নেত্রকোনার বড়বাজারের বারুণী মেলা

নেত্রকোনার বড়বাজারের বারুণী মেলা

শেয়ার করুন:

নাগরিক উল্লাসের রঙ-রঙিন প্রবাহে এই মচকানো মনকে কিছুটা স্বস্তি ও শৈশব ফিরিয়ে দেয় বারুণী মেলার বাঁশি, টমটমগাড়ির আনন্দধ্বনি। অর্ধকিলোমিটার কিংবা আরো দূর থেকে শোনা যায় বাঁশি-বাজনা-ভেঁপু। মাটির পুতুল, আহ্লাদী পুতুল, বুড়া, পালকি, ষাঁড়, গরু, হাতি, ঘোড়া, খেলনাপাতি, খই, মুড়ি, বাতাসা নিয়ে বাড়ি ফিরছে পাড়ার ছেলেরা-মেয়েরা। আমাদের শৈশবে পুরো বছর আমরা এই মেলার জন্য অপেক্ষা করেছি। সামান্য পয়সা নিয়ে পুরো মেলা ঘুরেছি। ভাবটা এমন যেন পুরো মেলার সবকিছু কিনে ফেলব। বড়বাজারের বটগাছের নিচে কালীমন্দিরের ছোট্ট পরিসরে এই জমজমাট আয়োজন।

কে বলবে কবে থেকে শুরু হয়েছে এই আয়োজন? সন-তারিখ তো কেউ লিখে রাখেনি। নদীর পাড়ের মেলা তাই বারুণী মেলা। হিমালয়মেয়ে গঙ্গার আরেক নাম বারুণী। চৈত্রমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে শতভিষা নক্ষত্র যোগ হয় বলে এই তিথিকে বলে বারুণী। এই তিথিতেই জাদুকাটা নদীতে হয় পণাতীর্থের স্নান (পূর্ণতীর্থ থেকে এই নাম পরিবর্তিত হয়েছে বলে মনে হয়)। এ-ও এক আচারিক বিশ্বাস। সনাতনীরা স্নানে শুদ্ধ হয়ে এভাবেই জীবনে ফেরেন। বারুণী মেলার একসপ্তাহ পরে হয় অষ্টমী মেলা। অষ্টমী মেলাতেও একই উল্লাসে জমে ওঠে বটগাছতলার প্রাঙ্গণ।

আমাদের বিকশিত মনের পাশে পালবাড়ির পালেরাই ছিলেন শৈশবের নায়ক। তাদের তৈরি মাটির খেলনার চেয়ে দামি কিছু ছিল না আমাদের। মেলা ঘুরে ঘুরে আজ শৈশবটাকেই দেখলাম। মেলা উপলক্ষে কত জায়গা থেকে কতকিছু যে আসে! মানুষ সামান্য বাণিজ্য করে। পুরো মেলায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে আঠারোবাড়ির বিন্নি ধানের খই। আমতলার গুড়ের বাতাসা, উখড়া, খেলনাপাতিও মানুষ ভিড় ঠেলে পোটলা ভরে নিয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে ভালো লেগেছে পালেরা এখনো মরে যায়নি। পৃথিবীতে পাল সম্প্রদায় না-থাকলে কে রাঙাবে মাটির আবরণ? ওদের সাথে কথা বলে জানা গেল, এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েক ঘর পাল আছে নেত্রকোনায়। এই কৃতিমান পালেরাই মাটির ঐতিহ্যকে রক্ষা করে চলেছেন।

শ্যামগঞ্জের রতীশ পাল এবং নারায়ণ পালের সাথে কথা বলে জানা গেল, শ্যামগঞ্জ বাজারের পশ্চিমে পালপাড়ায় এখনো ৫০-৬০ ঘর পাল আছে। আটপাড়ার অঞ্জন পাল এবং সঞ্জয় পাল জানাল, তারাও ২৫-৩০ ঘর কাজ করেন। মেলায় মেলায় ঘোরেন। টমটমগাড়ির বাজনা বাচ্চাদের হাতে তুলে দিয়ে শান্তি পান। বড় গাড়ার পালপাড়ার গৌরাঙ্গ পালও এমন কথাই জানাল। তেলিগাতী কামারগাতী গ্রামের গোপাল পাল আক্ষেপে জানালেন, যে-কয়েক ঘর পাল আছে তাদের পরে মাটির এই ঐতিহ্যকে কে আর ধরে রাখবে?

নদীকে কেন্দ্র করেই বঙ্গীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি। নদী মরে গেলে নদীর সংস্কৃতিও মরে যায়। সম্পূর্ণ লুপ্ত হয় না। ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়।

সরোজ মোস্তফা ১৭ মার্চ ২০২৬


গানপারে মেলা
গানপারে বারুণী মেলা

শেয়ার করুন:

COMMENTS

error: You are not allowed to copy text, Thank you