নব্বইয়ের দশকের প্রণিধানযোগ্য কবি মাহবুব কবির নেত্রকোনা শহরে বেড়ে উঠেছেন। ছোটবেলা থেকেই কবিতা লেখার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে, লেখালেখিসূত্রেই প্রিন্টিং প্রেসের সঙ্গে, নেত্রকোনার বিশেষভাবেই সিদ্দিক প্রেসের সঙ্গে, তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। কবি মাহবুব কবির এবং তাঁর বন্ধুদের সম্পাদনায় সে-সময়ে প্রচুর সংকলন সাময়িকী লিটলম্যাগ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়েছে। স্মৃতি থেকে সে-সময়ের প্রেস ও প্রকাশনা সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন। কথার ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছেন নব্বইয়ের দশকের নেত্রকোনায়, লেখালেখি ছাপাছাপির এলাকায়।
ইতিহাসের অলিগলি ঠিকুজি ফিরে দেখতে এ এক ভালো উপায়, স্মৃতিরোমন্থন করা আলাপচারিতায়। এর ফলে ইতিহাসের স্থান, কাল, পাত্রমিত্র অল্প কয়েকটি দৃশ্যে দেখতে পাওয়া যায়। এই সিরিজের আলাপচারিতা কাজেই ব্যক্তিকেন্দ্রী নিছক সাক্ষাৎকার নয়। ব্যক্তি কথা বললেও, হোক তার কথার প্রসঙ্গ ব্যক্তিক বা নৈর্ব্যক্তিক, কথায় কথায় ইতিহাস পরিস্ফুটিত হয়। ব্যক্তির কথার ভেতর দিয়ে এইভাবে হাজির হয় সময়।
নেত্রকোনার ছাপাছাপির ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলেই সিদ্দিক প্রেসের নাম আসবে। এই প্রিন্টিং প্রেসের আওতা ও অবদান স্থানিক পরিসরে ব্যাপক। কয়েক দশক ও প্রজন্ম ধরে এর ধাত্রিত্বে নেত্রকোনার সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ভুবন বিকশিত হয়েছে। এখানে, এই আলাপচারিতায়, নেত্রকোনার নব্বইয়ের দশকে একটি প্রিন্টিং প্রেস কেমন করে লেখকদের জন্য অবারিতদ্বার সমবেত সংসার হয়ে উঠেছিল লক্ষ করা যাবে।
এর আগে ‘নেত্রকোনার ছাপাছাপির ইতিহাস অনুসন্ধান’-কল্পে একটি নিবন্ধ মুসাবিদার সময় খেয়াল হয়, এ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত কোথাও নাই। উপায় একটাই। প্রেসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজনের সঙ্গে কথা বলে সেই সময়ের চেহারা বার করে আনা। মাহবুব কবির ছাড়াও কথা বলেছি আরও অনেকের সঙ্গেই। কিছু বাছাই-করা আলাপচারিতা প্রাসঙ্গিক কারণে বেশি গুরুত্ব বহন করে। এই সিরিজে এমন আরও কিছু কথাচক্র গ্রথিত হবার অপেক্ষায়।
আরেকটা কথা। আগের নিবন্ধটি ‘সিদ্দিক প্রেসের সিসার হরফ’ শিরোনামে লেখা ও ওয়েবে ছাপাও হয়েছিল দশককাল আগে। সেখানে নব্বইয়ের অব্যবহিত পরের নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশকের উদীয়মান সাহিত্যকর্মীদের সঙ্গে এর একটা আনুপূর্বিক সম্পর্ক বর্ণিত হয়েছে। লেখাটা গানপারে পাওয়া যায়। বাকি থাকা আলাপগুলিও ক্রমে এসে যাবে এরই ধারাবাহিকতায়।

আপনার কাছে সিদ্দিক প্রেস সম্পর্কে এবং এই প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী সম্পর্কে জানতে চাই।
আমরা যখন লেখালেখির চর্চা শুরু করেছি—আমাদের শৈশবে, কিংবা আমাদের থেকে অগ্রজ যারা তাদের শৈশবেও—মানে ষাট-সত্তর-আশির দশকেও সিদ্দিক প্রেস নেত্রকোনা শহরের বড় প্রেস। আমরা লেখালেখি করেছি ৯০ দশকে। কিন্তু আশির দশকের লেখকদের সঙ্গেও আমাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। বলা যায়, মফস্বল শহরে আমরা একসাথে সাহিত্যচর্চা করেছি। পত্রিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে আমরা যে-সময়টায় সিদ্দিক প্রেসে আসা-যাওয়া শুরু করেছি তখন প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। প্রেসে তিনি কম সময়ই থাকতেন। প্রেসে যতক্ষণ থাকতেন চুপচাপ বসে থাকতেন। আমরা তাকে খুব সমীহ করতাম। আমাদের সম্পর্ক ছিল তার বড়ছেলে মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর সঙ্গে। তিনি আমাদের কবিতা এবং কাব্যচর্চায় আগ্রহী ছিলেন। মোহাম্মদভাই আমাদের হেলাল হাফিজের কথা বলতেন। হেলাল হাফিজ ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তুমি প্রশ্নটা করে ভালোই করেছ। পৌরসভার সামনে মোক্তারপাড়ায় প্রেসটাকে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের ছাপাছাপির অবলম্বন ছিল এই লেটার প্রেস।

একটা প্রেস কীভাবে সাহিত্যচর্চায় অবদান রাখতে পারে? সিদ্দিক প্রেসকেন্দ্রিক আপনাদের কি কোনো সাহিত্যের আড্ডা ছিল?
এখন তো ফেসবুকে লেখা যায়। প্রচুর অনলাইনপত্রিকা কিংবা ওয়েবম্যাগ আছে সেসবেও লেখা যায়। আমাদের সময় তো এমনটি ছিল না। আমাদের সময় লিটলম্যাগ ছিল। প্রত্যেকটি জেলাশহর থেকে লিটলম্যাগ বের হতো। কাগজে ছাপার অক্ষরে কবিতা দেখার যে-আনন্দ সেটা আজ কী আর বর্ণনা করা যাবে! লিটলম্যাগগুলো লেটারপ্রেস থেকেই বেরোত।
সিদ্দিক প্রেসে আমরা আড্ডা দিতে যাইনি। আসলে সিদ্দিক প্রেসে আমাদের বাপ-চাচারা আড্ডা দিতেন। উত্তর আকাশ প্রকাশের সময় আমাদের অগ্রজ কবিরা সিদ্দিক প্রেসে আড্ডা দিতেন; আসতেন নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজের মতো কবিরা। আমাদের আগের জেনারেশনের কবিদের কাছে সিদ্দিক প্রেস এক-রকম তীর্থস্থানের মতোই ছিল।

এই প্রেস থেকে আপনারা কি কি লিটলম্যাগ করেছেন? আপনাদের সময় তো লিটলম্যাগের একটা জোয়ার ছিল। বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারি, ষোলোই ডিসেম্বর, ছাব্বিশে মার্চকে কেন্দ্র করে প্রচুর সংকলন প্রকাশিত হতো। সিদ্দিক প্রেসকে কেন্দ্র করে এ-ধরনের সংকলন কি আপনারা প্রকাশ করেছিলেন?
শোনো, একুশে ফেব্রুয়ারি ষোলোই ডিসেম্বর ছাব্বিশে মার্চ আসার আগে আগে, এই ধরো পনেরো বিশ দিন আগে থেকেই আমরা কেমন অস্থির হয়ে যেতাম, পাগল হয়ে যেতাম। নাওয়া-খাওয়া ভুলে এই কয়েকদিন সংকলন তৈরি করতাম। পত্রিকা কত যত্ন করে করা যায়—ভালো লেখা দিয়ে করা যায়—সেই চেষ্টাই করতাম। কখনোই মিস হতো না। একটা-না-একটা বের করতামই। ভাঁজপত্র করতাম—প্রচুর ভাঁজপত্র করেছি। আমাদের সব প্রকাশনা সিদ্দিক প্রেস থেকেই করেছি। একটা সংকলন বোধহয় বর্ণমালা প্রেস থেকে করেছিলাম। বাকি সব সংকলন কিংবা লিটলম্যাগ সিদ্দিক প্রেস থেকে করেছি।

লিটলম্যাগাজিনগুলোর নাম কি মনে আছে আপনার? ম্যাগাজিনগুলো কি আপনার সংগ্রহে আছে?
সংগ্রহে নেই। খুব দেখতে ইচ্ছে করে কিন্তু কোথাও একটা কপিও নেই। কারো কাছে যদি লিটলম্যাগগুলো, সংকলনগুলো পাওয়া যেত তাহলে আমাদের লেখালেখিজীবনের শৈশবটাকেই ফিরে দেখতে পারতাম।
আমাদের প্রথম সাহিত্যপত্রিকা ছিল উপল। নেত্রকোনার মোক্তারপাড়াকেন্দ্রিক আমাদের বন্ধুরা মিলে একটি সাহিত্যসংগঠন তৈরি করেছিলাম—‘উপল সাহিত্য সংসদ’। সেই সংগঠনের পত্রিকা ছিল উপল। পত্রিকাটি বের হয় ১৯৮৬ সালে। দুই ফর্মার লিটলম্যাগ। সম্ভবত আমাদের গুচ্ছকবিতা ছাপা হয়। মাহমুদুল করিম আব্বাসীর প্রবন্ধ ছাপা হয়। উপলের সম্পাদক ছিল মাহমুদুল করিম আব্বাসী। সে-সময় তো আমরা মিলেমিশে পত্রিকা করতাম। দেখা যেত সম্পাদনায় আমরা কয়েকজনের নামই আছে।

তারপরে বের করেছি এক ফর্মার খোলা কবিতা—যেখানে শুধু আমার আর ইয়াসিনুর রহমান রিপনের কবিতা ছিল। আট পৃষ্ঠা আমার, আট পৃষ্ঠা ইয়াসিনুর রহমান রিপনের। তারপর বের করলাম যন্ত্রণা—এটি মূলত ট্যাবলয়েড ধাঁচের পত্রিকা। বড় সাইজের ট্যাবলয়েড পত্রিকা। পত্রিকাটি খুব হিট করেছিল। পত্রিকা বের করে আমরা ঢাকায় নিয়ে এসেছিলাম। সে-সময় ধ্রুব এষ নেত্রকোনায় গিয়েছিল। ধ্রুব এষের সাথে পত্রিকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলে উঠেছিলাম। পরদিন দুই টাকা করে এই পত্রিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কাছে বিক্রি করা হলো। প্রচুর বিক্রি হয়েছিল। সবগুলো কপিই। আমাদের অনেক টাকা হয়ে গিয়েছিল।
আরেকটা কাগজ করেছিলাম খোলা তলোয়ার—ডেঞ্জারাস সব কবিতা দিয়ে এই সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতার বিষয় ও ভাষা ছিল খুবই অশ্লীল। এই সংকলনে ঠিকানা দিইনি আমরা। কোথা থেকে প্রকাশিত হয়েছে, লেখক কিংবা সম্পাদকদের ঠিকানা—কিছুই আমরা দেইনি। আমরা আগেই বুঝতে পেরেছিলাম—ঝামেলা হবে। ঝামেলাই হয়েছিল। থানায় অভিযোগ চলে গিয়েছিল। প্রকাশক কিংবা সম্পাদক কারো নাম ছিল না। আসলে মোহাম্মদভাই যখন কবিতা দেখতে চেয়েছেন—আমরা তখন ভালো কিছু কবিতা, পঠনযোগ্য কিছু কবিতা তাকে পড়িয়েছিলাম। প্রেস থেকে কি ছাপা হচ্ছে—প্রেসের মালিক দেখবে না? আমরা তাকে কিছু পঠনযোগ্য কবিতা পড়িয়েছিলাম। চূড়ান্ত অশ্লীলতাগুলো পড়াইনি, দেখাইনি। পুলিশ আসলে ট্রেস করতে পারছিল না—কোত্থেকে বের হয়েছে কারা বের করেছে।

খোলা তলোয়ার কত সালে বের হয়েছিল?
উনিশশোছিয়াশি সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন ছিল এটি। আমি, গাউসুর রহমান, ইয়াসিনুর রহমান রিপন মিলে এই সংকলনটি করেছিলাম। পরে সবগুলো সংখ্যা লুকিয়ে ফেলেছিলাম। নাম না থাকায় আমরাও বেঁচেছি, প্রকাশক মোহাম্মদভাইও বেঁচেছেন।
আসলে সে-সময় আমরা প্রচুর সংকলন করেছি, ভাঁজপত্র করেছি। নীলাদ্রি নামেও একটি সাহিত্যপত্রিকা করেছিলাম। তবে লিটলম্যাগ হচ্ছে উপল এবং অক্ষর। ‘অক্ষর’ বের করা উপলক্ষে আমাদের যে-উন্মাদনা ছিল—আজ তা ব্যাখ্যা করে বুঝাতে পারব না। সম্পাদক ছিলেন কবি সৈয়দ নাজমুল করিম—আমি আর গাজী মোবারক সহযোগী সম্পাদক ছিলাম। কবি ইয়াসিনুর রহমান রিপন এবং গাজী মোবারক হোসেন বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করেছিলেন। আজাদভাই ঢাকা থেকে প্রচুর লেখা সংগ্রহ করেছিলেন। অক্ষরের আশিভাগ কাজ আজাদভাই সম্পন্ন করেছিলেন, বাকি বিশভাগ আমি। গুণের একটা দুর্দান্ত কবিতা ছিল ‘হে কাঁঠাল দ্রুত পেকে ওঠো’। মনোয়ার সুলতানের বেতনের টাকা আর আজাদভাইয়ের বাসাভাড়ার টাকা দিয়ে ‘অক্ষর’ প্রথম সংখ্যা বের হয়েছিল সিদ্দিক প্রেস থেকে। কী যে সুন্দর হয়েছিল প্রথম সংখ্যাটা! সংখ্যাটা যদি আরেকবার দেখতে পারতাম—কারো কাছে যদি খুঁজে পেতাম!

সে-সময় যারা প্রেসে কাজ করত, তাদের কথা কি মনে আছে? কম্পোজার-মেশিনম্যান-বাইন্ডার—এদের কথা?
তোমার কথা শুনে ঠিক ঠিক মনে পড়ল তাদের কথা। আমাদের বাসার সামনে দিয়ে তারা প্রেসে যেত। সম্ভবত বাড়ি কাইলাটি ছিল। পাঞ্জাবি পরা বুড়ো মানুষ। ধীরে ধীরে হাঁটতেন। কারো নামই মনে নেই। কী নিষ্ঠার সঙ্গে যে তারা কাজ করতেন!
নেত্রকোনার ছাপাছাপির ইতিহাস অনুসন্ধান
সরোজ মোস্তফা রচনারাশি
- প্রেসের দিনগুলি নিয়া আলাপচারিতায় মাহবুব কবির || সরোজ মোস্তফা - November 3, 2026
- অনন্তের পারাবার ও মাটির জাহাজ || সরোজ মোস্তফা - July 25, 2026
- বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আত্মজীবনী || সরোজ মোস্তফা - July 15, 2026

COMMENTS