
১০.
বনভূমির মাঝে একটা একাকী মেইপল গাছ সারাঅঙ্গে হলুদ মেখে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ আশপাশে কোনো বিবাহ-উৎসবের নামনিশানা নজরে পড়ছে না। বরং গোরস্থানের মতো নীরবতা!
অন্য বৃক্ষেরাও নিঝুম হয়ে মাথা নত করে আছে। যেন বুঝতে চাইছে—ও কেন অকারণ বিয়ার সাজুনি সেজে উঠল?
আমিও ঠাহর করতে পারছি না এই গাছ কেন হলদে পাতা মেলে দিয়ে নিজেকে এখনই আলাদা করে ফেলল? সময়ের আগেই কেন ওর এমন উদযাপন? কেন ওর ঘোরতর সাজে সেজে ওঠা?
মৃদু পায়ে আমি ওর নিচে গিয়ে দাঁড়াই। শাখাপত্র ধরে ছবি তুলি। এই কনেবউয়ের পায়ের কাছে লালচে-কমলা রঙের পাতার স্তূপ। যেন নতুন জীবনে প্রবেশের আগে পুরাতন জীবনের খোলস ঝরিয়ে ফেলেছে। আমি মনে মনে ধরে নেই—ইহা একটি স্ত্রী জাতীয় উদ্ভিদ। স্ত্রীজাতিই নতুন জীবনে, নতুন পরিবেশে গিয়ে নিজেকে খুব দ্রুতই মানিয়ে নেয়। নিতে হয়। চালিয়ে নেয়। চালিয়ে নিতে হয় বলে। স্ত্রীজাতির এই অপরিসীম ত্যাগের কথা বড়-একটা শোনা যায় না। কেউই তেমন মুখ খোলে না। এর কারণও আছে;—যা-কিছু আমাদের চোখ সহ্য করে নেয় বা চোখে সহ্য হয়ে যায়, তা নিয়ে কেউই আর নতুন করে মাথা ঘামায় না। যেন ওইটাই তখন রীতিনীতি । ওইটাই তখন সমাজে অবশ্যকর্তব্য বলে ধরে নেয়া হয়।
একাকী মেইপলের গায়ের হলদি মেন্দির সুঘ্রাণ ফেলে আমি হাঁটি মসৃণ রাস্তা ধরে। দুইপাশে উঁচুউঁচু এন্তার বৃক্ষরাজি । তাদের ঘন ছায়া। ওদিকে অস্তগামী সূর্যের লালাভা এসে টেমস নদীর জলের রঙ দিয়েছে বদলে। কালো নাকি রূপালি নাকি কমলাভ—বোঝা মুশকিল।
দৃষ্টিনন্দন জ্যামিতিক ব্রিজের ওপর দাঁড়ালে বাতাস উড়াল দিয়ে আসে। সামান্য হিমহিম ভাব টের পাওয়া যায়। কিন্তু এই বাতাস শীতের কাঁপুনিহীন।
শুনি মর্মর আর লুনি হাঁসেদের গান। লুনিদের পাখসাট। আমার পাশ কাটিয়ে দৌড়ে যায় কেডস আর শর্টস পরা শ্বেত পদাতিক। কিছু বাদামিদের দেখি। বাদামিরা ঢেকে আছে বোরকা আর হিজাবনেকাবে।
এখানে জীবন উড়ে বেড়ায়। ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে ঘুরে বুক ভরে ঠেসে নেয় অক্সিজেন। খোলা হাওয়ার মতো এখানে উড়ে বেড়ায় নানা রঙের মানুষ। কেউ কারো পরোয়া করে না। কেউ কাউকে কটাক্ষ করে না।
এমনকি তাকিয়েও দ্যাখে না কেউ কাউকে। তবুও ঘন বনের মোড়ে সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে নামার আগেই আমি কিনা দৌড় লাগাই। আজন্ম যে-সংস্কারে বেড়ে উঠেছি, তা থেকে নিস্তার তো মিলবে না সহসা। অরক্ষিত জনপদের জীর্ণ জীবন ফেলে এসে খোলাহাওয়ায় ভেসে যাওয়া বড় চাট্টিখানি কথা নয়। যেখানে আমার দাসানুদাসের রুটিন চলাচল।
যে-দেশে সুযোগ পেলে তিনবছরের কন্যাশিশুকে রেইপ করা হয়, আর মাদ্রাসায় চলে পুত্রশিশু বলাৎকার, সেই দেশ থেকে এসে এত অবেলায় আমি কী করে খোলাহাওয়া হই? রঙিন প্রজাপতি হই আর উড়ে বেড়াই?
মিনিট পনেরো ড্রাইভ করলেই দেখা যায় বিস্তীর্ণ প্রান্তর। মাইলকে মাইল শস্য কেটে নেয়া খাঁ খাঁ জমিন। এই হেমন্তে এবারের মতো কিষানের ঘর পরিপূর্ণ। বরফকাল শেষ হলে শুরু হবে ফের আবাদ। ফের নতুন অঙ্কুর। আর নতুন ফসলের গান।
মাইলকে মাইল পেরিয়ে গেলে একটা সম্পন্ন বাড়ির চিন দেখা যায়। এটাই এই জমির মালিকের নিবাস। যেন দক্ষ ফিল্মমেকারের কোনো দুর্ধর্ষ আর্টফিল্মের দারুণ সিনেমাটোগ্রাফি ভেসে যাচ্ছে দৃষ্টির সামনে দিয়ে। যেন কোনো দূর অতীত থেকে রূপকথা জ্যান্ত হয়ে উঠল সদ্য! এখনই কোনো টমবয় ঘোড়া দাবড়ে চলে যাবে। আর রেখে যাবে পথের ’পরে ধূলির পর্দা এবং অশ্বখুরধ্বনি!
শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে চলে এলেও শহরতলির আমেজ পাওয়া হয়ে ওঠে না। প্রায় জনশূন্য রাস্তাগুলি চলতে চলতে উঁচু ঢাল হয়ে আসমান ছুঁয়ে ফেলে। ফের গড়িয়ে নামে বহুস্তর নিচে। মৃত্যুর রোলার কোস্টার বুঝি এমনই? এই রকম? কী জানি কেউ এসে তো বলে নাই জীবনের ওই পারের খবর!
মরিবার কালে হয়তো উঁচু হতে হতে একেবারে আসমান ছুঁয়ে ফেলব। কিছু মেঘ হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে ফের গড়িয়ে নামব। নামতেই থাকব। অতঃপর ভূতলে লুটিয়ে পড়বে বড় সাধের এই দেহখানি। মাটির দেহ মিলিয়ে যাবে মাটিতেই।
আমার এই দেহখানি তুলে ধরো, / তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো— / নিশিদিন আলোক-শিখা জ্বলুক গানে॥ / আঁধারের গায়ে গায়ে পরশ তব / সারারাত ফোটাক তারা নব নব। / নয়নের দৃষ্টি হতে ঘুচবে কালো, / যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো— / ব্যথা মোর উঠবে জ্বলে ঊর্ধ্বপানে…
১৩ অক্টোবর ২০২৫
ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ১০ || পাপড়ি রহমান - June 25, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৯ || পাপড়ি রহমান - June 17, 2026
- ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০৮ || পাপড়ি রহমান - June 11, 2026

COMMENTS