বাংলাদেশে এমন একটা সময় ছিল যখন তরুণ কবির ডেব্যু কবিতাবইয়ের পানে এক-প্রকার রেয়াতি দৃষ্টি দিয়া প্রাচীন কবিবংশের কুতুবেরা তাকাইতেন; বটে! এখন ওই দিন নাই আর। কবিতার মায়াহার্দ্য জগতে অবতীর্ণ হবার অব্যবহিত পরেই এখন তরুণ কবি নিজের সিগ্নেচার শানানোর কাজে সময় ও শ্রম ও মেধা-প্রতিভাদীপ্তি বিনিয়োগে তন্বিষ্ঠভাবে ব্রতী হয়ে ওঠেন। পুরনো কবির রেয়াতি দৃষ্টির আশায় তীর্থবায়স হবার গরজ কিংবা গোনাগ্রাহ্যির দরকার ফুরিয়েছে।
এই কথাগুলো মনে এল ‘অব্যক্ত সন্ধির দিকে’ শীর্ষক অভিষেক কবিতাবইটিতে বিধান সাহার কিছু পঙক্তিপানে যখন তাকাচ্ছি। কিন্তু কথাগুলো অসত্য নয় যে একদা বাংলা কবিতায় কল্কে পেতে গেলে একটু বয়োজ্যেষ্ঠ কবিদিগের অ্যাপ্রুভ্যাল লাগত। সবার না-লাগলেও অনেকেরই লাগত। ছোটকাগজদৌরাত্ম্যের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলোতে একটা লাইনঘাট মেনে সোহবৎ না করলে ফ্যাসাদে পড়তে হতো। বর্তমানে সেই বিকার নাই। নিজের কাজটা চাইলেই নিজমনে নিমগ্ন করিয়া যাওয়া যায়। বিধান সাহার ব্যক্ত কবিতাগুলোর দিকে তাকায়ে এই কথাগুলো উদয় হচ্ছিল মনে।
এইটা সাহার পয়লা কাব্যগ্রন্থ। ২০১৫-তে বেরোনো। সম্ভবত পরে, এখন পর্যন্ত, সেকন্ড কোনো কবিতাবই বাইরায় নাই। কিছু জর্নালধর্মী গদ্যের সম্মিলনী একটা বই শুধু হয়েছে এর মধ্যে। এই বইটা, কাজেই, আজোবধি বিধান সাহার বলা যেতে পারে একমাত্র জন্মজড়ুল বা উচ্চারণচিহ্ন। ‘চৈতন্য’ নামে একটা পাব্লিকেশন থেকে বেরিয়েছিল। হয়তো পাওয়া যাবে এখনও খোঁজপতা চালাইলে। এর প্রচ্ছদ করেছেন দেখা যাচ্ছে রাজীব রাজু। প্রচ্ছদ ও বইবিন্যাস স্নিগ্ধ খুবই।
বিধান সাহা সন্ধিপ্রস্তাব নিয়ে এসেছেন কবিতাপাঠকের দহলিজে, গেরস্থালির সহস্র উদ্ভটতার পরেও যে-পাঠক উদগ্রীব ও উৎকর্ণ কবিতার বিভাস্বর করপুটে পেতে, ব্যক্ত কথামঞ্জুষার ভেতরে এইখানে পাঠক লভিবেন অব্যক্ত ও অনির্বচনীয়ের সেই আস্বাদ যার জন্য হয়তো প্রতীক্ষায় ছিলেন তিনি। চিরযৌবনা বাংলা কবিতার মোহনায় এই কবিতাবই জুড়ে দিতে চেয়েছে একমুঠি ঝিনুক, বর্ণিল ফোয়ারা ও রৌদ্রকুয়াশার স্পর্শশীলা আওয়াজ।
‘অব্যক্ত সন্ধির দিকে’ থেকে একটা কবিতা আপাতত পড়া যাক :
যে ভাবে নীরব আছো — পাথরের মতো — বহুদিন —
উদাসীন একইভাবে — বদরাগে — রাত্রি জাগরণে —
স্রেফ হয়ে গেছি একা। জানি — পুরনো মলিন বড়!
আপন ঠিকানা ভুলে — ফুলে ফুলে নতুন আবাস
গড়ে তুমি নিয়েছো সঠিক। বেঠিক পথের পাড়ে —
এখনো যে — আড়ে-ঠারে চাই। আর সেই পথ জুড়ে
শোকের নীলচে রঙে আমাকে আঁকাই। … সুখী হও।পুজো শেষ হয়ে গেছে — কুয়াশা পড়ছে রোজ মাঠে
তুমি কি এমন দিনে — চিনচিনে ব্যথা পাও টের?
অথবা, আদা-চা খেতে খেতে — সিনে-ম্যাগাজিনে রাখো
চোখ? পুলক পুলক কোনো আভা ভেসে ওঠে চোখে?সহস্র স্মৃতির পথে মনে মনে হেঁটে যাই রোজ
তোমারও কি পথ হলো? এখনও কি আঁকো ফুল পাখি?যে গেছে ভুলের দেশে — যাক — আমি প্রাণ খুলে রাখি!
লেখা : আতোয়ার কারিম
… …
- আলুপোড়া : স্বাদ, স্মৃতি ও সত্তা || আহমদ সায়েম - October 22, 2026
- মানুষের নিঃসঙ্গতা || মেকদাদ মেঘ - October 22, 2026
- তপন চৌধুরী, প্রিয় নব্বই ও নেত্রকোনা || আরেফিন টিটো - October 22, 2026

COMMENTS