বাবা, মারা যাবার দিন || শুভ্র সরকার

বাবা, মারা যাবার দিন || শুভ্র সরকার

শেয়ার করুন:

সেদিন ছিল বুধবার।  অন্যান্য দিনের মতো আমারও বিভ্রম ছিল কল্পনার আভরণের। কিছুটা নীরবতার ভিতর, ডুবে যাবার ভিতর সময যেন দীর্ঘ হয়ে উঠছিল। আমি আইসিইউর সামনেই বসা ছিলাম। আর সব সত্যের মতান্তর নিয়ে কাকগুলোকে দেখছিলাম। হঠাৎ কাকগুলো কা কা ডেকে উড়ে চলে গেল। বিষণ্ণতা নামলো আমার চোখে। হিন্দুধর্মে কাককে পিতৃপুরুষের বার্তাবাহক মনে করা হয়। কাক পক্ষীকুলের সবচেয়ে বিচক্ষণ পাখিদের মধ্যে একটা। তাদের বুদ্ধির আভাস কিন্তু প্রাচীন মানুষের চোখও এড়িয়ে যায়নি। আমার চোখ আইসিইউর প্রবেশদ্বারের দিকে, প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল যেন আরো দু’টি চোখের। আমি তখনো জানতাম না যে,  প্রার্থনার চোখ কখন দূরতর দিকে উড়ে যেতে পারে।  তিনতলার নিচে অনকে বড় একটা কৃষ্ণচূড়ার গাছ ছিল। তখন ফুল ছিল না যদিও। তবু আমি ফুলের রঙে গাছটাকে দেখতাম। মনখরাপ নিয়ে খুব রাতে যখন গাছটার নিচে এসে দাঁড়াতাম, আঙুলের ফাঁকে গোল্ডলিফ পুড়ে যেতে যেতে, গাছটাকে বলতাম—তুমি সেবিকা হয়ে যাবে, নাকি!

০২.
সকাল ৮.৩৬। কেউ একজন ডেকে নিয়ে গেল আমায়। বললো আপনার টাকা জমা দেন। আমি টাকা জমা দিয়ে রিসিট নিয়ে এসে আবারও বসে থাকলাম। পাশে আমার বউ। টানা ষোলো দিন আমি আর আমার বউ খাবার খেলে খাইছি কিংবা কোনোদিন গোসল করলে করছি অথবা করি নাই। যেদিন বাবা মারা গেল, ঐ দিন আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম কখন ভেতরে আমাকে একনজরের জন্য দেখতে দিবে। অবশেষে ডাক পড়লো। দেখতে গেলাম। বাবার দু’চোখে গজকাপড়ের ভাঁজ করা টুকরো দিয়ে ঢাকা। আমি বললাম—ঢেকে রেখেছেন কেন ওনার চোখ? ওখানে কর্তব্যরত একজন ডাক্তার জানালো, যদি ওনার কর্নিয়ার সমস্যা হয়। আমি তখন তাকে বললাম—খুলে দেন এই পট্টি। চোখ নষ্ট হলে হবে কিন্তু বাবার জগৎ দেখার চোখ সোনালু ফুলের মঞ্জুরীর মতো ফুটে থাকুক।


০৩.
বাবার গলায় কণ্ঠীমালা ছিল। অপারেশনের দিন সেই মালাখানা খুলে ফেলা হলো। বাবা ছিলেন ধর্মপরায়ণ। তার কপাল থেকে নাক বরাবর তিলক দিয়ে রাখতেন। রঙ শূন্য হলে যেমন লাবণ্য ফুরিয়ে যায়, তেমনি বাবার সেই শূন্য গলায় আমি সেদিন লক্ষ করেছিলাম ভাঁজ করা আলোর ভিতর কল্পনাপ্রসূত এক নীল কণ্ঠহার। সেখানে দাঁড়িয়ে আমার সেদিন মনে হয়েছিল—মানুষের কাছে পৃথিবীর সব দৃশ্যই একেকটা ক্যানভাস, যা নিমজ্জন ও উজ্জীবনের পাড়ে এসে দুলতে থাকে। আমাদের সেই দুলতে থাকা যদি ভাসিয়ে দিতে পারতাম—‘কেয়া পাতার নৌকা গড়ে সাজিয়ে নেবো ফুলে / তালদিঘীতে ভাসিয়ে দেবো চলব দুলে দুলে’…

০৪.
সকাল ৯.২৬ মিনিটে বাবা মারা গেলেন। তার কিছুক্ষণ আগেও মার সাথে কথা হলো। মা যেন মায়ারেখার কাঁপনে কিছুই বলতে পারছিল না। যদিও তার ঘণ্টাখানেক আগে মাকে বলেছিলাম—যেভাবেই পারি বাবাকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসব। কিন্তু তা আর হলো না। এই সকাল দেখার মতো কত নতুন বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। তারাশঙ্করের কবির গায়েন নিতাইয়ের মতো বলতে ইচ্ছে করে,  ‘জীবন এত ছোট কেনে’ এই ভুবনে? তাহলে তো একজনমে কিছু দেখা হয় না, লেখাও।


শুভ্র সরকার রচনারাশি

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you