মানিকের সানগ্লাস || সোহরাব ইফরান

মানিকের সানগ্লাস || সোহরাব ইফরান

শেয়ার করুন:


‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ পড়েছিলাম যখন কুলিয়ারচর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। বইটি কেনার সময় ভেবেছিলাম, যাক, মুস্তফা মনোয়ারের পাপেট শো নিয়ে বোধহয় ভালো উপন্যাসই হবে। পাপেট শো এমনিতে একটাও বাদ দিতাম না। বাউল পাপেটের থেকে ষাঁড় পাপেটের বাউলকে তাড়া করার ব্যাপারটা টিভিস্ক্রিনে আমাকে বেশ আনন্দ দিত। কিন্তু অধিকাংশ বাংলা যাত্রা নব্বইয়ের তৎকালীন সিনেমা সবকিছুতেই একে অপরকে তাড়া দেয়া কেন বাঙালিকে আনন্দ দিত এই বিশ্রী ব্যাপারটা আমি তখন ঠিক বুঝতে পারতাম না। কিন্তু এটুকু বুঝতাম যে এটা একটা খ্যামটাপনা বৈ আর কিছু নয়। আনন্দ উপাদান তৈরি করার অক্ষমতার জায়গায় একটা হট্টগোল বাঁধিয়ে দেয়া। এপিসোডের শেষে যখন মুস্তফা মনোয়ার ক্যানভাসে ছবি আঁকতেন এবং অন্য পাপেটদের শাসন করতেন তখন কিন্তু একটা কিশোরহৃদয়ে আমি একটু শান্তি পেতাম। কারণ পাপেটগুলোও শান্তি পাচ্ছে সেটা ভেবে। কিন্তু শিশুকিশোররা যেভাবে ছোটাছুটি করতে পছন্দ করে সেই কারণেই বোধহয় পাপেট শোতে এমন একে অপরকে তাড়া দেয়ার বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু একজন শিল্পী যখন ছবি আঁকছে তখন তাকে কেন ষাঁড়টা তাড়া কখনোই করেনি? এর কারণ হচ্ছে শিল্পী নিজেই সেই পাপেটগুলো তৈরি করেছেন এটা তার পাপেটগুলো বুঝত। পুতুল আর পাপেট কোনো দেশেই এক বস্তু নয়। বাংলাদেশের পুতুল নাচ পটচিত্রের গল্প এসব তো খুবই চিত্রময় এদেশের মানুষের কাছে। আবার চীনা পুতুলনাচ আর পাপেট শো কিন্তু হরর বা পুরাণের কাহিনি ভর্তি যা অনেকটা হরর প্রাধান্য পেত।



বাংলাদেশের পুতুলনাচ কিন্তু মেলায় গিয়ে যেটুকু একজন দর্শক হিসেবে পেয়েছি সেটা খুবই আনন্দঘন একটা ব্যাপার। পুতুলনাচিয়ের কথা কিছুতেই ভাবতে পারতাম না পর্দায় তাকিয়ে এমনকি পুতুলনাচিয়ের পয়সা নেবার সময়ও একটা ঘোর লেগে থাকত। মনে হতো লাল বানুর হাতে পয়সা দিচ্ছি। কিংবা সবুজ কুমিরের জিভের ডগায় টাকাটা রাখছি। আমার মামাবাড়ি অঞ্চলে প্রতি বছর ভালো লোকগল্পের যাত্রাপালা হতো তখন। আমি নিজে কয়েকটি দেখেছি। ওরা যাত্রা এতটা পছন্দ করত যে জীবনের একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অভিনয় করত এমনকি ভিসিয়ার রেকর্ডিঙে শ্যুট করা ক্যাসেট যত্ন করে সপ্তাহে নরম রোদে রাখত। এটা ভালো লাগত নিজেদের বিনোদনের জন্য ওরা নিজের অভিনয় করা ক্যাসেটই মাঝেমধ্যে দেখে আনন্দ পেত। ওদের অঞ্চলে সিনেমাহল অনেক দূরে থাকায় ওরা বছরে একবার হলে অনেকেই যেতে পারত না। অশ্লীল যাত্রা তখন এতটা প্রাধান্য পায়নি বরং তা প্রাধান্য পাওয়ার ফলেই ওই অঞ্চলে বুনিয়াদি পরিবারে যাত্রা মঞ্চস্থ করার রেওয়াজ কমে গেল। কিন্তু কখনো বিলুপ্ত হয়নি একেবারে। যাত্রার পোশাকগুলো আমি পরখ করেছি নিজে, কারুকাজ, রঙ, মুকুট, শাড়ি, বাজুবন্ধ, চাবুক, টিনের তলোয়ার, পরচুলা, মেকাপ বক্স, পালকি, লাঠিয়ালের লাঠি ইত্যাদি আমার ভালোমতন ইনকোয়েরি করার সুযোগ হয়েছিল। একবার একটা পুতুলনাচে গিয়ে একটা মেয়ের সাততালা চুলের পুতুলখেলা দেখলাম। টিকিটের দাম চড়া তবুও তার শোটা সাপ্তাহিক হাটে দুইবার দেখলাম। শেষে ছোটমামীর চিনির টাকাও দিয়ে দিলাম শোতে। এর জন্য সেদিন সন্ধ্যায় মামী মামাকে বললো তোমার ভাগ্নে তো সাততালা চুলের পুতুলের পিছনে সব টাকা উড়িয়ে দিয়েছে। আর এসব নিয়ে বিচার করার বদলে ওরা যেন বেশ আমোদই পেলো। কারণ ওটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল। আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম। যদিও পুতুলটা ছিল পুতুলই। কিন্তু আমি তাকে জীবন্ত না ভেবে পারছিলাম না। সে এত সুন্দর ছিল, একটা গাঢ় বেগুনী রঙের ব্লাউস আর লাল রঙের দীর্ঘ লেহেঙ্গা পরা। চুল সাততালা বাড়ির উপর থেকে নিচে ঝুলিয়ে রেখে সংলাপ বলত। কি কি সংলাপ ছিল আজ আর তা মনে নেই কিন্তু সেই সাততালা চুলের পুতুলের আবেদন কিন্তু একরত্তিও কমেনি আমার কাছে। বরং মনে হয় শালার একটা সাততালা চুলের পুতুল নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিলে মন্দ হতো না। আমার শিখিয়ে দেয়া সংলাপ বলত আর আমার ইচ্ছে হলে আমার সাথে বেড়াতে যেত সিনেমাহলে। কিন্তু সাহিত্যের লোক হবার জন্য এই ইচ্ছের একটা কঠিন সমালোচক আমি নিজেই। কারণ সাহিত্য পড়ে আমাদের হৃদয় প্রশস্ত হয়েছে। আমরা নিজের আবেগ অনুভূতি ছাড়াও অন্যদের আবেগ অনুভূতি ও শিল্পকে বুঝতে শিখেছি। বা ক্রমশ শিক্ষার ও সৃষ্টির উল্লাসেই আছি।



যাক সে কথা, যখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ কেনার সপ্তাহেও আমাদের পাড়ায় কোনো অশ্লীল সিনেমা আসেনি। আমি আর আমার ক্লাসের দুয়েকজন সহপাঠী মিলে সিনেমা দেখার একটা দল ছিল। আমরা প্রায় যে-কোনো সিনেমাই দেখতাম। বলি সপ্তাহে ওই একটা বড় পর্দায় চুপচাপ মুখ বন্ধ করে অন্ধকারে সিনেমাপর্দায় তাকিয়ে থাকার যে ঘোর ছিল তা খুবই উপভোগ্য ছিল আমাদের কাছে। অবশ্য যখন অশ্লীল সিনেমা আসলো তখন প্রথমে পাঁচ মিনিট, দুই মিনিট পরে বছর গড়াতে গড়াতে গোটা সিনেমাই অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। সিনেমা দেখার দলটা ছোট হয়ে গেল। ওদের কারো কারো ঘেন্নায় বমি আসতো নাকি অপ্রাপ্তবয়সে এসব দেখায় বমি আসতো সেটা বুঝিনি, তবে অসুস্থ বোধ করেছিল তারা। এক সময় আমিও দীর্ঘদিন হলে আর যাইনি। সেই ভক্তিটা কমে গিয়েছিল পুরুষ্ট ঠোঁটেঠোঁটে ঘষাঘষি করে ওরা ফিল্মের উনিশ মিনিট কাটিয়ে দিত। এ কী করে সম্ভব? আরো কাজ আছে না গল্পে? যাক, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ অষ্টম শ্রেণীতে যখন পড়লাম তখন ঐভাবে গল্পের অ্যাডাল্টনেস ফিল করতে পারিনি কারণ আমি যে বেশকিছু বেলেল্লাপনায় ভর্তি অশ্লীল ফুটেজ দেখে মগজ ভর্তি করে রেখেছি। এবং সেটার পরাগায়ণ না হবার মনোবেদনা নিয়ে বড় হচ্ছিলাম। কলেজে পড়ার সময় যখন স্যার ক্লাসে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ পড়াচ্ছিলেন তখন কপিলা চরিত্রের উদ্যমী সংলাপ আর কমনীয় ক্লাসিসিজম আমাকে মানিকের ঐ বইটার কথা মনে করিয়ে দিলো। কপিলা দেখি ঐ বাঘিনী মেয়েটারই রিপ্রেজেন্ট সখিতুল্য। বইটা তখন আবার পড়ি। মানিকের ওই কুসুম চরিত্রটির একটা লায়নিক টেন্ডেন্সি রয়েছে যা ঠিক রবিঠাকুরের চরিত্রের মতন নয়। কুসুম এতটাই প্রভাবক ছিল যে পড়ে হুমায়ূন আহমেদ সেই কুসুমের আবেদন থেকে নিজেকে আর মুক্তই করতে পারেনি বা এই চরিত্রের রহস্যের জালে নিজেকে একেবারে দেবীভোগ বানিয়ে ছেড়েছেন তার সমগ্র সাহিত্যচিন্তায়। মানিক কিন্তু কুসুমকে অতটা খোলামেলা চরিত্রে দেখাননি, কিন্তু এই চরিত্রটি কল্পনার জগতকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। মানিকের চরিত্রের মধ্যে কুসুম একটা বিশেষণে পরিণত হলো বাংলা সাহিত্যে। কুসুম ছিল নজরুলীয় প্রতিভার মতন আগ্রাসী একটি মনোভাবসম্পন্ন চরিত্র। যেটির খপ্পরে অনেক সাহিত্যিকই পড়েছে। কুসুমের মধ্যে যৌন আবেদনের বিকাশগত স্পেস থাকার কারণে চরিত্রটি পরবর্তীকালে বাংলার নারীদের একটা বড় অংশের খামখেয়ালিপনাকে সুন্দর ও কিঞ্চিৎ জরুরি মনে করেছে সাহিত্যমুনশিরা। এই লেখায় উপন্যাসের একটি সংলাপ না লেখার পরেও লক্ষ করুন, কুসুম সবার মধ্যেই কতটা জীবন্ত। কুসুম আর কিছুই নয় আমাদের মধ্যে যৌনতা শেয়ারিঙেএর যে চাপা ভয় আছে সেটির এক প্রস্ফুটিত রক্তজবা। যা আমাদের ভেতর প্রায়ই দোলা দেয়। আমরা এই সানগ্লাসটি পাবার পর থেকে আমাদের নারীদের একটা বড় অংশকে বুঝতে শিখেছিলাম শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকে। সেটি করে আমাদের লাভই হয়েছে বলতে হয়। এই একটি চরিত্র বরং নজরুলের সাহিত্যকে স্পষ্ট করে। ওদিকে হুমায়ূন আহমেদ এর করায়ত্ত হবার কথা একদম ঘণ্টা পিটিয়ে জানান দেয়। এই চরিত্রের কবল থেকে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ আজো পর্যন্ত মুক্ত হতে পারেনি। বা মুক্ত হতেই চায় না আসলে। কুসুমের মতো চরিত্র রবীন্দ্রসাহিত্যের একটি অভাব যেন। শেষের কবিতায় কুসুম থাকলে শেষের কবিতা  পল্লিঅঞ্চলে আমরা  আরো আগেই পড়তাম। একটি স্বচ্ছ পুরুষ্ট আইগ্লাস পরা ছবি ছিল মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায়ের আইকনিক ফটোগ্রাফ। কিন্তু কুসুম ছিল মানিকের সেই উইয়ার্ড সানগ্লাস। যা মানিকের অন্তর্দহনকে আমাদের বুঝতে সাহায্য করে। বড় সাহিত্যে একটা চলমান ব্যাপার থাকে ঘটনার, যেমন শহীদুল জহির তার ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ উপন্যাসে বিশাল কলেবরে যে গ্যাং র‍্যাপের ফুটেজ লিখলো সেটি জহির আসলে কেন ঘটালো? খুবই সহজ, এক্সিসটেন্সের এত পরিমাণ প্রবল খাটুনি ছিল তার জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অন্যান্য সাহিত্যে সেক্ষেত্রে তার এই ফুটেজ নির্মাণ করতে সে বাধ্য হয়েছে। বন্দিকে আরো অন্যভাবে বাঁচানো যেত কিন্তু তিনি সেই নারীকে সাহস দিলেন কতগুলো দস্যুর হাত থেকে বন্দিকে মুক্ত করার কৌশলে। ফলে পাঠক সেটি অশ্লীলতার স্বাদ থেকে নয় বরং মুক্তি পাবার প্রচণ্ড বাসনা নিয়ে সেই বড়সড় অনুচ্ছেদ পড়ল, এবং শরীরময় অনুভূতির মুক্তি নিলো। না হলে শহীদুল জহির আমার মতন একটি পাঠকের রোষানলে পড়তেন হয়তো। এই ক্ষেত্রে চরিত্রটির ন্যুড কেলিভার মানিকের না হলেও আত্মাটি যে কুসুমের তা উপলব্ধি করা যায় হাড়ে হাড়ে। ভরা নদীর ভয়াল নৌকায় দ্রৌপদিকতার মিলনদৃশ্য যেন চলছিল। কপিলা  কুবেরের সঙ্গে যেভাবে ক্রিয়াশীল হতে পারল না। কপিলা যে দিনে দিনে কুবেরকে বিষিয়ে তুলেছিল কামতৃষ্ণা হেতু। আর কুবের অপারগ। এই আদিম ব্যর্থতা শহীদুল জহির সহ্য করতে পারেনি।  শহীদুল জহির যেন তারই একটা প্রতিশোধ নিলো। আর এর সবকিছুর জন্য কিন্তু সেই কুসুমই সাহস জুগিয়েছে। কাজেই কুসুমের লায়নিক টেন্ডেন্সি যে কতটা প্রভাবক তা আমরা পুতুল নাচের ইতিকথায় বুঝতে পারিনি। সেটা বুঝতে না পারাই হলো মানিকের ক্ষমতা। আর পরবর্তীকালে মানিকের চরিত্রদের যেই হরিলুট চললো তা পুতুল নাচের ইতিকথার সাফল্যই! কিন্তু শহীদুল জহির মহাভারতীয় একটা অনুমান সিনেমেটিক করে তুলেছে তার বর্ণনায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের দৃশ্যটা কিন্তু পরবর্তীতে সফলভাবে শহীদুল জহির করে দেখিয়েছে সাহিত্যে।



কুসুম চরিত্রের কুসুম আর বিশেষ্য হয়ে থাকেনি। সেটি বিশেষণ হয়ে গিয়েছে। আর এই শৈলীতে বেশি পারঙ্গম রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের প্রায় সব চরিত্রই বিশেষণ হতে পেরেছে। মানিকের মোটে একটি কুসুম পরবর্তীতে কপিলা। কিন্তু কুসুমেরই দোলাচল। এই যে ডাক্তার শশী ওটা কিন্তু কিছুতেই বিশেষণ হতে পারেনি। বিশেষ্যই থেকে গিয়েছে। অথচ অমিত কুমার বিশেষণ,  দেবদাস বিশেষণ,  এমনকি কিশোর চরিত্র ফটিকও বিশেষণ হতে পেরেছে। মূল ব্যাকরণগত সাফল্য রবীন্দ্রনাথের বেশি চরিত্র নির্মাণে; মানিকের চেয়ে ঢের ঢের বেশি। কিন্তু একমাত্র কুসুমের কারণে মানিকের এঁদো জেলেপাড়ার ধুতি পাঞ্জাবি পরা অচ্ছুৎ যৌবনের উপর একটি আধুনিক ফিল্টার কালার করে দেয় কুসুম। মেয়েটি দেবী তো অবশ্যই। যার জন্য মরেনি আজো। মেঘে ঢাকা তারা  ছবিতে অনেক মেয়েই কিন্তু ঐ উপন্যাস হাতে নিয়ে বসে থাকা ছোটবোনকে একেবারে জানে খতম করে দিতে চাইত। কিন্তু আপনি দর্শক হিসেবে ভেবেছেন মেয়েটি কেমন করে দিনরাত উপন্যাস পড়ার পর থেকে  তার বড়বোনের প্রেমিককে ছিনিয়ে নিয়ে বগলদাবা করলো? সেটি কি কুসুমের সাহস আসলে? উপন্যাসটা কি মানিকের ছিল তার হাতে? যেটি সিনেমায় আড়াল করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের সকল নারীদের একত্রে অডিশন নিলে একজন ফিল্মমেকার কিন্তু কুসুমের অডিশন একাধিকবার নিতে বাধ্য। কারণ চরিত্রটির সেই সাততালা পরিণত আবেদনের রহস্য রয়ে গিয়েছে। কিন্তু খেলার পুতুলের মতো সমাজে অনেকের প্রেম যৌনতা নিয়ন্ত্রিত হলেও কুসুমের মতো ওরকম দুয়েকটি পুতুল যে এক্সিস্ট করে সেটির বাস্তবতাই হলো পুতুল নাচের ইতিকথা  আর এর কোরিওগ্রাফার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। আটপৌরে বাংলা সাহিত্যে কুসুমের যে রঞ্জিত হৃদয়, তা সাহিত্যে যেভাবে পরবর্তীতে প্রভাব ফেলেছে তা হয়তো মানিকের কারণেই হয়েছে। কেননা যাত্রাপালায় অনেক চরিত্র মজুদ ছিল কিন্তু তা ক্লাসিক সাহিত্যের কার্পেটে উঠে আসার সিঁড়ি পায়নি। সেই ক্ষেত্রে মানিক তার হৃদয় থেকে কাঠের সিঁড়ি বাড়িয়ে সেই সাততালা চুলওয়ালা পুতুলটাকে তার ট্রলারে তুলে নিয়ে গেল। পুতুলটিকে বন্ধু দিলো, বান্ধবী দিলো, আঘাত দিলো, অনুভূতি দিলো যৌবন দিলো  আর দিলো প্রেম। যার সমস্ত কিছু স্রষ্টা আমাদেরও দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশের নদী-অধ্যুষিত মানুষের লাইফস্কেলে যেমন যৌবন থাকে যেটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আমরা পাইনি। জেলেপল্লিতে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের বঞ্চিত পুতুল একমাত্র মানিকের কারণে আমরা নাচতে দেখে কী আনন্দটাই না পেলাম। সেই পুতুল আবার অন্য অনেক সাহিত্যিক মানিকের কাছ থেকে হায়ার করে শো করতে নিয়ে যায়। পয়সা কিছু দেয়? কি দেয় না কে জানে! মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তো ডালভাতের ব্যবস্থা না করে সাহিত্য করতে নিষেধ করেছেন। এই জন্য শালার টাকার কথা ভুলতে পারি না। তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সতর্কতা যতটা না বুদ্ধিবৃত্তিক তার চেয়ে ঢের বেশি সিনেমেটিক। এর অভিপ্রায় হচ্ছে, অর্থমুক্তির জন্য কাজ করলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কি আর এত লেখা লিখত? শুধু অর্থমুক্তির জন্য পুতুল নাচালেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় একজন ধনকুবের হয়ে দিনপাত করে যেতেন। ধনাঢ্য সাহিত্যিকের সাথে অর্থমুক্তির দিকে অপেক্ষাকৃত ক্রমঅগ্রসরমান সাহিত্যিকের ফারাক এখানেই। পুতুলনাচ যারা দেখায় তারা কেউ প্রচণ্ড বিত্তশালী নন। আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুতুলনাচের সচিত্র বায়োস্কোপ না বানিয়ে লিখেছেন পুতুল নাচের ইতিকথা। সেটি তার আশেপাশের সামাজিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে উপলব্ধি করে একটি লোকজ শৈলী থেকে নেয়া অনুপ্রেরণা। আর সাহিত্য আই মিন ব্লাক ল্যাঙ্গুয়েজে নির্মাণ চালিয়ে যাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। এই জন্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার সাহিত্য লিখে পটল তোলার পরেও প্রাসঙ্গিক হয়ে রইল। হাজার বছর ধরে উপন্যাসের টুনি চরিত্রটি মানিকেরই আরেকটি পুতুল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেই সাততালা চুলের পুতুলকে নির্জন বিজনে স্থান দিলো, সেই পুতুলটি পল্লি-অধ্যুষিত বাংলা অঞ্চলে অন্তত দেড়শো বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। অনেক বড় বড় সাহিত্যিক জন্মে বিকশিত হয়েছে এর মধ্যে। কিন্তু পুতুলনাচ বিলুপ্ত হবার কালেও এই সংস্কৃতিবান নারীটি কারো বজরায় আশ্রয় পায়নি, কারোর বৌঠানের ঝি হয়েও সাহিত্যে আসতে পারেনি। তাকে বারংবার কুবেররা বজরার উপর দাঁড়িয়ে উপেক্ষা করে বলেছে, বাড়িত যা কপিলা! আমার ভদ্দরনোকের সাথে বৈঠিক হয় জানিস না তুই। তারপর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সাততালা চুলের পুতুল, ছোটলোকের সবথেকে মূল্যবান মূর্তিটি তার ট্রলারে নিয়ে ভরা সমুদ্রে রওনা দেয়। যা কিন্তু অন্য কোনো সাহিত্যিক উপলব্ধি করতে পারেনি কিছুতেই। কুসুম চরিত্রটি আবহমান বাংলায় এতখানি প্রাণবন্তভাবে রয়েছে অথচ উচ্চবিত্ত সমাজের সাহিত্যে এমন একটি চরিত্র ঝি চাকরানির স্থানও পায়নি কখনো। ওইসব সাহিত্যে চাকরানি নারীদেরও যথেষ্ট পসার। আটপৌরে হলেও দুগাছা চুড়ি, সুগন্ধি, পানপাত্র, প্রতি ঘন্টায় পানসুপোরি, বিকেলের আগে বিনুনি খোলার অবসর আর মেঝো বৌঠান দুপুরে শুয়ে থাকার সময় দাদার থিয়েটার নিয়ে উচ্চহাস্যে রসিক হয়ে ওঠা। এই চুড়ান্ত নিগ্রহ সাহিত্যের ছাত্রদের মনোবেদনার একটা কারণ ছিল। যেটির একটা সত্যিকারের জবাব মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দিয়েছেন সার্থকভাবে। বাংলা সাহিত্যে কুসুমের দাপট কতখানি তা আমরা আজো উপলব্ধি করছি। কারণ এই চরিত্রের প্রাণ তো বাংলার মানুষের। আমাদের খুব নিকটের। আমাদের কবিতা তিলে তিলে যেখানে বর্ণিল জীবন পেলো সেই পুতুলনাচ, সেই গভীর বার্নিশিয়ার রঙ দিয়ে পুত করে তোলা পর্দার সামনে পুতুলনাচ আর নাচিয়ের মুখে ডাবিং পুতুল কাহিনিগল্প। আমরা তো আমাদের বুদ্ধিমত্তার একটা অবস্থা আছে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু তার জন্য আমাদের দীর্ঘ সময় সংগ্রাম করতে হয়েছে।


একটা  পুতুল বিষয়ক নির্ঘণ্ট তৈরি করি :

১. মানিকের পুতুল : কুসুম, কপিলা।
২. শহীদুল জহিরের মিসেস ওয়ার্নেস প্রফেশন : মানিকের পুতুল কপিলার ও দ্রৌপদীর নাট্যায়ণ।
৩. হুমায়ূন আহমেদ এর কুসুম, ও অন্যান্য চরিত্রে : মানিকের পুতুল।
৪. জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে  উপন্যাসে : টুনি। মানিকের পুতুল। যা অন্য নারী থেকে ব্যতিক্রম।
৫. লাল বানু : আমার শৈশবের সাততালা চুলের পুতুল যাকে আমি মানিকের বাড়ি থেকে উঁকি দিয়ে আমাকে ডেকেছিল।

পরিশেষে একটা কথা না বললেই নয়, রবিঠাকুরের শোভা কি বোবা ছিল? সেটি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুতুল সাজানোর ব্যর্থ দায়ভার মেয়েটির মনের উপর চাপিয়ে দিলো আরো। কত তর্ক রয়ে যায়। কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুতুল সাজাতে কীভাবে পারলো। কীভাবে সে ছোটলোকের মূর্তিটি নিজের মনে করে চিনতে পারলো!


সোহরাব ইফরান রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you