সমকালীন.কবি সজল অনিরুদ্ধ জন্মেছেন ১৯৮৫ সালে নেত্রকোণার কলমাকান্দার সিধলী গ্রামে। তার কবিতায় সময়-সমাজ-রাজনীতি কখনো ব্যাঙ্গের মতো, কখনো প্রকাশ্য ধ্বনিতে, কখনো নির্জন সেতার হয়ে বাজে। বাস্তবতার অভিঘাত থেকে উচ্চারিত হয় তার কল্পনার পটভূমি, রঙ, ছবি, আখ্যান, দার্শনিকতা, দৃশ্যকল্প ও পরিহাস। জীবনকে দেখার এক অপরিমেয় চোখ তার আছে। একজন প্রজ্ঞান সাধুর মতো নয়—দেখার এই পর্যায়গুলোকে কবি বাজিয়ে ফেলেন দেশ ও পরদেশের বাস্তবতায়। দেশের অচলতা, বিশ্বরাজনীতির তীর্যক স্বার্থপরতা, বাণিজ্যিক ভণ্ডামি ও মানবিক কপটতা তার কবিতায় ব্যাঙ্গাত্মক নির্ঝরে কারুণ্য প্রকাশ করে।
কবির একমাত্র প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘চোখ যখন পর্নোগ্রাফিতে’। কাব্যগ্রন্থের নামটাই কেমন যেন অসুস্থ সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছে। সুস্থ সমাজের চোখ কখনো পর্নোগ্রাফিতে আটকে থাকে না। কিন্তু কবি বলছেন সমাজের চোখ পর্নোগ্রাফিতে আটকে আছে। কেন আটকে থাকে? দোষটা কার? সমাজের না-কি ব্যক্তির? এই তিনটা শব্দ মূলত একটা অসুস্থ সমাজের ভিডিও। অনেকে বলবেন কাব্যগ্রন্থের নাম হিসেবে এটা খুবই অসুন্দর এবং অশ্লীল। কিন্তু সমাজে যেখানে অশ্লীল হয়ে আছে, ব্যক্তির আচরণ ও যাপনধর্ম যেখানে অসুস্থ হয়ে আছে তখন কবিকে সে-সত্য প্রকাশ করতে হয়। কবি সাহস করে সেই সত্য উচ্চারণ করেছেন।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার একটা সত্য, দায়িত্বশীল প্রত্যয় এই কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় আভিধানিক অর্থের থেকে সামাজিক, বৈশ্বিক বিপর্যয়ই বেশি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কবি নিজেকে প্রশ্ন করেন, নিজের পিতাকে প্রশ্ন করেন—নারীর সাথে জৈবিক যাপন ছাড়া তার আর কোনো সম্পর্ক আছে কি-না? এই সামাজিক স্টুডিওর ভেতরে আমাদের সম্পর্কগুলোকে কবি প্রশ্ন করেন। বাস্তবতাকে দেখিয়ে দেন সত্যের নিরিখে।

এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় একটি জিজ্ঞাসা। গদ্যের কাব্যিক আখ্যানে কবি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সংযুক্ত বিপর্যয়গুলোকে তুলে ধরেছেন। বৈশ্বিক পৃথিবীর মাতব্বরি, মানবিক ভণ্ডামিকে ধরিয়ে দিয়েছেন। কাব্যগ্রন্থের কোনো কবিতারই শিরোনাম নেই। ৪২টি কবিতার এই গ্রন্থ মূলত একটিই কবিতা। ব্যাঙ্গের তুলিতে সমাজে বহমান পরিস্থিতি ও পরিণামগুলোকে তুলে ধরেছেন।
আসুন, পাঠক, কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি পড়ি।
“রমণীর বীজতলায় আমাদের প্রার্থনা, আদম আর হাওয়া যাই বলো তুমি এই বিশ্বসংসার তো আসলে এক পর্নোগ্রাফির কারিশমা। বাৎসায়নের এই আধুনিক সংস্করণে দৃষ্টি রেখে বুঝলাম এ তো শুধু রগরগে দৃশ্য দেখে রেটিনার তৃপ্তি নয় আরও এক অন্য কিছু। এই পৃথিবী ভাব না বস্তু, বস্তু না ভাব অথবা ভাব আর বস্তুর আশ্চর্য সঙ্গমে তৈরি এক গুলবাহার। এ নিয়ে তর্কে তর্কে চায়ের কাপ ভেঙে ফেলা হোক ডজনে ডজন। তারপরও আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্য কথা একটাই—পর্নোগ্রাফি।
আমাদের জন্ম আমাদের ভ্রূণ এই শিল্পের কাছে অসম্ভব ঋণী। আমাদের বাবা এই পীড়নশিল্প দিয়ে তৈরি করেছেন আমাদের। আমাদের মা এই পীড়নশিল্পের মডেল। যে কিনা বছরের পর বছর প্রাচ্য সাধুদের মতো নিশ্চুপ থেকে আশ্চর্য সব জীবন্ত গোয়ের্নিকার জন্ম দিয়েছেন। তার স্টুডিওটা কতটুকু বড় আমরা তা জানি। তারপরও তার চাষবাসে হেরফের নেই। আর আমরা ওই অন্ধকার স্টুডিও থেকেই শিখে আসি লাটিম ঘোরানোর কৌশল। কে বলে লাটিম ঘোরানো শিখতে হলে বড় হতে হয়? আসলে আমরা তো মায়ের পেটেই লাটিম ঘোরানো শিখি। আমাদের বাবাই শিখিয়ে দেন কি করে লাটিমে সুতলি প্যাচাতে হয়। কি করে ভাঙতে হয় মৌ দিদিদের চাক।”
সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
গানপার বইরিভিয়্যু
- দার্শনিকতা, দৃশ্যকল্প, পরিহাস ও এক অপরিমেয় চোখ || সরোজ মোস্তফা - May 18, 2026
- রবীন্দ্রনাথের পারস্য যাত্রা || সরোজ মোস্তফা - May 15, 2026
- পুষ্ট আমের সবুজে এসেছে পঁচিশে বৈশাখ || সরোজ মোস্তফা - May 7, 2026

COMMENTS