প্রিয় পিতা সূর্য,
তোমার অসীম আলোই সকল জীবের পুষ্টির উৎস। তুমিই আমাদের সূর্য, আমাদের অসীম আলো ও জীবনের উৎস। তোমার আলোকরশ্মি ধরিত্রী মায়ের বুকে নিয়ে আসে উষ্ণতা, সৌন্দর্য ও সজীবতা। আর তাকে শক্তি জোগায় আমাদের লালন করতে এবং সমস্ত জীবনের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে রাখতে। যখন আমি গভীরভাবে ধরিত্রী মায়ের দিকে তাকাই, তখন তাঁর মধ্যে তোমাকেই দেখি। তুমি কেবল আকাশে নও, তুমি ধরিত্রী মা ও আমার মধ্যেও চিরকাল বিদ্যমান।
দশদিক আলোকিত করে তোলা গোলাপি আভায় দীপ্ত এক মহিমান্বিত গোলক তুমি পূর্ব দিক থেকে প্রতিটি সকালেই প্রকাশিত হও অপরূপ জ্যোতিতে। তুমি আমাদের অসীম সহানুভূতিশীল এবং অপরিসীম প্রজ্ঞাসম্পন্ন পরম দয়ালু পিতা, আর একই সঙ্গে তুমি অসীম সাহস ও অদম্য শক্তির এক অনন্য প্রতিমূর্তি। তোমার অগ্নিগর্ভ মুকুট থেকে বিকিরিত আলোককণাগুলি প্রায় দেড়শো মিলিয়ন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মাত্র আট মিনিটের কিছু বেশি সময়ে এসে পৌঁছায় ধরিত্রী মায়ের বুকে। প্রতি মুহূর্তে তুমি নিজের এক ক্ষুদ্র অংশ আলোক-শক্তি রূপে পৃথিবীর উদ্দেশে নিবেদন করো। প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি ফুলে, প্রতিটি জীবন্ত কোষে তুমি বিরাজমান। কিন্তু প্রতিদিনই আমাদের পৃথিবীর চেয়ে তিন লক্ষ ত্রিশ হাজার গুণ বৃহৎ তোমার বিশাল দেহ, জ্বলন্ত প্লাজমা, ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে। আগামী দশ বিলিয়ন বছরের মধ্যে তোমার অধিকাংশ সত্তা রূপান্তরিত হবে শক্তিতে, যা ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে। তখন তুমি আর আজকের এই দৃশ্যমান রূপে থাকবে না, কিন্তু তোমার অস্তিত্ব অব্যাহত থাকবে তোমার বিকিরিত প্রতিটি ফোটনে। কিছুই হারাবে না, কেবল রূপ বদলাবে।
প্রিয় পিতা সূর্য,
তোমার সঙ্গে মা পৃথিবীর সৃজনশীল ঐকতান জীবনের সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তোলে। মায়ের কক্ষপথে সামান্য এক হেলানই আমাদের উপহার দিয়েছে চারটি অনন্য ঋতু। আমরা পেয়েছি বসন্তের কোমলতা, গ্রীষ্মের দীপ্তি, শরতের প্রশান্তি, আর শীতের নীরবতা। তাঁর সেই আশ্চর্য সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া তোমার শক্তিকে ধারণ করে বায়ুমণ্ডলের জন্য অক্সিজেন সৃষ্টি করে, যা তোমার প্রখর অতিবেগুনি বিকিরণ থেকে আমাদের রক্ষা করে। যুগের পর যুগ ধরে মা দক্ষতার সঙ্গে তোমার আলো সংগ্রহ ও সঞ্চয় করে রেখেছেন নিজ সন্তানদের লালন করার জন্য, আর নিজের সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করার জন্য। তোমার এই সৃষ্টিশীল সুরের কারণেই পাখিরা উন্মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে পারে, হরিণেরা বনভূমির ভেতর মুক্তভাবে ছুটে বেড়াতে পারে। প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি সত্তা তার নিজস্ব উপাদানে আনন্দ খুঁজে পায়, তোমার পুষ্টিদায়ক আলো আর সেই অলৌকিক বায়ুমণ্ডলের ছায়াতলের জন্য, যা আমাদের সকলকে বুকে জড়িয়ে ধরে, রক্ষা করে, আর মমতায় সাথে লালন-পালন করে।
আমাদের প্রত্যেকের একটি হৃদয় আছে। যদি সেই হৃদয়ের স্পন্দন থেমে যায়, তবে আমরা মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব। কিন্তু যখন আমরা আকাশের দিকে তাকাই, তখন উপলব্ধি করি হে প্রিয় পিতা সূর্য, তুমিও আমাদের হৃদয়। তুমি কেবল এই ক্ষুদ্র দেহের বাইরে নও; আমাদের প্রতিটি কোষের ভেতরও তুমি বিরাজমান, যেমন তুমি বিরাজমান মা পৃথিবীর দেহের মাঝে।
প্রিয় পিতা সূর্য,
তুমি সমগ্র মহাবিশ্বের এবং আমাদের সৌরজগতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যদি তুমি হারিয়ে যেতে, তবে আমাদের জীবন, এমনকী মা পৃথিবীর জীবনও, সমাপ্ত হয়ে যেত। হে পিতা সূর্য আমি তোমাকে আমার হৃদয় হিসেবে দেখতে চাই গভীরভাবে এবং উপলব্ধি করতে চাই সেই আন্তঃসম্পর্ক, সেই আন্তঃঅস্তিত্বের সত্য, যা তোমার, মা পৃথিবীর, আমার এবং সকল প্রাণের মধ্যে অবিচ্ছিন্নভাবে বিরাজমান। আমি অদ্বৈত ও আন্তঃঅস্তিত্বের দীপ্ত প্রজ্ঞার আলোয় দীপ্ত হয়ে মা পৃথিবীকে, পিতা সূর্যকে, এবং মানুষে মানুষে একে অপরকে ভালোবাসার সাধনা করতে চাই, যা আমাদের সকল প্রকার বিভেদ, ভয়, ঈর্ষা, ক্ষোভ, ঘৃণা ও হতাশা থেকে মুক্তি দেয়।
তিক নাত হান অনুবাদ
জয়দেব কর রচনারাশি
- ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৮ / পিতা সূর্য, আমার হৃদয় || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর - May 9, 2026
- ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৭ / তোমার চূড়ান্ত স্বরূপ : না মৃত্যু, না ভয় || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর - May 4, 2026
- ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৬ / আমাদের মহাকালের যাত্রাপথ || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর - April 29, 2026

COMMENTS