
০৪.
সবুজ সতেজ বৃক্ষরাজির ওপর কে যেন চুপিসারে গলানো সোনা ঢেলে দিয়েছে। তাই সোনার আভায় ঝলমল করছে পাতায় ঠাসা শাখাপত্র। এ এক অদ্ভুত দৃশ্য! হপ্তাখানেক আগেও দেখেছি হাওয়ায় দোলানো সবুজ অথচ এরই মাঝে এমন বদল! ধীরে ধীরে এই বনভূমি আগুনরাঙা হয়ে উঠবে। যেন অনন্তকাল ধরে জ্বলছে এই দাবানল। আদতে দাবানল নহে হে, এ হলো বসন্ত-বিলাপ।
বসন্ত ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে প্রকৃতির হাহাকার। বেদনায় পর্যবসিত হতে হতে ঝরে পড়া। তার আগে চিন রেখে যাওয়া—একদিন আমিও ছিলাম…
আর মানুষ? কোনোকিছু ফুরিয়ে যাওয়ার আগে তার বোধগম্যই হয় না কী সে হারাতে যাচ্ছে। কিংবা এই পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর…
কেন মানুষ এত অবোধ? যা-কিছু তার জন্য মূল্যবান তা হারিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অনুধাবন করতেও পারে না, ভালোবাসিয়া তোমায় মিটিলো না সাধ, ভালোবাসিয়া। তাই আবার বাসিতে ভালো আসিব আসিব আসিব এই ধরায়…
হায় মানুষ! মৃত্যুর আগেও টের পায় না যে আর বাকি নাই সময়।
অথচ ফুরোবার আগেই এই প্রকৃতি অমোঘ চিহ্ন এঁকে যায়। বৃক্ষরাজির চূড়ায় চূড়ায় আগুনের রঙ। কিন্তু বাকি অর্ধেক সবুজ, সতেজ, দুর্বার।
এদের দেখে মীনকুমারীর কথা মনে আসে। যাদের দেহের আধেক মানবী আর আধেক মাছেদের আঁশ পেঁচিয়ে লেজের সৌন্দর্য হয়ে ফুটে উঠেছে! এক মীনকুমারী মানুষের প্রেমে পড়ে জলের দরে বিক্রি করে দিয়েছিল তার পুচ্ছের স্বাধীনতাকে। সলিলে অবগাহনকে। তারপর গল্প মোড় নিয়েছিল অন্য বাঁকে। প্রেমিক পুরুষের প্রতারণার বেদনায় মীনকুমারী হয়ে উঠেছিল সমুদ্দুরের ফেনা। অতঃপর সে বাতাস হয়েছিল। হয়েছিল নীল দিগন্ত। হয়েছিল চিরকালের আকাশ। ভালোবেসে দেখিয়াছি ছেলেমানুষেরে…এই যে আধেক আগুন আর আধেক জীবন নিয়ে বনভূমি কী অপরূপ শান্ত ও সমাহিত! এর পরশে বিদায়ী সুর্যের আলোর রঙও বুঝি যায় বদলে? সে-ও হয়ে ওঠে কেমন বিষণ্ণ। কমলারঙা আলো নিয়ে ঝুলে থাকে আকাশের পশ্চিম দেয়ালে। এরপর অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। পাতা ঝরার মরশুম সন্নিকটে বলে সূর্যেরও হয়তো এমন বদল?
অচিন দেশের ভোলভাল আমি তেমন বুঝি না। এই দেখি ২২ ডিগ্রি তাপমাত্রা। রাত্তির এগারো পেরোলেই ঝুপ করে নেমে যায় একেবারে ১১ ডিগ্রি। এ কোন ফ্যাসাদ রে বাপ!
অধঃপতনে যাইবি বলে একেবারে আধেক নাকি? এই আধেক হজম হতেও তো টাইম লাগে রে। ওহে হিম, তুমি আমার কোন নব্য প্রেমিক হে? বিড়ম্বনা ছাড়া আর কীইবা দিতে পারে পুরুষপ্রেমিক?
আচিন দেশে আরও আছে নানান কিসিম। আছে দেদার মিষ্টির যোগান। মধুমেহ রোগ এদের জিনে প্রবাহিত হয় না। ফলে মধু খাও, মধু মাখো দেহে, আর মধুর হও প্রেমে কিংবা অপ্রেমে!
আরে ধুর! এ কোন গজব! এখানে আসা অব্দি একটা গান আমাকে ভেঙচুরে মণ্ডতে পরিণত করে দিচ্ছে…
মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের বুকে ঝরে / মাকে মনে পড়ে / আমার মাকে মনে পড়ে / সে যে জড়িয়ে আছে, ছড়িয়ে আছে সন্ধ্যারাতের তারায় / বিশ্বভুবন মাঝে তাহার নেইকো তুলনা…
হোক না মা অথর্ব, মা একচোখা পাষাণী, মা ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্সে ভুগে ভুগে সঙ্গিন দশাপ্রাপ্ত, তবুও সে বেঁচে থাকুক।
এই পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর…
এই এলিট দেশে পাড়ার মোড় নেই, আছে পথের বাঁক। আছে কফির ঝাঁক আর ঝাঁকা। ঝাঁকে ও ঝাঁকায় আছে Tim Hortons-এর কফি। কফিখোর এক পুরুষ একদা কফি নিয়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিল। অবাক কাণ্ড! মৃত্যুর পূর্বেই ওর কফির স্বাদ আপামর জনগণের কাছে পৌঁছে যায়। পৌঁছে যায় কফি ক্যাফের মাধ্যমে। এবং এই অচিন দেশের মানুষেরা বড় কৃতজ্ঞ। বড় নমিত। তাই আনাচেকানাচে গড়ে ওঠে Tim Hortons কফিশপ। এখানকার উত্তম কফি মানেই Tim Hortons!
তবে মজার ব্যাপার হলো, এই কফি খেলে ঘুমে উধাও হওয়ার বদলে ঘুম নেমে আসে চক্ষুজুড়ে!
এই কফি আমারেও করে বিমোহিত। একটা স্মল কফিকাপে দুই ক্রিম, এক আর্টিফিশিয়াল সুগার। কীরকম বর্ষায় ধেয়ে আসা নবজল-রূপ এই কফি!
খাওয়ার আধঘন্টার মাঝেই নিবিড় ঘুম অনিবার্য।
ওহে Tim Hortons, তুমি কি কফির ছলে আফিম খাইয়ে দাও নাকি?
টিমের কফি খেয়ে আমি ঘুমে ঢলোঢলো, তখন কলকাতায় রাত আড়াইটা। আর দ্বৈপায়ন অডিও কল করে—আজ সাড়ে চারহাজার টাকার মদ খেয়ে বাসায় ফিরছি।
আমি থমকাই। দ্বৈপায়ন তুমি এত মদ খেয়েছ কেন?
Tim Hortons এককাপ কফি ওকে পাঠাতে পারলে মন্দ হতো না।
ময়ুরপঙ্খী ভাসিয়ে রওয়ানা দিলেও ওর কাছে পৌঁছাতে বছরখানেক লেগে যাবে।
তার চাইতে দ্বৈপায়ন তুমি মদই খাও। মদের পিপের ভিতর বসে থাকো। মদের তো হাতপা নেই। তাই তোমার কাছে পৌঁছানোর তেমন হ্যাপাও নেই…!
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৬ || পাপড়ি রহমান - May 29, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৫ || পাপড়ি রহমান - May 22, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৪ || পাপড়ি রহমান - May 15, 2026

COMMENTS