ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০২ || পাপড়ি রহমান

ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী / ০২ || পাপড়ি রহমান

শেয়ার করুন:

০২.
মুক্তা যেমন শুক্তির বুকে—এ-রকম একটা বাসনা মনে মনে পোষণ করি বলে রাজ্যির চাপ এসে আমাকে ধরাশায়ী করে ফেলে। এত বয়স পেরিয়ে এসেও আমার অধরা বাসনা থেকে মেলে না কোনো মুক্তি। কী এক অবসাদ নাকি ঘোরগ্রস্ততা? নাকি নির্বাণ নাকি শান্তি? অথবা শাস্তি? বহু হইলো একজীবনে, আর কত হে পথিক? শাস্তি কিংবা অশান্তির সরীসৃপের বিষাক্ত ছোবল থেকে এতকাল পর হয়েছে আমার উদ্ধার। মানুষের বিষের চাইতে ভয়ঙ্কর বিষ আর কোনো প্রাণী বহন করে কি না আমার সত্যি জানা নাই।

মানুষের চাইতে ক্ষতিকারক দাহ্য পদার্থ আর কিছু আছে কি না সে-বিষয়েও অজ্ঞ।

আহ! ‘টুকরো করে কাছি আমি ডুবতে রাজি আছি’—এই ডুব হলো নিজের ভিতরে ডুব দেয়া। ডুবুরীর মতো ক্রমাগত অনুসন্ধান করা। অথই জলে ডুবে যদি মানিক পাওয়া যায়? ইচ্ছেরও ঝিনুকে নাকি মুক্তো ফলে? হৃদয় যদি সোনা হয় সহজে মেলে। সোনার সোহাগে হিয়া হয় সোহাগি। ভোলে না তখন মন মৃগের মায়ায়…

মেইপল পাতার ছায়া নিয়ে হেঁটে যাই ক্রমাগত। চৌপাশে কী শান্ত সুনিবিড় বন। পাহাড়ি ঢাল। বসন্ত এল বলে। এখানে বসন্ত মানে অগ্নিকাণ্ড। দাবানলের আভা নিয়ে দাউদাউ বনভূমি। এখুনি ঝরেছ পাতারা। হয়েছে জীর্ণ আর শীর্ণ। তবুও বৃক্ষদের কী রোয়াব! যেন ওরাই রাজামহারাজা! যেন মরিবার আগে মরতে নাই। যেন বলে দেয়—যুদ্ধ করে টিকে থাকার নামই জীবন। আহা! ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন / মন রে আমার / তাই জনম গেল শান্তি পেলি না রে মন / মন রে আমার…

সেই ভেঙেচুরে চৌচির হয়ে থাকার দিনগুলি! কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন কতভাবে যে অভয় দিতেন! বলতেন—
যুদ্ধ করে টিকে থাকার নামই জীবন।

এত যুদ্ধ! এত যুদ্ধ! কেন টিকতে হলো? কেন টিকতে হয়? অথচ আমি তো এভাবে টিকে থাকতে চাইনি।

পেছনে তাকালে গা কাঁপিয়ে জ্বর আসে। এ-রকম উত্তাল সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে পারে এসে দেখি ধূ ধূ বালিয়াড়ি। বালির পাহাড়। পা ডেবে যায় হাঁটু অব্দি। বালিতে মোড়ানো পায়ের দিকে অথর্ব হয়ে তাকিয়ে থাকি। আমার আর চলার শক্তি নাই। আর কোনো যুদ্ধ করার মতো বল আর দেহে নাই।

মেইপল পাতারাও কী ক্লান্ত হয়? আর ঝরে পড়ে? আর হয়ে ওঠে মর্মর!

কিংবা শুকনো পাতার নূপুর! কাজী নজরুল ইসলাম—বললেন না মর্মর। বললেন কি না ‘শুকনো পাতার নূপুর’। কী আশ্চর্য চিত্রকল্প!

সার বেঁধে দাঁড়িয়ে নেই মেইপল—তবুও কী রকম ডিসিপ্লিন! ওদের মন বুঝি পাতায় ছাওয়া?

এখানেও আসে রুদ্র বৈশাখ? বৈশাখ আসে না, আসে সামার। আসে ফল। আর আগুন লেগে যায় বনে বনে। ডালে ডালে ফুলে ফলে পাতায় পাতায় রে…!

এই মেইপল বৃক্ষেরা কী জানে যে বাংলাদেশ নামক একটা হতদরিদ্র দেশ আছে, যে-দেশের বেশিরভাগ মানুষ ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনও বদলে ফ্যালে।
যে-দেশে বাংলা প্রথম মাসের নাম—বৈশাখ!

“ওগো বৈশাখী ঝড়! ল’য়ে যাও অবেলায় ঝরা এ মুকুল। / ল’য়ে যাও বিফল এ জীবন—এই পায়ে দলা ফুল।। / ওগো নদীজল লহো আমারে / বিরহের সেই মহা-পাথারে, / চাঁদের পানে চাহে যে পারাবারে—অনন্তকাল কাঁদে বিরহ-ব্যাকুল।।”

কবি কাজী নজরুলের এ-রকম আকুতি কি পূর্ণ হয়েছিল? হয়তো।
যদি তিনি এই বনভূমিতে আসতেন কোনোদিন, তাহলে হয়তো লিখতেন ‘বাতায়ন পাশে মেইপল পাতার সারি’।

আমার থাকবার ঘরটাতে একটা জানালা আছে, যে-জানালা দিয়ে দেখা যায় পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। দিন ব্যাপে মেঘেদের চলাচল। কত মেঘ যে আসে আর ভেসে যায়!
কেন আসে আর কেনই-বা ভেসে যায়?

“কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে / তোমারে দেখিতে দেয় না /মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না / মোহমেঘে তোমারে অন্ধ করে রাখে / তোমারে দেখিতে দেয় না / মাঝে মাঝে তব দেখা পাই / চিরদিন কেন পাই না?”


ফরেস্ট সিটি দিনপত্রী
পাপড়ি রহমান রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you