অর্ণবের গান ও অন্যান্য অনুধ্যান || আহমদ সায়েম

অর্ণবের গান ও অন্যান্য অনুধ্যান || আহমদ সায়েম

শেয়ার করুন:

মানুষজনের ভিড়ে নিজেকে যেভাবে দেখতে পাই, ছুঁতে পারি নিঃশ্বাস, চিন্তার বিন্দুবিসর্গ—তার একবিন্দুও যেন পাই না একা হয়ে গেলে। আশ্চর্য না? মানুষ যত একা হয়, তত নিজের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। বাইরে থেকে মনে হয়, একা মানুষ নিজেকে বেশি বোঝে; অথচ সত্যিটা অনেক সময় উল্টো। ভিড়ের মধ্যে আমরা অভিনয় করি, আর একা হলে সেই অভিনয়ের কাপড় খুলে পড়ে যায়। তখন নিজের চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে যায় আরেকজন মানুষ—যে আমার মতো দেখতে, কিন্তু আমি না।

একলা হলে তর্কে জড়িয়ে যাই। নিষ্ঠুরতা খেয়ে ফেলে আমার একসমুদ্র গল্প, কবিতার উজ্জ্বলতা, বিশালতা, পাপও। একা হইলে নিজেকে পাই না—শুনতে একটু ভিন্ন লাগলেও মাঝে মাঝে তা-ই ঘটে যায়। লোকজনের সামনে একা হতে পারলে স্বপ্ন দেখা যায়, ভাবা যায় মননের গল্প নিয়ে; কিন্তু একলা থেকে একা হয়ে গেলে মননের গল্পের সাথেই যুদ্ধ শুরু হয়। নিজের সাথে নিজের তর্ক সবসময় শুভ হয় না। কখনো কখনো সেই তর্ক মানুষকে এমন নিষ্ঠুর করে তোলে যে সে নিজের ভেতরের শিশুটাকেও হত্যা করতে পারে।

আমরা ভাবি মানুষ অন্যের হাতে কষ্ট পায়; অথচ সবচেয়ে ভয়ংকর অত্যাচার মানুষ নিজের উপর নিজেই করে। দিনের পর দিন নিজের ভুল মনে রেখে, পুরনো কথোপকথন মাথায় চালিয়ে, “এভাবে না বললেও পারতাম”, “আরেকটু ভালো হতে পারতাম”—এইসব ভাবতে ভাবতেই মানুষ ধীরে ধীরে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষি হয়ে দাঁড়ায়। তখন আয়নায় মুখ দেখা যায়, কিন্তু আত্মা দেখা যায় না।

সত্যি বলতে—মানুষ বেঁচে থাকে পাপ নিয়ে, পাপকে আঁকড়ে ধরে, পাপের সংখ্যা দেখতে, সংখ্যা বাড়াতে। তবে সব পাপ সমান না। কিছু পাপ সমাজ দেখে, কিছু পাপ কেবল মানুষ নিজের ভেতরে বহন করে। যে-পাপের কোনো সাক্ষি নেই, সেই পাপই সবচেয়ে বেশি মানুষকে খেয়ে ফেলে। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে বুকের ভিতরে যে শূন্যতা কাজ করে, তার অনেকটাই এই অদৃশ্য পাপের শব্দ।

দিনকে রাত করি দায়িত্ববোধের পাহাড় নিয়ে; অথচ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না কবিতা লেখা, পড়ে না রঙের গল্পে ক্ষতচিহ্নের মাত্রা দেওয়া। এই সমাজ মানুষকে বাঁচতে শেখায়, কিন্তু অনুভব করতে শেখায় না। ভাবের সংসারে একটা ছিদ্র আঁকাও যেন অপরাধ। সেখানে কান্নারও শৃঙ্খলা আছে, ভালোবাসারও নিয়ম আছে, নীরবতারও কর দিতে হয়।

 


এমন সংসারে গানই আশ্রয়।

এই গান কোনো পছন্দের নয়—গান বলতে আমার কাছে কথাই মুখ্য। তাই কার গান, ধরন, মিউজিক—এসবের আগে আমি শুনি শব্দের ভেতরের মানুষটাকে। কখনো খালি গলায় গাওয়া গান শুনি, কখনো অসম্পূর্ণ সুরে আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাস। কথাগুলো শুনতে শুনতে তার রস নেওয়া যায় অনেক পরে; লাগে যেন কেউ আমার হয়ে কথা বলছে।

শুধু গান না, প্রতিটা কাজই এমন। আমি মনে করি বুঝিয়াশুনিয়া কাজ করা ভালো, তবে অতিরিক্ত কোনোকিছুই ভালো নয়। অতিরিক্ত ভাবনা মানুষকে অসুস্থ করে দেয়। নিজের দিকে বেশি তাকাতে তাকাতে মানুষ একসময় নিজের প্রতিটা ক্ষতকে বড় করে দেখে; তখন সুখের থেকেও দুঃখের স্মৃতি বেশি সত্য মনে হয়।

এই “অতিরিক্ত” কী—তা বোঝা যায় নিজের মুখোমুখি দাঁড়ালে। আমরা নিজেরে আকাশসমান রেখে প্রশ্ন করি সমতলে। তাই প্রশ্নে-প্রশ্নে নিজেকেই শেষ করি। আমরা উত্তর চাই, অথচ নিজের বিরুদ্ধে যাওয়া উত্তর শুনতে চাই না।

পাপ করানো হয়—কেউ নিজে থেকে পাপ করতে চায় না; তাই বলে পাপের বিচার হবে না তা নয়। এই পাপ না করার পেছনে আপনার সততার মাপ নেওয়া হবে। সেই মাপটাই আপনি, বা আপনার ছায়া; যে-ছায়াকে আপনি সহজে দেখতে পাবেন না, তাকে দেখা শিখতে হয়। অনেকেই সারাজীবন আয়নার সামনে দাঁড়ায়, কিন্তু নিজের সামনে দাঁড়াতে পারে না।

অজুহাত একটা অসুখ। ভয়ংকর অসুন্দর ব্যক্তিরা অজুহাতের মাত্রা বাড়িয়ে কাজের ক্ষেত্র বাড়ায়। কেউ নিজেকে মূল্যায়নের সূত্র তৈরি করে, কেউ নিজের ব্যর্থতার পাশে ফুল সাজায়। বুঝতে পারে না—মূল্য নিজে নিজে বাড়ানো যায় না। কথায় আছে, “লোকে যারে বড় বলে সে-ই বড় হয়।” কথাটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তা জীবন দিয়ে দেখতে হয়।

যখন দেখা যায় সময় শেষ হয়ে আসে, আর ফেরত পাওয়া যায় না পাঠশালার বয়স—তখন বুকের ভেতর অন্যরকম শব্দ হয়। যারে অবহেলায় ছুঁয়ে দেখিনি, কথা বলিনি, সময় দিইনি—তাদের জন্য মন কেঁদে ওঠে। তখন বোঝা যায়, মানুষ আসলে সম্পর্ক হারিয়ে বড় হয় না; বরং একটু একটু করে ফাঁকা হয়ে যায়।

এখন সময় আছে—বুঝতে পারছি; কিন্তু তার আর আমাকে প্রয়োজন নেই। অজুহাতগুলো নিজের দিকে ফিরছে। যেন আমি নিজেই নিজের আদালতে দাঁড়িয়ে আছি।

 


এমন একটা অনুভূতি নিয়ে যখন অর্ণবের গান কানে বাজে, অন্যরকম এক ফিলিংস কাজ করে মনে। মনে হয় কেউ আমার ভিতরের অন্ধকার ঘরে চুপচাপ আলো জ্বেলে দিয়েছে।

কখনো জানতে চাসনি তোকে কত খুঁজেছি যে কীভাবে
কখনো ডুবুরীর বেশে, রাঙামাটি পথ শেষে কত কীভাবে…”

গান আসলে অনেক সময় আয়নার থেকেও সৎ। আয়না কেবল মুখ দেখায়, গান দেখায় ভিতর। তাই কিছু কিছু গান শুনলে মনে হয়—আমি কাউকে খুঁজিনি, বরং নিজেকেই খুঁজছিলাম এতদিন।

মানুষের জীবনে কিছু কথা থাকে, যা সরাসরি বলা যায় না। তাই মানুষ কবিতা লেখে, গান শোনে, গভীর রাতে ছাদে উঠে আকাশ দেখে। কারণ মানুষ সব সত্য ভাষায় বলতে পারে না; কিছু সত্য শুধু অনুভব করা যায়।

এই পৃথিবী সবাইকে সব দিতে প্রস্তুত, কিন্তু আমরা প্রকৃতির পোড়ন বা জ্যোৎস্না বুঝি না বলেই মনে করি বৈষম্যের শিকার হয়েছি। নিজের দিকে আঙুল তুলতে নারাজ বলেই অন্যের দিকে অভিযোগ ছুঁড়ে দিই। অথচ সত্যি কথা হচ্ছে—মানুষ সবচেয়ে বেশি হারায় নিজের কাছেই।

আয়নায় মুখ না দেখে যদি পারতাম নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে, মনে হয় না ডুবুরীর বেশে কাউকে খুঁজতে হইত। গানের কথাগুলো এমন গহ্বরে ফেলে দেয় যে নানান কাজের ভুল চোখে পড়ে। মনে হয়—জীবনের সবচেয়ে বড় অপচয় ছিল অনুভূতিকে অবহেলা করা।

অর্ণবের গায়কি এমন—যেন খুব ধীরে কেউ মানুষের বুকে হাত রেখে কথা বলছে। তার গান শুনলে মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত নিঃসঙ্গ মানুষ একই নদীর পাড়ে বসে আছে। কেউ কাউকে দেখছে না, তবু সবাই একে অপরকে বুঝতে পারছে।

শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়তো নিজের কাছেই ফিরে আসে। অনেক তর্ক, অনেক পাপ, অনেক অজুহাত, অনেক ব্যর্থতার পরে। তখন সে বোঝে—পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সাক্ষাৎ হচ্ছে নিজের ছায়ার সাথে দেখা হওয়া। কারণ ছায়া কখনো মিথ্যা বলে না।

২৭ জানুয়ারি ২০২৫


আহমদ সায়েম রচনারাশি
গানপারে অর্ণব

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you