শৈশবে আমাদের পাড়ায় আসত এক জাদুকর, জবরজং আলখাল্লা-গায়ে; মাথায় মোচার খোলের মতন হ্যাট। সুচাল লম্বা সেই টুপিতে ছোট ছোট গোল আয়না আর রঙিন পুঁতি বসানো। টুপিতে আলো পড়ে ঝিকমিকি জেল্লা ঠিকরাত। কাঁধ থেকে হাঁটু-অব্দি-নেমে-আসা একটা লম্বা-ভারী কাপড়ের ঝোলা; উৎসুক মানুষজন তাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে যেত আর দেখানো শুরু হতো তার ভেলকি। ঝোলা থেকে একে-একে বের করে আনতো সে মানুষের মাথার খুলি, পশুর বাঁকা চিকন-লম্বা হাড় ও আতশকাচ! এপাড়া-ওপাড়া হেঁটে চলবার সময় একটা পেতলের ঘণ্টি বাজাত সে সারাক্ষণ। তার সেই ঘণ্টার ধ্বনি পাড়ার বাচ্চাদের জন্য ছিল ‘ওয়েক আপ কল’। ঝিমধরা দুপুরের ভাতঘুম টুটে গিয়ে হঠাৎই জেগে উঠত পাড়া। আমরা সব আন্ডাবাচ্চা দে ছুট, দে ছুট…
আমাদের কাছে শৈশবের সেই জাদুকরই ছিল হামেলিনের বাঁশিওয়ালা…তার ভেলকি কহতব্য নয়! বিনে-পয়সায় জাদু দেখবার কত নাছোড় আবদার ছিল আমাদের! কী এক কারণে একদিন মন গলে গেল তার। জাদুকর একটা কালো পশমি চাদর মেলে তাতে কিছু চাল ছড়িয়ে দিলো। যেই না সে তাতে হাড়ের কাঠিটি বোলাল, আমাদের বিমূঢ় চোখের সামনে ফটফট ফটফট মুড়িভাজা হতে থাকল। গরমাগরম মুড়িতে ভরে উঠল সেই শূন্য চাদর।
সেদিন যা ঘটল, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। যে-ম্যাজিক সে দেখাল, তাতে বালকদলের সে হয়ে উঠল পৃথিবীর রাজা। তারা তাকে ভাবল সর্বজয়ী। মহামহিম সেকান্দর আর নেবুশাদনেজারের সম্মিলিত প্রতাপের অধিক তার প্রতাপ যেন-বা।
জীবনের খরতাপ আর আগুন সয়ে বেঁচে থাকি। দুই হাতে ক্লেদ আর ক্লিন্নতা সরাই। পালাবার পথ খুঁজি, বাস্তবের শ্বাপদে-ভরা-বন থেকে মনের গহিন বনে পালিয়ে বেড়াই। যাই নিজের কাছে। কেননা, আমার ভেতরে তো সেই জাদুলোভী শিশুটি এখনো বাস করে। সবার চোখের আড়ালে গিয়ে, শূন্য কাগজের খিড়কি খুলে, ফিসফিস স্বরে আমি তার চোখে চোখ রেখে কথা বলি। তারপর আমরা দু-জন সেই জাদুকরকে ডেকে এনে সিংহাসন পেতে বসতে দিই। তার পায়ের কাছে মুগ্ধ বসে থাকি। বলি তাকে, দেখাও তোমার জাদু, প্রিয় জাদুকর!
আমাদের কথা আমাদেরই কানে ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে। তখন বুঝতে পারি, সে এসেছিল তবু আসে নাই…
অথবা, আমি নিজেই সেই জাদুকর। নিজেকেই যে দেখিয়ে চলেছে কালো-কালো অক্ষরের অবিরাম জাদু। নিজের কাছেই তবু বারবার ধিক্কার পেতে হয় তাকে। এক সময় নিভৃতে রচিত সেই অক্ষম অক্ষরের খেলা অন্যদের চোখে পড়ে যায়। জানি না, জাদুলোভী পাঠকেরা দূরের অলিন্দে বসে বাহ্বা দ্যায় কীনা, তালি দ্যায় কীনা কিংবা খিস্তি ঝাড়ে কীনা।
জানি না, কোন স্বর্গ-নরকের লোভে টানা চার দশক সাঁতরে চলেছি আমার আয়ুর চেয়ে দীর্ঘ এক গন্ধকের নদী। ভাষার অন্তহীন অরণ্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছি নিঃশব্দে, নীরবে। ঝোলাহীন, আলখাল্লাহীন। অক্ষর-সরণি ধরে চলতে থাকা আয়ুদীর্ঘ এই ম্যারাথন কখনো থামবে না।
যুধিষ্ঠিরের ভাগ্যে অন্তত একটা কুকুর-সঙ্গী জুটেছিল। শিল্পী বা কবির কোনো সঙ্গী নেই, সারথীও নেই। কবিতায় আমি তাই বলি :
‘‘…আমার সামনে এক রুবিকন, পুলসিরাত, ভয়ানক ক্রূর অমানিশা
এর সামনে একা আমি;
কিস্তিহীন, নিরশ্ব, রসদহীন
পিগমিদের চেয়ে ছোটো আমি!’’
কবিতা এমন এক খেলা যা খেলতে হয় পাঠকের থেকে যোজন-যোজন দূরে বসে, একটা অন্ধকার টানেলের ভেতর বসে। নিজেকেই প্রতিপক্ষ করে নিজের সঙ্গে এই খেলা। যেনবা ‘দূরের টেবিলে বসে একা আমি খেলছি পেশেন্স’। এই তবে খেলার নিয়ম!

কবির সম্বল তার ভাষা। তার চাই কথা বলার নিজস্ব ভঙ্গি ও স্বর; পৃথিবীকে দেখবার, দেখাবার নিজস্ব তরিকা। চাই এমন এক কল্পনাপ্রতিভা, অন্যদের দেখার ভঙ্গিকে যা পাল্টে দিতে পারে। একটা ইডিয়োসিনক্র্যাসি, একটা ব্যক্তিগত স্বভাব-বৈশিষ্ট্য অন্যসব কবির মতন আমারও আরাধ্য। নিজ স্বভাবের আঁচ, নিজের ভেতরের একা-বাঘটির নখ ও থাবার ছাপ, পাগমার্ক বলে কিছু যেন থাকে। নিজের সিগনেচারটুকু যেন ফুটে ওঠে রচিত অক্ষরে। এইটুকু চাওয়া শুধু, এটুকুই চাওয়া।
নিজের সিগনেচার? সে তো বৈদূর্যমণির মতন দুর্লভ। ভক্তের পুজো দেবার আগ-মুহূর্তে বে-হাত হয়ে যাওয়া নীলপদ্মের মতন দুর্লভ। তাকে না-পেয়ে নিজের একটি নীল চোখ, নিজের সমস্ত জীবন সঁপে দিয়ে আভূমি আনত হয়ে আছি। কোনো এক হর্ম্যমিনারের খিলান-গম্বুজের নিচে লুকিয়ে রাখা সেই নীলপদ্মের মতন নিজস্ব এক সিগনেচার খুঁজে চলেছি জীবনের উপান্ত অবধি। তবু না-পাওয়ার কালি শুধু মেখেছি দু-হাতে। কোনো ক্ষতি নেই তাতে। না-পাওয়াতেই পেয়েছি পাওয়ার বহু স্বাদ। পাবো কি পাবো না—টানা চল্লিশ বছর পর সেই প্রশ্ন অবান্তর আজ।
মনের অতল থেকে বুদ্বুদের মতন উঠে আসা চিত্রকল্প-উপমা-রূপক-প্রতীকই আমার জাদুভেলকি। আমার হাড়ের কাঠি। অথবা, কবিতা নামের যেসব ছাইপাঁশ এতকাল ধরে রচনা করেছি, হয়তো সেসব বিদ্রূপের মতন ফিরে আসবে। ছুটে আসবে নিজেরই বুকের দিকে বুমেরাং হয়ে। তাতেও আমার কোনো হেলদোল নেই। অনন্ত কুহেলিময়, আবছায়া পথে এক নিঃসঙ্গ পর্যটক আমি। দিনে দিনে এই সত্য বুঝেছি, কবিতা আদতে কবির বানপ্রস্থ, তার একার সন্ন্যাস।
অক্ষরের রতিখেলা জমে ওঠে, বুলফাইট জমে ওঠে; শূন্য অ্যারিনায় তবু কোনো দর্শকের মুখ তো দেখি না! কী তাদের প্রতিক্রিয়া সে-ও বোঝা দায়! কবির ভাগ্যে শংসা-তারিফ-হাততালি নগদা-নগদ কিছুই মেলে না। কালেভদ্রে বড়জোর জমে ওঠে দু-একটা জাদু; সেই জাদু কারা দেখছে, কোনখানে কোন অ্যারেনার পাশে বসে দেখছে তা-ও জানবারও উপায় নেই। এ যেন নর্তকীকে না দেখেই নাচ দেখবার মতন ব্যাপার।
একদা ডব্লু বি ইয়েটস তাঁর ‘Among School Children’ কবিতায় একটা গূঢ় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন : ‘How can we know the dancer from the dance?’ প্রশ্নের ভেতরেই উত্তর লুকানো—নর্তকীকে দেখা ছাড়া তার নাচ দেখা অসম্ভব। কবিতা উপভোগের বেলায় একথা খাটে না।
কবিতা হচ্ছে ভাষার সবচে’ আলোছায়াময় এলাকা। অথবা, অক্ষরের অভ্র ও কাচে বানানো এক কুহকী আয়না; যে-আয়না কৃষ্ণবিবরের মতো সকল মূর্ত অবয়বকে গ্রাসে টেনে নেয়; সে তাদের করে তুলতে চায় বিমূর্ত, অস্পষ্ট-আবছায়া। শব্দকে তার অভিধানের সুনির্দিষ্ট মানে থেকে বের করে আনতে চায়। দিতে চায় অন্যতর অর্থের দ্যোতনা।
সে-অর্থও আবার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। হেরাক্লিতাসের নদীর মতন ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে যেতে, বদলে যেতে থাকে। জগতে সকলের কাছে যা-কিছু নগণ্য-সামান্য, কবির আয়নার ভেতরে কী এক জাদুবলে সে-ও অসামান্য হয়ে ধরা দেয়। কবিতার অদ্ভুত মুকুরের অতল গহিনে যে-পাঠক তাকায়, সে তখন নিজের চেনা মুখচ্ছবিকেই দেখতে পায়। দেখতে পায়, হয়তো-বা, অন্য কোনো রূপে…‘রূপ দেখিলাম রে, আমি দেখিলাম আপনার রূপ’… একেক সময় একেক রকম সেই রূপ!
লুতের কন্যাদের মতন কুহকী চেহারা কবিতার। এক আপাতমধুর বিভ্রম। যার কোনো ছকে-টানা ব্যাখ্যা নেই। বুঝি-বা, এক নির্লজিক লজিকই তার আয়ুধ। এভাবেই এক ব্যাখ্যাহীন আলকিমিতে গড়ে ওঠে কবিতা। রাশি রাশি সন্দেহ-তুষারে ঢাকা ‘অরূপের রূপের সাগর’ কবিকে ডাকে : আয় আয়!
যারা ব্যাখ্যা চায়, যারা শুধু গণিতে-লজিকে কথা বলে তাদের উদ্দেশে কখনো কখনো কবিকেও নীরবতা ভেঙে বলে উঠতে হয় :
…বামুন, ঘোড়ার পিঠে ন্যস্ত হয়ে কবিতার ব্যাখ্যা চেয়ো না…
…না-হয় মফস্বলে সামুদ্রিক মাছের সম্পাদনা তুমি কোরো…
এক মনো-চিত্রকরের বেশে কবিকেও দাঁড়াতে হয়ে শূন্য ক্যানভাসের সামনে, অলিখিত কাগজের সামনে, এক ‘তাব্যুলা রাশা’-র সামনে। তবে পাঠকের জন্য সবসময়ই একটি অ্যাভিন্যু, একটা স্পেস খোলা রাখতে হয়। পাঠকও যেন তাতে অংশ নিতে পারে। সে-ও যেন ক্যানভাসের খালি জায়গাগুলোতে নিজের মনপসন্দ রং চাপিয়ে দিতে পারে। যেন সে-ও বসে বসে আঁকতে পারে তার বাসনাসম্মত ছবি ও আদল। তখনই কেবল একপেশে ন্যারেটিভকে ভেঙে, চুরমার করে এগিয়ে চলা যায় বহুস্তর অর্থ ও ব্যঞ্জনার দিকে। পদ্যের একরৈখিক খাঁচা ভেঙে কবিতা এগিয়ে চলে কল্পনা, বিভ্রম, পরাচেতনা আর অনন্যতাকে সঙ্গী করে।
অতীতে কবিতাকে অনেক অনাবশ্যক ভার ও বোঝা বইতে হয়েছে। অনেক বাচালতা ও বিবৃতির ভার। ক্রমশ-অচল-হতে-থাকা প্রচলের, স্টেরিয়োটাইপের লটবহর বইতে-বইতে গাধার পিঠের মতন বাঁকা হয়ে গিয়েছিল তার পিঠ। একালে এসে কবিতা সেই ভার ঝরিয়ে ফেলেছে অনেকখানি। ‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ্দ হাঁটিয়া চলিল / কিছুদূর গিয়া মর্দ্দ রওয়ানা হইল’-র মতন হাস্যকর অন্ত্যমিল যোজনা করবার যুগ কত আগেই অবসিত!
বাচালতা, বিবৃতিমুখরতা আর একরৈখিকতার গাদ ও গাঁজলা ঝরিয়ে ভাষার বুকের হাপরে কবিতা বয়ে আনছে তাজা নতুন হাওয়া। ডুব দিচ্ছে, তাকাচ্ছে ব্যক্তিমানুষের মনের অতলে। স্তর ভেঙে-ভেঙে তাকাচ্ছে মুখোশের আড়ালে লুকানো মুখচ্ছবির দিকে। তার গোপন মর্মের দিকে।
কবিতা আর ভারবাহী গর্দভ নয় আজ; সে এখন প্রান্তরের ঘাসে চরে-বেড়ানো দলছুট জেব্রা। অথবা, প্রখর জেব্রার পায়ে সে এক জ্বলন্ত তৃণের প্রদর্শনী।
বাঁধা ছক, স্টেরিয়োটাইপকে ভেঙে-গুঁড়িয়ে সংগোপন লীলা ও সংহারে কবিতা মেতে উঠতে চায় তার নিজেরই নিয়মে। তার নিজ স্বভাবের মুদ্রাদোষে। যৌথের কোরাসে গলা মিলিয়ে নয়, বরং নিচু আর ব্যক্তিগত স্বরে।
চেনা শব্দের আড়ালে অযুক্তি ও অবচেতনের খেলার নানামুখী আমন্ত্রণ জারি থাকে আজকের কবিতায়—একথা বুঝেছি। আরও বুঝেছি, সঙ্গত কারণে গদ্যকে হতে হয় কমিউনিকেটিভ, অবিমূর্ত আর হেঁয়ালিবর্জিত। কালীয়দমনের মতন বিপজ্জনক খেলায় মেতে ওঠা গদ্যের কাজ নয়। একান্তভাবেই তা কবিতা নামের ঘাড়ত্যাঁড়া বালকৃষ্ণের কাজ…
কবিতা যেন হিমশৈল এক; দৃশ্যমান চূড়াটির নিচেই জলতলে থাকে তার মগ্ন মহাদেশ। অরূপের রূপের সাগরে যারা ডুব দিতে পারে, এই সত্য তারা শুধু জানে।
জন্ম-বাউদিয়া আমি। জীবনকে দেখেছি বহু রূপে, বহুল স্বরূপে। বাড়ি থেকে পালিয়ে থেকেছি রেলস্টেশনে। থেকেছি আশ্রিত হয়ে নানা স্থানে। থেকেছি দুর্গম কালেঙ্গা পাহাড়ে ডেরা বানিয়ে। পরিবার থেকে বহু দূরে— প্রবল এক মূর্খ অভিমানে। মায়ের স্নেহমাখা করস্পর্শ থেকে বহু দূরে গিয়ে। দেখেছি মুখোশে ঢাকা মানুষের মুখ। খুব কাছ থেকে দেখেছি সখারূপের আড়ালে ওঁত পেতে থাকা ক্রূর শকুনিমামাকে। এসব অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে আমার কবিতায় :
‘‘…ব্যারেলে গুলির মতো
শকুনিমামার হাসি বন্ধুগণ রেখেছে প্রস্তুত!’’
যে-মায়ের থেকে অভিমানে সরে গিয়েছিলাম দূরে, তাঁকে চিরকালের মতন হারিয়ে ফেলার বহুদিন পর তাঁকেই শোনাতে চেয়েছি কিছু কথা, তাঁরই মুখে-বলা ভাষায় :
‘‘…মগরা নদীতে আর লাফুনিয়া-কইজুরি বিলে
তোমার নাকের মতো বেঁকা ঘোলা জলে নাও লয়া
মনভরা গোস্বা লয়া, পেটভরা ভুক লয়া আমি
অলম্ভূত কালা বাইদে ভাইসা রবো একলা স্বাধীন!
যেন আমি বাচ্চা এক উদ
খিদা লাগলে উপ্তা ডুবে আচানক কালবাউস ধরে
কুশার-খেতের ভিত্রে বইসা খাব ফুর্তি লয়া মনে
…আমারে না পায়া যদি নিজের জাগ্না চউখে মাখো তুমি নিদ্রাকুসুম
আমি তবে পুটকিছিলা বান্দরের মতো
বসে রবো
চুপচাপ
বদ্যিরাজ
গাছের
আগায়!’’
কবিতা যেন ট্রান্সট্রোমারের কবিতায় বর্ণিত তাইবেরিয়াসের মুখ-আঁকা একটি কয়েন। কবে যে হাতে নিয়ে একে পরখ করতে গিয়েছিলাম! সেই থেকে এর দিকে অপলক তাকিয়ে থেকেছি সারাটা জীবন। অন্যরা একে যখন দেখছে তখন তারা রায় দিচ্ছে, একটাই মুখ তাতে আঁকা। আর আমি? একটি মুখের ছাঁচে দেখতে পাচ্ছি আঁকা আছে দশটি আনন।
একগামিতা, রহিরঙ্গের স্থূল রূপ আর একরৈখিকতা এড়িয়ে কবিতাকে বহুস্তর অর্থ ও সৌন্দর্যের দিকে চালিত করতে চেয়েছি আমিও—অন্য অনেক কবির মতন। আমার সাধ্যমতো অল্প পুঁজি নিয়ে। করোটির ভেতর হঠাৎ-জেগে-ওঠা এঁড়ে-কল্পনাকে সম্বল করে। উপমা-রূপক-প্রতীক-ইশারা আর সামান্য কল্পনাপ্রতিভাকে সম্বল করে। অন্ধের মতন লাঠি ঠুকে ঠুকে চলেছি গন্তব্যহীন। চলেছি অদেখার স্বর্গনরকের দিকে। কুকুরহীন, দোসরহীন একা। বন্ধু ও সারথীহীন একা। আজ মনে হয়, কবি ও শিল্পীরা ভিড়ের ভেতরেও একা।
বুঝেছি, ক্রমবিকাশের এই পর্যায়ে এসে কুহক-হেঁয়ালিঘেরা এক সন্ধ্যাভাষাই হয়ে উঠেছে কবির ভাষা। অনতিস্পষ্ট তার কুহু। নিচুস্বর তার ঘুঘুডাক। তথাপি, প্রকৃত পাঠকের ওয়েভ-লেংথে ঠিকই এর মর্ম ধরা পড়ে—এটুকুই ভরসা। কবিতাটি লেখা হয়ে যাবার পর কবির নিজের কাছেই স্থায়ী কোনো ব্যাখ্যা কি আর থাকে ! ‘Lady, three white leopards sat under a juniper-tree.’—এলিয়টের কাছে এই বাক্যের অর্থ জানতে চাওয়া হয়েছিল। এলিয়টের জবাব : ‘It means, Three white leopards sat under a juniper tree.’
মাটির নিচে, মগ্ন চৈতন্যের ভেতরে ডরম্যান্ট বীজের মতন, ফল্গুর মতন অগোচর যে পুলক-বিষাদ, কবিকে তা তুলে আনতে হয় নির্বিকল্প এক বিকল্প ভাষায়। যে-ভাষা অন্য সবার হয়েও এক-সময়-হয়ে-ওঠে কবির নিজের। আমিও প্রচলের ভাষা-ভঙ্গিকে নিজের মতন করে নতুন ছাঁচ দিতে চাই। ভাষার পাথর কুঁদে কুঁদে চেয়েছি নানা রকমের অসংখ্য প্রতিমা গড়তে। জানি না, কতটা কী করতে পেরেছি। হয়তো-বা শিব গড়তে গিয়ে গড়েছি বাঁদর!
কবিতায় ছন্দ, কাঠামো, ধ্বনি আর মূর্ত যেসব রূপকে আমরা দেখতে পাই, সেসব তো রসদমাত্র। পরমান্ন বানাতে সুজাতারও তো কিছু উপকরণ লাগে। সঠিক তাপে-আঁচে নিপুণ অনুপাত মেনেই তাকে তৈরি করতে হয় মহাভোগ। আমিও চেয়েছি তেমনটাই করতে আমার নিজের মতন।

চিরকাল একই রকম কবিতা আমি লিখতে চাইনি কখনো। চেয়েছি অনেক রকমের, অনেক স্বাদের কবিতা লিখতে। বারবার চেয়েছি অচেনা কুমারী রাস্তা ধরে হাঁটতে। যে-ধরনের কবিতা আমি আগে লিখিনি, লিখতে চেয়েছি তেমন কবিতা। প্রমিত ভাষায় কবিতা যেমন আমি অনেক লিখেছি, তেম্নি লিখেছি অপ্রমিত ভাষার কবিতাও। প্রমিত-র দহলিজে ঢুকে পড়ে অবলীলায় চালান করে দিতে চেয়েছি পূ্র্ববাংলার ভাটি অঞ্চল আর নানা অঞ্চলের ভাষাকে; এমনকী পুরান ঢাকার কুট্টিদের ভাষা শিখে নিয়ে লিখেছি ‘চান্নিপশর রাইতের লৌড়’-মতন কবিতা।…তাই কেন যেন ‘বন্দুকের চোরাচালানের মতো মনে হয় নিজেকে আমার’…মনে হয় নিজের লেখা কবিতাকেও। এটা বোধ করি সব কবিরই মনের কথা।
প্রমিতের কলোসিয়ামের পাথর ভেঙে আমি গড়তে চেয়েছি আমার নিজের জন্য একটা সিস্টিন চ্যাপেল। অথবা, শষ্প-তৃণ জড়ো করে বানাতে চেয়েছি বাসনাসম্মত একটা বাবুইপাখির বাসা। হয়তো-বা, তা করতে গিয়ে আমি ব্যর্থ হয়েছি বারবার, বহুবার। অসীম হিম্মত সহ থ্যাঁতলানো ভাঙা পায়ে উঠে দাঁড়িয়েওছি বারবার—যেদিন জরদ্গব বৃদ্ধ হয়ে যাব তখন যেন বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনাতে পারি :
‘‘…অনেক আগামীকালের প্রাসাদে বসে
আমি পান করে যাব এসব ঘটনা
প্রবল কাশির সঙ্গে মনে মনে…’’
কে না জানে, গোত্রের ভাষাকে পরিশুদ্ধ করতে হয় কবিকেই। তা সে করে নানা উপায়ে। নিজেরই অজান্তে। মানুষের কল্পনার সীমানাকে বাড়িয়ে, দেখবার দৃষ্টিকে বদলে দিয়ে, শব্দকে নতুন অর্থ ও সৌন্দর্য দিয়ে; আবার কখনো মৃত, অপ্রচলিত, ডরম্যান্ট শব্দের ভেতর নতুন রক্ত সংবহন করে। এরকম ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠার ক্রনিক ব্যামো নিজের ভেতরে বহন করতে হয় কবিকে। আমিও চেষ্টা করেছি আমার সাধ্যমতো নিজের স্বর ও আলাপকে আরও বেশি ব্যক্তিগত করে তুলতে। আবার একইসঙ্গে করে তুলতে চেয়েছি সর্বজনীন। বাঘের মতন নিজের পাগমার্ক, নিজের সিগনেচার রাখতে চেয়েছি প্রাণপণ—কল্পনায়-শব্দে-বাক্যে আর প্রতিমা-রূপকে। নাম মুছে দিলেও যেন বলে দেওয়া যায়, এটা জুয়েল নামের দোয়েল পাখির গান। এটা এই ছোট্ট বাবুইপাখির আপন হাতে বানানো খড়ের বাসাটি :
‘‘নিঃশব্দ কামানে তুমি একা বসে ভরছো বারুদ
শীতকাল গেল
নিঃশব্দ কামানে তুমি একা কেন
ভরছো বারুদ?’
—এই প্রশ্ন আমি নিজেকে করেছি বহুবার। অথবা, আমার নিজেকে আর আমার পাঠকদের শুনিয়ে বলেছি :
‘‘… তবু এই পর্যটন মুহূর্তের
অন্ধের একটি চোখে সুর্মাটানা প্রণয়ের ভাষা’’
টানা কয়েক দশক ধরে ইন্দ্রিয়ের ক্ষমজলে ডুব দিয়ে, সিনান ক’রে কবিতা নামের রায়বাঘিনীর ডেরার দিকে টেনে নিয়ে চলেছি আমার ক্রমভঙ্গুর রথ। নির্বেদের স্রোতে ভেসে যেতে দেখেছি আবহমানের ঝাউবন। সেখানে কত যে ইশারা আর কত-কত স্রোতকল্প দোলা; পর্বতের ধাপে ধাপে মনুষ্যখুলির ছায়া প্ররোচনা আকারে সাজানো।
আমার কাছে আমার কবিতা যেন এক ক্রমহননের পথ, যে আমাকে বেষ্টন করে আছে। ঝুঁকে আছে আমারই মুখের ওপর।
আমি বুঝে গেছি, সৃজনের-হননের ঘোর চক্র থেকে আমার মুক্তি নেই। সিসিফাসের মতন কেবলই পাথর ঠেলছি গত চল্লিশ বছর ধরে—একা একা। ব্যর্থ হবো, অসফল হবো জেনেও অগ্নিমুখ পতঙ্গের মতন ছুটে চলেছি আলোরূপী আলেয়ার পানে। নিজেকে শুনিয়ে বলছি :
‘‘…উঞ্চা পথ, উঞ্চা কষ্ট
কান্ধে পাত্থর লইয়া
উঠিতেছি আমি সিসিফাস!’’
আমার প্রথম পাঁচটি কবিতাবইকে এক মলাটের ভেতর এনে ২০২৩ সালে কলকাতার ‘আদম’ প্রকাশন থেকে বেরোয় আমার ‘কবিতাসংগ্রহ’। কবিতাসংগ্রহ প্রকাশিত হওয়ার পর বেরিয়েছে আরও তিনটে কবিতাবই—‘রাইকে হাওয়ায় লেখা চিঠি’, ‘দারুবিপণির ঝাঁপ ও সাদা পাতাদের হাসি’। এখন কবিতাবইয়ের সংখ্যা আটটি।
আত্মহননের আর আত্মসৃজনের ঘোরে আমি অন্ধকার কুরুর মাঠে সঙ্গিন উঁচিয়ে রয়েছি। যেখানে একটু আগেই শরশয্যা নিয়েছেন ভীষ্ম। আর নীল ভবদ্বীপে, সূর্যাস্তে হননবিরতি শেষে যুযুধান দুই শিবিরেই শাদা পতাকা উড়ছে। তখন আহত এক ঊনমানব অন্যদের নজর এড়িয়ে চুপে টলমল পায়ে হাঁ-মুখ খাঁড়ির পাশে আধ-খাওয়া চুরুট জ্বালায়।
কবিতায় আমি তাঁর মুখটুকু আঁকি।

COMMENTS