কবির জন্যে কবিতা
সিকদার আমিনুল হকের প্রস্থানগামিতা লক্ষ করে
গমের রুটির মতো ভোর ভাঙছে। রাত্রি তার শেমিজ ছাড়ছে।
এখন ঢিলে হয়ে আসছে বিয়ারের গন্ধের সঙ্গে গাঢ় প্রস্রাবের পীত।
কাফকাও পরে নিচ্ছে তার জামা। মাথায় পরে নিচ্ছে ক্যাপ।
তোমার পছন্দের ফাউন্টেন পেনটির কথাই বলে রাখলাম। আরো
যে নিবগুলো আছে কিম্বা সোনালি জিহ্বারা তাদের উল্লেখ আছে
পৃথিবীর যাবত এনস্লাইকোপিডিয়ায় কিম্বা থাকবে অতঃপর।
আর এদিকে শ্বাসটানার কষ্ট, অসুখের বিষণ্ণতা, রুগ্ন বিকেল,
এইসব আত্যন্তিকতার ভেতর থেকে অবিারম মেয়েদের নাম
ঝরে পড়তে শুরু করেছে বরফের মতো শাদা গ্রীষ্মের চাতালে।
এর মধ্যেই তুমি চলে যাচ্ছ, কবি? আর একটু থাকবে না?
অনন্ত এবং অন্তর্গত ভ্রমণের জন্যে তোমার তো অন্তত একটি
জামা চাই। সেই জামাটির জন্যে কি তুমি একটু দাঁড়াবে না।
তোমার মতো কেউ কবিতা লিখত না, লিখবে না—
এই অভিশাপ এই বিজয় নিয়ে তুমি কি মুখ থুবড়ে পড়ে গেছ
সিল মাছের মতো সমুদ্রের তপ্ত জল ছেড়ে
আমাদেরও প্রস্থানগামিতার বালিতে থলথলে মোটা ঠোঁট গুঁজে?
সারারাত খুব হল্লা গেছে বুঝি ইয়ারের? আর মন নেই যে
নিবিষ্ট হও বালিকাদের ঘামের গন্ধের মতো বিষণ্ণতায়?
কবি, দ্যাখো তোমাকে ফেরাবার জন্যে তোমাকেই আমি লিখছি
শাদা ওয়াইনের রূপবান কর্কের মতো অক্ষরগুলো সাজিয়ে।
তোমার যাওয়া ঘাসের বুকে কাস্তের ধার ঠেকাতে
রক্তাক্ত করে ফেলছি আমার চেনা হাত। আমি লিখছি কবিতা—
তোমার রূপকল্পের জগৎ থেকে একটি একটি বোতাম খুলে নিয়ে।
এক্ষুনি কাফকা এসে কেড়ে নেবে। তারও তো জামা-ই চাই।
আর তাই দেখে তুমি একেবারে নগ্নতার কাফন পরে
এইভাবে উড়ে যাবে সতত ডানায়?—যা ধাতব রূপালি,
প্রতিভার সবুজে নির্মিত, তোমাকে আমি কি করে ফেরাব?
তুমি তবে চলেই যাচ্ছ, কবি? আমাদের রূপালি কিন্তু
তোমাকেই টানছে। টের পাচ্ছ তো? টেনে ধরে রাখছে।
জন্ম জন্মান্তরেও তুমি কিন্তু এই তন্তু ছিঁড়তেও পারবে না, কবি।
গ্রীষ্মাবাসে খরগোশের মতো আমাদের বসবাসও মাত্র দুদিনের নয়।
তোমার রুম আটকে, তালা দিয়ে কখন যে তুমি বেরিয়ে গেলে?—
আমরা বোধহয় তখন মেতেছিলাম রাত্রির বীর্যে ও বীজে।
কবি, আমরা কথা দিচ্ছি নজর রাখব ওই তালাটিতে,
যেন ব্রার হুকের মতো কেরানীর মতো কেউ খুলে না ফেলে।
যারা খোলে, তাদের হাতে মর্দিত যুবতীদেরই স্তন ঝুলে পড়বে—
আমিও দিচ্ছি এই অভিশাপ। এদিকে প্রতিদিনই আমাদের শাঁস
পচে যায়, যেতে থাকে, কবিতার আভাঁ গার্দ অভাবে। তবু
এবং তবুও আমি সংসার করেই যাচ্ছি এই দুর্গন্ধের সিটিতে—
একটি সেঞ্চুরি ফ্লাওয়ারকে যে সজ্ঞানেই করতে চাইছি,
এটা যদি কোনো গৌরব হয় আমার, তুমি সেটা নেপথ্যে
নাটকের চরিত্রের মতো জানিয়ে গেলে তোমার উৎসর্গপত্রে।
কবি, এই আমাদের গৌরব অনেকটা বাদামের খোসার মতো যে
আমাদের হাতের আঙুল কিন্তু মায়াবী। আর এটাও সত্য
খুব পিপাসা পেলে আমরাও দাঁড়াই তোমারই মতো আমাদেরও
রুমের দরোজায়, তালা আপনিই খুলে যায়, যেমন
পিয়ানোর সি শার্প ছাড়া পায়। আমরা ফ্ল্যাঙ্কের দুরন্ত যৌবন
যেন ব্যাংকের লকারে সোনা। তোমার প্রস্থানের পরেও আমরা
ভদ্কায় ভেজাব গলা, আর তোমার মেহগনি পাতার মতো
পায়ের চিহ্নের দিকে তাকাতে তাকাতে বোতাম পরাতে থাকব
কাফকার জামায়। তাকে আমরা উলঙ্গ দেখতে চাই না।
এনস্লাইকোপিডিয়ার ডিটেনশন তো আমি চাইই না।
চিৎকার করে উঠি। আমার স্বরসমূহ ছন্দিত হয়ে ওঠে
প্রতিরাতে—যখন নিঃশব্দে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় স্বপ্ন
এবং খুব ঝুঁকে পড়ে নির্জন রাজপথটাই দেখে চলে লোকশূন্য।
কবি, তোমার প্রস্থানগামিতা লক্ষ করেছি। এবং দাঁড়াতে বলছি।
কবিতা সিল্কের থানে তোমারও জামা বানাবার দর্জির খোঁজে,
তুমি নিশ্চিন্ত থেকো কবি, আজ দিনমান তোমার বন্ধুরা ঘুরছে।
এদিকে দর্জির মজুরি দেবার জন্যে আমরাও ধর্না দিচ্ছি
হিসেব বিভাগের পর বিভাগে কবিতার শ্রমে প্রাপ্য ভেজা নোট
এবং বহু ব্যবহৃত সন্ধ্যার গণিকার চুম্বনের মতো টাকার জন্যে।
সম্ভবত এই ধর্না দিতে দিতেই ট্রেনের মতো পার হয়ে যাবে জীবন।
আমাদেরও গ্রীষ্মাবাসে ছাতা পড়বে। ম্যানেজার উধাও হবে।
প্রস্থানগামিতা ফেটে পড়বে হাস্যে। কবি, তুমি বেঁচে গেলে
তোমাকে আর মজুরি দিতে হবে না কোনো দর্জিকে।।
২২ মে ২০০৩ ঢাকা
কবিতাটি নেয়া হয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘বালক তুমি একদিন’ কবিতাবই থেকে। ফেব্রুয়ারি ২০০৫ সালে বইটি পাব্লিশ হয় চারুলিপি ঢাকা থেকে। এখানে মুদ্রিত কবিতাটির তলায় তারিখ দেখে বোঝা যাচ্ছে এর রচনাকাল বইপ্রকাশের দুইবছর আগেকার। কবিতাটি সিকদার আমিনুল হকের প্রয়াণে লেখা, তা তো অনুমান করা যায় শিরোনামেই। ইংরেজিতে যেমন এলিজি। সিকদার মৃত্যুবরণ করেন ১৭ মে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে। এরই অব্যবহিত পরের হপ্তায় সিকদারস্মারক কোনো সাময়িকীপৃষ্ঠায় এইটা ছাপা হয় ফার্স্ট। বইভুক্ত হয় এরও দুইবছর পরে। এই কবিতায় সিকদারের কাব্যকয়েনেইজ ব্যবহার করে একদমই শোকতাপ মর্সিয়ামাতম ছাড়া সৈয়দ হক শান্ত বিবেচনায় বিদায় জানাচ্ছেন নিজের অনুজ দশকের অত্যন্ত প্রতিভাপ্রাখর্যসম্পন্ন কবিকে। এক হক ফেয়ারোয়েল জানাচ্ছেন আরেক হককে। সৈয়দ হক পঞ্চাশের দশকের, সিকদার হক ষাটের। তা-ই তো, তা-ই না? আর, আরেকটা কথা, বই থেকে গ্রহণের পর প্রুফচেককালে এক-দুইটা বানান/টাইপো সংস্কার করা হয়েছে কেবল। দুই কবির কেউই নাই আজ আর। তাদের কবিতারা আছে। এবং অন্য অন্য। ধন্যবাদ।
গানপার
১৯ মে ২০২৬
গানপারে সৈয়দ শামসুল হক
- সিকদার আমিনুল হকের প্রস্থানগামিতা লক্ষ করে || সৈয়দ শামসুল হক - May 19, 2026
- সব আলো অবশেষে আলোহীনতার দিকে || শুভ্র সরকার - May 14, 2026
- ভাগেযোগে বিকট জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা || নাফিস সবুর - May 5, 2026

COMMENTS