অবাক লাগে না। মানুষের মৃত্যুর খবর শুনতে। এই আকুতি উত্তরের প্রত্যশা করে না। সন্ধ্যা নেমে এলে কারা যেন জেনে যায়—মৃত্যু কেবল মিলনের। তবে মৃত্যুর ঘরবাড়ি আমাদের মুখস্থ নাই। কারো কারো মৃত্যুতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে বিভ্রান্ত হয়ে ভাবি, সে তার ভারী বুকটা আমাকে দিয়ে গেল বুঝি। খুব গতি পেয়ে চলে যাচ্ছে শালিখ। অনন্তের দিকে কেন মানুষের লোভাতুর আকাঙ্ক্ষা। আমার মাথা কেবলি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইহকাল আর পরকালের ফায়দা নিয়ে ভাবতে গিয়ে ফুলের গন্ধে ভরে যাচ্ছে আমার শরীর।
পৃথিবীর দিকে দিকে সন্ধ্যা থেকে নিশ্চুপ জেনেছি—
“তুমি যাকে মৃত্যু বলো, তুমি যাকে বলো শেষ, সমূল পতন আমি তার গভীরে বিশ্বাসী বারুদের চোখ দেখে বলি এসব মৃত্যু কোনো শেষ নয়, সব নয় এসব মৃত্যু থেকে শুরু হয় আমাদের সূর্যময় পথ।”
এমন কাকে বলব আমি, উড়াও জীবনভর। সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পথে দু’টি হলুদ প্রজাপতি দেখলাম একসাথে উড়তেছে। লোককথা অনুযায়ী হলুদ রঙের প্রজাপতি উড়তে দেখা মানে অত্যন্ত শুভ লক্ষণ। অবশ্য কিছুক্ষণ পরে এইসব আর মনে থাকবে না। না থাকুক মনে, তবে মনকে বলি মন তোমাকে যদি পরাই বাতাস—উড়তে পারবে তো!
০২.
মানুষরে দেখি কত ঘোরাঘুরি করতে। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ আর অজানা রাস্তার মোহনীয়তায়। আমি তো যাইতে পারবো না, এই জানা নিয়ে এক গোপন অহঙ্কার পুষি। আর আমার ভিতরে আস্ত একটা অচেনা শহর নিয়ে বসে থাকি। আমার কল্পনার জগৎ, আমার অভিজ্ঞতা। এটাকেই আমি আমার অর্জন ধরে নিয়েছি।
সেই শহরে জাহাজের আলো নি়ভে যাচ্ছে না। আলো জ্বলছে চাঁদের মাহাত্ম্য নিয়ে। পূর্ণিমার রাত—কাঁকড়াগুলোও যেন উড়ে বেড়াচ্ছে জোনাকির কাছ থেকে আলো ধার নিয়ে। মেঘ ভিড়িয়াছে কালো আপেলগাছের বলিরেখা জুড়ে৷ আর পাপপুণ্য এক করে ঝুড়িতে ভরে সমুদ্রের কিনারে বসে আছে দেবদূত। অক্লান্ত চাষীর মতন দেখাচ্ছে তাকে।
০৩.
একটা ছেলে হাতভর্তি কচুরিপানার ফুল নিয়ে যাচ্ছে। আমি দূর থেকেই রঙের উত্তাপ টের পাচ্ছি। পরক্ষণে মনে হইলো এত যে রঙের উত্তাপ টের পাই, কিন্তু মৃত্যুর রঙের উত্তাপ কেন টের পাই না! আদতে মৃত্যুর কোনো রঙ হয় না, সেটা আমিও জানি। আবার হয়তো হয়—হতে পারে তা সাদা, কালো, নীলচে কিংবা বেগুনি।
অথচ শোকের নিমিত্তে নিবেদিত ফুলের রং অনেক ক্ষেত্রে সাদা হয়। আমি চাইলে ছেলেটার পিছু পিছু চলে যেতে পারতাম। কিংবা ওর থেকে কয়েকটা ফুল চেয়ে নিতে। ফুলের ‘ভবিষ্যত’ মাত্রাবৃত্তেই তো দুলে ওঠে বাতাসে। ফুল কখনো নিজের ছিল না, যখন নিজের হতে চেয়েছে তখনি ঝরে গেছে নয়তো মানুষের হাতে উঠে এসেছে।
০৪.
মাগরিবের আজান হচ্ছে। শব্দের যে খেলা তা আজানের সুরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে যেন। অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে সূর্যের পরিচয়। একটা কালো বিড়াল আসলো। মাঝে মাঝে তার দেখা পাওয়া যায়। আমি একবার ময়মনসিংহের হাসপাতালের মর্গের সামনে ঠিক এমন একটা কালো বিড়াল দেখেছিলাম। বিড়ালটা সামনে থেকে নাই হয়ে যেতেই, একটু ধাক্কা দিলো—চোখের ধাক্কা। শোনা কথা, কালো বিড়াল পথ কাটলে অমঙ্গল হয়। যদিও বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি নাই। ছোট নারিকেলগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ভাঙা ভাঙা বাতাস এসে গায়ে লাগলো। সূর্যের জায়গায় আধখানা চাঁদও উঠছে দেখলাম।
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- সব আলো অবশেষে আলোহীনতার দিকে || শুভ্র সরকার - May 14, 2026
- ভাগেযোগে বিকট জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা || নাফিস সবুর - May 5, 2026
- দ্বিতীয় ক্ষেত্রের ইশারা ও ভাবনা || শুভ্র সরকার - May 3, 2026

COMMENTS