ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী || পাপড়ি রহমান

ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী || পাপড়ি রহমান

শেয়ার করুন:

০১.
আঁধার নেমে আসবার ঠিক আগ মুহূর্তে অদূরের পাহাড়গুলিকে নিস্তরঙ্গ নদীর মতো দেখায়। যেন ওতে জলের ঘনঘটা নাই, ওঠানামা নাই। বিদায়ী সূর্যের লালাভা গায়ে মেখে মৃতবৎ পড়ে আছে এক সুদীর্ঘ নদী। নদী নাকি স্বর্গের পথ? পথ নাকি পাহাড়? পাহাড় নাকি মরুভূমি? মরুভূমি নাকি সমুদ্দুর? এইরকম নানান ভুলভুলাইয়ার ভিতর ক্রমাগত ঘুরপাক খাওয়া আমি স্বর্গ বা নরকের ঠিকানা স্থির করতে পারি না। কিংবা আমি কি পেরেছি এই পৃথিবীর ঠিকানা স্থির করতে? নিজের স্থায়ী বা অস্থায়ী ঠিকানা? কিংবা অন্যের?

এই বেশ ভালো আছি তবে—
সুতের শ্যাওলা হইয়া ভাসিয়া বেড়াই…

জানালার কাচে এসে দামাল বাতাস মাথা ঠুকে যায়। কেমন ঝমঝমিয়ে বেজে যায় এখানকার বাতাস। যেন কোনো জিপসি যুবতী এখুনি ওর বহুবর্ণা ঘাঘরা দুলিয়ে নেচে উঠবে তুমুল। ওর গলায় বেজে উঠবে সুর। যে-সুর শুনলে আপনাআপনি নত হয়ে উঠবে হৃদয়। আর মনে পড়ে যাবে জীবনের ভুলগুলির কথা। ভুলগুলি নাকি ফুলগুলি? নাকি প্রস্ফুটিত ভুল আর ফুলেদের মিশ্রণে গড়ে ওঠা অদ্ভুত এক পাহাড়। যাকে দূর থেকে দেখলে মরা নদী বলে বিভ্রম জাগে।

এখানকার অস্থির হাওয়ার ডানায় ভেসে থাকে হিমকণা। অক্সিজেনে ঠাসা এই হাওয়াতে নিঃশ্বাস নিলে ভারি আরাম বোধ হয়। আহ! যেন কেউ গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে—

কেন তবু বারে বারে ভুলে যাই / আজ মোর কিছু নাই / ভুলের এই বালুচরে / যে-বাসর বাঁধা হলো / জানি তার নেই কোনো দাম / আজ সাগরের ঢেউ দিয়ে সবকিছু মুছিয়া দিলাম।

পাহাড়কে ঘিরে থাকা সূর্যের রক্তাভা শরীরে মেখে মেঘের পুচ্ছ ঝুলে আছে আমার দুই চোখের কর্নিয়ার কাছাকাছি। আর অগুনতি যানবাহন সাঁই সাঁই করে ছুটে চলছে। ওদের হেডলাইটের আলো দেখে দিন নাকি রাত, রাত নাকি দিন এই প্রশ্নের তল পাওয়া যায় না।

অদ্ভুত বিষয় হলো, অন্টারিওর এই লন্ডন সিটিতে নাই কোনো ট্রাফিক জ্যাম। রিক্সা বা অটোর বিশৃঙ্খলা। লোকাল বাসের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি। যেসব বাস কি-না দুইপয়সার জন্য খানিক বাদে বাদেই কচ্ছপ গতিসম্পন্ন হয়ে যায়। দুইপয়সার জন্য ঢিমেতেতালা চালে চলে। দুইপয়সার জন্যই কাইজ্যাফ্যাসাদ করে। এমনকি খুনখারাবিও করতে পারে এই মাত্র দুইটা পয়সার জন্যই। বাসের হেল্পার দুই টাকার জন্য অবলীলায় প্যাসেঞ্জারকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় রাজপথে। প্যাসেঞ্জার চলে যায় গাড়ির চাকার তলায়। আবার উল্টা চিত্রও দেখা যায়।  মারমুখী প্যাসেঞ্জারের রামধোলাই খেয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করে কোনো নওল কিশোর, আসল নাম মুছে গিয়ে হেল্পার হয় যার নাম। হেল্পার মরলেই কী কিংবা প্যাসেঞ্জার মরলেই কী? সব মৃত্যুর ঘটনাই আমাদের দরিদ্র দেশের সুশীল মানুষ ব্রেকফাস্টের টেবিলে ধূমায়িত চায়ের সঙ্গে পান করে ফেলে। ওয়াশরুমে ঢুকে কমোডের ফ্ল্যাশ টানার সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃত হয়ে যায় খুন-গুমের মতো সিরিয়াস বিষয়আশয়। যেন ডেইলি রুটিনে থাকবেই কিছু মৃত্যুসংবাদ। কিছু গুম বা খুনের ঘটনা। আর রাজনীতিবিদদের পল্টিবাজি।

তেমনি খাদ্যে ভেজালও অবধারিত। বাজার করতে গিয়ে ভেজাল জিনিস কিনতেই ছিলাম অভ্যস্ত। মাছে ফরমালিন। ফল আর সব্জির বিষ উদরে ঠেসে আমাদের প্রতিদিন নীলকণ্ঠ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা।

আহহা, এই হিমের দেশে এসে বড্ড মিস করছি সেসব। চিরচেনা দৃশ্য এখানে অনুপস্থিত। যেন কোনো সভ্যদের দেশে নতুন করে জন্ম হয়েছে আমার। কিংবা আমি বাস্তব জীবনে যা দেখছি, এসব যেন কোনো সেলুলয়েডের ফিতায় চলমান। হররোজ দেখছি, যাপন করছি যা-কিছু সেসবের নাম আর্টফিল্ম। ওরফে চিরকালীন ক্ল্যাসিক।

‘চামারের পেটে হজম না হওয়া ঘিয়ের’ দশা ইয়াদ করে শঙ্কিত হয়ে আছি, এতসব ক্ল্যাসিক নিয়ে কখন না জানি আমি মুখ থুবড়ে পড়ি? আর তাতেই না থেঁতো হয়ে যায় আমার নাকচোখের আদি ও অকৃত্রিম ঢকনকশা!

ভরসার কথা, এইখানে আছে বিশুদ্ধ দামাল হাওয়ার দৌরাত্ম্য।
আমার আসন্ন পতন ঠেকাতে এই হাওয়ার ওপর নির্ভর করা যায়।

তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে / টুকরো ক’রে কাছি / ডুবতে রাজি আছি / আমি ডুবতে রাজি আছি
সকাল আমার গেল মিছে, / বিকেল যে যায় তারি পিছে / রেখো না আর, বেঁধো না আর / কূলের কাছাকাছি।

সমূহ পতন ঘটাতে বা সমূহ পতন ঠেকাতে খোলা হাওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য আর কে আছে, বলো?


ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you