সমুদ্রের ধারে যেতে পারব না জেনে, একটা গন্ধরাজ গাছের কাছে গেলাম। একদিন অয়ন মিস্ত্রী আমাকে বলেছিল যে, কবি তোমার যখন মনখারাপ হবে—তখন গন্ধরাজ ফুলের কাছে এসে দাঁড়িয়ো। তাতে তুমি স্বর্গের সুবাস পাবে। সুবাস দেবতাদের আদিম অন্তরের তুষার।
নিমতলি বাজারে একমাত্র অন্ধ লোক বলতে যে ছিল—সে হচ্ছে এই অয়ন মিস্ত্রী। অন্ধ হলেও কাঠের নকশার নানাবিধ কাজ সে পারত। সম্ভবত তার চেতনায় ছিল চোখের জলরেখা। আর হাতের আঙুলে ছিল ক্রন্দন। সে গান শুনত, মুজিব পরদেশীর। তার স্বস্তি শব্দটার ভেতর—সে শুধু গাছপালার কল্পনা নিয়ে থাকত। কল্পনায় সে একটা শহরকে জন্ম দিতে চেয়েছিল, যেখানে শুধু গাছেরাই থাকবে।
গাছেদের শহর শুনলে যে-কারো চোখেমুখে রহস্য এসে ভিড়তে শুরু করবে। আমি আন্দাজ করে দেখছি, যে-শহরের কোনো পথ নাই। কারণ মানুষবিহীন এই পথ কারা তৈরি করবে। যদি কোনো পথ তৈরি হয় তবে তা হবে ‘অ্যানিমেল ট্রেইল’।
সুনির্মল বসুর একটা কবিতা আছে—‘সবার আমি ছাত্র’। অয়নদার কাছে গেলে আমার মনে হইতো আমি তার ছাত্র। কাফকার মতো লেখকও ভেতরটাকে চূর্ণ করে দেওয়ার মতো গ্রন্থের স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু অয়ন মিস্ত্রীর কাছে গেলে আমার ভেতর চূর্ণ না হলেও, আলোড়িত হতো। নিমতলির বৃষ্টি সেই গাছেদের ছুঁতে পারবে কি না আমার জানা নাই। বৃষ্টির শব্দের সাথে পাখিরদের ঝরে পড়া পালকের যে শব্দ, তা বদল করে সে মূলত গাছেদের মৃত্যুর গন্ধ নিতে চেয়েছিল—এক ছায়ার নৌকায় দাঁড়িয়ে৷ অপ্রকাশ্য জীবন, ঘুমের ভেতর ভাঁজ করে রাখা আরেক জীবনের গল্প অচেনা মনে হয়। অচেনা মনে হয়—অয়ন মিস্ত্রীর মৃত্যুও। মৃত্যু নানাভাবেই ভেঙেচুরে দিতে পারে ভিতরে জমে থাকা কথাকেও।
হিন্দুধর্মে চন্দ্র ও সূর্যকে মানুষের কর্ম ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তির উপায় বা পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই অনুসারে, অয়নদার মৃত্যু শুক্লপক্ষের তিথিতে হয়েছিল। চন্দ্রমার এই বর্ধমান আলো ও উষ্ণতাকে ‘দেবযান’ বা আলোর পথ বলা হয়, যা থেকে আত্মা ব্রহ্মলোক বা উচ্চতর স্বর্গে প্রবেশ করে। অয়নদা, তুমি তো আর জানবে না কখনো—তাও বলি। আমি যা ছিলাম তা আর নাই। আমার হৃদয় শব্দে শব্দে ভরা, তবু নীরবতা জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো বুকপকেটে নিয়ে ঘুরি। একবার ভাবি, তুমি কাছে আর দূরের প্রেক্ষিতে—ফুলেদের ভাষা বুঝাবুঝি শেষে হয়তো একটি শালবৃক্ষের বক্তব্য শুনছো।
নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে—ভালোবেসে অসংখ্যবার তোমার নাম ধরে ডাকি। তোমার ব্যস্ততা থাকবে—বলো, আমি কখন ফিরব সেই অপেক্ষায়? চিরদিন আকাশ তোমার, আমাকে পত্র লিখে জানিয়ে দিও।
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- যে গান ছোট হয়ে আসে || শুভ্র সরকার - May 24, 2026
- পাখিদের মৃত্যু আকাশ নেয় না, মাটিকেই নিতে হয় || শুভ্র সরকার - May 20, 2026
- সব আলো অবশেষে আলোহীনতার দিকে || শুভ্র সরকার - May 14, 2026

COMMENTS