আহমদ সায়েম। কবি, প্রধানত, পত্রিকাসম্পাদক ও ফটোকর। জন্ম নয় সেপ্টেম্বর উনিশশআটাত্তর। বেড়ে-ওঠা বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব বর্ডারবর্তী সিলেট শহরে, সেখানকার বারুতখানা মহল্লার অলিগলি ঘিরে কেটেছে কবির কৈশোর ও যৌবনের উদ্গমকাল; এই শহরেরই স্মৃতিবিস্মৃতির রোদে-মেঘে-মধুতে ঘেরা যাপনযাত্রা। স্নাতকোত্তর পড়াশোনা সম্পন্ন করে বিবিধ ব্যবসায়-উদ্যোগ প্রবর্তনা ও পুনঃপুনঃ ব্যর্থতা সয়ে শেষে অপ্রাতিষ্ঠানিক বইপ্রকাশন কোলাজ পত্তনির পাশাপাশি একটা প্রাইভেট কোম্প্যানির চাকরিতে বেশ কিছুকাল কাটিয়ে একদশকপ্রায় থিতু যুক্তরাষ্ট্রস্থ পেন্সিলভ্যানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায়। সূনৃত, একটি ছোটকাগজ, এবং রাশপ্রিন্ট, একটি ওয়েবম্যাগ, সম্পাদনা করে আসছেন যথাক্রমে কুড়ি ও অর্ধকুড়ি বছর ধরে। দেড়যুগ কবিতালিপ্ততার পর ‘অনক্ষর ইশারার ঘোর’, প্রথম কবিতাবই তাঁর, প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি দ্বিসহস্রপনেরো অব্দে। সেই অভিষেকের পরে একদশক সময়ের চক্র পূর্ণ হলো। কবির আরও আরও বই বেরিয়েছে এর পরে, এরই মধ্যে, সেই খবরও কবিতাপাঠক নিশ্চয় জানবেন। যদিও কবি আহমদ সায়েম বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চায় তিনদশক পরিকান্ত, হ্রস্বকায় এই নিবন্ধে একবার ফিরে দেখব কবির অভিষেকমুহূর্ত শুধু।

২
উপন্যাস সম্পর্কে এই নিরুক্তিটি আমরা জানি যে জগতের প্রত্যেকে একটি-অন্তত অনন্য উপন্যাস উপহার দিতে সক্ষম;—উপন্যাসের নন্দন বিবেচনায় এই অনন্যতা আদৌ গরহাজির থাকুক অথবা হাজির, শিল্পরূপাৰয়বিক ঔৎকর্ষ-ঔজ্জ্বল্যগত অল্পবিস্তর তরিতম সত্ত্বেও, প্রত্যেকের আত্মজীবন যেহেতু অন্যের সঙ্গে তুলনীয় নয়, অভিষেকউপন্যাস যৌক্তিকভাবেই অতএব অনুপম ও অনন্য। রচকের যাপনকাহিনি ও জীবনবোধ, অন্তত প্রথম আখ্যানভাগে, শতচ্ছিন্ন অভাব-প্রভাব নিয়েও তুলনারহিতভাবে পৃথক। ঔপন্যাসিকের কব্জিজোর দ্রষ্টব্য, বলা হয়ে থাকে, পয়লা বালাম উপাখ্যান হাজিরার পর থেকেই বস্তুত।
কবির ক্ষেত্রেও ঘটনাটা তা-ই। পৃথিবীতে এই একটা জায়গায়, কবিতায়, সন্ধেবেলায় সূর্য ওঠে এবং সকালবেলায় চাঁদ। কবি-ও-কবিতা ভেদে যুক্তি-ও-কল্পনাশাসন বৈচিত্র্যে-ও-বৈভিন্ন্যে পৃথকতর কৌশলে ও রসে আঢ্য। কবিতা আবহমান দুই বোবার মধ্যস্থ যোগাযোগোপায়। এবং কবিতায়, বলা বাহুল্য, কবি নিরন্তর ইশারা ধারণ ও সঞ্চারণের কাজটাই করে চলেন। সর্বজনে সেই ইশারা আদৌ সঞ্চার হবে না জেনেও কবি তার কৌশল বাতিল করতে গররাজি থাকেন যতক্ষণ-না আপন অন্তর্দেশ থেকে অনাসক্তি আসে, কেননা পার্থিব বোধ ও অভিজ্ঞানের বাইরে যেয়েই শুরু হয় কবিতার কাজ। কবি তার পরা-অপরাব্যঞ্জিত ভুবনের খোঁজতালাশ পাঠকেরে যে-তরিকায় দিতে চাইছেন, সেই তরিকায় সাক্ষর হবার উদযোগটুকু পাঠকেরেই নিতে হয় এগিয়ে এসে। এতদব্যতীত কবিতা আস্বাদনের পথসংক্ষেপ দুনিয়ায় আবিষ্কার হয় নাই। কবিতা শেষমেশ প্রত্যেক কবিরই নিজস্ব পথমানচিত্র অঙ্কনের অভূতপূর্ব কিমিয়া, সাগ্রহ অভিযানপ্রিয় পাঠক নিজের আনন্দে সেই পথরেখা চায় চিনে নিতে।
এইখানে, এই কবিতাবাহনে, এই বইয়ে, তেমনই এক নখর-ও-নহবতভরা জাগতিকতার দেখা পাওয়া যাবে সাঁটলিপিসৌকর্যের দ্রুতরেখ কয়েকটি ইশারায়। এর অ(ন)ক্ষরগুলো সনাক্তকরণে, কবি ও কবিতার ন্যায়, পাঠকের তরফ থেকেও ঘোর অভিপ্রেত। প্রবাহিত কবিতাপাঠক সকলেই টের পাবেন, এই বইয়ের, এবং যে-কোনো কবির অভিষেকপুস্তকের, ঘোর অতীব সংক্রামক, এবং অবধারিতভাবেই ইশারাজাগতিক।

৩
অভিষেক মাত্রেই অনুপম ও অনন্য। কবির হোক বা গায়কের নায়কের খেলোয়াড়ের। অভিষেক মাত্রেই অপূর্ব ও অনপনেয়। উপমার অতীত, অন্য তুলনারহিত। অভিষেক মাত্রেই স্বাগতযোগ্য। কবির মাড়ানো পথঘাট সম্পর্কে একটা আন্দাজ পেতে গেলে একটু অপেক্ষা করতে হবে। সেই-যে একটি নিরুক্তি নিবন্ধের দ্বিতীয় অংশে সেঁটে এসেছি, বিদেশি কোনো-এক এমিনেন্ট উপন্যাসলেখকের নামোল্লেখ না-রেখে, সেইখানে শেষে বলা আছে যে লেখকের জন্ম হয় দ্বিতীয় উপন্যাস থেকে। ডেব্যু সবসময় হাইলি অ্যাপ্রিশিয়েইটেড হয় যে-কোনো সভ্য সমাজে। ক্যারিয়ার কার কত দূরপাল্লার তা ঠাহর করবার জন্য অপেক্ষা করতে হয় দ্বিতীয় বইয়ের আগমন পর্যন্ত।
দু-দুটো পরিচ্ছেদচিত্র সহ প্রচ্ছদের শিল্পকর্ম রনি আহম্মেদের করা। আর কবির প্রতিকৃতিচিত্র করেছেন ফখরুল ইসলাম। বইয়ের বাহ্যিক আকৃতি ও ভিতরের বিন্যাস মনোরম, গতের অনুগত নয়, উন্নত। অনাড়ম্বর অথচ অবলোকনীয়। বইটা হার্ডবাইন্ড নয়, পেপারব্যাক; ফলে, দেখতে বেজায় ভালো। চোখধাঁধানো নয়, নয়নজুড়ানো।

৪
দুইটি পৃথক পরিচ্ছেদে বইটি বিন্যাস করা হয়েছে। এর প্রথমটি ‘তৃণবর্ণিল চিত্রচয়নিকা’ নাম্নী, দ্বিতীয় ও অন্তিম পরিচ্ছেদ ‘ধ্বনিবিদ্ধ তরুপত্রালি’। লিরিকধর্মী কবিতার সমাবেশ ঘটেছে পয়লা ভাগে, শেষভাগ গদ্যফর্ম্যাটেড প্রশস্ত কবিতায় সাজানো। অথবা আরেকভাবে বলা যায়, ফার্স্ট পার্টে একক ও কলেবরে ক্ষীণ কবিতারা অ্যাভ্যাইল্যাবল এবং লাস্ট পার্টে গুচ্ছক ও কলেবরে দীর্ঘ কবিতাদের ধারক। বইয়ের সার্বিক উৎপাদনমান ত্রুটিমুক্ত নয়। দ্বিতীয় মুদ্রণে গেলে সেসব ত্রুটি নিশ্চয় মেরামত করা যাবে। একদিন। বইয়ের এই সুবিধাটা আছে যে একবার মুদ্রিত বইয়ের সংস্করণ প্রকাশ করা যায়। ফিল্মস্টার থিয়েটারপার্ফর্মার স্পোর্টসপার্সনদের ক্ষেত্রে এই সুবিধাটা নাই। জিরো অথবা আলতো স্কোর নিয়া আউট হলেও অভিষেক ম্যাচ প্লেয়ার ও সমুজদার উভয়ের কাছেই স্মরণীয়। কবির কাছে যেমন তার ডেব্যু কবিতাবই স্মৃতিশিরোধার্য।
জাহেদ আহমদ
রচনাকাল ২০১৫ ফেব্রুয়ারি / সংস্কারকাল ২০২৬ জুন
গানপারে আহমদ সায়েম
- ধ্বনিবিদ্ধ তরুপত্রালি, তৃণবর্ণিল চিত্রচয়নিকা - June 22, 2026
- জাক প্রেভের, স্বপন সৌমিত্র ও কথার ফটোগ্রাফি - June 7, 2026
- গানের কথা গানের সুর শৈলশহর সমুদ্দুর - June 1, 2026

COMMENTS