দিলীপ গঞ্জুর কাল ও কলিজা

দিলীপ গঞ্জুর কাল ও কলিজা

হিলুয়াছড়া চা-বাগানের অনেকটাই ভিতরের দিকে গেলে একটা বাজার। শহর থেকে এয়ারপোর্টের দিকে যে-মেইনরোডটা গেছে, সেই রোড ধরে চৌকিদেখি পর্যন্ত যেয়ে ডাইনে টার্ন নিয়া বাগানরোডে ঢুকতে হয়। আধেক রাস্তা ইউনিয়ন পরিষদের পয়সায় পিচঢালা, বাকিটা মাটি আর ইটসুরকি। সিএনজিচালিত পরিবহনে যেতে পারেন, লাইনের ট্যাক্সি টিগার্ডেনে লোকবহনে নিয়োজিত নাই বিধায় রেন্টে ট্যাক্সি নিতে হয়, সবচেয়ে ব্যেটার হয় বাইকরাইড। মোটরবাইকে চেপে এই-ধরেন আধঘণ্টাটাক আগাইলেই হিলুয়াছড়া বাগানের বাজারটা পাওয়া যাবে। এমনিতেই চায়ের উচ্চাবচ টিলাঘেরা রাস্তা চিরে যাতায়াত অত্যন্ত মনোজ্ঞ হলেও দৈহিক ক্লেশও বড় কম নয়। বেশ দুর্গম এবড়োখেবড়ো পথ। তবে একবার হিলুয়াছড়া বাজারটায় গিয়া নামতে পারলেই নিমেষে পথহ্যাপার ক্লান্তি উবে যায়।

সেই বাজারে তেরো-চোদ্দটা পাকা বা আধাপাকা দোকানকোঠা। সংলগ্ন ঘরবাড়িগুলোতে ছবির মতন মানুষ শিশু মুর্গি তিতির টেঁপি আর রাজহাঁস। ঘরবাড়িগুলো পরিচ্ছন্ন। মনে হবে গ্যাব্রিয়্যাল গার্সিয়া মার্কেসের আখ্যানদেশে যেন পৌঁছে গেছি। নিকানো উঠোন, অলমোস্ট প্রত্যেকটা ঘরেরই চালা নিচু, ঢেউটিনখেলানো এবং দেয়ালে আল্পনা আঁকানো। দোকানসারির ঠিক মুখামুখি মন্দির। তিনইঞ্চি উচ্চতায় দেয়ালঘেরা বেশ বড় পরিসরের মন্দিরচাতাল। কালীর থান। বাগানিয়াদের মধ্যে মা-কালীর কদর কম্প্যারেটিভলি বেশি। এর নজির পাওয়া যায় বাগানরাস্তার দুইধারে একটু দূর দূর জঙ্গুলে বেশকিছু জায়গায় ক্ষীণকায় জায়গায় আগাছা ছেঁটে একেকটা কালীথান বানিয়ে রাখা। থানের নিত্যপূজারীরা সাঁঝের বেলায় মোম জ্বালিয়েও দিয়া যায়। এইসব চোখে পড়বে যেতে-আসতে। এবং আরও নজর করলে দেখা যাবে যে মেইনস্ট্রিমের সনাতনী কালীদেবীর তুলনায় দেহাতি বাগানিয়াদের দেবীটি পৃথক বৈশিষ্ট্যবহ।

অরণ্যগভীর অপরাহ্ন। অতিথিপরায়ণ দিলীপ গঞ্জুর দোকানে বসে তাতানো তেলে ভাজা ডালের বড়ায় কামড় দিতে দিতে বেশ-খানিকটা আলাপআড্ডা হয়। দিলীপের সঙ্গে খায়খাতির কবে থেকে, বেমালুম ভুলে গেছি। কিন্তু বছর-দশ হবে এতে ডাউট নাই। বিশেষ কোনো প্রসঙ্গ মাথায় রেখে সেভাবে এর আগে জমিয়ে আলাপ হয় নাই। দিলীপবাবুরা গঞ্জু গোত্রের লোক, উঁচা খান্দান তাদের, উড়িষ্যা থেকে সেই ইংরেজ আমলের গোড়ার দিকটায় তাদের পূর্বজেরা চা-বাগানে এসে ঘাঁটি গাড়লেও গঞ্জু গোত্রের লোকেরা রাজার জাত বলেই দিলীপবাবু জানালেন।

গঞ্জুরা বাগানি আর-দশজনের মতো হলেও অনেকটা অ্যারিস্টোক্র্যাটিক একটা ভাবসাব তাদের মধ্যে খেয়াল করলেই বোঝা যায়। বাগানের বাইরে মেইনস্ট্রিমে এই কিছুদিন আগেও জমিজিরেত ছিল তাদের। দিলীপ গঞ্জুর নিজেদেরই পিতামহের আমলে বেশ ভালো ভল্যুমের জমিন ছিল বলিয়া জানা গেল। সংগ্রামের সময় একাত্তরে সেই মিরাশদারি বেহাত হয়ে যায়। এখন দোকানটা আছে, আর ভিটেটুকু। মোটামুটি নিরভিযোগেই দিন চলে যায়। হ্যাপিলি।

লিকার বিক্রি হয়, কিছু চুরট-চানাচুর-বুট-বাদাম থাকে চাট হিশেবে। সেভেন্টি। বিশুদ্ধ নলকূপজল দিশির সঙ্গে এমনভাবে মেশানো হয় যাতে পানাহারকারীর স্বাস্থ্যবিঘ্ন না ঘটে। এই বাজারের আর-দশটা পানাহারদোকানের চেয়ে দিলীপের দোকানেই ভিড়টা বেশি। লিটারপ্রতি দেড়শ। বছর-কয়েক আগে আদ্ধেকেরও কম ছিল হাদিয়া। আক্রা বাজার, পড়তায় পোষাতে হবে তো। খদ্দেররা আসে শহর থেকেই। মোস্টলি বিকালঘেঁষা সন্ধের দিকটায়। ইনকাম যা হয় তাতে বেশ তো খুশিবাসিতেই জিন্দেগি গুজরিয়া যায়।

সেভেন্টি বানাইতে একটা হাতযশ তো লাগেই নিশ্চয়। প্ল্যান্ট থেকে আসে থার্টি, সেইটাতে পানি মিক্সআপের কেমিস্ট্রিটা সবার হাতে সমানভাবে খেলে না। তারতম্যের কারণে দ্রব্যগুণ ফিকে হয়ে যায়। আবার পানি পরিমাণে কম হয়ে গেলে সেইটাও গোলযোগকারী। ইদানীং অনেকেই স্লিপিং ট্যাব্লেট গুলে মিশিয়ে দেয় যাতে অল্পেই কিক পায় সেবাগ্রহণকারী। বৃথা হাদিয়া ডাবল হাঁকায়। স্বাস্থ্যের জন্য তো হুমকিই। দিলীপের এই বাবতে বেশ নামডাক আছে এলাকায়। বাংলার আলকেমিস্ট দিলীপ গঞ্জু। সর্বসাধারণের বোঝার স্বার্থে বলতে হয় সেভেন্টির রসায়নশিল্পী দিলীপ গঞ্জু। অত্যন্ত স্যুদিং তার হাতে সৃজিত পানীয়। কথায় কথায় দিলীপকে তার সৃজনকর্ম নিয়া প্রায়ই মুখর হয়ে উঠতে দেখেছে সবাই।

দিলীপের জন্মও সেভেন্টিরই আশপাশে। সেই সংগ্রামের বছরের গল্পগাছা করবার সময় তার জন্মকাল ও বয়সের গাছপাথর ঠাহর করবার একটা চান্স পাওয়া যায়। আইডিয়া হয় দিলীপের ভল্লুকের মতো গুঁজ-করে-রাখা রাগকণ্ঠ, গমগম গলা আর তার প্রায় কাপালিক চক্ষুদ্বয় কেন অত বলদর্পিত গনগনানো। তবে একটা চাক্ষুষ কারণ কারোরই অগোচর থাকত না, তা হচ্ছে এ-ই যে দিলীপ ঘুম থেকে উঠে সেভেন্টি মিশায়া বাজারের ব্রেড খায়, সারাদিনে কয়বার কয় গেলাশ সাবাড় করে সেই ইয়ত্তা আঙুলে কে-আর গুনে রেখেছে, রাইত বারো বাজিয়ে ঘুমাইতে যাইবার সময় দিলীপ সেভেন্টি দিয়াই তার ডে কল্ করেছে হেমন্ত-বসন্ত-বর্ষা বারোমাস।

দোকানে রেগ্যুলার কাস্টোমার সকলেই প্রায় শাহরিক মানুষ। ট্র্যাক-ট্যাক্সির ড্রাইভার থেকে শুরু করে সদ্য-পাশ-দেয়া ছাত্র নবযুবকেরা ছাড়াও কবিশিল্পীসাহিত্যিক অনেকেই দিলীপ গঞ্জুর নিয়মিত খদ্দের। কথা বললে যে-কেউ বুঝতে পারে দিলীপের সিনা পাক্কা ছাপ্পান্ন ইঞ্চি চওড়া। আর তার কলিজার বেড় কত বুঝতে গেলে একটু টাইম তো লাগেই। নিজের কাস্টোমারদের লাগি দিলীপের জানকুর্বান পলকের অপেক্ষা মাত্র। মুর্গি-খাসি খাইতে চাইলে একতুড়িতেই দিলীপ ব্যবস্থা করে ফেলে। অফ-সিজনে হাঁস বা কাছিম বা কুচিয়া খাইতে চাইলে অবশ্য দুই-একদিন আগে ব্যবস্থার জন্য বলিয়া রাখতে হয়। এইগুলার জন্য আলাদা সার্ভিসচার্জ লাগে না। আর এক্সপেন্স বাজারদরের চেয়ে হাফ না হলেও অলমোস্ট কাছাকাছি। দিলীপের এইসব ব্যবস্থাদি সমস্তই আউটসোর্স করা। তার নিজের প্রোডাক্ট শুধুই সেভেন্টি। পিউর সেভেন্টি। দিলীপের কাছ থেকে কেউ খোলা-পলিথিনে-মোড়া বাগানি চাপাত্তি নিয়া বাসায় গিয়া বউয়ের গঞ্জনার শিকার হয়েছে এমন বিবৃতি একটাও নাই। দিলীপ গঞ্জুরে আপনি কি দিলেন সেইটা বিবেচ্য নয়, দিলীপের কাছ থেকে আপনি পাবেন চিরদিন একনাম্বারটাই। দিলীপ গঞ্জুকে এই কথাটা আমরা বহুবার বলতে শুনেছি। দিলীপের ভোক্যাল কর্ড, তার গলার টিম্বার এবং পিচ, তার অ্যাক্সেন্ট তো অরিজিন্যাল এবং আমাদের চেয়ে সবসময় আলাদাই।

দিলীপের দোকানে বেঞ্চি আছে, সাকুল্যে তিন-চারটে, ভেতরের দিকটায়। একলগে জনা-দশেক বসা যায়। সামনের অংশ থেকে এই অংশটা পর্দা দিয়া আলাদা করা। বাজারের সব দোকানেই আসনব্যবস্থা একই ডিজাইনের। কাউরেই কিন্তু দুই-তিনঘণ্টার আগে গা তোলার হেলদোল করতে দেখা যায় না। আর আসেও লোকে একেকটা দঙ্গল বেঁধে। কেউ একলা আসে না। কাজেই ভিতর-বাইর মিলিয়ে জনা-চারেকের তিন-চারটা গ্রুপ বসবার ব্যবস্থা পায়। এর থেকে ইনকাম হয় দেড়শ করে ধরলে আটশ বা হাজার বড়জোর। দোকানগুলো খদ্দেরের জন্য দুয়ার খুলে বেলা আড়াই-তিনটার দিকে। এর আগ পর্যন্ত দোকানদার সকলেই টিগার্ডেনে পাতাতোলা বা আরও সমস্ত কাজ করে এবং খোরাকি নেয় হপ্তান্তে। দিলীপ অবশ্য বাগানিয়ার কাজকর্ম খুব-একটা নাই। বিয়াশাদির পরে এখন বউ পাতাতোলার কাজে হপ্তা পায়। ফ্যামিলির শুধু কাচ্চাবাচ্চারা ছাড়া বাকি সবাই হপ্তাকামে খোরাকি নেয়।

এই হিলুয়াছড়া বাগানেই-যে কেবল এমনটা দেখা যায়, তা নয়। সিলেটের শহরসংলগ্ন যতটা বাগান আছে সবখানেই চিত্র প্রায় একই। সিটি-অ্যাডজ্যাসেন্ট টিগার্ডেনের সংখ্যাও তো কম নয়। লাক্কাতুরা, মালনীছড়া, কালাগুল, বুরজান ইত্যাদি বিচিত্র নামে একদম শহরলাগোয়া চা-বাগান আছে কম করে হলেও গোটা-বিশেক। সব বাগানেরই নিসর্গ মনোহর, বলা বাহুল্য, সবচেয়ে বেশি দ্রষ্টব্য অথচ সবচেয়ে কম দেখা হয় বাগানিয়া মানুষগুলোরেই। পিটপিটে চোখ, ঢুলুঢুলু দিনভর, অদ্ভুত মায়ামাদকময়তা মানুষগুলার অবয়বে খেলা করে।

শেষ যেইবার দিলীপবাবুর সঙ্গে এই নিবন্ধকারের দেখা হয়, গেল বর্ষায়, বৃষ্টিদিন ছিল। ভুল বললাম। হ্যাঁ, ইয়াদে এসেছে, সেই বর্ষাবিকালের দিন-পনেরো পরে একবার দেখা ও কথাবার্তা হয়েছে সন্ধ্যালগ্নে। ভেবেছিলাম তার লগে একদিন আরেকটু সবিস্তার কথা বলা যাবে নেক্সট কোনো অবকাশে। সেই-রকম কথাই ছিল দিলীপ গঞ্জুর সঙ্গে। এরপরে, সেইবারের মাস-তিনেকের মধ্যে, হিলুয়াছড়ায় যাই, গিয়ে দেখি দোকানে বসে আছে একটা আঠারো-উনিশ বছরের ছেলে। দিলীপবাবু কই? লিভার-সিরোসিস হয়েছে দিলীপকাকার, ছেলেটা জানায়। ভাতিজাই দোকানে বসছে গেল কয়দিন ধরে। দিলীপেরা ভাইব্রাদার সবাই মিলে একান্ন পরিবার। বড়ভাইয়ের ছেলে সেই কারণেই দোকানে বসছে। দিলীপের আরেক ভাইয়ের দোকানও লাগোয়া। তারও কারবার সেভেন্টিরই। দিলীপের দুই ছেলে এখনও প্রাইমারি পড়ছে। এই তো সবেমাত্র ভর্তি হয়েছে দুইজনে আগুপিছু। অসুখে বেশ ভুগছে বেচারা, ভাবলাম যে দেখতে যাই।

কিন্তু তা আর হয় নাই। তিনমাস ভুগেছে। কলিজার ক্ষয়ক্ষতি নিয়া বাবু দিলীপ গঞ্জুর বিশেষ ভ্রুক্ষেপ কোনোকালেই ছিল না। বাগানিয়াদের কারোরই নাই। মৃত্যু জিনিশটা বাগানিয়া হাউজহোল্ডগুলায় আসে এক কালাজ্বরের বেশে এবং দুই লিভারে পচন ধরিয়ে দামামা বাজিয়ে। বেশ কয়েকবার দিলীপের মুখে শুনেছিলাম বটে যে তার লিভারে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এবং দিলীপ তার লিভারের আপডেট জানাইবার সময় চোখেমুখে বেশ একটা ভাবের উদয় হতো, গর্বের একটা ভাব, লক্ষ করেছি। টিগার্ডেনের এই জনগোষ্ঠীর কাছে লিভার-সিরোসিসে ডেথের ব্যাপারটা ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ, অনেকটা দেবদাসের মাহাত্ম্যমণ্ডিত, অনেকটা ব্যাটাগিরির ব্যাপার।

ওসমানী মেডিক্যালে নেয়া হয়েছিল অবশ্য। পত্রপাঠ বদ্যির জবাব পাইতে দেরি হয় নাই। দিলীপের স্বজনেরা হাসপাতালের বড়বাবুদের কাছে ধর্না না দিয়া বাড়িতেই নিয়া আসে প্যাশেন্ট। সব মিলিয়ে মাস-তিনেক মাটিতে প্ল্যাস্টিকের চাটাইয়ে শুয়ে থেকেছে। ভেদবমি, রক্তবমি, সিম্পটম যা যা হয়েছে ফ্যামিলিমেম্বারদের কাছে সেসব কিছুই আননৌন নয়। শেষে দিলীপ চক্ষু মুদেন জানুয়ারির গোড়ায়। এরই মধ্যে শ্রাদ্ধকৃত্যাদি সাঙ্গ হয়েছে। চোঙ্গা মাইকে মন্দিরের পুরোইত ঠাকুরের কয়েকটা আনুষ্ঠানিকতার পরে পাড়ার উঠতি ছেলেমেয়েরা তালকাটা গলায় দেশাত্মবোধক কয়েকটা বাংলা আর বাকি হিন্দি ফিল্মি গানগুলা গাইতে পেরেছে। বেইল তিনটার দিকে প্যান্ডেল বেন্ধে মাইক লাগানো হয়, রাইত দশটার মধ্যেই প্রোগ্র্যামের সমাপ্তি।

হিলুয়াছড়া চা-বাগান, গঞ্জু সমাজ ও দিলীপ গঞ্জুর সারাজীবন নিয়া ভাবতে বসে দেখছি যে তেমন বলবার মতো কিছুই জানি না এই গঞ্জু জনগোষ্ঠী সম্পর্কে। বেশ অনেক বছর ধরে এই বাগানে গতায়াত থাকলেও, যা হয় আর-কি, রোম্যান্টিক শহুরে গাড়লপনার কারণে ন্যাচারাল অ্যাম্বিয়্যান্স নিয়া আহা-হাহা গাওয়া ছাড়া এখানকার রক্তমাংশের মানুষরতন সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা হয় নাই। দিলীপের সঙ্গে যেটুকু কথাবার্তা হয়েছে তা-ও শুধু উপরটপকা ঠাট্টাতামাশা। বাকিটা যার যার মৌতাতে মশগুল।

তবে হিলুয়াছড়া বাগান বলতেই দিলীপের মুখটা আমৃত্যু মনে থাকবে আমাদের অনেকেরই। ভীষণ অতিথিপরায়ণ দিলীপ গঞ্জু। সকলেই টিগার্ডেনে সিধাসাধা আতিথ্যপূর্ণ সদাচারী হয়ে থাকে। একটা ভাবঘোরে থাকে এরা প্রায় সকলেই বলতে গেলে। একেকটি টিগার্ডেনে এইরকম দিলীপপ্রতিম মানুষ কম করে হলেও ছয়-সাতশ পাওয়া যাবে। একটু বেশিই দিলদরিয়া বাবু দিলীপ গঞ্জু। সবচেয়ে বেশি দরাজ তার গলা। ফ্যাসফ্যাসে এবং একইসঙ্গে ভরাট। গমগমে। এলআরবি-র প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর মতো। চোখজোড়া বাংলা পানির প্রভাবে কেমন যেন ঘোলাটে। এরপরও ধকটুকু গোপন থাকে না তার চোখের। কলিজায় ব্যামো হয়েছে, এবং এইটা যে ডেথপাসপোর্ট, এইটা বাবু দিলীপের কাছে স্রেফ তথ্য ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা ভাবতাম দিলীপ গঞ্জু বোধহয় বাড়িয়েই বলছে। যেমন গল্পগাঞ্জুড়ি সে, একটা তিলের কথা কইতে যেয়ে তাল বানিয়ে ফেলতেই পারে। গেলাশ দুই-চাইরটা সাবড়ে একদমই মিতবাক বন্ধুটিরে আমরা কি প্রগলভ হতে দেখি না? কাজেই, দিলীপের দেবদাসাখ্যানে তেমনটা আমল দেই নাই।

কিন্তু কলিজাব্যাধিতে ব্যয়িত-নিঃশেষিত হয়ে দিলীপ বিদায় নেবার পরে তার ভাই নির্মল আর তার ভাতিজা কৃষ্ণের সঙ্গে মেমোরিচারণ করতে যেয়ে বুঝতে পারি মৃত লোকটা তাদের পরিবারে একটা বাঘের ব্যক্তিত্ব নিয়া গার্ডিয়ানশিপের ডিউটিটা পালন করে গেছে। নেক্সটডোর ন্যেইবার দোকানদাররা দিলীপকে এই হিলুয়াছড়া বাজারের সবচেয়ে তেজি আর খাঁটি মানুষের শিরোপাটা দিতে কার্পণ্য করে না। তারা বলে, দিলীপের পরোপকার আর তার ন্যায়নিষ্ঠ কণ্ঠের ক্রোধ তাদের লোকালয়ে চিরদিনই নাকি জাগরুক রইবে। ইত্যাদি।

দিলীপের কাল আর আমাদের কাল অভিন্ন ও একই। কিন্ত শুধু কলিজার বিচারে মাপতে গেলে হেঁট হয়ে যেতে হবে স্বর্গত বাবু দিলীপ গঞ্জুর কাছে আমাদের অনেকেরেই। লিভার তাজা রাখতে যেয়ে আমরা খাই ইতংবিতং কতকিছুই, চিকিৎসায় ব্যয় করি গুচ্ছের পয়সা, কিন্তু কলিজার ব্যবহারে তেমন আগুয়ান আমরা আর কেউই হই না। আমাদের বাপচাচাদের আমলেও লোকে ভ্যালু দিত যারা নাকি জন্মাইত ও জীবনটা যাপন করত কলিজার ঐশ্বর্য নিয়া। আড়াই-তিনহাত দৈর্ঘ্যের শরীরে আমাদের কলিজাটা আজকাল আছে বলেই তো মনে হয় না। আমাদের এইটুকু মুর্গিলিভার সুরক্ষায় প্রায় প্রতিদিনই নিকটবর্তী কারো-না-কারোর কলিজায় দাগা দিই, খুনজখম করি প্রয়োজনে, মিথ্যাচার আর ঠকানো ও ধোঁকাবাজির জাব্দাখাতা কে খুলতে যায়!

সেলফোনক্যামেরায় রাজ্যির কত সিনসিনারিই দিবারাত্র তুলি, দিলীপ গঞ্জুর একটা ছবি কোনোদিনই ক্যাপ্চার করবার কথা মাথায় আসে নাই। এখন পস্তানো বেফায়দা। আর এই নিবন্ধের সঙ্গে সেঁটে-দেয়া ব্যানারের ছবিতে যে-দেয়ালটা দেখা যাচ্ছে, এইটা পাকা একটা ঘরের চারদিকে ঘেরা বাংলাদেশপতাকাখচিত নকশার একাংশ। ওই হিলুয়াছড়া বাজারবর্তী দিলীপ গঞ্জুর দোকানসংলগ্ন বসতগৃহ। রঙমিস্ত্রি দিয়া না, গেরস্তের নিজহাতে লেপানো রঙদার ঘরদোরের মালিক গঞ্জুসমাজের প্রায় সক্কলেই। ইয়াদ হয়, দিলীপের কাছেই জেনেছিলাম ‘বাংলাদেশ গঞ্জু সমাজ’ নামে তাদের একটা সামবায়িক সংঘ রয়েছে। সেই সংঘের অ্যানুয়্যাল জেনারেল মিটিং হয় বাৎসরিক ভিত্তিতে, সেই সুবাদে একটু উদ্বেল খানাপিনাও হয় সমাজের ছেলেবুড়ো সব্বাই মিলে। নেমন্তন্ন করে রেখেছিল কার্নিভ্যালেস্ক সেই দিনরাইতের কমিউনিটিফাংশনে এইবার। কবে যেন জমায়েতটা হয় তা-ও তো ভুলে গেছি দেখি। লিভারতাজা মানুষের স্মৃতিবিস্মৃতি নিয়া বাগবিস্তার ছাড়া ব্যাগে বেশিকিছু তো সদাইপাতি ছিল না, নাই, কাজেই কথা বাট্টি করি এখানেই। ফ্যুলস্টপ।

লেখা : জাহেদ আহমদ

… …

 

গানপার

COMMENTS

error: