‘এসো আমার শহরে’ — এই গান প্রকাশের ৭ বছর হলো। সময় কীভাবে চলে যায় তা টের পাই না আমরা। এই গান বেঁধেছিলাম ২০১২/’১৩-র দিকে। খুব ভাঙাচোরা আর অনুপ্রেরণাহীন এক সময়ে। সব মরবিড লাগছিল বুঝি তখন। আমি কোহেন অল্প অল্প শুনেছি ততদিনে। এই গান যখন বাক্য হয়ে সুর হয়ে বের হলো তখন কোহেনের আছর এসে পড়েছে স্পষ্ট বুঝেছি। অমন লো এন্ডে গান আর কেই-বা গায় এই জগতে। টম ওয়েটসের গলাও ভীষণ ভারী আর তবে তার প্রকার ভিন্ন। কোহেন তার শান্ত নদীর জলের মতো গম্ভীর এক স্বর নিয়ে আমাকে প্রভাবিত করেছিল তার গায়কী দ্বারা। সে-সময় আমি যা বলতে চাইছিলাম যে ক্রোধ আর পরাজিত অনুভব যুগপৎ কাজ করছিল মনে তাকে এই স্বভাবেই গাইতে মন চাইছিল। স্বতঃস্ফূর্ততাকে দমাইনি তাই।
আমার মনে আছে তখন রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটা ফটোগ্রাফ দেখেছিলাম যেখানে একজন বাস্তুহীন লোক ব্রিফকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যার শূন্য দৃষ্টি দিগন্ত ছাড়িয়ে বহুদূরে। পেছনে কুয়াশাময় পাহাড়ের চূড়া। এই ইমেজগুলো নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল ‘এসো আমার শহরে’ নির্মাণে। এখানে কেবল আমার অভিজ্ঞতাটুকুই রইল;—এর বাইরে একে যখন যন্ত্রানুষঙ্গ বা এর অ্যারেঞ্জমেন্ট যখন হলো, এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই যেভাবে একে ইন্টারপ্রেট করল তার জায়গা থেকে — এসব গল্প বাকি আছে এখনও।
সৌরভ (সরকার) তখন মেঘদল থেকে ছুটিতে। আমার মনে আছে একটা লাইভ শোতে এটা শুনে সে আমাকে ফোন করে বলল এখানে আমি ক্লারিনেট বাজাবো শিবু। আমি ভীষণ তাড়িত হলাম। এটা আমার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা ছিল। এই গান প্রকাশিত হবার পর কত কথা কত আলাপ কত ইন্টারপ্রিটেশান আজ অব্দি পাচ্ছি তা আমার মাথার মুকুট। তাদের কাছে রইল আমার প্রণতি।
একটা ছোট্ট ঘটনা বলে এ লেখা শেষ করি। এই গানটি যারা শুনেছেন তারা মাত্রই জানেন এ-গানের শুরুতে রয়েছে কয়েক ছত্র কবিতার লাইন যা কিনা কবিতার মতো পাঠ করি আমি। রেকর্ডেড ভার্শনেও সেটিই আছে। এই কবিতার অংশটুকু গানের ভাবনায় ছিল না। এমনকি গানটি সম্পন্ন হবার পরেও এটি ছিল না। আমরা এসএটিভিতে এটি পারফর্ম করেছিলাম সেখানে এটি নেই। কীভাবে কবে এটি যুক্ত হলো সে-কথাই বলছি।

আমরা বুড়িগঙ্গার পাড়ে কবি নজরুল কলেজের ছাত্রাবাসের (প্রাচীন মঙ্গলাবাস) ছাদে সেট ফেলেছিলাম মেঘদলের কিছু গান লাইভ পারফর্ম করব বলে; সেখানে প্রায় দিনব্যাপী চলেছিল নানা যজ্ঞ। এর ভিডিও ডকুমেন্টেশন টিমে আমাদের সমস্ত সুহৃদ বন্ধুজনেরা ছিলেন যাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। সেই ছাদে যেদিন শুটিং হলো সেখানে প্রথম গানটিই ছিল ‘এসো আমার শহরে’।
খুব সকাল সকাল শুটিং শুরু হয়েছিল। গানটার টেক্নিক্যাল আয়োজনের পর যখন গানটি গাইতে শুরু করলাম একটা ইন্ট্রো পার্ট শুরু হয়নি তখনও। মাত্র প্যাডের মতো একটা কর্ড ব্যাকআপ পাচ্ছি কানে, ঠিক সেই মুহূর্তে মরা বুড়িগঙ্গার ছাই ছাই আকাশ আর ধূসর দূরের উঁচু উঁচু ফ্ল্যাট, আকাশে চিলের মন্থর ওড়াউড়ি আমার ভেতরে এক অদ্ভুত কাব্যবোধের জন্ম দিলো। আমি সকলকে চমকে দিয়ে ভুল করে গেয়ে উঠলাম ‘এই ধুলো ধুলো শহর…।’
এই গানের ভিজুয়াল নির্মাণ বিষয়েও জরুরি আলাপ বাকি রয়ে গেল, সেসব গল্প পরের কিস্তিতে হবে।
০৫ মার্চ ২০২৫
শিবু কুমার শীল রচনারাশি
গানপারে মেঘদল
টুকটাক সদালাপ সমস্ত
মেঘদল অফিশিয়্যাল অন ইউটিউব
- একটা ডিলেট করা সিনের মধ্যে ঢুকে বসে আছি || নাফিস সবুর - March 27, 2026
- মেঠোসুরের আঠারো বছরপূর্তি সংখ্যা : লোকজ চেতনার নবউদ্ভাস || মিহিরকান্তি চৌধুরী - March 26, 2026
- জ্বালা-নি-সংকট || নাফিস সবুর - March 26, 2026

COMMENTS