পাখি আশ্চর্য—পাখিদের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি কী করে লিখে রাখে আকাশ। পাখি জন্মের আগেও এসেছিল যে বাতাস, সেই বাতাস কী করে পাড়ি দিয়েছিল স্বভাবগত উড়াল। একবার রাঙ্গা নামে এক ঋষি নিজের ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল কেটে একটা পাখি বানালেন। ছোট পাখি, নাম দিলেন লীলাপাখি। তারপর পাখিটাকে বললেন—যা উড়তে উড়তে আনন্দ নিবি। আরও বললেন—আনন্দ অনেকটা আমার মতো। অনেক আনন্দের মুখোমুখি হব বলে আজ তোকেও আনন্দযাত্রী করলাম।
কখনো বিস্ময় সাবলীলভাবে নির্বাক কিংবা বিমূঢ় হয়ে পড়ে। যখন ভাবি ফরিদ উদ্দীন আত্তারের কালজয়ী সুফি মাহাকাব্য ‘মানতিকুত তাইর’ বা ‘পাখিদের সম্মেলন’। একঝাঁক পাখি (আসলে কতগুলি মানবাত্মা) একটি আধ্যাত্মিক পাখির নেতৃত্বে উড়ছে। কোন দিকে? সিমুর্গ পাখির খোঁজে। এই সিমুর্গ পাখিই আল্লা। সাতটি উপত্যকা পেরিয়ে পাখিরা উড়ে যাচ্ছে৷ যেতে যেতে পাখিগুলি নিজেদের ক্ষুদ্রত্ব আর ভয় উপলদ্ধি করছে। নানা পরীক্ষা ও বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কেবল ত্রিশটি পাখি (ফার্সিতে ‘সি’ অর্থ ত্রিশ, ‘মুর্গ’ অর্থ পাখি) গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। সেখানে গিয়ে তারা বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করে যে, তারা নিজেরাই ‘সিমুর্গ’। এর মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন—ঈশ্বর বা সত্য মানুষের নিজের মাঝেই বাস করে, যার জন্য কেবল আত্মশুদ্ধি ও কঠোর সাধনার প্রয়োজন হয়।
০২.
পাখি প্রার্থনার কথা সংগীতে বলে। তারপর মমতা ভারি নিঃশ্বাস ফেলে পাতার উপরে। বাড়িতে থাকতে দেখতাম—ঝিঙেগাছে মৌটুসি পাখি আসতো। ফুলের ভেতরের মধু (নেকটার) খাওয়ার জন্য ঠোঁট ডুবিয়ে ফুল খাইতো। আচ্ছা, ফুলেদের এমন নির্জনকালে পাখিদের এমন নিস্তরঙ্গ ভাব আমি কখনো দেখি নাই কেন? মানুষও ফুল খায়। আমার প্রিয় লাগে বকফুল আর বিলাতি ফুলের বড়া খাইতে। স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা মানুষের গৌরবময় উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি—এইটা আমি মনে করি।
একবার মনে পড়ে শেষরাতের ঝড়ের পর একটা শালিখের বাচ্চা পেয়েছিলাম। একটাই। বাচ্চাটাকে বাঁচাবো ভেবে বাড়িতে নিয়ে আসলাম। তারপর খুদ আর সরিষার দানা মুখে তুলে দিলাম। বাড়িতে বিড়ালের ভয়ও ছিল কখন আবার নিয়ে যায়। খাঁচা দিয়ে ঢেকে রাখলাম। একদিন পর বাচ্চা পাখিটা মরে গেল। দুনিয়ার মা ছাড়া ছানা পাখিদের বাঁচানো কষ্টসাধ্য বুঝলাম। স্বপ্নহীনতার ভিতর আমি এখনো অনুভব করি পাখিটা মরে নাই। পাখিটার ওই ভঙ্গি অনুপম—তার মৃত্যুর দিনক্ষণ নিয়ে চাঁদের দিকে গেছে। আমি পাখিটার নিঃসঙ্গতার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সময়কে বিচ্ছিন্ন করে দেখেছি—অতি যত্নে গাছ যেমন মারা যায়, আবার অতি অযত্নেও মারা যায়। তেমনি পাখিদের ক্ষেত্রেও সত্য মনে হইছে। অনন্তকাল থেকে যাওয়ার বাসনা তারা তো দেখে নাই। আমি আমার হাততালি আকাশে উড়াই—পরক্ষণে পাখিরাও আকাশে উড়ে যায়। কিন্তু পাখিদের মৃত্যু আকাশ নেয় না, মাটিকেই নিতে হয়। অনেকদিন বিকেলে দেখেছি দুল্লসড়কের হালিম বয়াতির মিলের সামনে বিদ্যুতের তারে পাল ধরে পাখিরা বসে থাকতো। তখন আমার কাছে মনে হইতো কেবল উড়তে পারা নয়, পাখিদের প্রধান সৌন্দর্য তাদের বসে থাকার ভেতর ওই গাঁথুনিটুকুই।
“সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- পাখিদের মৃত্যু আকাশ নেয় না, মাটিকেই নিতে হয় || শুভ্র সরকার - May 20, 2026
- ঊষর দিন ধূসর রাত : নারীজীবনের নাড়িস্পন্দ || শুক্তি সরকার - May 19, 2026
- সিকদার আমিনুল হকের প্রস্থানগামিতা লক্ষ করে || সৈয়দ শামসুল হক - May 19, 2026

COMMENTS