আত্মজীবনী কোনো লেখকের নিছক বর্ণনা কিংবা আখ্যান নয়। আত্মজীবনী মূলত লেখকের আয়না। নিজেকে দেখার আয়না। সে-হিসেবে লেখকের প্রত্যেকটি লেখাই তাঁর আয়না। তাঁর আত্মজীবনী। শুধু গল্প, কবিতা, উপন্যাস, পত্রসাহিত্যে কিংবা প্রবন্ধসাহিত্যেও রবীন্দ্রনাথ আত্মজীবনীই লিখেছেন। সম্পূর্ণ সাহিত্যকর্মের বাইরেও ‘জীবনস্মৃতি’ এবং ‘ছেলেবেলা’ শিরোনামে রবীন্দ্রনাথ দুইখণ্ডের ছোট্ট আত্মজীবনীও লিখেছেন। যেখানে স্পষ্ট হয়ে আছে কবির জীবনদৃষ্টির বিচিত্রতর শাখা-প্রশাখা, আত্মবিকাশের একান্ত নির্জন ছোটবেলা।
কথাশিল্পী কবি সৈয়দ শামসুল হক তিনখণ্ডে জীবনের তিনটি পর্বকে লিখেছেন। যতীন সরকার লিখেছেন ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’। যেখানে উঠে এসেছে পূর্ব-ময়মনসিংহের একশো বছরের ইতিহাস। জীবনের সাথে, সময়ের সাথে দৌড়ুতে দৌড়ুতে আমরা ক্রমশ বদলে যেতে থাকি। জীবনটাকে উদযাপন করতে থাকি। প্রবহমান জীবনটাকে, সময়টাকে উদযাপনটাই মানুষের আত্মজীবনী। কিন্তু লেখক শুধু সময় উদযাপন করেন না, সময়টাকে লিখেনও। তাই আত্মজীবনীতে উঠে আসে সময়ের নথিপত্র, দর্শন, রাজনীতি, মাটির মানচিত্র।
ষাটতম জন্মদিনে কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদ প্রণীত ‘এ হেন সোনার নৌকা’ গ্রন্থটি বের হয়েছে। এই গ্রন্থটি মূলত লেখকের কৈশোরিক আত্মজীবনী। খুবই ছোট্ট পরিসরে কবি লিখেছেন তার অঙ্কুরিত সময়ের চারপাশ, স্কুল, স্কুলিং, প্রাকৃত পরিস্থিতি। হাওরপারে নেত্রকোনায় কবি জন্মেছিলেন। সেই জলমগ্ন ভূমি মোহনগঞ্জ থেকে হিরনপুরে পরিত্র মনের একটা শৈশব উঠে এসেছে আত্মজীবনীতে। এখানে শুধু ব্যক্তি উপস্থিত হননি ব্যক্তির সাথে একটা সমাজ, সে-সমাজের আচার-বিচার ও সংস্কৃতিও হাজির হয়েছে।

জীবনের কোনো গাইডবই হয় না। প্রতিটি জীবন জ্বলন্ত। লেখকের বর্ণনা খুব সহজ। প্রত্যেকটি চ্যাপ্টারের একটা শিরোনাম তিনি রেখেছেন। কাজেই যে-কেউ এক নিঃশ্বাসে এই গ্রন্থ পড়ে ফেলতে পারবেন। দেখে ফেলতে পারবেন কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদের জীবনের উঁকি। ‘মাতৃজঠরের কিনারায়’, ‘স্কুলে যাওয়ার আগে মক্তবে গিয়েছি’, ‘নানুর বাড়ির নামডাক’, ‘পৃথিবীটা আব্বা-আম্মার উঠান’, ‘হাশেম মামার স্কুলিং’, ‘পৃথিবীটা মোহনগঞ্জের আশেপাশে’, ‘সুফি পুরুষের পরম্পরা’, ‘গান-গায়েনের মাটি’, ‘পথের কিনারে মন মহাজন’, ‘স্কুলের জানালা’, ‘অঞ্জু ঘোষের সিনেমায়’, ‘স্টেশনে স্টেশনে পরাবাস্তবতা’, ‘জীন-পরীদের গ্রামে’, ‘আত্মীয়-স্বজনে, বায়স্কোপে’, ‘পথের মানচিত্র’, ‘নানার সিন্দুক’, ‘পথের কিনারে’,—এই শিরোনামগুলোই বলে দেয় লেখকের আত্মজীবনীর সারাংশ।
মোটমাট ৮৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি যে-কারো শৈশবকে ফিরিয়ে দেবে।
গানপার বইরিভিয়্যু
- বিদায়, কবি আনিসুর রহমান বাবুল! || সরোজ মোস্তফা - April 20, 2026
- কবিতা নাই কেন? - March 28, 2026
- নেত্রকোনার বড়বাজারের বারুণী মেলা - March 27, 2026

COMMENTS