১৯৯৪ সালে জেলা-শহরের কলেজে পড়তে গিয়ে এমনসব গান শুনতে লাগলাম যা আগে শুনিনি। এই শোনা সবসময় ইচ্ছাকৃত না। ইচ্ছা ছাড়াও শুনছি। ক্যাসেটের দোকান থেকে ভেসে আসছে। অ্যালবামের নামও কী আশ্চর্য় আশ্চর্য়! ‘ক্যাপসুল ৫০০ এমজি’। ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’। গানের দলগুলোর নামও কেমন ঈর্ষা-জাগানিয়া। ফিলিংস। এলআরবি। ফিডব্যাক। মাইলস। এই দলগুলোতে যারা গান করেন তাদের কেমন বিদেশি-বিদেশি লাগে। কিন্তু তাদের গান ভালো লাগে। মনে হয় এইভাবে আমি কথা বলতে চাই। এটাই আমার কথা বলার, ভালোবাসা বা দুঃখ প্রকাশের স্মার্টেস্ট ওয়ে। বিটিভিতে সপ্তাহে ১/২দিন ব্যান্ডসংগীতের অনুষ্ঠান হতো। বাসার সবাই হাসাহাসি করত। কিন্তু আমরা, আমার বয়সীরা — আমরা অহঙ্কারের সাথে, গর্বের সাথে সেইসব অনুষ্ঠান দেখতাম। আমাদের মন-হৃদয় বিকশিত হবার একটা ভূমি পেয়েছে যেন। যে-ভূমিটা ম্যাড়ম্যাড়ে না। কাঁচা আবেগী না। আমরা ‘বেদনা মধুর হয়ে যায়’ বা ‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে’-এর বদলে গলা ছেড়ে গাইতে চাই ‘হায় জ্বালা জ্বালা জ্বালা / এই মন জুড়ে’ বা ‘ফিরিয়ে দাও, আমার এ প্রেম তুমি ফিরিয়ে দাও’। অথবা ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘তোমাকে সত্য জেনে ভুলেছিলাম’, ‘আমি তোমার দূরে থাকি কাছে আসব বলে’ …
.
আমরা ওপেন এয়ার কন্সার্টের অপেক্ষায় থাকতাম। কন্সার্টে উদ্দাম নাচতাম। ব্যান্ডসংগীত হয়ে উঠল তারুণ্যের সিম্বল। ভোরের ঘুমভাঙানিয়া পাখির মতো তরুণদের প্রাণে জাগিয়ে দিলো ভোর। আমরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। আমরা ক্যাসেটের দোকানে ভিড় করতাম। জানতে চাইতাম নতুন কী কী ক্যাসেট এল। ঘোরের মধ্যে দিন কাটছে যেন। আমাদের মনে এই ব্যান্ডসংগীত, এই সংগীতশিল্পীরা ইভটিজিং বা কোনো মেয়ের মুখে অ্যাসিড নিক্ষেপের পশুত্ব জাগতে দেয়নি বরং আমরা পছন্দের মেয়েকে ক্যাসেট গিফট করতাম। যেন মিউজিক্যাল চিঠি।
.
কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পুরোপুরি ডুব দিই ব্যান্ডসংগীতের দরিয়ায়। রাতের শহরে দলবেঁধে গেয়ে যাই ‘রেললাইনের ঐ বস্তিতে / জন্মেছিল একটি ছেলে / মা তার কাঁদে …’ অথবা ‘এই রূপালি গিটার ফেলে / একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে …’ — আনন্দের মাঝেও আমাদের হৃদয়ে ভর করত/করে এক অদেখা বিষাদ। আমরা বিষাদিত হই।
.
বিষাদ দিয়েই যেন উদযাপন করে চলি জীবন। এই গানগুলো হয়ে যায় আমাদের আত্ম-উদযাপনের অদৃশ্য গিটার। আমরা নিজের হৃদয়কে বাজিয়ে বাজিয়ে স্বপ্নের কাছে ফিরি। ব্যর্থতা থেকে ফিরি। আমাদের রক্তে মিশে যায় গানগুলো।
.
আমরা আরো বড় হলাম। বুড়ো হতে আরম্ভ করলাম। কিন্তু আমাদের সেই কৈশোর, সেই ইউনি-লাইফ আর সেই গান আমাদের বুড়ো হতে দেয় না। আমাদের বুড়ো-না-হতে-চাওয়া জীবনের আকাশ থেকে হঠাৎ ঝরে পড়ে দেখি আমাদের সেই গাইডিং স্টার্স। আজম খান চলে গেছেন সেই কবে। গতকাল চলে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু। আইয়ুব বাচ্চুই ছিলেন প্রধান গাইডিং স্টার। আত্ম-উদযাপনের আমাদের অদৃশ্য রূপালি গিটার। নিজের বিরহের দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠতাম ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে …’ অথবা ‘এই রূপালি গিটার ফেলে / একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে / সেদিন চোখের অশ্রু তুমি রেখো / গোপন করে …’ — কত হাজার হাজার বার গেয়েছি তার গান! কত কন্সার্টে নেচেছি! বিষাদিত হয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হয়েছে জীবনভরতি নক্ষত্র নিয়ে ফিরেছি।
.
আমাদের জীবনের বিষাদে নক্ষত্রের মতো গান ছড়িয়ে আইয়ুব বাচ্চু অন্ধকার জগতে চলে গেলে আমাদের ভেতর যে সমুদ্র বলকে-ওঠার কথা তা ঠিকই বলকাচ্ছে হৃদয়ে, কিন্তু সেই বেদনাকে উদযাপন করা যাচ্ছে না। বন্ধুর গলায় ধরে বন্ধু কাঁদতে পারছে না। গাইতে পারছে না ‘আমার গল্প শুনে / হয় আলোকিত উৎসব / গল্পশেষের আমি / আঁধারের মতো নীরব’।
.
কারণ আমাদের জীবন চলে গেছে কুড়ি কুড়ি বছরের পার।
.
আমাদের গানভরা যৌবনের স্মৃতি ধীরে ধীরে ইহলোক ছেড়ে পরলোকে পাড়ি জমাচ্ছে। একদিন আমরা আবার, পরলোকে, উদযাপন করব আমাদের যৌবন।
.
এবি, তোমাকে আমরা মিস্ করছি। তুমি জানতে। এই জানা ঠিকাছে।
… …
- গানের মেটাফর, গানের মেটামরফসিস || মুহম্মদ ইমদাদ - July 18, 2019
- আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু এবং আমাদের ডেজার্টেড স্মৃতির ইডেন || মুহম্মদ ইমদাদ - October 20, 2018
COMMENTS