আলুপোড়া খাওয়ার ইচ্ছা হইল। অথচ নিজের উদ্যোগে কখনো অ্যারেঞ্জ করে আলুপোড়া খাই নাই। আলুপোড়া খাওয়া হবে, এমন দাওয়াত থাকত। রাত জেগে সবাই মিলে অনেক আলু পোড়ানো হইত। আলু খাওয়ার চেয়ে সবাই মিলে আলু পোড়ানো আর একসঙ্গে বসে খাওয়াটাই ছিল বেশি আনন্দের। সেই আনন্দের মধ্যে আলাদা একটা মায়া ছিল।
সিলেট শহরের পাশেই, এমসি কলেজের পেছনে ‘আলুরতল’ নামের জায়গাটিতে আমাদের কথাকলি নাটকের দল থেকে একবার আলুপোড়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হলো। রাত দুই-তিনটা পর্যন্ত গানবাজনা আর আলুপোড়া খাওয়া চলল। কত কথা, কত হাসি, কত আনন্দ! সময়ের হিসাবে রাতটা হয়তো খুব দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু স্মৃতির হিসাবে সেই রাতের ব্যাপ্তি অনেক। দিনগুলো ফিরে পাওয়া কঠিন, কিন্তু আজ সেসব কথা মনে করে বেশ ভালোই লাগছে।
সেই দিনগুলোর কথা মনে করে আজ নিজেই ঘরের চুলায় আলু পুড়িয়ে খাইলাম। কিন্তু সেই ভালোলাগা বা স্বাদ—কোনোটাই পেলাম না। গ্যাসের চুলায় আলু পুড়িয়ে সেই স্বাদ পাওয়ার কথাও নয়। আলু তো ধানের খড় দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে খাইলেই বেশি ভালো লাগে। আগুনের আঁচ, পোড়া খোসার গন্ধ আর তার ভেতরের নরম আলু—সব মিলিয়ে অন্য রকম একটা স্বাদ। এখন সেইভাবে আলু পোড়ানোর আয়োজন করা সম্ভব কি না, জানি না। তবে আয়োজন করলেও সেই সময়টাকে কি আর ফিরিয়ে আনা যাবে?

নাটকের দলের সেই আয়োজনেরও আগে, যখন আরও ছোট ছিলাম, বছর শেষে নানাবাড়ি যাওয়ার বয়স। ডিসেম্বর মাস। খালাতো ভাইবোন, মামাতো ভাইবোন—এত এত মানুষ যখন একসঙ্গে হইতাম, তখন নানাবাড়িতে আলু পোড়ানোর আনন্দই ছিল আলাদা। কে কয়টা আলু খাইল, কে নিজের আলুটা আগুন থেকে আগে তুলে ফেলল, কে আবার পুড়ে যাওয়া খোসা ছাড়াতে গিয়ে আলু ভেঙে ফেলল—এসব নিয়েও কত হাসাহাসি হইত! তখনকার আলুপোড়ার স্বাদ বড় হয়ে খাওয়ার চেয়ে আনন্দের সঙ্গে বেশি জড়ানো ছিল। সেই আনন্দের ভাগ ছিল সবার মধ্যে।
আসলে ব্যাপারটা শুধু স্বাদের নয়, বয়সেরও। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখের স্বাদ যেমন বদলায়, তেমনি বদলে যায় আনন্দ উপভোগ করার ধরনও। একসময় যে সামান্য আয়োজনেই কত আনন্দ পাওয়া যেত, এখন অনেক আয়োজন করেও সেই আনন্দ পাওয়া যায় না। স্মৃতির মধ্যে স্বাদটা রয়ে যায়, কিন্তু বাস্তবে সেই স্বাদ আর আগের মতো ধরা দেয় না। হয়তো আলুর স্বাদ বদলায়নি, বদলে গেছি আমরা। বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে চারপাশের মানুষজন, বদলে গেছে একসঙ্গে থাকার সেই সহজ সুযোগগুলো।
তবু এখন নিজেরা সেই স্বাদ বা আনন্দ না পেলেও বাচ্চাদের আনন্দ দেখে খারাপ লাগে না। বরং ওদের আনন্দের মধ্যে নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর কিছুটা যেন দেখতে পাই। ওরা যখন আগুনের পাশে বসে আলু পোড়ায়, হাসাহাসি করে, নিজেদের মতো করে আনন্দ খুঁজে নেয়, তখন মনে হয়—আনন্দ আসলে হারিয়ে যায় না, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে তার ধরনটা শুধু বদলে যায়। আমরা হয়তো আগের সেই আনন্দ আর ফিরে পাব না, কিন্তু নতুনদের আনন্দের মধ্যে তার কিছুটা ছায়া দেখতে পারি।

আগের সেই আলুপোড়ানো সোনালি দিনের কোনো ছবি আর সংগ্রহে নেই। তাই আজ নিজের আয়োজনে করা আলুপোড়ার ছবি তুলে লেখাটার সঙ্গে রাখলাম। ছবিগুলো আজকের, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু আগের কতগুলো দিন, কতগুলো মুখ, কত হাসি আর কত স্মৃতি।
আলুপোড়া খেতে বসে আজ বুঝলাম, সব খাবারের স্বাদ জিভে থাকে না। কিছু স্বাদ জমা থাকে স্মৃতিতে। আর সেই স্বাদ ফিরে পেতে আলুর চেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সেই সময়, সেই মানুষগুলো আর একসঙ্গে থাকার সেই আনন্দের।
১০ অক্টোবর ২০২৬
আহমদ সায়েম রচনারাশি
- আলুপোড়া : স্বাদ, স্মৃতি ও সত্তা || আহমদ সায়েম - October 22, 2026
- মানুষের নিঃসঙ্গতা || মেকদাদ মেঘ - October 22, 2026
- তপন চৌধুরী, প্রিয় নব্বই ও নেত্রকোনা || আরেফিন টিটো - October 22, 2026

COMMENTS