গানের মানুষ ও মেঠোসুর সম্পাদক বিমান তালুকদার, আমাদের বিমানদা, সেদিন হঠাৎ করেই সিলেট থেকে আমাদের গ্রামে এলেন| বিমানদা মানেই মাটির গান, ভাটির গান, পাখির ঠোঁটে করে নিয়ে যাওয়া রোদের সৌরভ—সুরের এক নিরবধি বয়ে চলা মানুষের গান—জীবন ও জগতের সমস্ত যাতনার ভেতর থেকে যেন দোয়েলের উঁকি|
মেঘালয়ের পাড় ঘেঁষেই আমাদের গ্রাম ঘাগটিয়া| চিরকাল গ্রামটিকে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের বুক চিরে নিরবধি বয়ে চলা মনোরম যাদুকাটা নদী| বারোমাসি স্বচ্ছ ও কচুয়া জলের কোলাহল| নদীটির ঠিক পশ্চিম পাড়ে প্রায় ১০০ বিঘা জমির উপর প্রায় ৩,০০০ শিমুলগাছ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এশিয়ার বৃহত্তম শিমুলবাগান|
প্রথম দিন আমরা তিন জায়গায় মজমা বসিয়ে গান শোনলাম বিমানদার কাছ থেকে| কিছুক্ষণ শিমুলবাগানে ছোট্ট পরিসরে; তখন আমাদের সঙ্গী ছিল আলোকচিত্রী অমিয় হাসান, মাহবুব, আরজু, ফাহিম, তমাল, এরশাদ, তোফায়েল, মুন্না, জোনায়েদ, তাসকিন, মিজান, ইফতেখার এবং আরও একজন অপরিচিত গানের মানুষ যিনি ডুপকি বাজিয়ে আমাদের সঙ্গে ছিলেন| তখন আমাদের গান নজর কেড়েছিল শিমুলবাগানে ঘুরতে আসা নবীন থেকে প্রবীণ সকল পর্যটকদের|

তারপর আমরা মাহারাম নদী পার হয়ে চলে যাই বারেক টিলায়| সেখানে গিয়ে আমরা অনেক শিশুকিশোরদের সাথে গানের আড্ডায় মেতে উঠি| এবং সেই গানের মজমাটা বিশাল বড় হয়ে ওঠে| শিমুলবাগানের আয়তনের তুলনায় সেদিন বেশি পর্যটক থাকায় গানের সুরে সুরে সেখানে অনেক মানুষ জড়ো হতে থাকে এবং পাশের গ্রাম লাউড়ের গড় থেকে আমাদের সাথে যুক্ত হন ফখরুল হাসান রেজা|
এই আড্ডায় অনেক অপরিচিত গানের মানুষ আমাদের সাথে গান করেন এবং নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে চারিদিক মাতিয়ে তোলেন| সেখানকার পরিবেশ ছিল খুবই প্রাণবন্ত| সীমান্তবর্তী পাহাড়, নদী, ফালামগড়া ও বৃক্ষের গভীর ছায়ায় গানে গানে মানুষের কথা, জীবন ও নদীর কথা| সেখানে আব্দুল করিম ও হাসন রাজা সকলের গলায় মধুর হয়ে ঝরে যাচ্ছিলেন আনন্দ হয়ে মৃত্তিকার ঘাসে শীতের সরল রোদের ভঙ্গিতে|

তারপর আমরা টিলার গোদারা মানে খেয়া পার হয়ে চলে যাই নদীর পাড় ঘেঁষা বিস্তৃর্ণ বালির মাঠ হেঁটে হেঁটে শাহ আরেফিন মোকামে| তখন সীমান্ত অঞ্চলে গাঢ় হয়ে গোধূলি নেমে এসেছে| কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা মোকামে পৌঁছাই| সেখানে হালকা চা-নাস্তা করে মোকাম পরিদর্শন করি| তখন সেখানে হইহই রইরই অবস্থা আশেকান ও ভক্তবৃন্দের আনাগোনায়| কতজন সেজদায়, কতজন গানে, কতজন মানতে ব্যস্ত| পাশে ভারতের সীমান্তের লাইটের হলুদ আলো গাছবিরিকের ফাঁক দিয়ে এসে আমাদের চোখে ঢেউ তুলে যাচ্ছিল| আমরা সীমান্তের দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সারি সারি সোডিয়াম বাতির আলো ও বাতাসের গতি শরীরে মাখি। তারপর একটা জায়গায় বসে মোমবাতি জ্বালিয়ে শুরু হয় গানের আসর| বিমানদা সেখানে জাহেদ আহমদের লেখা ও সুর-করা বেশ কয়েকটা গান গাইলেন| আর এমনিতেও সচরাচর বিমানদা যে-গানগুলো করে থাকেন প্রায় সবই জাহেদভাইয়ের লেখা ও সুর করা গান| আমি এখানে একটি গান তুলে ধরলাম :
মরলে পরে তুমি আমার শ্মশানবন্ধু হইও
সতী সাবিত্তিরির মতো শুদ্ধাচারে বইও
লইলে লইও দয়ালহরির নামটি মুখে লইও
নসিবে না সইলেও আমার তুমি যেন সইও
কলঙ্ক মাখিলাম গায়ে তুমি শ্বেতশুভ্র রইও
চন্দ্রসূর্য্ সাক্ষি রেখে জয়জীবনে মজিও
করে না যা বঞ্চনা তা-কিছুরে পূজিও
দুধকলা দিয়া আদুল বিলাইটা পুষিও
সকালবেলায় টবের গাছের গোড়ায় পানি দিও
তুলসীতলায় সাঁঝের বেলায় আরতি রাখিও
মুরগিগুলার ফৈরে হাতের আদর বুলাইও
খুদিকুড়ার সঙ্গে মধুর মমতা মাখাইও
দুঃখ তোমায় দিসি যত সবই ভুলে যাইও
দুনিয়াবি বিভেদ ভুলিয়া মিলনের গান গাইও
গল্পছলে স্মৃতিপুঁতির মালাটা গাঁথিও
গত অনাগত সবে ভালোটিবাসিও
বলিও বলিও তোমার পুত্ররে বলিও
মনে যদি না-রয় চুম্বন মনে করাইও
অন্তরের অন্তস্থল থেকে আমার আশীর্বাদ জানিও
হতভাগা বাপের সোহাগ কন্যারে পৌঁছাইও
ভবিষ্যতে কি হয় না-হয় কিচ্ছু না ভাবিও
প্রণয়লীলায় প্রাণবন্ত ভরসা রাখিও
সুরমাগাঙে ভেলায় চেপে ইন্দ্রের দেশে যাইও
দোহাই আরেকটিবার তোমার সংসারে ফিরাইও
মুহূর্তেই অনেক অপরিচিত গানের মানুষ জড়ো হয়| তুমুল গানে ও সুফিকথনে শেষ হয় গানের আসর| গান শেষে বিমানদাকে আসরের একজন শ্রোতা বলছিলেন আপনাকে আমি চিনি| জিন্দাবাজারে দেখি| সবসময় এই দুটো ব্যাগ আপনার সাথে থাকে| নানা জায়গায় হাঁটতে দেখি| তিনি একজন রিকশাচালক| বিমানদা বলছিলেন, হ্যাঁ, একটা দোতারার ব্যাগ আর নিজের ব্যাগ দেখিয়ে এইটার ভেতরে ডুপকি, মন্দিরা আর গান থাকে|

অন্য মানুষজনের গান শোনার আরও আগ্রহ ছিল| আমাদেরও ছিল, থাকতে পারলে ভালো লাগত| কিন্তু রাতে গোদারা বন্ধ হয়ে যাবে বলে আমাদের এগোতে হলো| তারপর অটোরিকশা নিয়ে আমরা চলে আসি লাউড়ের গড় বাজারে| সেখানে ‘এলজি ওয়ারিয়র ক্রিকেট ক্লাব’-এ বসে চা-বিস্কুট খেয়ে গোদারাঘাটে অর্থাৎ খেয়াঘাটে আসি| গোদারা পার হয়ে শিমুলবাগানের পাশের দীর্ঘ বালুর মাঠ, গ্রামের অন্ধকার দেখে দেখে হেঁটে চলে আসি আমার বাড়িতে অর্থাৎ ঘাগটিয়ার বাঁশপাড়ায়| তখন আমাদের সঙ্গীরা আলাদা-আলাদাভাবে বাড়ি চলে গিয়েছেন|
আমাদের ঘরে আম্মার স্নেহমাখানো ভাত খেয়ে মানে রাতের খাবার শেষ করে আমি, বিমানদা ও কবি সাইমুন হক চকবাজারে গেলাম| সেখানে গিয়ে দেখা হলো সুন্দরপাহাড়ী গ্রামের আলমগীরভাইয়ের সাথে| উনি গানের মানুষ| যখন আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন থেকে উনারে গরম পীরের মাজারে দেখি উনি গানবাজনা করেন| আমাদের চা খাওয়ালেন বাজারে| তারপর আমরা ভাইস চেয়ারম্যানের বালুর মাঠ নামে পরিচিত মাঠে গিয়ে গানের আসর বসাই, তখন আমাদের সাথে যুক্ত হয় দুই তরুণ ফয়সাল ও জুনায়েদ| আড্ডা শেষ করে বাড়িতে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি|

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা শেষ করে আমি, বিমানদা, সাইমুন রওনা করি দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের বড়দল নতুনহাঁটি গ্রামে| সেখানে ঘণ্টা দেড়েকের ভেতর আমরা পৌঁছে যাই| রাস্তা খারাপ থাকায় মোটরসাইকেল আমাদের নামিয়ে দিলো, তারপর কিছু জায়গা হেঁটে যাওয়া লাগল কিন্তু দোস্ত রিমন ও আরও একজন আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে আসলো| অবশেষে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে| সেখানে আমার আরও কয়েকজন বন্ধু আমাদের অপেক্ষায় ছিল| সেখানে গিয়ে দোস্ত রিমনের বাড়িতে উঠি| খাওয়াদাওয়া করি| একটু মাটিয়ান হাওর ও বড়দল এলাকাটা ঘুরে দেখি| বিকেলের দিকে মাটিয়ান হাওরের বুকে শিশুকিশোর ও কৃষক-শ্রমিক আর মেহনতি মানুষ নিয়ে রমরমা এক গানের আসরে বিমানদা উজালা করে তুললেন হাওরপাড়ের মানুষজনকে| একে একে গাইলেন :
‘মাটির আসরে / বনের বাসরে’
‘সকালে উঠিয়া বলো শুভ সকাল / শুভ রক্তজবার ডাল’
‘পড়ো দইয়ল পাখির নামে / পড়ো সবুজ পাতার খামে / পড়ো অশ্বত্থ বটের ছায়া / আকুল আপনজনের মায়া’
‘মন চলো চলো ভ্রমণে / একলা নিতাই হৃদয়স্পন্দনে’
‘পুবালি বাতাসে / গন্ধ ভেসে আসে’
‘দেখার হাওরে পেয়েছি দয়ালের দরিশন / ভবগৃহে কেউ নাই আমার আরিপরিজন’
গানের ফাঁকে ফাঁকে আমরা কৃষকদের সমস্যা ও হাওরপাড়ের জীবন নিয়ে আলাপ করলাম| জানতে চাইলাম কি কি সমস্যায় আছেন সবাই, কীভাবে জীবন অতিবাহিত করছেন, ইত্যাদি বিবিধ বিষয়| সেখানে গোধূলির মেরুন সূর্যের অস্তে যাওয়ার পর শেষ হয় আমাদের গানের আড্ডা, কিন্তু কৃষক-শ্রমিকদের সাথে আলাপ আড্ডা চলমান থাকে হাওরের বুকে ছোট ছোট খড়ের ঘরে|

যখন সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাতের দিকে যাচ্ছে তখন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা জোহান নামের এক বন্ধুর গাড়ি করে বড়দল থেকে তাহিরপুরের দিকে যাত্রা করি| কিছুক্ষণের মধ্যে তাহিরপুর পৌঁছেই সাংবাদিক বাবলুভাইয়ের বাসায় যাই| উনার বাসা উপজেলার পাশেই| বাসা চিনতে কষ্ট হয়নি, উনি বাসার গেইটেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাদের অপেক্ষায়| বিমানদা মেঠোসুর লিটলম্যাগটা বাবলুভাইকে দিলেন এবং হাওরের মানুষের জীবনমান ও শিল্পসংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে নানা আলাপ করলেন সংক্ষেপে| বাবলুভাইয়ের আন্তরিকতা টের পেলাম| তারপর চা-নাস্তা করে আমরা উনার বাসা থেকে বের হয়ে তাহিরপুর বাজারে বাইকস্ট্যান্ডে আসি| কিন্তু ঈদের সময় থাকার কারণে এবং কিছুটা রাত হয়ে যাওয়ার কারণে ন্যায্য ভাড়া থেকে একটু বেশি ভাড়া চাইছিল মোটরসাইকেলড্রাইভার| তখন বন্ধু জোহান বললো—চলো, আমিই গাড়ি করে দিয়ে আসি|
আমরা পরিস্থিতি বুঝে জোহানকে নিয়ে রওনা করি ঘাগটিয়ার দিকে| কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসি ঘাগটিয়া| গরমপীরের মাজারে এসে আমরা গাড়ি থেকে নামি| ঘাগটিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই গরমপীরের মাজার| বছরে দুইটা ওরস হয় মাজারে উনার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে—সে এক রমরমা উৎসব| যা-হোক, সে-আলাপ আপাতত রাখি| মাজারে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে আলমগীরভাই ও আরও কিছু গানের মানুষ ও বাউল-ফকির| মাজারের ভেতরে গেলাম| ভেতরে ঢুকেই বুঝতে পারলাম আমাদের অপেক্ষায় সবাই বসে আছে| আসর শুরু হলো—বিমানদা গান ধরলেন| গানগুলো হলো :
‘স্বাগত জানাই / বিশেষ দিবার কিছুই নাই / তোমায় স্বাগত জানাই’
‘আদরে আদরে যাবে রাত / আসিবে প্রভাত’
‘অল্প খাইতে হয় অল্প পড়তে হয় / মানবজন্ম লইলে অল্প ঘুমাইতে হয়’
‘এসেছিলাম সুরমা গাঙে ভেসে বেড়াতে / দেখার হাওরে পড়ল নৌকা আফালের হাতে’
‘ভবনদী পার করিবা আমারে তেনায় গো নবি মোস্তফায় / ভবনদী পার করিবা আমায়’
তারপর গান গাইলেন বাউল আনোয়ার পাশা, আলমগীরভাই, পাগল আকাশ; আর যারা নানা যন্ত্রপাতি বাজালেন তারা হলেন কুহিনুরচাচা, সাজ্জাদ নুর ভাই এবং নাম-না-জানা আরও সাত-আটজন| পরে আমাদের সাথে যুক্ত হলেন মাজারের খাদিমসাহেবের বড়ছেলে গোলাম শহীদ সাহেব| উনি চা-বিস্কিট খাওয়ালেন এবং গান ও মাজার নিয়ে অল্পস্বল্প আলাপ করেলেন বিবিধ| আড্ডা শেষ করে আমরা হেঁটে হেঁটে বাড়ির দিকে যাই| আমাদের বাড়ি মাজারের পাশেই—হেঁটে গেলে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট লাগে| বাড়িতে এসে খাওয়াদাওয়া করে সেদিন ঘুমিয়ে পড়লাম|
পরদিন সকালে উঠে আমরা তিনজন বিমানদা, কবি সাইমুন হক ও আমি রওনা করলাম রাজারগাওয়ের দিকে| সেখানে আমাদের বিদায় জানাতে গেলেন আলোকচিত্রী অমিয় হাসান| কারণ আজকেই চলে যাবেন বিমানদা তাই শেষবার মোলাকাত ও বিদায় জানাতে অমিয় হাসান বিন্নাখুলী গোদারাঘাটে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন| গোদারা পার হয়েই আমরা পেলাম আরেক নতুন সঙ্গী—কবি মনোয়ার পারভেজ| সে বিশ্বম্ভরপুর থেকে এসেছে| সঙ্গী একজন যোগ হলেও বিয়োগ হলো কবি সাইমুন হক| সে চলে গেল সিলেটে জীবনমুখী ব্যস্ততার জন্য|

বিন্নাখুলী বাজার থেকে উত্তরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে গেলাম শ্রী অদ্বৈত আচার্য প্রভুর প্রধান জন্মধাম বা আখড়াতে| সেখানে মধুদাদা নামে একজনের সাথে আমাদের দেখা হয়, আলাপ হয় নানা বিষয়ে| উনিই আমাদের ব্যবস্থা করে দিলেন আখড়ার ধর্মশিক্ষিকা আনিকা রায়ের মাধ্যমে বেশকিছু শিশুকিশোর| আনিকা রায়ের সঙ্গেও তখনই পরিচয় হলো| তিনি জানালেন দুপুর আড়াইটা নাগাদ সকল শিশুকিশোররা আসবে—ততক্ষণ আমাদের অপেক্ষা করতে হবে| মূলত তাদের সঙ্গে গানে গানে আনন্দ ভাগাভাগি করাই ছিল আমাদের এই সফরের উদ্দেশ্য|
ঘড়িতে তখন বারোটা সমান সমান| আখড়ার সেবায় যিনি নিয়োজিত থাকেন তিনি আমাদের বললেন, কিছুক্ষণ পর প্রসাদ দেওয়া হবে—তার আগে আপনারা স্নানটা সেরে ফেলুন| আমরা তিনজন যাদুকাটা নদীর দিকে এগোতে লাগলাম| আখড়া আর নদী পাশাপাশিই| নদীর ঘাটেই মূলত আখড়া| স্নান সেরে আখড়ায় এসে প্রসাদ খেলাম| ততক্ষণে প্রায় আড়াইটা বেজে গেল| এরপর আনিকা রায় শিশুকিশোরদের জড়ো করলেন রাজারগাও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে একটা মাঠে| আমরা সেখানে গিয়ে চাটি পেতে সবাইকে নিয়ে বসলাম| আমরা তখন সকলের সাথে পরিচিত হলাম| তারপর বিমানদা একটা গান ধরলেন—
ঝাঁকেঝাঁকে কবুতর চালেচালে ঘর
মোমের(ও) বাত্তি জ্বলে মানুষের ভিতর
বোঝে না কেউ বোঝে না আমি কিসের তর
আমারই জিম্মাদারি নিসর্গনশ্বর।
শহর নগর বন্দরে এই খবর রটাই
বিপদের সময় মানুষ ছাড়া সহায় নাই
মানুষের স্বভাবে হাজার প্রকার দোষ
দুঃখদৈন্যে মানুষ খোঁজে মানুষের সন্তোষ।
কল্পলোকের আসরে গল্পধানের খই
সিদ্ধিখোরের দেশে সিদ্ধ সহজ মানুষ কই
নিরাই শ্রীরাই সুরমায় চিরাইকলের সুর
বাত্তি নিভিয়া গেলে কে আপন কে পর।
এই গান শুনে সকলেই আনন্দিত হয়ে ওঠে এবং আশেপাশের ঘরবাড়ি থেকে অনেক নারী-পুরুষ জড়ো হতে থাকে| তখন বিমানদা শিশুকিশোরদের জন্য গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী গান খেলাচ্ছলে গাইলেন : ‘আয় মোরা সবাই মিলে / নাচিয়া গাহি তালে তালে’, ‘বাংলা ভূমির প্রেমে আমার প্রাণ হইল পাগল / আমি বাংলা প্রেমে ঢাইলমু আমার দেহমনের বল’, ‘হাসবে খেলবে নাচবে গাইবে / খাটবে ভুলে ভয় আর মান / দেহের তেজ আর মনের তুষ্টি / আনন্দে উথলাবে প্রাণ’, ‘ছুটব খেলব হাসব / সবায় ভালো বাসব’, ‘লাগো কাজে কোমর বেঁধে / খুলে দেখো জ্ঞানের চোখ / কোদাল হাতে খাটে যারা / তারাই আসল ভদ্রলোক’, ‘কৃত্যে নৃত্যে পূর্ণ করে রে কায়মনপ্রাণ গড়ে নে’|

এরপরে আরও কিছু গান হলো| বাচ্চাদের নিয়ে খেলাধুলা হলো| তখন সন্ধ্যা নেমে আসছিল| পৃথিবী আর আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল, ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছিলাম আকাশের গুড়ুম গুড়ুম শব্দে| তারপর বিদায় নিয়ে আমরা হাঁটা শুরু করি বিন্নাখুলী বাজারের দিকে| বাজারে আসতেই ভয়ানক ঝড়তুফান শুরু হয়ে যায়| আমরা একটা মসজিদে গিয়ে উঠি| ঝড় থামার পর একটা রেস্তোরাঁয় চা-নাস্তা করে আমি চলে আসি বাড়িতে আর বিমানদা ও মনোয়ার স্মৃতি নিয়ে চলে যায় গানের মালা দান করা বিশ্বম্ভরপুরের দিকে—যেন উড়ে যাচ্ছে সাদা দুটি বক ছায়া ফেলে যাদুকাটার বুকে…
জুন ২০২৬
রোদ্দুর রিফাত রচনারাশি
জঙ্গলে দেজাভু
- জাকির জাফরান, বাংলা কবিতার তিন দশকের তবিলদার - August 6, 2026
- শোনো পুঁইপাতা, জাকির জাফরান ও এক গার্ডেনারের গান - August 4, 2026
- শোনো পুঁইপাতা || জাকির জাফরান - August 4, 2026

COMMENTS