

মনে হলো, ঘরে ফিরে আমিও চেষ্টা করব। যদি সত্যিই করা যায়, তাহলে আজকের দিনের জন্য সেটি বিশাল এক শিক্ষা হবে।

তারপর তিনি আমার একটি ছবি তুলে সেটিকে অ্যাআই দিয়ে পেন্সিল স্কেচ, জলরঙের ছবি এবং ভাস্কর্যের আদলে রূপান্তর করে দেখালেন। দেখতে সত্যিই অসাধারণ লাগছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এক ধরনের ভয়ও জন্ম নিচ্ছিল ভেতরে।

আমার পেইন্টার বন্ধুদের কী হবে?

যারা দিনের পর দিন সময় নিয়ে একটি ছবি আঁকেন, একটি প্রচ্ছদ তৈরি করেন, একটি মূর্তি গড়েন—তাদের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

আমরা যারা এখনো শব্দ নিয়ে বাঁচতে চাই, অনুভূতির কাছে ফিরে যেতে চাই—আমাদের অবস্থাই-বা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আগামী দিনে?

প্রযুক্তি মানুষকে সাহায্য করে—এ কথা সত্য। কিন্তু কোনো একসময় যদি প্রযুক্তি মানুষকেই অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে শুরু করে, তখন কি আমরা কেবল বিস্মিত হবো? নাকি ভয়ও পাবো?

মেলা থেকে বের হওয়ার আগে দেখা হয় ড. ইবরুল চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন সাংবাদিক শামিমভাইয়ের সঙ্গে। এর আগে দেখা হয়েছিল প্রফেসর ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ এবং ড. ফাতেমা আহমেদের সঙ্গেও।

বৃষ্টি তখনো থামেনি।

রাত গভীর করে নিউইয়র্ক থেকে ফিলাডেলফিয়ায় ফিরতে ফিরতে প্রায় দুইটা বেজে যায়। গাড়ির কাচ বেয়ে বৃষ্টির পানি নেমে আসছিল, আর আমার ভেতরে একই প্রশ্ন ঘুরছিল বারবার—বইমেলার এই আড্ডাগুলো, মানুষের এই মুখোমুখি বসা, চায়ের কাপে জমে থাকা সাহিত্য, তর্ক, অনুভূতি—এসব কি কোনোদিন সত্যিই যন্ত্রের কাছে হার মানবে?

নাকি মানুষ শেষ পর্যন্ত মানুষকেই খুঁজে নেবে—সব প্রযুক্তির পরেও?

মে ২০২৬


আহমদ সায়েম রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you