মানুষের নিঃসঙ্গতা || মেকদাদ মেঘ

মানুষের নিঃসঙ্গতা || মেকদাদ মেঘ

শেয়ার করুন:

‎মানুষ জন্মগতভাবে একা নয়; তবু তার সমগ্র জীবন যেন এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গতার প্রতিলিপি। পৃথিবীতে আসার মুহূর্ত থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ অসংখ্য সম্পর্ক, ভাষা, সভ্যতা, ধর্ম, রাষ্ট্র ও প্রযুক্তির মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে রাখে, অথচ তার অন্তর্গত একাকিত্বের গভীর কূপ কখনও পূর্ণ হয় না। এই বৈপরীত্যই মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য।

উত্তর-আধুনিক সময়ে নিঃসঙ্গতা আর কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক অবস্থা। মানুষ যত বেশি সংযুক্ত হয়েছে, তত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজারো বন্ধুর ভিড়ের মাঝেও সে নিজের মুখের প্রতিধ্বনি শুনতে পায় না। তার পরিচয় অসংখ্য প্রোফাইল, পাসওয়ার্ড ও ডিজিটাল উপস্থিতির ভেতরে ভেঙে গিয়ে একাধিক সত্তায় বিভক্ত হয়েছে। ফলে মানুষ নিজের সঙ্গেই আর একা থাকতে পারে না; সে নিজের কাছ থেকেই নির্বাসিত।

নিঃসঙ্গতা আসলে ভাষারও সংকট। মানুষ যে-ভাষায় ভালোবাসে, সেই ভাষাতেই কখনও কখনও তার গভীরতম বেদনা প্রকাশ করা যায় না। শব্দের ভেতরে যে-নীরবতা বাস করে, মানুষ প্রায়ই সেই নীরবতার বন্দী হয়ে পড়ে। অনেক কথা বলা হয়, কিন্তু খুব কম কথা পৌঁছায়। এই অপৌঁছানোই নিঃসঙ্গতার আরেক নাম।

আধুনিক সভ্যতা মানুষের শরীরকে আরাম দিয়েছে, কিন্তু আত্মাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ভোগবাদ মানুষকে শেখায়—সবকিছু কেনা যায়; অথচ ভালোবাসা, স্মৃতি, বিশ্বাস কিংবা মৃত্যুভয় কোনো বাজারে বিক্রি হয় না। ফলে মানুষ যত বেশি ভোগ করে, তত বেশি শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই শূন্যতা কোনো অভাবের নয়; এটি অর্থের অনুপস্থিতি।

উত্তর-আধুনিক দর্শন আমাদের জানায়, কোনো একক সত্য নেই; আছে বহু সত্য, বহু বয়ান। কিন্তু এই বহুত্বের মাঝেও মানুষ একটি স্থির আশ্রয় খোঁজে। যখন সে দেখে প্রতিটি বিশ্বাসই প্রশ্নবিদ্ধ, প্রতিটি ইতিহাসই পুনর্লিখিত, প্রতিটি পরিচয়ই নির্মিত—তখন তার নিঃসঙ্গতা আরও ঘনীভূত হয়। কারণ সে বুঝতে শেখে, তার দাঁড়িয়ে থাকার মাটিটুকুও হয়তো সম্পূর্ণ দৃঢ় নয়।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বিচ্ছেদও এই নিঃসঙ্গতাকে গভীর করেছে। একসময় মানুষ নদীর শব্দে, বৃক্ষের ছায়ায়, পাখির উড়ানে নিজের অস্তিত্ব চিনত। আজ সে কংক্রিটের নগরে আকাশের বদলে বিজ্ঞাপনের পর্দা দেখে। ফলে তার ভেতরের ঋতুগুলোও ধীরে ধীরে অনুবাদহীন হয়ে পড়ে। সে আর বৃষ্টির ভাষা পড়তে পারে না, বাতাসের গন্ধে ইতিহাস চিনতে পারে না।

তবু নিঃসঙ্গতা কেবল অভিশাপ নয়। এই একাকিত্ব থেকেই জন্ম নিয়েছে শ্রেষ্ঠ কবিতা, গভীরতম দর্শন, অনন্য শিল্পকর্ম এবং আত্ম-আবিষ্কারের সাহস। মানুষ যখন সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের নীরবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন সে আবিষ্কার করে—নিজের ভেতরেও একটি মহাবিশ্ব আছে। সেই মহাবিশ্বে স্মৃতি নক্ষত্রের মতো জ্বলে, অনুতাপ কৃষ্ণগহ্বরের মতো টানে, আর স্বপ্ন আলোর মতো অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে যায়।

মানুষের নিঃসঙ্গতা তাই কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি মানব-অস্তিত্বের মৌলিক ব্যাকরণ। আমরা প্রত্যেকে অন্যের দিকে এগিয়ে যাই, কারণ আমরা একা। আবার শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরেই ফিরে আসি, কারণ আমাদের একাকিত্ব কেউ সম্পূর্ণ ভাগ করে নিতে পারে না। এই অসম্পূর্ণ ভাগাভাগির মধ্যেই ভালোবাসার জন্ম, শিল্পের জন্ম, সভ্যতার জন্ম।

মানুষের নিঃসঙ্গতা কোনো শূন্য কক্ষ নয়; এটি এমন এক অন্তহীন করিডর, যেখানে প্রতিটি দরজার ওপারে আরেকটি আয়না অপেক্ষা করে। মানুষ সেই আয়নাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বারবার নিজের মুখ খোঁজে। কখনও সে নিজেকে পায়, কখনও পায় কেবল ছায়া। আর সেই ছায়ার সঙ্গেই সে লিখে চলে তার জীবন, তার ইতিহাস, তার অমোচনীয় একাকিত্বের মহাকাব্য।


‎মেকদাদ মেঘ রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you