২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। বিশেষ এবাদতের রাত। আলেক্সান্ড্রা প্যালেস, লন্ডন। মহিমান্বিত রজনি।
পরে, অনেক পরে, যখন সব শেষ হয়ে গেছে এবং মানুষ বাড়ি ফিরেছে এবং রাস্তায় ঠান্ডা বাতাস বইছে, তখনও কেউ কেউ আলেক্সান্ড্রা প্যালেসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, তারা নিজেরাও জানে না কেন দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো ভেতরে ফেলে আসা কোনো মুহূর্তের কথা মনে পড়ছে তাদের, যদিও তারা কিছু ফেলে আসেনি। তারপরও খালি খালি লাগতে থাকে তাদের। ওদের। কারণ, অবিশ্বাস একটা বসবাসযোগ্য ঘটনা। এই রাতে এইখানে তারা খুঁজে পাইছে ডিজিটাল সন্ন্যাস। এখন মনে হচ্ছে বাড়ির পথ ধরলে সুশৃঙ্খল এবং উদ্দেশ্যমূলক জাগতিক ভোগ ও সংসার জীবনে ফের চেপে বসবে না তো! কাঁচা ভয়।
এইসবই ঘটছে কামেল ফ্রেড অ্যাগেইনের মিলাদ মাহফিল থেকে শিরনি হাতে বিদায়ের কালে।
মিলাদ মাহফিলে যা হয় তা হলো—মৃতকে ডাকা হয়, এবং কখনো কখনো মৃত সাড়া দেয়। মৃত্যুর পরেও কিছু কিছু কণ্ঠস্বর ডাকলে সাড়া দেয়। সেই রাতে কামেল ফ্রেড আবারো ডেকেছিল এবং আশেক থমাস সাড়া দিয়েছিল। Daft Punk-এর কবর থেকে। ফ্রেঞ্চটাচের ফিউচারিস্টিক পাস্টের মঞ্জিল হতে।
Fred again…নামের যে মানুষটি—যার আসল নাম ফ্রেড গিবসন এবং যে আল্লামা ব্রায়ান ইনোর কাছে নাদ, নিনাদ, আর্তনাদ, কলরব, এবং গীতিবাদ্যের তালিম নিছে, শিখেছে এবং যে দর্শক-শ্রোতামণ্ডলির ব্যক্তিগত কর্ণকুহরকে ড্রাম এন বেইজের জ্যান্ত জঙ্গলে পরিণত করে—সে এই রাতে একটা কার্যসিদ্ধি লাভ করেছে। যা করার কথা কেউ অগ্রিম ভেবে রাখেনি। তারপরও, আন্ধার ঝিলমিল সেই রাতে প্রায় সকলেরই যেন স্বপন দেখে ধড়ফড়ায় উঠার পর যেমন কিছু মনে থাকে না, কিন্তু শরীরে একটা আবছায়া ফগ থেকে যায়, সেই অনুভূতির মতোই ছিল এই রাত। আশেক Thomas Bangalter, যাকে মানুষ ষোলো বছর ধরে কোনো মঞ্চে দেখেনি, যিনি গত অক্টোবরে প্যারিসে একবার ফিরে এসেছিলেন, তিনি আবার এলেন—এবার ব্রেক্সিটের রাজধানী লন্ডনে।
এবং তখন বোঝা গেল যে কিছু কিছু অনুপস্থিতি আসলে নিরপেক্ষ অপেক্ষা।

কামেল ফ্রেড লিখেছিল সেই দিন, শো হবে এই এলানের আগে : “আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে এটা টাইপ করছি।” এই বাক্যটা পড়ে যারা হাসল তারা বুঝল না, কারণ এই বাক্যটা শুধু একজন আবেগে-উত্তেজিত মানুষের স্বীকারোক্তি নয়। এই জন্য যে, যে সে নিজেও জানত না এটা সম্ভব, যেভাবে মানুষ জানে না কখন বৃষ্টি আসবে কিন্তু বৃষ্টি আসলে মনে হয় এটাই স্বাভাবিক ছিল, এটাই হয়তোবা হওয়ার কথা ছিল।
ডিজেবাদ্য প্রদর্শনীর গৌরচন্দ্রিকা হয়েছিল জর্মন-ব্রিটিশ সুরলেখক জর্জ ফ্রেডরিক হ্যান্ডেলের Sarabande দিয়ে, তারপর Peter Fonda-র কণ্ঠস্বর, তারপর সেই পুরনো ‘Jack has a groove’ স্যাম্পলিং।
আশেক থমাস। লা জওয়াব।
যারা সেখানে ছিল তারা বলেছে যে প্রথম কয়েক মিনিট তারা বুঝতে পারেনি কী হচ্ছে, ধীর, গম্ভীর এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় বারোক সংগীত থেকে হাইস্পিডের, ভারী বেইজের রেভ মিউজিকের মোহময় অন্ধকারাচ্ছন্ন পারফর্মিং আর্টে যাওয়ার এই পথটা তাদের কাছে অপরিচিত মনে হয়েছিল। যদিও আসলে এটা পুরনো পরিচিত পথ। কারণ, গির্জার ভেতরে নাদের যে কম্পন হয় এবং গোডাউন বা পরিত্যক্ত ওয়্যারহাউজের ভেতরে যে কম্পন হয় তাদের মধ্যে পার্থক্য শুধু স্থাপত্য এবং কাঠামোর, অবস্থানকারী শরীরের না।
তাই, স্মৃতিকে জিরো জিরো টু তে কল দিয়ে জেনে নিন যে, ফরাসি ইলেক্ট্রনিক মানিকজোড় Daft Punk ভেঙে গিয়েছিল ২০২১ সালে। তারপর থেকে ইলেক্ট্রনিক মিউজিকের বড় একটা অংশ এমন একটা অনুভূতির মধ্যে বাস করছিল যেটাকে হয়তো শোক বলা যায়, যদিও কেউ মরেনি, কিন্তু কিছু-একটা চলে গিয়েছিল যা ফিরে আসার কথা ছিল না এবং সবাই জানত ফিরে আসার কথা নেই কিন্তু তবুও অপেক্ষা করত, অসম্ভবের দিকে তাকিয়ে।

স্বর্গীয় তাত্ত্বিক মার্ক ফিশার একবার লিখেছিলেন যে হন্টোলজি হলো সেই অবস্থা যেখানে যা-হতে-পারত তা যা-হয়েছে-তার চেয়ে বেশি বাস্তব মনে হয়।
Daft Punk ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ইলেক্ট্রনিক মিউজিকের একটা বড় অংশ এই হন্টোলজিতেই বাস করছিল। সহ-আশেক গাই-ম্যানুয়েল এবং আশেক থমাসের হেলমেটের ছায়া, যা কখনো আসেনি কিন্তু সবসময় আসবে বলে মনে হয়েছিল। আলেক্সান্ড্রা প্যালেসে সেই সন্ধ্যায় যা বাজল, তা অনেকটা Alive 2026-এর মতোই ছিল—Daft Punk-এর ক্ল্যাসিক ও জনপ্রিয় গানগুলোর সাথে একটা আধুনিক পারফরম্যান্সের ইন্টিমেইট মেলামেশা।
সেই রাতে বাজল ‘One More Time’, ‘Harder, Better, Faster, Stronger’, ‘Around the World’, ‘Technologic’, Stardust-এর ‘Music Sounds Better With You’। কিন্তু এগুলো যেভাবে বাজল তা আগে কখনো বাজেনি, কারণ, ফ্রেড আর থমাস সপ্তাহভর স্টুডিয়োতে ছিল এবং পুরো একটা নতুন সংগীতায়োজন করেছিল শুধু এই এক রাতের জন্য। ‘One More Time’-এর সাথে Marvin Gaye মিশে যাওয়ার পর যারা কাঁদল তারা নিজেরাও জানল না কেন কাঁদছে, হয়তো এই দুটো গান আলাদা ছিল না কখনো, হয়তো তারা সবসময় একে অপরের মন যেখানে হৃদয়ের সেখানে ছিল এবং আজ রাতে প্রথমবার সেটা দৃশ্যমান হলো।
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে কে যে করলো—সম্ভবত থমাস নিজেই—Prince-এর ‘Raspberry Beret’ ছেড়ে দিলো, Digital Love-এ মিশিয়ে। সেই মুহূর্তে হাজিরানে মজলিশে যা ঘটল তা বর্ণনা করা কঠিন, কারণ কিছু কিছু মুহূর্ত ভাষার আগে থেকে থাকে এবং ভাষার পরেও থাকে, ভাষা শুধু তাদের পাশ দিয়ে বয়ে যায়।
এক ছাদের নিচে যুগপৎভাবে নৃত্যরত, ক্রন্দনরত এবং হাসিমুখের দেখা এইখানেই পাওয়া সম্ভব ছিল কারণ আত্মার নাচন শারীরিক দোলাচলের ব্যস্তানুপাতে ক্রিয়াশীল।

আশেক থমাস সম্পর্কে একটা কথা বলা দরকার, যে-কথাটা সাধারণত বলা হয় না।
তিনি জানেন কীভাবে মানুষের সেই আদিম সেরিব্রাল অংশকে, যে-অংশ শুধু নড়তে চায়, যুক্তিহীনভাবে, সম্পূর্ণভাবে, সেই অংশকে জাগিয়ে দিতে হয়। সাউন্ড অ্যাটাকে। এটা একটা বিরল ক্ষমতা এবং এই ক্ষমতা সবার থাকে না এবং যাদের থাকে তারা নিজেরাও জানে না কীভাবে এটা কাজ করে, তারা শুধু জানে যে করতে হবে। এই অজানাকে কী ইন্সটিংক্ট নামেও ডাকা হয়!
এই দফায় কামেল ফ্রেড দশ সপ্তাহে দশটি শহরে দশটি সুরেলা প্রদর্শনী করেছিল। প্রতিটি রাতে ভিন্ন অতিথি, প্রতিটি শহরে ভিন্ন গল্প।
লন্ডনে এসেছিল JME, La Roux, D Double E, Skream ও Benga, The Streets, Underworld। এরা প্রত্যেকে নিজের মতো করে একটা রাত তৈরি করেছিলেন, কিন্তু সব রাতই শেষ পর্যন্ত এই শেষ রাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, যেভাবে নদীর সব শাখা জানে সমুদ্র কোথায়, যদিও নদী নিজে কিছু জানে না।
মিলাদ মাহফিলে আমাদের দেশে যা হয়, তা অবশ্যই আপনাদের জানা আছে। তা হলো, একজন বিদেহী মানুষের রুহের উদযাপন করা হয় তার চলে যাওয়ার পরে।

Daft Punk চলে গেছে।
কিন্তু সেই রাতে আলেক্সান্ড্রা প্যালেসে যা হলো তা কোনো সমাধির উদযাপন ছিল না। বরং, সেটা ছিল একটা প্রশ্ন।
এবং প্রশ্নটা হলো : কিছু কিছু জিনিস কি সত্যিই শেষ হয়? নাকি তারা অন্য কোনো রূপে থেকে যায়, অন্য কারো হাতের মধ্য দিয়ে ফিরে আসে, অন্য কোনো রাতে অন্য কোনো শহরের আর্বানিটিতে?
কামেল ফ্রেড বলে ফেলেছে যে, এটা তার জীবনের সেরা শো! এই কথাটা শুনে মনে হয়—হ্যাঁ, হতে পারে। কিন্তু আরো মনে হয় যে এই কথাটা বলার সময় সে হয়তো বুঝতে পেরেছিল যে কিছু কিছু মুহূর্ত জীবনে একবারই আসে, এবং সেই মুহূর্ত যখন আসে তখন মানুষ হয় তা ধরতে পারে অথবা তার পাশ দিয়ে চলে যায় এবং পরে জানতে পারে যে সে কী মিস করেছে, কিন্তু পরে জানলে কোনো লাভ হয় না, কারণ সেই মুহূর্তের থাকে না কোনো রিটার্ন টিকেট।
রাতের শেষে, সব কিছুর পরে, শো-স্টপার ‘One More Time’ বাজল।
আর এর ভেতরে তখন মৃদু অথচ ঘন নিঃশ্বাসের মতন একটা নীরবতা যা শব্দের চেয়ে গভীর—সেই নীরবতা যা ছেড়ে দিলে সোনার গৌর আর না পাওয়ার মতন মোচড় দিবে, যদিও জানি নাথিং লাস্ট ফরেভার ইভেন দ্য কোল্ড নভেম্বর রেইন। তাই তারাও বোঝে, শেষ হওয়াটা দরকার ছিল এবং শেষ হওয়াটা সুন্দর কিন্তু তবুও বুকে একটা ভারবাহী ইউএসবি প্লাগড-ইন হয়ে থাকে।
আসরের বাইরে রাতের লন্ডন। আসরের ভেতরে আশেক থমাস ও কামেল ফ্রেড পাশাপাশি দাঁড়ানো এবং হাজার হাজার মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল এবং কেউ কেউ কাঁদছিল এবং কেউ কেউ জানত না যে কাঁদছে কারণ কখনো কখনো চোখের জল এমনিই আসে। চুপি চুপি। শরীরের সিদ্ধান্তে।
মার্ক ফিশার ভাবতেন যে লেইট ক্যাপিটালিজম ধীরে ধীরে সব ধরনের মিউজিককে তার নিজের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলছে। এখন আর কোনো রাপচার নেই, নাই কোনো প্রকৃত বিস্ময়। সবকিছু আগে থেকে জানা, সব হজমের স্বাদ আগে থেকে ফিট করা। ওই বিশেষ এবাদতের সেই রাতে তাঁর ভয়কে আশায় প্রমাণ করল।

কারণ সেখানে রাপচার ছিল। সত্যিকারের।
যখন ‘One More Time’ বাজল—শেষবার, সেই রাতের শেষ track হিসেবে—তখন Alexandra Palace-এর হাজার হাজার মানুষ কাঁদল। শুধু স্মৃতি তুমি বেদনার জন্য না। কাঁদল কারণ সেই মুহূর্তে তারা অনুভব করল যে কিছু-একটা সত্যিকারের ঘটছে—যা রেকর্ড করা যাবে, YouTube-এ দেখা যাবে, কিন্তু যা সেই রাতের বাইরে আর কখনো পুরোপুরি অনুভব করা যাবে না।
এটাই জ্যান্ত শো দেখার ইলেক্ট্রনিক রহস্য।
পরে, অনেক পরে, যখন সব শেষ হয়ে গেছে এবং রাস্তায় কোল্ড ব্রিজ বইছে এবং মানুষ বিড়ি ফুঁকছে, তখনও সেই জিকির কারো কারো ভেতরে থেকে যাবে, যা অন্তরে অন্তরে গুনগুন করে : one more time, we’re gonna celebrate; এই আরেকবার সেলিব্রেট করার আবদার আসে, অই রুহানি ট্রিপের সাধ না মিটিল, আশা না পুরিলোর রিয়েলিটি থেকে। যেভাবে, মুন্সি জালালউদ্দিন খাঁ জানিয়েছিলেন—‘দেখলে ছবি, পাগল হবি’ এবং যারা যারা বাড়ি ফিরছিল তারা জানবে যে এই রাত একটা ছবি ছিল, সত্যই ছিল, এবং তারা সেখানে ছিল, অথবা ছিল না, কিন্তু যেভাবেই হোক এই ছবিটা এখন তাদের ভেতরে আছে এবং থাকবে। ধুকপুক হার্টবিটের বিপিএম (বিট পার মিনিট) রেটের মতো।
এটাই মিলাদের শেষ কথা। বাকি সব কথা অপ্রয়োজনীয়।
ইমরান ফিরদাউস রচনারাশি
- ইলেক্ট্রনিক মিলাদ মাহফিল, নিনাদের দরগায় || ইমরান ফিরদাউস - April 6, 2026
- একটি ঢিলেঢালা ও কয়েকটি একলা একলা || ইমরান ফিরদাউস - March 24, 2026
- ফিল্মের মধ্যে কবিতা || ইমরান ফিরদাউস - October 17, 2025

COMMENTS