ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৬ / আমাদের মহাকালের যাত্রাপথ || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর

ধরিত্রীর নিকট প্রেমের চিঠি-৬ / আমাদের মহাকালের যাত্রাপথ || তিক নাত হান || ভাষান্তর : জয়দেব কর

শেয়ার করুন:

প্রিয় ধরিত্রী মা,
বিস্ফোরিত নক্ষত্রের ধূলিকণা ও নাক্ষত্রিক গ্যাসের ভেতর থেকে তুমি আর পিতা সূর্য যখন প্রথমবার রূপ লাভ করেছিলে তা কি তুমি মনে করতে পারো? তখনও তুমি আজকের মতো নবীনতার রেশমী আচ্ছাদনে আবৃত হওনি। সেই সময়, মা, প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে, তোমার গায়ে ছিল গলিত শিলার তৈরি পোশাক। অচিরেই তা শীতল হয়ে শক্ত ভূত্বকে রূপ নিল। তখন পিতার আলো আজকের দিনের তুলনায় অনেক কম তীব্র ছিল। কিন্তু তোমার পাতলা বায়ুমণ্ডল সেই তাপকে ধরে রেখেছিল, যাতে তোমার সাগরগুলো বরফে পরিণত না হয়। জীবন ধারণের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রথম কয়েক শত মিলিয়ন বছরে তুমি অগণিত প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছ। তোমার আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে এসেছিল প্রচণ্ড তাপ, আগুন আর গ্যাস। আর তখন তোমার ভূত্বক থেকে নির্গত বাষ্প হয়ে উঠল ধীরে ধীরে মেঘ, আর সেই মেঘ থেকে জন্ম নিল বিস্তীর্ণ মহাসমুদ্রের জল। তোমার নিজের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিই ধরে রাখল জীবনধারণকারী সেই আকাশকে, আর তোমার চৌম্বক ক্ষেত্র তাকে রক্ষা করল সূর্যবায়ু ও মহাজাগতিক রশ্মির প্রখর আঘাত থেকে।

কিন্তু, মা, বায়ুমণ্ডল গঠনেরও বহু আগে তুমি সহ্য করেছিলে এক ভয়ংকর আঘাত। এক বিশাল মহাজাগতিক পিণ্ড যার আয়তন প্রায় মঙ্গলের সমান ছিল, তার সাথে ঘটেছিল তোমার সংঘর্ষ। সংঘর্ষের দরুণ, সেই গ্রহের একটি অংশ মিশে গেল তোমার সঙ্গে, আর বাকিটা তোমারই ভূমধ্যস্তর ও ভূত্বকের কিছু অংশ নিয়ে রূপ নিল চাঁদে। প্রিয় ধরিত্রী মা, চাঁদ তোমারই এক অংশ, স্বর্গীয় অপ্সরার মতো সুন্দর। সে তোমার স্নেহময়ী বোন, চিরকাল তোমার সঙ্গেই চলে, তোমাকে ধীর হতে এবং ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে, আর তোমার দেহে সৃষ্টি করে জোয়ার-ভাটার ছন্দময় স্পন্দন।

আনন্দময় ও সুরেলা এক নৃত্যে পিতা সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত আমাদের সমগ্র সৌরজগৎ একটি পরিবার। প্রথমে রয়েছে বুধ— ধাতব প্রকৃতির, গহ্বরপূর্ণ, সূর্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী। তার পরেই আছে শুক্র— প্রচণ্ড তাপ, উচ্চচাপের বায়ুমণ্ডল এবং আগ্নেয়গিরিতে ভরপুর। এরপর আছ তুমি, প্রিয় মাতা পৃথিবী— সবচেয়ে সুন্দর, সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

শীতল ও নির্জন লাল গ্রহ মঙ্গল ঘোরে আমাদের পরের কক্ষপথে। আর তারপর গ্রহাণুপুঞ্জ অতিক্রম করে আসে গ্যাসীয় দানব বৃহস্পতি— সমস্ত গ্রহের মধ্যে আকারে সর্ববৃহৎ, নানা বৈচিত্র্যময় উপগ্রহের সমাবেশে পরিবেষ্টিত। বৃহস্পতির পরের কক্ষপথে রয়েছে শনি—অপূর্ব বলয়ে বিভূষিত গ্রহ। তারপর আসে সংঘর্ষের ফলে পাশ ফিরে কাত হয়ে থাকা গ্রহ ইউরেনাস। আর সবশেষে রয়েছে দূরবর্তী নীল নেপচুন— অশান্ত ঝড় ও প্রবল বায়ুপ্রবাহে পরিপূর্ণ।

এই অপরূপ মহিমার দিকে তাকিয়ে আমি গভীর বিস্ময়ে উপলব্ধি করি, হে প্রিয় ধরিত্রী মা, তুমি আমাদের সমগ্র সৌরজগতের সবচেয়ে মূল্যবান ফুল, মহাবিশ্বের বুকে ঝলমল করা এক সত্যিকারের রত্ন।

তোমার বুকে প্রথম জীবের আবির্ভাব ঘটতে সময় লেগেছিল প্রায় এক বিলিয়ন বছর। সেই আদিযুগে জটিল অণুগুলো, সম্ভবত বহির্বিশ্ব থেকে আগত, ধীরে ধীরে একত্রিত হতে শুরু করল, আত্মপ্রতিলিপিকারী গঠন তৈরি করে ক্রমে জীবন্ত কোষের মতো হয়ে উঠল। দূরবর্তী নক্ষত্রমণ্ডল থেকে আসা আলোককণারা তোমার বুকে এসে স্থির হলো, যেন তারা তোমার নবজন্মের সাক্ষী হতে চায়। ক্ষুদ্র এককোষী জীবেরা ধীরে ধীরে বড়ো ও জটিল রূপ নিল; এককোষী প্রাণীরা বিকশিত হয়ে বহুকোষী জীবের জন্ম দিলো। জীবনের এই বিকাশ শুরু হয়েছিল তোমার গভীর সমুদ্রের অন্তরাল থেকে। সেখানে তারা বৃদ্ধি পেতে লাগল, সমৃদ্ধ হতে লাগল, এবং তোমার বায়ুমণ্ডলকে ক্রমে আরও বাসযোগ্য করে তুলল। ধীরে ধীরে গঠিত হল ওজোনস্তর, যা ক্ষতিকর বিকিরণকে তোমার পৃষ্ঠে পৌঁছতে বাধা দিল এবং এর স্থলভাগেও জীবন বিকাশকে সম্ভব করে তুলল। এরপরেই, যখন সালোকসংশ্লেষণের অলৌকিকতা বিকশিত হলো। সূর্যের আলো আর তোমার প্রাণশক্তির মেলবন্ধনে তখন তুমি পরলে আজকের মতো সেই অপূর্ব সবুজ আবরণ, জীবনের প্রতীকস্বরূপ এক চিরন্তন শাড়ি, যা এখনও তোমার শরীরে জ্বলজ্বল করে।

কিন্তু, সমস্ত কিছুই অনিত্য এবং পরিবর্তনশীল। তোমার ইতিহাসের দীর্ঘপথে জীবনের অগণিত রূপ বারবার ধ্বংস হয়েছে। পাঁচ বারেরও বেশি সময় তোমার বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে বিলুপ্ত হয়েছে জীবন। প্রায় পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর আগে এক বিশাল গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসরসহ অন্যান্য জীবপ্রজাতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। প্রিয় মা, সকল কঠোর পরিস্থিতিতে তোমার এই সহনশীলতা ও সৃজনক্ষমতার প্রতি আমি গভীর বিস্ময়ে অভিভূত। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার এই অনন্তযাত্রার কথা আমি স্মরণে রাখব; আমি এই সচেতনতা নিয়ে বাঁচব যে, আমরা সকলে তোমারই সন্তান, আর আমাদের দেহ ও প্রাণ নক্ষত্রেরই ধূলিকণায় গঠিত। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, জীবনের এই মহিমান্বিত মহাসংগীতে আমিও আমার আনন্দ এবং ঐক্যতানের শক্তি নিবেদন করে আমার অংশটুকু পালন করব।


তিক নাত হান অনুবাদ
জয়দেব কর রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you