এই বছর আমার দেখা সেরা ছবি অ্যাপেক্স। থ্রিলার মূলত। গল্পের প্লট যে খুব নতুন, তা না। কিন্তু প্লটটা যেই দৃশ্যায়নের ভিতর উপস্থাপন করা হইছে, ওইটা খুবই ইন্টারেস্টিং অ্যান্ড আই-ব্লেসিং। ট্রাভেলিং, হাইকিং যেহেতু আমার প্রিয়, আমার মনের সমস্ত খেয়ালে এই মুভির সব সিন মিইশা গেছে পোলার দ্রবণের মতো।
ওকে। আর কী আছে এই মুভিতে? শার্লিজ থেরন। ম্যাডম্যাক্স ফিউরি রোডের ওই ধারালো, প্রতিশোধস্পৃহায় সমাহিত, মায়াবী চোখ যার, সে। মুভিতে তার চরিত্রের নাম সাশা।
সিনেমার শুরুতে সাশারে দেখা যায়, নরওয়ের এক দুর্গম গিরিতে বেটার-হাফের সাথে ভয়ঙ্কর রক-ক্লাইম্বিং করতেছে। সেইখানে আচমকা এক দুর্ঘটনায় মানসিকভাবে বিধ্বস্ত সাশা অস্ট্রেলিয়ায় চইলা আসে। এইবার ঠিক খাড়া পাহাড়ে রক-ক্লাইম্বিং না—মনের ব্যথা দূর করতে সে বাইছা নেয় অস্ট্রেলিয়ার ভয়াল এক আউটব্যাক—যেইখানে পাহাড় ও জঙ্গলের মাঝে বইয়া গেছে খরস্রোতা নদী, ঝিরিপথ।
পাথরে ভরা ওই খরস্রোতা নদীতে কায়াকিং এবং পাহাড়-জঙ্গলে ঢাকা ঝিরিপথে হাইকিং কতটা প্রাণঘাতী ও কালান্তক হইতে পারে, আইসল্যান্ডের পরিচালক বালতাসার কোরমাকুর তার ক্যামেরার শৈল্পিক লেন্সে তা-ই যেন থরে থরে সাজাইয়া রাখছেন আমাদের মতো ভুখানাঙ্গা সিনেমাখোরদের জন্য। যদিও এই পরিচালক এইরকমই। তার সিগ্নেচার মুভি হইলো এইধরনের অ্যাডভেঞ্চার জন্রার মুভি।

যাদের পাহাড় ভালো লাগে, দেশ-বিদেশের অপরূপ সুন্দর কিন্তু বিপজ্জনকভাবে পিচ্ছিল ও খাড়া পাহাড় বাইতে ভালো লাগে, যাদের পাথুরে-নদীতে নৌকা চালাইতে ভালো লাগে, যাদের ঝিরিপথে দীর্ঘ হাইকিং করতে ভালো লাগে—এই মুভি তাদের মনের ভিতর টোকা দিবে। সাথে শার্লিজ থেরনের টানটান ফিটনেস, ফাইটিং স্কিল, কড়া-লিকারের মতো আর্দ্র চোখ, প্রিয় মানুষরে হারানোর ব্যথায় কাতর নিরাবেগ মুখ, পাথরের মতো টনটনে চোয়াল এবং মৃত্যুরে অনায়াসে বইতে পারা এক ইস্পাত-কঠিন অ্যাটিট্যুড—যে-কোনো মুভিখোররে এমনিতেই গিইলা ফেলবে ফ্রয়েডের প্রি-কনশাস মাইন্ডের ট্রাঞ্জিশন পিরিয়ডেই।
আর রইলো বালতাসার কোরমাকুরের ক্যামেরা। ক্যামেরায় ধরা দৃশ্যের সিম্ফোনি। অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল ও নিউ-সাউথ ওয়েলসের বিভিন্ন পাহাড়, বন, ঝিরিপথ, খরস্রোতা নদী, কাঠের বনে নিঃসঙ্গতার ফ্রিকোয়েন্সি, বন-পাহাড়ের সাথে আকাশের লীন হইয়া থাকা, বিরান-নির্জনতায় এক সাইকোপ্যাথের মনোপলি-বিহেইভ, সাশার দুর্বিনীত লড়াই—বালতাসারে আপনে জম্বি হইয়া থাকবেন নিশ্চিত।
আমি আর কোথায় মইরা থাকি, জানেন? সাশার মনখারাপের নৈশব্দে। ট্রমা থেইকা বাইর-হইতে-চাওয়া সাশারে প্রকৃতির স্বগতোক্তিতে দিশা খুঁজতে দেইখা। নিজের নিঃসঙ্গতারে নিজের ভিতর বাইটা নিতে, গৌরবে। নিজের প্যাশনের সাথে একটুও সমঝোতা না কইরা। বালতাসারের ক্যামেরা সাশা নামে এমন এক নারীচরিত্ররে ভিজ্যুয়ালাইজ করে—মানুষের চাইতে যার ভিতর প্রকৃতির মোহ বেশি, স্থিরতার চাইতে যার ভিতর গতির ক্ষিপ্রতা বেশি। সাশার ভিতর শুধু জীবনের উৎসব আছে। আপনে চাইলে সাশারে দার্শনিকভাবেও দেখতে পারেন। বড় একটা স্কেলে দেখলে আপনের মনে হইতে পারে, সাশা মহাকালের ট্র্যাপে মানুষের ওই প্রতিশ্রুতি—যারে কোনো ক্ষতিপূরণ দিয়াই নিয়তির সাথে কম্প্রোমাইজ করানো যায় না।
মে ২০২৬
হাসান শাহরিয়ার রচনারাশি
- অ্যাপেক্স : দুরাভিসারে আত্মরক্ষার উৎসব || হাসান শাহরিয়ার - May 30, 2026
- মধ্যরাতে বৃষ্টিমায়া ও নজরুল || হাসান শাহরিয়ার - May 26, 2026
- তথ্য অপতথ্য ও অনলাইন অফলাইন অসভ্যতা || হাসান শাহরিয়ার - May 2, 2026

COMMENTS