পূর্ব পরিচ্ছেদ / লোক দশকতামামি ০৭ : দশকি কবিতার (’৮০) ’৯০ যাত্রাবিন্দু ও যাত্রিকগণ
পঞ্চাশ থেকে আশির সূচনালগ্নে সচল ভাষাভঙ্গি থেকে সরে গিয়ে সময়চেতনার মাপে কবিতাকে সেলাই করার পথ-অনুসন্ধান অগত্যা ব্যক্তি আমির উপস্থাপন ও সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতায় বিচ্ছেদ এনে দিয়েছিল। অন্যদিকে নব্বইয়ের জন্য আশির ভাষা-প্রকরণের চাপ থেকে বের হওয়া সহজ ছিল না। বাংলা কবিতায় ব্যক্তিকতার ধারা, সময়-সমাজ সংলগ্ন হওয়ার ধরন কিংবা বৈশ্বিকতায় সংযুক্তির প্রবণতা তলিয়ে দেখার ভাবনা নব্বইয়ের কবিমনে ঘাঁই তুলছিল। শুরুর দিকে বিভ্রান্তির ঘোরচক্কর কম ছিল না। নয়ের কবিতাকে যদি ত্রিশ বছরের জার্নি গণ্য করি সেক্ষেত্রে প্রথম দশ বছরে একাধিক তরঙ্গ পাঠক সেখানে দেখতে পায়। নিজেকে খোলসে গুটিয়ে নেওয়ার ঘটনা শুরুতে একাধিক কবির মধ্যে প্রবল ছিল। আশির মধ্যভাগকে পাশ কাটিয়ে পৃথক ভাষারীতি নির্মাণের চেষ্টায় সকলেই উৎসাহী ছিলেন, যদিও বেগ ও দ্যুতিবিবশ চমকটি তখনো অনুপস্থিত ছিল যার প্রভাবে শব্দের অর্থস্তর কানে নতুন আওয়াজ ওঠায়। ঘোড়ার লাগাম অগত্যা নব্বই থেকে শূন্য অবধি আশির মধ্যভাগের কবিরা মোটের ওপর দখলে রেখেছিলেন।
খোন্দকার আশরাফ হোসেন, মাসুদ খান, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, জুয়েল মাজহার, অকালে-ঝরে-পড়া বিষ্ণু বিশ্বাস অথবা শোয়েব শাদাবের কবিতাপাঠে অনুভবের তন্তুরা যেভাবে সচকিত হয়ে উঠত তার সঙ্গে তুলনা করলে নব্বইয়ের খোলসবন্দি ভাষায় স্নায়ুবিধ্বংসী আবেদন তখনো ব্যাপক হয়ে ওঠেনি। প্রথম এক দশকের কবিতাপাঠে বোঝা যেত দশকি-ছকে সক্রিয় তরুণদের বড়ো অংশ কোলাহল থেকে প্রস্থান নিতে চাইছিলেন। খণ্ড খণ্ড অনুভূতির সুরজালে ব্যক্তি আমিকে সেলাই করতে সকলে আকুলান হলেন এবং ডুবুরি হতে চাইলেন আত্মমগ্ন কাব্যভাষায়। খণ্ড অনুভব দিয়ে অখণ্ড মালিকা রচনায় উন্মুখ নব্বই অগত্যা বুঝিয়ে দিয়েছিল…
আমি পঞ্চাশের আমিত্বজারিত কবিতার প্রতিধ্বনি নই। দশকের-পর-দশক জুড়ে বহমান প্রেম, রাজনীতি, বিক্ষোভে আকীর্ণ ম্যানিফেস্টোর সহযাত্রী নই। আমি ভাই ফাঁদেপড়া পাখি। ব্যক্তি ও সমাজ থেকে প্রেরণা লাভের অবকাশ সময় আমার জন্য রাখেনি। আমার গানে চোখা বিদ্রুপের উপস্থিতি অন্য পথে ঘটে। গণবিক্ষোভের তরঙ্গ ও তরঙ্গভঙ্গের পরিচিত বয়ান সেখানে গরহাজির থাকতে চায়। মনস্তাপ থাকলেও তার বহিঃপ্রকাশ অতীতের ন্যায় উচ্চকিত নয়। প্রেম, যৌনতা, স্বকাম অথবা পরকাম পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর মতো রগরগে যৌনাতুর নয়। আমার ভাষায় সেইসব শব্দ নিখোঁজ যাদের কারণে গুটিয়ে-যাওয়া আর্তিকে বিগত দশকের স্মারক বলে পাঠক দেগে দিতে পারেন।
স্বাতন্ত্র্য সন্ধানের ফিকিরে নব্বইয়ের কবিরা ইতস্তত উদ্দেশ্যহীন অনুভবের জালে এক দশক কাটালেন। আত্মমগ্ন ভাষার সন্ধানে উৎসুক কবি মৃদুভাষে জলের কথা কইলেন, নদীর বাখান গাইলেন, প্রেমিকার বদনে ছলকে-ওঠা কুয়াশাঘন ধূসরিমার কাহিনি শোনালেন, আশা-নিরাশার দোলাচলে অবগুণ্ঠিত গোলাপপাপড়ি জখম হওয়ার দুখে স্নায়ুবিবশ হলেন, মিথ-পুরাণ-লোকায়তের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কসমিক থেকে সাইবারনেটিক্স তরঙ্গের মতো সেখানে আছড়ে পড়ল, আর কবিতায় বাঁকবদল ঘটানোর সংকল্পে ভাঙচুর হলো ব্যাপক…তথাপি এর কোনোটাই যেন দশকি পালাবদলের ঘূর্ণিপাকে খাবি-খাওয়া সময়ের সুর ধরতে সহায়ক মনে হচ্ছিল না। আদি নব্বইয়ের সিংহভাগ কবির মনোবিশ্বে পরিপার্শ্ব থেকে নিষ্ক্রমণ নেওয়ার প্রবণতা খোলাচোখে দৃশ্যমান ছিল। ওদিকে এই ধারায় যোগ দিতে অস্বস্তি বোধ করছেন এমন কবিগণ জীবনানন্দ, আল মাহমুদ, মোহাম্মদ রফিক বা ফরহাদ মজহারের রসায়ন থেকে তৈরি সড়কে গমনের ভাবনায় উতলা ছিলেন। ‘লিরিক’ ছোটোকাগজের উত্তর-আধুনিক প্রকল্পনা মধ্য-নব্বইয়ে নতুন তত্ত্বের ঝড় নিয়ে এলে অনেকে সেই পথে পা বাড়িয়েছিলেন। অন্যদল গোমেজ ও মাসুদ খানের মকারির ওপর ভর করে স্বাতন্ত্র্য তৈরির মেকি চেষ্টায় মেতে ছিলেন কিছুদিন। ব্যতিক্রম হয়তো ব্রাত্য রাইসু। তাঁর মকারিসৃষ্ট নৈরাজের প্রতীক দোরা কাউয়া পাতি কাকের গোয়া মারলেও কিছুদিন পর একঘেয়ে ছকের চক্করে পাক-খাওয়ার ক্লান্তি রাইসুকে সেখান থেকে খালাস নিতে বাধ্য করেছিল। আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছির কবি রাইসুর উজ্জ্বল স্বকীয়যাত্রা সে-কারণে অসমাপ্ত ও সময়ের সঙ্গে অনেকটাই নির্জীব।
গানপার ম্যাগাজিনরিভিয়্যু
আহমদ মিনহাজ রচনারাশি
নব্বইয়ের কবি, নব্বইয়ের কবিতা
আশির দশকের কবি, আশির দশকের কবিতা
গানপারে ব্রাত্য রাইসু
- মঙ্গলশঙ্খ বাজলো তৃণপুষ্পময় || শুভ্র সরকার - March 29, 2026
- একটা ডিলেট করা সিনের মধ্যে ঢুকে বসে আছি || নাফিস সবুর - March 27, 2026
- মেঠোসুরের আঠারো বছরপূর্তি সংখ্যা : লোকজ চেতনার নবউদ্ভাস || মিহিরকান্তি চৌধুরী - March 26, 2026

COMMENTS