‘মেঘদুস্যুর ছায়া’ কবি মুর্শেদ জামান-এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। ৪৮ পৃষ্ঠার মানে তিন ফর্মার এই বইতে কবিতা আছে মোট ২৭টি। বইটির প্রকাশক বুকিশ। সুন্দর আল্পনার এই প্রচ্ছদটি করেছেন কবি ও গদ্যকার নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। মোটামুটি আমরা যে-ধরনের কবিতা চারপাশে দেখতে পাই, তার থেকেও এই কবিতাগুলো একটু আলাদা, আনকোরা।
কবিতার শক্তিশালী দিক তবে কী ভাষার বুনন? কবিতাকে কখনো মনে হয় আমার কাছে—জীবনকে জানা যার ভেতর থেকে এমন। আবার পরক্ষণে মনে হয়—কবিতা তো মিছা কথা, নিরিবিলি সততার কথা বলে দোকানদার যেভাবে ঠকায়।
‘চাঁদের মুখ ডুবছে যেন রূপালী বৈষ্ণব’। কবিতার এই চরণটি কবির ‘সুরমামাখা জল’ কবিতা থেকে নেয়া। চাঁদের রূপ দেখতে আমরা প্রত্যেকেই ভালোবাসি। কিন্তু চাঁদ কেবলই আড়াল করতে চায় তার এই রূপ, এমন সব রহস্যে, আলো-আঁধারির খেলায় তবে কী মেঘ? আমি যে-মেঘের বহর দেখছি এই শহরে, সেই একই মেঘ আবার কবির কবিতায় হাওরের উল্টোপিঠে, এটাও সত্য। মেঘও যে দুস্যুর মতো হয়, যার ছায়া এই শূন্যতাকেও অতিক্রম করে। সেখানে তিনি সুন্দরের খোঁজে হাঁটতে থাকেন, ‘শিকারি রাঙা পাখির পেলো মৎস্য-লোভ’।

০২
পরিবর্তন জীবনেরই ধর্ম—জড়ের নহে, মৃতেরও নহে। দুপুর, লোকজনের আনাগোনা একটু কম। এই ফাঁকে হাতে নিয়ে পড়তেছিলাম ‘মেঘদুস্যুর ছায়া’ কবিতার বইটি। হঠাৎ লক্ষ করলাম—দোকানের ভেতরে দুইটা রোশনদার, দুইটাতেই চড়ুই পাখির বাসা আছে। আমি কখনোই পাখির বাসা ভাঙি নাই, বরং প্রতিদিনই বাসা থেকে নিচে পড়ে থাকা খড়কুটো পরিষ্কার করি। এরমধ্যে একটা পাখি চলে এল, I am glad that you are back!
তখন আমার কবিজনম নয়, পাখিজনম ধরে বয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
“এখানে মেলেছে রোদালু বাতাস—পাখাহীন প্রজাপতি
জলের উপরে পেতে আছে ছটি, মাকড়েরা জালপাতি”
পাখাহীন প্রজাপতি মাটি থেকে মায়ার দূরত্ব নিয়ে কতখানি আর উড়তে পারে। অথচ কবিতার জন্য কবি পথ আঁকে, আঁকে আকাশ। যে-প্রাণ তৈরি হলো তার সরলতার কথা একজন আর্টিস্ট ছাড়া কে আর বলতে পারে, বলুন? যদি জানেন সবকিছু স্বতঃস্ফূর্ত নয়, আবার সবকিছু নির্বাকও নয়—তবু কেন আপনার/আমার ভিতরে জাগে সেই কল্পকাহিনি।

০৩
কবি মুর্শেদ জামান চাকুরির সুবাদে দীর্ঘদিন হাওর অঞ্চলে থেকেছেন। কিশোরগঞ্জের ইটনা, অষ্টগ্রাম পরিশেষে বাজিতপুর। বাজিতপুরের অনেক স্মৃতি আছে আমারও। আমার বাবার চাকুরির সুবাদে আমার থাকা হইছে বাজিতপুরে। তমালগাছ, মনে পড়ে কী আমায়? দুপুরগুলোর মতোই হেমন্তে হারিয়ে ফেলেছি যে নীল রঙের শার্টটা আমার! আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। সালটা ১৯৯১ সাল। ভিসিআরদোকানের ফাঁক দিয়ে ‘সডক’, ‘চাঁদনী’ সিনেমা দেখি। যা-ই হোক, এইসব স্মৃতি নিয়ে আরেকটা গদ্য লেখা যাবে আরেকদিন।
মুর্শেদ জামানের ‘মেঘদুস্যুর ছায়া’ পড়তে গিয়ে মনে হইছে, সেখানে কত কত রাত তিনি মগ্ন করে দিয়েছেন নিজেকে অন্তর্গতের ভাষার প্রাপ্তির আনন্দে। হাওর তাকে বলেছে নিশ্চয়ই, সত্য জেনে রাখো সখা!

০৪
“তোমার ভিতর এক অরণ্য ভিজতে থাকে, একান্ত সে।”
কবি যখন একান্ত হয় তখন বুঝতে হবে, সেও হৃদয়ের বাতাস খুলে দিতে জানে। কবির রীতি জানা নেই, কিন্তু অরণ্যের রীতি জানা আছে।
অরণ্য ছড়িয়ে দিতে জানে—মাটি, শান্ত ছায়া, ছোট-বড় বৃক্ষকে।
চন্দ্রসূর্য সাক্ষি, বনবিবি ভীষণ জোছনা পছন্দ করতেন। বনের সবুজ পাখিরা ধনুকের মতো বসে থাকত, শুধু বনবিবির হেঁটে যাওয়াটুকু দেখবে বলে। মহামতি কনফুসিয়াস বলেছিলেন—সৌন্দর্য সবকিছুরই আছে, শুধু সেটা আবিষ্কার করবার দৃষ্টি থাকতে হয়। আমি মনে করি, ‘মেঘদুস্যুর ছায়া’ বইটাতেও সেই সৌন্দর্য আছে—যদি সীমাবদ্ধতাকে জড়িত না করেন।
শুভ্র সরকার রচনারাশি
- সংক্ষিপ্ততম করে টুকে রাখা ছায়াপাঠ || শুভ্র সরকার - April 9, 2026
- একটি পুরনো হাস্যকলহ || সোহরাব ইফরান - April 7, 2026
- বাবা, মারা যাবার দিন || শুভ্র সরকার - April 3, 2026

COMMENTS