ভালো থাকুক তেহরান ইসফাহান || শফিউল আজিজ

ভালো থাকুক তেহরান ইসফাহান || শফিউল আজিজ

শেয়ার করুন:

প্রিয় লেখক সেবাল্ড পড়তে গিয়ে জানতে পারসিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ড্রেসডেন আর কোলোন শহরের মানুষের মাথাপিছু ধ্বংসাবশেষের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩১.১ আর ৪২.৮ কিউবিক মিটার। আরেক লেখকের বরাতে তিনি জানান—কবর না দেয়া মানুষের মৃতদেহ খেয়ে শহরগুলাতে সেই বছর জার্মান ইঁদুরেরা খুবই হৃষ্টপুষ্ট হয়ে যায়। বিশালাকার, বর্ণিল সবুজ মাছিদের অভূতপূর্ব বংশবৃদ্ধি হইসিলো সময়টায়। চারপাশে ছড়ায়া-ছিটায়া থাকা এত লাশ। ম্যাগটগুলা বড় হইতে হইতে একেকটা প্রায় আঙুলের সমান হয়ে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ বসন্তে।

শিউরে ওঠার বদলে একধরনের অবশতা তৈরি করে বর্ণনাগুলা। প্রকৃতি, ধ্বংসযজ্ঞ আর প্রজাতির বংশবৃদ্ধির সম্পর্কটা এখানে অস্বস্তিকরভাবে বাস্তব। সেবাল্ডের বর্ণনায় প্রক্রিয়াটা তখন যুদ্ধ নামের প্রাচীনপন্থাটা নিয়ে তথাগত বোধ বদলায়া দেয়। টেলিস্কোপ দিয়ে গ্যালিলিওর প্রথম চাঁদের পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতার মতো কিছু। ফলে যুদ্ধটা আর দূরের কোনো বস্তু বা ধারণা হয়ে থাকে না। দৈনন্দিন পরিচয়সীমানার ভেতরেই ভয়াবহতাকে নতুন করে দ্যাখ্যা এই অভিজ্ঞতা। বুঝি—যুদ্ধ সকরুণ, শীতল ও উর্বর-পচনশীল।

ভাবতেসিলাম গাজাতে অবশ্য মাথাপিছু ধ্বংসাবশেষ হিশাব করার কোনো সুযোগ থাকবে বলে মনে হয় না। ওইখানে তো প্রায় কোনো মাথাই আর বাকি নাই যার পিছু হিশাব করা যাবে। গাজার ইঁদুর, ম্যাগট আর মাছিদের বংশবৃদ্ধির হার দিয়েই হয়তো ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদদের ধারণা করতে হবে মানুষের সাথে কী করা হইসিলো একবিংশ শতাব্দীতে।

একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধ প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার যুদ্ধ। যুদ্ধ সবসময় তা-ই ছিল—কিন্তু এইভাবে না…এইমাত্রায় না…বোধয়।

এইসব চিন্তা থেকেই ইরানকে নিয়ে ভাবতেসি। দেখা যাইতেসে মাত্র সাধারণ রাষ্ট্রের একটা ন্যূনতম আদল হিশেবে টিকে থাকার জন্য ইরানকে অনেক যন্ত্রণা ভেতর দিয়ে যাইতে হইতেসে। পুরা প্রক্রিয়াটা এতোটা স্বচ্ছ ও সহজভাবে অনুধাবনযোগ্য যে উল্টা সন্দেহ হয়—আসলেই কি বুঝতেছি?

মূলত বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবতে গিয়েই ইরান আসলো মাথায়। ইরান রাষ্ট্রের কী হবে? রাষ্ট্র টিকলো কী টিকলো না—সেই আলোচনা ও ফলাফলে গরিবের কোনো ভাগ কোনোকালেই তেমন ছিল না। আর একবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্র একটা রোম্যান্টিক ধারণা; বিংশ শতাব্দীর পশ্চিমে, পূবে, উত্তরে, দক্ষিণে—সব মরু ও মেরুতেই এই সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রথম সফল প্র‍্যাক্টিশনার ভ্লাদিমির লেনিন।

কমরেড লেনিন আমাদের ভুয়া স্বপ্ন দেখাইসিলেন—রাষ্ট্র নাকি মানবিক হবে! মানবিক হওয়ার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রাষ্ট্রই বিলীন হয়ে যাবে একদিন৷ রাষ্ট্র বিলীন হওয়ার সেই স্বপ্নকে গুলাগে পাঠাইতে বেশিদিন সময় লাগে নাই রাষ্ট্রের। সেই উন্নয়নবাদী সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট ফেইল করতে করতে করতে করতে আবারও ফেইল করতেসে এই শতাব্দীতে—যে-কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার মতোই। এবং গত শতাব্দীর মতোই। এবং আরও ট্র‍্যাজিক্লি৷

ভাবি। আর কয় শতাব্দী ফেইল করলে মানবজাতির বোধদয় হবে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রপরিচয় শেষ পর্যন্ত একটা অপ্রতুল ধারণা। নিওলিবরাল বাস্তবতায় রাষ্ট্রের কী সক্ষমতা আছে সারারাত জাগা ঘুমঘুম চোখের পোলাপানদের দিয়ে সকালে জাতীয় সংগীত গাওয়ানো ছাড়া? মোহাজের কবি শহীদ কাদরী যেমন বলসিলেন—রাষ্ট্র বললেই মনে হয় তেজগাঁ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া, হাসপাতালে আহত মজুরের মুখ৷ রাষ্ট্র মানেই নিহত সৈনিকের স্ত্রী৷ রাষ্ট্র মানেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের ব্যর্থতা৷ রাষ্ট্রসঙ্ঘের ব্যর্থতা মানেই—লেফট রাইট, লেফট রাইট, লেফট।

একদম। রাষ্ট্র মানে এইসব কাদরী বলসিলেন ১৯৭৪ সালে৷ ২০২৬-এ সেই সত্তরের দশকে শুরু হওয়া সময়ের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বিন্যাসের অন্তিমকাল ঘোষিত হচ্ছে৷ আবারও প্রমাণিত হচ্ছে—রাষ্ট্র মানেই লেফট রাইট, লেফট রাইট, লেফট…

রাষ্ট্রপরিচয় এখনো আমাদের দাপ্তরিক রাজনীতি তথা অ্যাক্টিভিজমের কর্তৃত্বসীমা নির্ণয় করে বলেই তার দোহাই দিয়ে মানুষ হওয়ার সীমানা নির্ধারণ করাটা গত দুইশো বছরের বড় মানবিক বিপর্যয়গুলার একটা৷ এই পরিচয়ের ছাতার নিচে সমাধানও আধখেঁচড়া৷ এমন কী ট্রেডিশনাল মার্ক্সিজমও যে সমস্যাগুলা অনেক আগেই চিহ্নিত করে গেসে, বর্তমান অ্যাক্টিভিজম সেগুলাকেও শনাক্ত ও সমাধান করতে অপর্যাপ্ত৷

মার্ক্সিজমের ইতিহাসের নানা বোঝাপড়া ও বাস্তবায়ন সেটাই দেখায়। এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত সব সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্টই তো দিনশেষে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ। এই ক্ল্যারিটি থাকা গুরুত্বপূর্ণ৷ তাহলে কে কোন পজিশন থেকে চিন্তা করে সেটা নিয়ে বোঝাপড়াটা স্পষ্ট হয়। তাছাড়া চিন্তা বা সমাধান কোনটাই আগায় না, বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে৷ এটাই প্রথম স্টেপ বর্তমানের ঝামেলা বোঝার৷ বাংলাদেশের বাংলাদেশে। বাংলাদেশ, অন্য দেশের মতোই, একই ট্রেইনে৷ লম্বা ট্রেইন, বগি শুধু আগেপিছে, পথ একই। তবে এটা নিশ্চিত ওয়েটিং রুমে কাউকে ফেলে আসা হয় নাই এই যাত্রায়৷ কখনো কেউ ছিলও না ওয়েটিং রুমে একা বসে৷

একটা জিনিশ স্পষ্ট৷ এই নিওলিবরাল অমানবিকতায় রাষ্ট্রপরিচয় নিয়ে তারাই সবচেয়ে বেশি আহাউহু করে যারা রাষ্ট্রের নামে লাভের গুড়টা খাইতে পারে৷ অথবা খেয়ে ফেলসে, এখন পারতেসে না৷ তাই বা অথবা খাওয়ার আশায় সংগ্রামরত৷ তবে খাওয়া হবে—এই মৌসুমে অথবা পরেরটা৷ শিক্ষার নামে। সংস্কৃতির নামে। রাজনীতির নামে। আর্টের নামে। মানবতার নামে৷ কর্তব্যবোধের নামে। নৈতিকতার নামে৷ বিপ্লবের নামে৷ স্বাধীনতার নামে৷ মুক্তির নামে৷

এমন বাস্তবতায় রাষ্ট্র কোন সঙ্গতিপূর্ণ বিশ্লেষণের রাজনৈতিক একক হিশাবে আর বিদ্যমান নাই৷ (কখনো কি ছিল?) রাষ্ট্রপরিচয় নির্জীব, অমানবিক হওয়ার একটা লাইসেন্সমাত্র- অন্য যেকোন সময়ের থেকে বেশি এই সময়ে।

মার্ক্স ফ্রান্স রাষ্ট্রটাকে বলসিলেন ক্ল্যাসিক টেরেইন অফ ক্লাস স্ট্রাগল—যেখানে বারবার রাষ্ট্রকে ঘিরে শ্রেণীদ্বন্দ্ব সবচে বেশি প্রকট হয়। ইরান সম্ভবত নিওলিবরাল অন্তর্দ্বন্দ্বের সেই ক্ল্যাসিক টেরেইনটা (একমাত্র না); যেখানে কন্ট্রাডিকশনগুলা সবচেয়ে স্বচ্ছ, থিয়েট্রিক্যাল, আর হিস্টরিক্লি ডিসাইসিভ হয়ে উঠতেসে৷

দুর্দান্ত সময়। বুঝতে চাওয়ার, সম্ভাবনার। দুর্দান্ত, এবং ট্র্যাজিক। নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না, মনে হয়। তবে কিছু একটা হইতেসে।

কানেক্টিভিটির এই যুগে ইন্টারন্যাশনাল সলিডারিটি গড়ে তোলার এমন সুযোগ হয়তো ইতিহাসে আর আসে নাই আগে। তবে ইন্টারন্যাশনাল সলিডারিটির নামে গ্লোবাল সাউথের জয়মাল্য গাঁথা শেষ পর্যন্ত নিওলিবরালিজমের লজিকের ভেতর পুঁজিবাদের ভরকেন্দ্র সরানোর এক পরিচয়বাদী খায়েশ। তাতে মানুষের মুক্তি নাই, যত র‍্যাডিক্যালই শোনাক না কেনো এই হুংকার। এই তাত্ত্বিক অবস্থান মূলত ‘অপশ্চিমা’ এলিটদের পুরাতন জাতীয়তাবাদী টুল৷

তারপরেও ইরান টিকে যাক। টিকতেছে। ভালোভাবেই। ধ্বংসযজ্ঞ থেকে উঠে দাঁড়াক ইরানের মানুষ৷ তারপর নিজেদের মুক্তির গানে নিজেরাই সুর বসাক।

ভালোবাসা ইরানের মানুষের জন্য। তারা পারবে। তাদের সংগ্রামের ইতিহাস তাই বলে৷ মানুষের উপর বিশ্বাস না রাখা যে-কোনো বাস্তবিক দর্শন হিশাবে সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ। তবে না রাখাটা পাপ কী না সেটা রবীন্দ্রনাথবিষয়ক চিন্তা। সেই চিন্তা বর্তমানে প্রাসঙ্গিক আর বিশ্বজনীন।

সেখান থেকেই ইরানের প্রতি ভালোবাসা৷ ভাবাদর্শিক ডোপামিনের ফিডব্যাক লুপ ছাড়া। ভালো থাকুক তেহরান, ইসফাহান। কোম আর তাবরিজ৷ কারাজ আর মাশহাদ৷

রচনাকাল ০১ এপ্রিল ২০২৬ পরিমার্জনা ০৯ এপ্রিল ২০২৬


শফিউল আজিজ রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you